তোমারই ভুল ছিল-মুহাম্মদ বরকত আলী

তোমারই ভুল ছিল-মুহাম্মদ বরকত আলী

নিঝুম রাত। চারিদিকিকে ঝিঝি পোকার ডাক। গ্রামের রাত খুব সহজেই অনুভব করা যায়। গ্রামের মানুষ সন্ধ্যার পর পর ঘুমে যায়। সেই সাথে ঘুমে যায় সারা গ্রাম, গ্রামের প্রকৃতি। কিন্তু রাতকে জানান দিয়ে যায় ঝিঝি পোকার দল, জোনাকি পোকা, আরও অজানা প্রাণির কোলাহল। সামনে মাসেই তপুর এইচ এসসি পরীক্ষা।
একটা চাটায়ের ঘরে নিজের মত নিরবে পড়ছে তপু।
ঘরের ভিতর ধানের বস্তা সাজানো, হাড়িপাতিল, একটা বাইসাইকেল আর অন্যান্য প্রয়োজনিও অপ্রয়োজনিও জিনিস পত্র। এটা তপুর দুলা ভাইয়ের বাড়ি।
তপুর দুলা ভাই বিদেশে যাওয়া উদ্দ্যেশে বাড়ি থেকে বের হয়েছে। সাথে বাড়ির অন্যান্য পুরুষেরাও গেছে।তপুর বোনের বিয়ে নিজ গ্রামে হওয়াতে বাড়ি ঠেকানোর দায়িত্বটা এসে পড়েছে তপুর ঘাড়ে। তপু পড়ে চলেছে রাতকে আর রাতের ঘুমকে উপেক্ষা করে। হঠাৎ কেমন যেনো শব্দ হলো।
তপু হকচকিয়ে গেলো। না জানি কোনো চোর এসেছে। কিছুক্ষন চুপ থাকার পর আবার শব্দ।
শব্দটা বাইরে থেকে আসছে। যদি চোর এসে থাকে আর সব কিছু চুরি করে নিয়ে যায়, তাহলে তপুর
উপর একটা ভিতুর ছিল পড়বে। তাই আর দেরি না করে হাতে একটা লাঠি নিয়ে দরজা খুলে বাইরে আসতেই কে যেনো তপুকে এক ধাক্কায় ভিতরে নিয়ে যায়।
হারিকেনের আলোয় চকচক করে একটা মেয়ের মুখ। মেয়েটার নাম সিমু। যে মেয়েটা তপুকে
ভালোবাসে। তপুকে বারবার প্রস্তাব দিয়েও ফিরে দেয় তপু। আজ সে সুযোগ পেয়েছে। তপু কোনো কথা বলার আগেই কারা যেনো বাইরে থেকে দরজার সিকল তুলে দেই।

