হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস দরজার ওপাশে খন্ড-৪

দরজার ওপাশে খন্ড-৪

শুধু মাথা ভেজানোর জন্যে গিয়েছিলাম, পুরো শরীর ভিজিয়ে ফেললাম । আরাম লাগছে । একটু শীত ভাব হচ্ছে- আরামদায়ক শীত ভাব । অর্থাৎ আমি সুখ পাচ্ছি । এই সুখের স্বরুপ জানলেই দুঃখ কি তা জেনে ফেলব । ভেজাল বাণী তাই বলেছে । চোখ বন্ধ করে কলের নিচে মাথা পেতে আছি । সারাদিন এভাবে বসে থাকলে কেমন লাগবে । চোখ বন্ধ থাকায় বৃষ্টির মত লাগছে । মনে হচ্ছে আষাঢ় মাসের মুষল বর্ষণে গা পেতে আছি ।

মেসের ঠিকা ঝি ময়নার মা’র কথা কানে না এলে কল্পনা আরো ফেনানো যেত । ময়নার মা চলে এসেছে । সে কথা না বলে এক মুহুর্ত থাকতে পারে না । আশেপাশে কেউ নেই বলে কথা বলছে বাসনগুলির সঙ্গে । মানুষের সঙ্গে কথা বললে তেমন কৌতুহলী হতাম না । বাসন কোসনের সঙ্গে কথা বলছে বলেই কৌতুহলী হয়ে শুনতে ইচ্ছা হচ্ছে । মানুষ শুধু যে প্রাণী জগতের সঙ্গেেই সম্পর্ক স্থাপন করতে চায় তাই না, জড় জগতের সঙ্গেও চায় ।

ময়নার মা চাপা গলায় গভীর বেদনার সঙ্গে বলছে, চেপ্টা থালা । আমিও চেপ্টা, তুইও চেপ্টা । আমার চেপ্টা কপাল, তরও চেপ্টা কপাল । কান্দাভাঙা ডেকচি । তর যেমন কান্দাভাঙা, আমারও কান্দাভাঙা । তর কান্দা ভাঙছি আমি ময়নার মা । ক’দেহি আমার কান্দা কে ভাঙছে ?

দরজার ওপাশে খন্ড-৪

ময়নার মা’র কথা শোনার ইচ্ছা করছে, ক্ষুদ্র এবং নির্দোষ ইচ্ছা । এটা ঠিক হচ্ছে না । কলের পানি আরো জোরে ছাড়তে পারলে কাজ হতো । পানিতে আর জোর নেই । আমি বাথরুমে থেকে বের হয়ে এলাম । ময়নার মা আমাকে দেখে লম্বা ঘোমটা দিল ।ঘোমটার আড়াল থেকে বলল, আব্বার শইল ভাল ? সে গোড়া থেকেই আব্বা ডাক ধরেছে । নিষেধে কাজ হয়নি ।

‘ভাল । তুমি কেমন আছ, ময়নার মা?’

‘আমি হইলাম আফনের কান্দাভাঙা ডেগ । আফনের মাথার দরদ কমছে?’

‘কয়েকদিন হচ্ছে না।’

‘বদ্যি গেরামের একখান তেল আছে, মাথার দরদে খুব আরাম । আফনেরে আইন্যা ‍দিমু।’

‘আচ্ছা দিও।’

‘দেশের বাড়িত কেউ নাই, যাওয়া পড়ে না । আফনের জইন্যে যামু।’

আমি চুপ করে রইলাম । আমার দিক থেকে কোন সাড়া পেলে সে কথা বলা থামাবে না।

‘মাথার দরদ ভাল জিনিস না । ময়নার বাবা মরল মাথার দরদে । ফাগুন মাসে আমার পরথম বলল, আইজ কাজে যামু না- মাথার মইদ্যে দরদ । আমি কইলাম এইটা কেমুন কথা? মাথার মইদ্যে দরদ হইছে বইল্যা কাম কামাই করবেন? যান কামে যান। তা ধরেন মানুষটা গেল…’

ময়নার মা’র এই গল্প আগেও কয়েকবার শোনা । আবারো শুনতে ইচ্ছা হচ্ছে । ভেজা কাপড়ে দাঁড়িয়ে গল্প শুনছি । শুনতে মোটেও ইচ্ছা করছে না । গল্পটা আবার বলতে পেরে সে যতটা আনন্দ পাচ্ছে আমি ঠিক ততটাই বিরক্ত হচ্ছি । সব মিলে সমান সমান।

দরজার ওপাশে খন্ড-৪

রফিকের কাছে যাব বলে ভেবেছিলাম তার প্রয়োজন হল না । ভেজা কাপড়ে দোতলায় উঠে দেখি রফিক বারান্দায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে । অত্যন্ত সুপুরষ একজন মানুষ। আমার ধারণা, সে ছেড়া শার্ট গায়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও তাকে রাজপুত্রের মত লাগবে । সে শেভ করেনি । মুখে খোঁচা-খোঁচা দাঁড়ি । তার পরেও এত সুন্দর দেখাচ্ছে। আমি আনন্দিত গলায় বললাম, কি খবর রফিক?

রফিক একবার আমার দিকে তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল । জবাব দিল না । চুপ করে রইল । প্রশ্ন করলে সে কখনো জবাব দেয় না । আগে কিছুটা ‍দিত, ইদানীং একেবারেই দিচ্ছে না । ব্যাপারটা যত অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে আসলে তত অস্বাভাবিক না । প্রশ্ন করলে চুপ করে থাকার কারণ সে নিজেই ব্যাখ্যা করছে । সেই ব্যাখ্যা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য বলেই মনে হয়েছে । স্কুলে পড়ার সময় স্যারেরা তাকে প্রশ্ন করতেন, পড়া ধরতেন । সে যে উত্তরই দিত মার খেতে হত । মার থেতে থেতে প্রশ্নর উপরই তার এক ধরণের ভীতি জন্মে গেছে ।

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস দরজার ওপাশে খন্ড-৫

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *