এই ঘর থেকে চলে যা। মিলু একটু সরে গেল কিন্তু ঘর থেকে বের হল
না।
মিলু প্রায় কুড়ি বছর ধরে তাদের সঙ্গে আছে। দশ বছর বয়সে ভিক্ষা করতে এসেছিল। জাহানারা তার সুন্দর মুখ দেখে অবাক হয়ে বললেন, ভিক্ষা করছিস কেন বাসায় কাজ করবি? মিলু বলল, না। তিনি মেয়েটাকে একটা জামা দিলেন। পাঁচটা টাকা দিলেন। বলে দিলেন, যদি কাজ করতে ইচ্ছা হয় চলে আসিস। মেয়েটা পরের দিনই চলে এল । তিনি বললেন, কি রে থাকবি?
নাম কি তাের? ‘কুদরতী।‘
কুদরতী কোন নাম না—তাের নাম এখন মিলু। বুঝেছিস?
ইনা বল জি।‘ ‘জি।। ‘পা ছুঁয়ে সালাম কর। মিলু পা ছুঁয়ে সালাম করল ।
জাহানারা বললেন, তাের চেহারা ছবি সুন্দর তুই ভালমত থাক তাের ভাল হবে। বয়স কালে বিয়ে দিয়ে দেব। তাের বয়েসী মেয়ে পথে ঘাটে ঘুরাও ঠিক না। থাকবিতাে ঠকমত?
হ্য।‘ ই না-বল জি।‘ ‘জি।‘
ভালমত থাকবি। আদব–কায়দা শিখবি। কাজকর্ম শিখবি। সময় কালে আমি টাকা পয়সা খরচ করে বিয়ে দেব।’
জি আচ্ছ।‘
জাহানারা তার কথা রেখেছেন। মিলুর বিয়ে দিয়েছেন তাঁদের ড্রাইভার রহমতের সঙ্গে। বিয়ের পরেও মিলু ঘরেই আছে । ছেলেপুলে হয়নি। একদিক দিয়ে সুবিধাই হয়েছে। ছেলেপুলে হয়ে গেলে নিজের কাছে রাখতে পারবেন না। যেখানে যান নিজের সঙ্গে রাখেন।
শাহেদকে কোথাও পাওয়া গেল না। ডাকবাংলাের সর্ব পশ্চিমের ঘরটা নবনীর ছােট বােন শ্রাবণীর । আর তিন মাস পরেই তার আই এস সি ফাইন্যাল পরীক্ষা। দুটি কাটাতে এসেও সে নিরিবিলি পড়বে এই অজুহাতে ডাকবাংলোর সবচেয়ে সুন্দর ঘরটা নিয়ে নিয়েছে। এই ঘটা নাকি নিরিবিলি। তার ঘরের সঙ্গের বারান্দাটা নদীর দিকে। বারান্দায় দাড়ালেই নদী দেখা যায়।
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-৫
শীতকাল বলেই নদী শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। নদীর চেয়েও যা চোখে পড়ে তা হল নদীর চর । চাঁদের আলােয় বালির চর চিকচিক করে । অদ্ভুত লাগে দেখতে। শ্রাবণী এখানে আসার আগে দু‘সুটকেস ভর্তি বই নিয়ে এসেছে। এক সুটকেসে পাঠ্যবই। এক সুটকেসে গল্পবই। পাঠ্যবইয়ের সুটকেসের তালা খােলা হয়নি। গল্পের বইয়ের সুটকেস খােলা হয়েছে। সে ক্রমাগত গল্পের বই পড়ে যাচ্ছে। প্রতিটি বই তার আগেই পড়া। একবার না, কয়েকবার করে পড়। তারপরেও এমন ভাবে পড়ছে যেন নতুন বই।
নবনী ঘরে ঢুকে দেখল, শ্রাবণী খাটে পা ঝুলিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে বসে আছে। তার হাতে বই। গলায় লালরঙা মাফলার । শাবণীর গলায় লালরঙা মাফলারের মানে হল টনসিলের সমস্যা হয়েছে। কিছুদিন পর পর তার টনসিলের সমস্যা হয়। ঢোক গিলতে পারে না। সে কাউকেই কিছু বলে না। একটা লাল মাফলার গলায় পেঁচিয়ে খাওয়া–দাওয়া বন্ধ করে দেয়।
নবনী বলল, তাের কি গলাব্যথা? শ্রাবণী বই থেকে মাথা না তুলে বলল, হুঁ। জ্বর আসেনি তাে, গাল লাল লাগছে। ‘এসেছে। একশ এক পয়েন্ট ফাইভ।‘
কি পড়ছিস?‘ নির্বাচিত ভূতের গল্প । এখন পড়ছি পরশুরামের মহেশের মহাযাত্রা।
আজ কি সারাদিনই বই পড়লি?‘
মাঝখানে একবার বাবা মাছ দেখতে ডাকলেন। মাছ দেখলাম। বাবাকে খুশি করার জন্যে বিকট চিৎকার দিলাম—‘ও মগাে! এটা কি? মাছ নাকি? ওয়াক থু। মাছ এত বড় হয়?
নবনী হেসে ফেলল । শ্রাবণী হাসল না। পা নাচাতে লাগল। নবনী বলল, যত দিন যাচ্ছে তুই উতই একটা ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টর হয়ে দাঁড়াচ্ছিস। ব্যাপারটা কেউ লক্ষ্য করছে না।
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-৫
শ্রাবণী হাই তুলতে তুলতে বলল, কেউ যে করছে না তা—না, কেউ কেউ করছে। আহ আপা, এখন তুমি যাও। ভূতের গল্প এক নাগাড়ে পড়তে হয়। মাঝখানে ইন্টারাপশান হলে পড়াই মাটি। মনে হচ্ছে তুমি শাহেদ ভাইকে খুঁজছু। খুঁজে না পেয়ে বিব্রত বােধ করছ ? কাউকে মুখ ফুটে জিজ্ঞেসও করতে পারছ না।
উনি গােসল করার জন্যে কুয়ােতলায় গেছেন । ডাকবাংলােয় একটা কুয়া আছে, তুমি জান কি-না জানি না কুমার পানি অব পরিষ্কার। শাহেদ ভাই সেই পরিষ্কার পানিতে গা ধুবেন । এই ঠাণ্ডায় কুয়ার পানি? হ্যা। উনার যেহেতু টনসিলের সমস্যা নেই, ঠাণ্ডা পানিতে কিছু হবে না।’ কুয়ার পানিতে গােসলের বুদ্ধি কি তুই দিয়েছিস?”
শ্রাবণী পা নাচাতে নাচাতে বলল, । গতকাল কুয়ার পানিতে আমি গােসল করে ঠা গিয়েছি। আজ লাগাবেন শাহেদ ভাই। আপা, এখন কি তুমি যাবে? গল্পটা শেষ করতে চাই। তুমি এক কাজ কর, কুয়ার পাড়ে চলে যাও। আমার বারান্দা দিয়ে নামার সিড়ি আছে। এসাে, তােমাকে দেখিয়ে দিচ্ছি। ‘দেখাতে হবে না।’
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-৫
নবনী কি করবে ঠিক ভেবে পেল না। শেষ পর্যন্ত কুয়ালার দিকে রওনা হল । ডাকবাংলাের জায়গাটা অনেক বড়। কাঁটা তার দিয়ে ঘেরা। পেছনে রীমিত আম কাঠালের বাগান। নবনীরা দু’দিন পার করে দিয়েছে, এখনাে ডাকবাংলাের চারপাশে ভাল করে দেখা হয়নি। সে জানতােই না– এদের কুয়ােতলাও আছে। ডাকবাংলােয় সাধারণত কুয়া থাকে না।
শাহেদ শােসল শেষ করে হি হি করে কাঁপছে। তার গায়ে মােটা টাওয়েল । শাহেদ একা নয়। ডাকবাংলাের কেয়ারটেকার দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে হারিকেন । মালীও আছে। সে এতক্ষণ পানি তুলে দিচ্ছিল।
নবনী কুয়ালার পাশে এসে দাঁড়াল। সহজ গলাল বলল, কেমন আছ?
শাহেদ বলল, খুব খারাপ আছি। শ্রাবণীর কথা শুনে পুরােপুরি বিভ্রান্ত হয়েছি। সে বলেছে কুয়ার পানি গরম। আমি সরল মনে বিশ্বাস করেছি।
বললেই তাে ওরা গরম পানি করে দিত।
Read More