তপু এখন কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। এত রাতে তার ঘরে একটা পূর্ণ যুবতী মেয়ে। সিমু কান্দা
শুরু করেছে। মনে হচ্ছে ন্যাকামো কান্না। তপু এরি মধ্যে বেশ কয়েক বার জিজ্ঞাসা করেছে সে
এত রাতে এখানে কেন? কিন্তু এত উত্তর কান্নার আওয়াজ ছাড়া কিছুই পাই নি। এ এক মহা
বিপদ। কিছুতো বলছে না বরং কানা কাটি করে বিভ্রান্তিকর অবস্থায় ফেলে দিচ্ছে। বাইরে কারা যেনো কানা ঘুষা শুরু করে দিয়েছে। এবার তপুর হুস ফিরে এলো।
কারো যেনো তার ঘরের দরজার শিকল তুলে দিয়েছে। সিমু ঘরের ভিতর ঢোকার পরপর এত
তাড়াতাড়ি লোক আসা অসম্ভব একদম অসম্ভব।
তাহলে কি তপুকে পরিকল্পিত ভাবে বিপদে ফেলছে? নিশ্চয়। বাইরে থেকে পরিচিত লোকের হাক
এলো, “এই ঘরের ভিতর কারা রে? এটা হাসানের গলার স্বর। এই গলার স্বর তপুর পূর্ব পরিচিত। হাসান যে তপুর বন্ধু! হাসানের সাথে সাথে আরও কয়েক জনের গলার আওয়াজ পাওয়া গেলো। ওদের কথা শুনে তপুর বুবু আর জায়েরা ঘুম থেকে জেগে উঠেছে।
আস্তে আস্তে বাড়ির পাশের লোকের কানে পৌছালো। তারপর মূহুর্তের মধ্যে পূরো গ্রাম জেগে গেছে। এখনো বাইরে থেকে শিকল উঠানো। বেড়ার ফাক দিয়ে দেখা যাচ্ছে কয়েক জনের হাতে লাঠি, হাত কুড়াল, দা ইত্যাদি।
তপুর বাবাকে ডাকা হয়েছে। মড়ল মাতব্বর ডাকা হয়েছে। বসে পড়লো শালিসে। সিমু হলাহল
মিথ্যা বললো যে, তপুর সাথে আমার চার বছরের সম্পর্ক।
আজ রাতে সে আমাকে এখানে আসতে বলেছে। তপু নির্বাক। সে বুঝতে পেরেছে তার কথা বিশ্বাস করা হবে না। তাই অযথা বেশি কথা খরচ করতে রাজি না সে। মাথাটা খুব যন্ত্রনা করছে। মনে
হচ্ছে এখনি সে পড়ে যাবে।
তপু বাবা দিকে এক পলক তাকিয়ে চোখ নামিয়ে বললো, “বাবা, এসব মিথ্যে কথা। সব সাজানো।
সিমু অনেক দিন থেকেই আমাকে পছন্দ করে। আমি ওকে না করে দিয়েছি, তাই ওর এই আয়োজন। ”
তপুর বাবা চুপ করে থাকে। কোনো কথা বলে না। তপুকে জানে কেমন ছেলে। মড়ল মাতব্বর কথার
প্যাচ লাগিয়ে দিচ্ছে। হাসান সহ আরও যারা এসেছিল সবার কথা হলো বিয়ে পড়িয়ে দেওয়া।
শেষ মেষ তাই ঠিক করা হলো। তপুকে কয়েক জন পুকুরে নিয়ে গেছে গোসল করাতে। শিতের
মৌসুম। রাত দুইটা আড়াইটা বাজে। পুকুরে গোসল করা খুব কষ্টের ব্যাপার। কিন্তু গন্ধ সাবানটা
নিয়ে তপু পুকুরে নেমে পড়েছে। এখন তপুর কোনো শিত করছে না। রাগে অভিমানে আর কিছুটা
ভয়ে শিত পালিয়ে গেছে। রানা বার বার করে তপুকে বলেছে পালিয়ে যেতে। কিন্তু সে পালাবে না।
পালালে ওরা ধরে নিবে সত্যি সত্যি তপু এই অপরাধি।
তারপরও যে তাকে পাওয়ার জন্য মান সম্মান ধুলোই মিশিয়ে দিলো

অন্তত তপু তার দৌড় দেখতে চাই। চারিদিকে পাহারা দিচ্ছে যেনো তপু পালাতে না পারে।

রাত চারটার সময় বিয়ের কাজ সম্পুর্ন হলে তপুকে বাড়িতে যেতে না দিয়ে সিমুর বাড়ি নিয়ে
যাওয়া হলো
সবার বাসর ঘর ছেলের বাড়িতে হলেও তপুর বাসর রাত হলো শশুর বাড়ি। দুজনেই একই ঘরে। এখন আর কারো কোনো বাধা নেই। রাত আর বেশি নেই
কিছুক্ষনের মধ্যেই ফজরের আযান ভেসে আসবে। সিমু নব বধু সেজে বসে আছে খাটে।
তপু খাটের এক কোনায় চুপচাপ বসে আছে। সিমু কিছু একটা বলার জন্য এগিয়ে আসতেই তপু
দাঁড়ালো।
সিমুকে থামিয়ে বললো, কি ভেবেছো তুমি? আমাকে ব্ল্যাক মেইল করে বিয়ে করলেই সব হয়ে গেলো? না, না সিমু না। ভালোবাসা জোর করে পাওয়া যায় না। তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছো,
আমাকে কাদিয়েছো। ভালোবাসার মানুষকে যেকোনো মুল্যে পেতেই হবে? একবারও
ভাবলে আমাকে তুমি পেলে সুখি হবে কিন্তু তোমাকে আমার জন্য পাওয়াটা সুখের কিনা?
আমাকে
কষ্ট দিয়ে তুমি তোমার ভালোবাসা আদায় করেছো।
সুতরাং তুমি শুধুমাত্র তোমার নিজের সুখটাই দেখেছো। তুমি নিজেকে ভালোবাসো, আমাকে না।
ভালোবাসা মানে প্রেমিক সুখি রাখা।
সিমুকে কোনো কথাই বলতে দিলো না তপু। সকাল হয়ে এসেছে। মোরগের ডাক শোনা
যাচ্ছে। সকালের নাস্তা না করেই বের হলো
তপু।

( অসমাপ্ত গল্প)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *