সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-১৩)

নয়ন রহস্য

‘সিড়ির সামনের মেঝেতে ছড়িয়ে আছে রক্ত, আর সেই রক্ত থেকে পায়ের ছাপ সদর দরজার দিকে চলে গেছে। সেই ছাপ পরে মেপে দেখেছিলম্বায় ষােল ইঞ্চি।‘যে ! লালমােহনবাবু কথাটা শেষ করতে পারলেন না। তারপর ? বলল ফেলুদা।তরফদার বলে চললেন, “আমাদের দরজায় কোল্যাপসিবল গেট লাগানাে। রাত্তিরে সে গেট তালা দিয়ে বন্ধ থাকে। সেই গেট দেখি অর্ধেক খােলা, আর তালা ভাঙা।

সেই আধখােলা গেটের বাইরে মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে আমার দারােয়ান ভগীরথ । ভগীরথের পাশ দিয়ে আরাে রক্তাক্ত পায়ের ছাপ চলে গেছে পাঁচিলের দিকে।‘জলের ঝাপটা দিয়ে ত কোনােরকমে ভগীরথের জ্ঞান ফিরিয়ে আনলাম। সে চোখ খুলেই ‘দানাে ! দানাে!’ বলে আর্তনাদ করে আবার।

ভির্মি যায় আর কি ! যাই হােক, তার কাছ থেকে যা জানা গেল তা হচ্ছে এই—মাঝরাত্তিরে সদর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সে খৈনি ডলছিল। দরজার বাইরে একটা লাে পাওয়ারের বাতি সারারাত জ্বলে । এই আবছা আলােয় ভগীরথ হঠাৎ দেখে যে একটা অতিকায় প্রাণী পাঁচিলের দিক থেকে তার দিকে এগিয়ে আসছে।

প্রাণীটা যে পাঁচিল টপকে এসেছে তাতে সন্দেহ নেই, কারণ গেটে রয়েছে সশস্ত্র প্রহরী।  ‘ভগীরথ বলে সে একবার চিড়িয়াখানায় গিয়েছিল ; সেখানে গরৈলা” বলে একটা জানােয়ার দেখে। এই প্রাণীর চেহারা কতকটা সেইরকম, কিন্তু তার চেয়েও ঢের বেশি লম্বা আর চওড়া। এর বেশি ভগীরথ আর কিছু বলতে পারেনি, কারণ তার পরেই সে সংজ্ঞা হারায়। 

নয়ন রহস্য (পর্ব-১৩)

‘বুঝেছি’, বলল ফেলুদা। দানােটা তারপর কোল্যাপসিবল গেট ভেঙে ভেতরে ঢােকে, আর তখনই তােমার বিশ্বস্ত বাদশা দানােটার পায়ে কামড় দিয়ে তাকে জখম করে। এবং তার ফলেই দাব তার কাজ অসমাপ্ত রেখে পলায়ন করে। কিন্তু যাবার আগে সে প্রতিশােধ নিয়ে যায়। বাদশার ঘাড় মটকানাে মৃতদেহ পড়ে ছিল সদর দরজা থেকে ত্রিশ হাত দূরে-তার মুখের দুপাশে তখনাে রক্ত লাগা।

 আমি মনে মনে বললাম–এই ঘটনায় যদি খুশি হবার কোনাে কারণ থাকে সেটা এই যে টিএটির উদ্দেশ্য সিদ্ধি হয়নি। | ফেলুদা চিন্তিত ভাবে চুপ করে আছে দেখে তরফদার অধৈর্য হয়ে বলে উঠলেন, কিছু বলুন, মিস্টার মিত্তির ? ‘বলার সময় পেরিয়ে গেছে সুনীল’, গম্ভীর স্বরে বলল ফেলুদা। এখন করার সময় । 

‘কী করার কথা ভাবছেন ? ‘ভাবছি না, স্থির করে ফেলেছি। ‘কী ? ‘দক্ষিণ ভারত যাবাে। ম্যাড্রাস দিয়ে শুরু। নয়ন ইজ ইন গ্রেট ডেঞ্জার। তার যাতে অনিষ্ট হয় এটা দেখার ক্ষমতা তােমাদের নেই। এখানে প্রদোষ মিত্রকে প্রয়ােজন। তরফদারের মুখে হাসি ফুটে উঠল। ‘আপনি যে আমাকে কতটা নিশ্চিন্ত করলেন তা বলতে পারব না। আপনি অবশ্য আপনার প্রােফেশনাল কাপাসিটিতে কাজ করবেন।

আপনার পারিশ্রমিক আর আপনাদের তিনজনের যাতায়াত ও হােটেল খরচা আমি দেব । আমি মানে—আমার পৃষ্ঠপােষক। ‘খরাচের কথা পরে । তােমাদের যাওয়ার তারিখ ত উনিশে ডিসেম্বর, কিন্তু কোন ট্রেন সেটা জানি না। ‘কােমণ্ডল এক্সপ্রেস। ‘আর হােটেল ? ‘সেও রােমণ্ডল। ‘বুঝেছি । তাজ কােমল। তাই ত?” 

নয়ন রহস্য (পর্ব-১৩)

‘হ্যা, আর আপনারা কিন্তু ফার্স্ট ক্লাস এ সি.-তে যাচ্ছেন! এখনই আপনাদের নাম আর বয়স একটা কাগজে লিখে দিন। বাকি কাজ সব শঙ্কর করে দেবে। ফেলুদা বলল, বুকিং-এ অসুবিধা হলে আমাকে জানিও। রেলওয়েতে আমার প্রচুর জানাশােনা। তরফদাররা গেলেন পৌনে দশটায়, তারপর ঠিক পাঁচ মিনিট বাদেই ফেলুদার একটা ফোন এল যেটা যাকে বলে একেবারে অপ্রত্যাশিত ।

কথাটথা বলে সােফায় বসে শ্রীনাথের সদ্য আনা চায়ে একটা চুমুক দিয়ে ফেলুদা বলল, কাল ডিরেক্টরি খুলে দেখেছি, এই নামে শুধু দুটো ফোন আছে। ‘এইসব সামান্য ব্যাপারে আপনার সাসপেন্স তৈরি করার প্রবণতাটা আমার মােটই ভালাে লাগে না, মশাই,’ বললেন জটায়ু ! কার ফোন সেটা হেঁয়ালি না করে বলবেন ? 

হিঙ্গোয়নি।’ যার কথা কাগজে বেরিয়েন্টুে ? ..। “ইয়েস স্যার। তেওয়ারির পার্টনার । ‘এই ব্যক্তির কী দরকার আপনার সঙ্গে ? ‘সেটা ওর ওখানে গেলে বােঝা যাবে । ভদ্রলােক বললেন কর্নেল দালালের কাছে আমার প্রশংসা শুনেছেন। ‘ও, গতবছরের সেই জালিয়াতির মামলাটা ? ‘অ্যাপয়েন্টমেন্ট হয়েছে ? ‘সেটা আমার কথা থেকেই আপনার বােঝা উচিত ছিল ; আপনি মনােযােগ দেননি। 

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-১৪)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *