হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-৭

জামিল সাহেব বললেন, সুরুজ মিয়া আপনি অনেক ঝামেলা করেছেনএখন বাসায় গিয়ে বিশ্রাম করুনমেনি থ্যাকস। 

মাছটা কাটায় তারপর যাব স্যার । এতবড় মাছ সবাই কাটতে পারে নাপেটি নষ্ট হয়ে যাবেমাছ কাটার লােক এবং বটি নিয়ে এসেছি‘ 

ভাল করেছেন

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে জামিল সাহেব ইতস্তত করে বললেন, মাছ যে কাটবে সে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন তাে? আমার স্ত্রী আবার এইসব ব্যাপারে—খানিকটা কি যেন বলে শূচিবায়ুর মত আছে| সুরুজ মিয়া হাসি মুখে বললেন, আপনি এটা নিয়ে চিন্তা করবেন না, স্যার। আমি তারে সাবান দিয়ে গােসল করায়ে তারপর মাছের কাছে নিয়ে যাবময়লা হাতে মাছ ছোঁয়াও ঠিক নাআমি এখনি তারে গােসলে পাঠায়ে দেই। 

শ্রাবণী বলল, চেয়ারম্যান চাচা, আপনার সঙ্গে আমার খুব জরুরি একটা কথা আছে অসম্ভব জরুরি? 

কি কথা মা?‘ 

সবার সামনে বলা যাবে নাআপনি আমার সঙ্গে বারান্দার ঐ মাথায় আসুন। 

সুরুজ মিয়া বিম্বিত এবং আনন্দিত মুখে এগুলেন । বিস্মিত ও আনন্দিত হবার মৃ কারণ হচ্ছে মন্ত্রী সাহেবের মেয়ে তাকে চাচা ডাকছে। আফসােসের ব্যাপার হল, ডাকটা বাইরের কেউ শুনতে পায়নি। ওসি সাহেব সামনে নেই। সে শুনলেও কাজ হত। আর দশ জনের কাছে বলত। 

সুরুজ মিয়া বললেন, কি কথা আম্মা ‘আপনি কি আমার জন্যে একটা জিনিস জোগাড় করে দিতে পারবেন? 

অবশ্যই পারব। এখানে না পাওয়া যায়, ঢাকা থেকে নিয়ে আসব। রাত একটায় একটা ট্রেন আছে। ঐ এনে লােক পাঠায়ে দিব।’ 

‘ঢাকা থেকে আনতে হবে না। আমার মনে হয় এখানেই পাওয়া যাবে। হয়ত আপনার বাড়িতেই আছে।’ 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-৭

জিনিসটা কি? ‘একটা মই।’ 

মই! মই কি জন্যে? এই ডাকবাংলাের ছাদে উঠার ব্যবস্থা নেই। আমি মই দিয়ে ছাদে উঠব। ‘আমি এক্ষণ মই নিয়া আসতেছি।’ 

‘এখনি আনার দরকার নেই। এখন আনলে বাবা দেখে ফেলবেন, রেগে যাবেন। আপনি বরং কাল সকালে নিয়ে আসবেন। নটার আগে। ন’টা পর্যন্ত বাবা ঘুমিয়ে থাকেন। তিনি কিছু জানতে পারবেন না। 

সুরুজ মিয়া ভীত গলায় বললেন, স্যার যদি রাগ করেন তাহলে কাজটা করা কি ঠিক হবে আম্মা ‘কোন অসুবিধা নেই। আপনি তাে আর জানেন না কি জন্যে আমি মই চেয়েছি। আমি আপনার কাছে চেয়েছি। আপনি সরল মনে এনে দিয়েছেন।’ 

নবনীর ঘরটা ছেড়ে দেয়া হয়েছে শাহেদের জন্যে। ডাকবাংলােয় আরেকটা সুন্দর কামরা ছিল, অনেক বড়, এটাচড় বাথ। কিন্তু সেই কামরায় জানালার একটা কাচ ভাঙ্গা। ভাঙ্গা জানালায় শীতের হাওয়া ঢুকছে। শাহেদকে এখানে থাকতে দেয়া যায় না। তা ছাড়া তার জ্বর আসছে বলে মনে হচ্ছে। অবেলায় কুয়ার পানির গােসলের ফল ফলতে শুরু করেছে। গা ম্যাজ ম্যাজ করছে। রাতে সে চিতল মাছের একহাত সাইজ পেটি খেতে পারেনি। খানিকটা মুখে দিয়েই বলেছে, খেতে খুব ভাল হয়েছে কিন্তু আমি খেতে পারছি । থার্মোমিটারে এখনাে জ্বর পাওয়া যাচ্ছে না। জামিল সাহেব বললেন, ডাক্তার খবর দেব? 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-৭

শাহেদ বলল, এখানে ডাক্তার আছে 

‘এখানে নেই । মাধবনগরে একজন এমবিবিএস আছেন। লােক পাঠিয়ে নিয়ে আসি। বেশিক্ষণ লাগবে না। যাবে আর আস 

লাগবে না। ভাল ঘুম হলেই শরীর ঠিক হয়ে যাবে।’ ‘তাহলে রাত করার কোন দরকার নেই। তুমি শুয়ে পড়।’ 

শাহেদ ঘুমুতে গেল। জাহানারা বার বার বলে দিলেন, কোন অসুবিধা হলেই আমাদের ডেকে তুলবে। তাছাড়া আমাকে ডেকে তুলতেও হবে না। আমি বলতে গেলে সারারাত জেগেই থাকি। আমার ঘুম হয় না। 

ঘুম হয় না কেন?’ 

নতুন জায়গায় আমার ঘুম হয় না । ঘুমের অষুধ খেলেও হয় না । দশ-পনেরাে দিন এখানে থাকলে জায়গাটা পুরনাে হবে, তারপর ঘুম হবে। এই জন্যে বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না। তােমার চাচা জোর করে নিয়ে এসেছেন। আগে একবার এসেছিলেন— তখন নাকি জায়গাটা খুব মনে ধরেছিল—খুব সুন্দর, হেনতেন, কত কথা। 

জায়গা তাে সুন্দরই।’ 

সুন্দরের কি আছে বাংলাদেশের সব জায়গাই তাে এরকম। নদী, গাছপালা, মাঠ, আলাদা কিছু তাে না। তাও যদি ডাকবাংলােটা সুন্দর হত। পাকা দালান করে রেখেছে। বাংলাে হবে কাঠের। তার উপর দেখ ইলেকট্রিসিটি আছে, কিন্তু অন্য কোন সুযােগ সুবিধা নেই। একটা ফ্রিজ নেই, ওয়াটার হিটার নেই। ইলেকট্রিসিটির যে অবস্থা! এই আছে, এই নেই। সারাক্ষণ হ্যাজাক জ্বালিয়ে রাখতে হয়। হিস হিস শব্দ আসে—আমার মনে হয় ঘরে সাপ ঢুকেছে। শাহেদ, শুতে যাবার আগে তােমার চা বা কফি খাবার অভ্যাস আছে 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-৭

অভ্যাস নেই। কিন্তু আজ এক কাপ গরম চা খাব।’ তুমি তােমার ঘরে চলে যাও। আমি চা বানাচ্ছি।’ আপনাকে বানাতে হবে না, চাচি। কাউকে বলুন, বানিয়ে দেবে।’ 

কাউকে বলতে হবে না। চা আমিই বানাব। আমি নিজেও খাব। নিজের চা নিজে না বানালে আমি খেতে পারি না।’ 

চা নিয়ে এল নবনী । ট্রেতে করে এক কাপ চা, এক গ্লাস পানি। শাহেদ চা খাবার পর পর এক গ্লাস পানি খায় । 

শাহেদ চাদর মুড়ি দিয়ে বিছানায় বসে আছে। তার হাতে গত সপ্তাহের টাইম। এ সপ্তাহের টাম বের হয়ে গেছে। আগের সপ্তাহেরটা পড়া হয়নি। কোথায় যেন পড়েছিল– ছুটি কাটাতে এসে আপটুডেট কিছু পড়তে নেই। পুরনাে জিনিস পড়তে হয় । খবরের কাগজও পড়া যাবে না। পড়লেও মাস খানিক আগের বাসি কাগজ পড়তে হবে। 

নবনী বলল, জ্বর কি এসে গেছে। 

“আমার মনে হচ্ছে এসেছে, থার্মোমিটার বলছে না। তােমাদের থার্মোমিটার নষ্ট না তাে? নবনী শাহেদের কপালে হাত রেখে হাসি মুখে বলল, থার্মোমিটার নই, তােমার গা গরম। প্যারাসিটামল খাবো প্যারাসিটামল আছে । না তুমি বস তাে খানিকক্ষণ। 

নবনী বসল। শাহেদ বলল, আমি এসেই তােমাকে ঘরছাড়া করছি তুমি ঘুমু কোথায়? 

শ্রাবণীর সনে। 

কাল জানালার কাচটা লাগিয়ে ফেললে—আমি ঐ ঘরে চলে যেতে পারব। তুমি ফিরে আসবে তােমার জায়গায়।

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-৮

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *