সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-১০)

নয়ন রহস্য

‘আমি সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াই। আমার অঢেল টাকা । এক পয়সা। নিজে উপার্জন করিনি, সব বাপের টাকা। উইল করেননি, তবে আমিই একমাত্র সন্তান, তাই সব টাকাই আমি পাই । কিসের টাকা জান ? গন্ধদ্রব্য। পারফিউম । কুন্তলায়নের নাম শুনেছ ? ‘সে তাে এখনাে পাওয়া যায়,’ বললেন জটায়ু ।। “হ্যাঁ। বাবারই আবিষ্কার, ব্যবসাও বাবারই। এখন এক ভাইপাে। দেখে। আমার কোনাে ইনটারেস্ট নেই। আমি সংগ্রাহক। 

‘কী সংগ্রহ করেন ?  ‘নানান মহাদেশের এমন সব জিনিস যার জুড়ি নেই ।একমেবা দ্বিতীয়। কিচোমাের কথা বললাম। এছাড়া আছে দুহাতে একসঙ্গে লিখতে পারে এমন একটি সেক্রেটারি । জাতে মাওরি। নাম টোকোবাহানি। আরাে আছে। একটি ব্ল্যাক প্যারট তিন ভাষায় কথা বলে। একটি দুইমাথা বিশিষ্ট পমেরেনিয়ান কুকুর, লছমনঝুলার একটি সাধু উড্ডীনানন্দ, মাটি থেকে দেড় হাত উপরে শুনাে আসনপিড়ি হয়ে বসে। ধ্যান করে। তাছাড়া |

‘ওয়ান মিনিট সার,বলে লালমােহনবাবু বাধা দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া হল । হাতের লাঠি মাথার উপর তুলে চোখ রক্তবর্ণ করে তারকনাথ চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ইউ ডেয়ার ইনটারাপ্ট মী! | ‘সরি সরি সরি স্যার । জটায়ু কুঁকড়ে গেছেন- ‘আমি জানতে চাইছিলুম আপনার সংগ্রহের মধ্যে যারা মানুষ, তারা কি স্বেচ্ছায় আপনার ওখানে রয়েছে ? 

নয়ন রহস্য (পর্ব-১০)

‘তারা ভালাে খায়, ভালাে পরে, ভালাে বেতন পায়, আরাম পায় আদর পায়—থাকবে না কেন ? হােয়াই নট ? আমার কথা আর আমার সংগ্রহের কথা পৃথিবীর অনেক দেশের অনেক লােকেই জানে ; তােমরা না জানতে পার । আমেরিকা থেকে একজন সাংবাদিক এসে আমার সঙ্গে কথা বলে দেশে ফিরে গিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসে “দ্য হাউস অফ ট্যারক” বলে এক প্রবন্ধ লেখে। 

এবার তরফদার মুখ খুললেন । ‘অনেক কথাই ত জানা গেল, কেবল আপনার এখানে আসার কারণটা ছাড়া। ‘এটা আবার বলে দিতে হবে ? আমি ওই খােকাকে আমার সংগ্রহের জন্য চাই। কী নাম যেন ? ইয়েস—জ্যোতিষ্ক। আই ওয়ন্ট জ্যোতিষ্ক ।  ‘কেন? সে তাে এখানে দিব্যি আছে,’ বললেন তরফদার। খাওয়া 

পরার অভাব নেই, যত্নআত্তির অভাব নেইসে আমার ডেরা ছেড়ে আপনার ওই উদ্ভট ভিড়ের মধ্যে যাবে কেন তারকনাথ তরফদারের দিকে প্রায় আধ মিনিট চেয়ে থেকে বললেন, ‘গাওয়াঙ্গিকে একবার দেখলে তুমি এমন বেপরােয়া কথা বলতে পারতে ‘হােয়াট ইজ গাওয়াঙ্গি ? প্রশ্ন করলেন জটায়ু ‘নট হােয়াট, বাট হু, গম্ভীরভাবে বললেন তারকনাথ নট বস্তু, বাট ব্যক্তি ইউগান্ডার লােক

পৌনে আট ফুট হাইট, চুয়ান্ন ইঞ্চি ছাতি, সাড়ে তিনশাে কিলাে ওজনকোনাে ওলিম্পিক ওয়েট লিফটার ওর কাছে পাত্তা পাবে নাএকবার টেরাইরের জঙ্গলে একটা বাঘকে ঘুমপাড়ানি ইনজেকশনের গুলি মারে, কারণ বাঘটার গায়ে স্পট এবং ডােরা দুইই ছিল একমেবাদ্বিতীয়মসেই বাঘকে কাঁধে করে সাড়ে তিন মাইল বয়ে এনেছিল গাওয়াঙ্গিসে এখন আমার একনিষ্ঠ সেবক

নয়ন রহস্য (পর্ব-১০)

আপনি কি আবার দাসপ্রথা চালু করলেন নাকি ?’ জটায়ু বেশ সাহসের সঙ্গে প্রশ্ন করলেন  নাে স্যার! গজিয়ে উঠলেন টি এন টি। গাওয়াঙ্গিকে যখন দেখি তখন তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার ইউগ্যাডার রাজধানী কাম্পালা শহরে এক শিক্ষিত পরিবারের ছেলেবাপ ডাক্তার

তাঁর কাছেই শুনি গাওয়াঙ্গির যখন চোদ্দ বছর বয়স তখনই সে প্রায় সাত ফুট লম্বাবাড়ির বাইরে বেরােয় না । কারণ রাস্তার লােকে ঢিল মারে ইস্কুলে ভর্তি হয়েছিল, কিন্তু ছাত্রদের বিদ্রুপের ঠেলায় বাধ্য হয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনতে হয়আমি যখন তাকে দেখি তখন তার বয়স একুশভবিষ্যৎ অন্ধকার চুপচাপ ঘরে বসে থাকে সারাদিনদেখে মনে হল এইভাবে সে আর বেশিদিন। বাঁচবে না। সেই অবস্থা থেকে তাকে আমি উদ্ধার করে আনি

আমার কাছে এসে সে নতুন জীবন পায়সে আমার দাস হতে যাবে কেন ? আমি তাকে নিজের সন্তানের মতাে স্নেহ করিআমাদের সম্পর্ক পিতা-পুত্রের সম্পর্ক যাই হােক তারকবাবু’,বললেন তরফদার, আপনার অনুরােধ রাখতে পারলাম না। আমি জ্যোতিষ্ককে চিড়িয়াখানার অধিবাসী হিসেবে কল্পনা করতে পারি না এবং চাইও না। গাওয়াজির বিবরণ শােনার পরেও এটা বলছ বলছি‘ 

ভদ্রলোেক যেন একটু দমে গিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তাই যখন বলছ তখন এই ছেলেটিকে একবার দেখতে পারি কি সেটা সহজ ব্যাপারআপনি সেই কলকাতার উত্তর প্রান্ত থেকে এসেছেন, আপনার জন্য এতটুকু করতে পারব না ? নয়ন এসে দাঁড়াতে তারাবু তার দিকে ভুরু কুঁচকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আমার বাড়িতে কটা ঘর আছে বলতে পার ? ‘ছেষট্টি। এবার তারকনাথ উঠে দাঁড়িয়ে তার লাঠির রুপপা দিয়ে বাঁধানাে মাথাটা ডান হাতের মুঠো দিয়ে শক্ত করে ধরে বললেন, ‘রিমেমবার, তরফদার-টি এন টি অত সহজে হার মানে না। আমি আসি।’ 

নয়ন রহস্য (পর্ব-১০)

ভদ্রলােক চলে যাবার পর আমরা কিছুক্ষণ কোনাে কথাই বললাম না । য়নকে তার ঘরে পাঠিয়ে দিলেন তরফদার। অবশেষে লালমােহনবাবু ফেলুদার দিকে ফিরে বললেন, ‘চার দিয়ে ত অনেক কিছু হয়না মশাই ? চতুর্দিক, চতুর্ভুজ, চতুর্মুখ, চতুর্বেদ-এই চারটিকে কী বলব তাই ভাবছি। | ‘চতুলোভী বলতে পারেন। বলল ফেলুদা।

‘চার জনই যে লােভী তাতে ত কোনাে সন্দেনেই। তবে লােভী হয়েও যে কোনাে লাভ হল না সে ব্যাপারে সুনীলকে তারিফ করতে হয়। ‘আরিফ কেন স্যার ?’ বললেন তরফদার  ‘এত সােজা অঙ্ক। সে ছেলে আমার বাড়িতে মানুষ হচ্ছে সুস্থ পরিবেশে । আমি তাকে দেখছি । সে আমাকে দেখছে। স্রেফ লেনদেনের ব্যাপার । এ অবস্থার পরিবর্তন হবে কেন ? আমরা তিনজন উঠে পড়লাম। 

একটা কথা বলি তােমাকে, তরফদারের কাঁধে হাত রেখে বলল ফেলুদা, আর আপয়েন্টমেন্ট না ।  ‘পাগল ! বললেন তরফদার। এক দিনেই যা অভিজ্ঞতা হল, এর পরে আবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট !’ ‘তবে এটা বলে রাখি নয়নকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে যদি আমার প্রয়ােজন হয়, তাহলে আমি তৈরি আছি । ছেলেটির উপর আমার মায়া পড়ে গেছে। | ‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার, থ্যাঙ্ক ইউ । প্রয়ােজন হলেই খবর পাবেন।‘ 

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-১১)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *