সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-২২)

নয়ন রহস্য

আমরা গাড়ি থেকে নেমে সামনে এগােনর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লালমােহনবাবু একটা জটায়ু-মার্কা প্রশ্ন করলেন। ‘এ ত বল্লভদের কীর্তি, তাই না মশাই ? ফেলুদা তার গলায় একটা বাজখাঁই টান এনে বলল, ‘পল্লব,মিস্টার গাঙ্গুলী, পল্লব। নট বল্লভ।‘কোন সেঞ্চুরি ? ‘সেটা খােকাকে জিজ্ঞেস করুন, বলে দেবে। লালমােহনবাবু অবিশ্যি সেটা আর করলেন না; খালি মৃদুস্বরে একবার সজারু বলে চুপ করে গেলেন।

আমি জানি মহাবলীপুরম সপ্তম শতাব্দীতে তৈরি হয়েছিল।| প্রথমেই শাের টেম্পল বা সমুদ্রের ধারের মন্দিরটা দেখা হল। মন্দিরের পিছনের পাচিলের গায়ে ঢেউ এসে ঝাপটা মারছে। ‘এরা স্পট সিলেক্ট করতে জানত মশাই, ঢেউয়ের শব্দের উপরে গলা তুলে মন্তব্য করলেন জটায়ু ।। | ডান পাশে দূরে একটা হাতি আর একটা ষাঁড়ের মূর্তির পাশে কয়েকটা ঘােট ঘােট মন্দিরের মতাে জিনিস রয়েছে। ফেলুদা বলল সেগুলাে পাণ্ডবদের রথ।

যেটা দেখতে কতকটা বাংলার গাঁয়ের কুঁড়ে ঘরের মতাে, সেটা হল দ্রৌপদীর রথ।’ মাথা ঘুরে গেল গঙ্গাবতরণ দেখে। এটাকে অবিশ্যি অর্জুনের তপস্যাও বলা হয়। বাইরেই রয়েছে ব্যাপারটা, আর বােঝাই যায় যে একটা বিশাল পাথরের স্ল্যাব দেখে শিল্পীদের এই দৃশ্য খােদাই করার আইডিয়া মাথায় আসে। দুটো বিরাট হাতি, আর তার চতুর্দিকে অজস্র মানুষের ভিড়। লালমােহনবাবু নয়নকে নিয়ে এখনাে আমাদের পাশেই ছিলেন, দশাটার দিকে চোখ রেখে বললেন, ‘এত ছেনি-হাতুড়ির কাজ, তাই না ? 

নয়ন রহস্য (পর্ব-২২)

‘হ্যা, গভীরভাবে বলল ফেলুদা। তবে ভেবে দেখুন—হাজার হাজার প্রাচীন ভাস্কর্যের নমুনা রয়েছে আমাদের সারা দেশ জুড়ে, দশ বার শতাব্দী ধরে সেগুলাে তৈরি হয়েছে, অথচ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে দেখলেও তার সামান্যতম অংশেও একটিও হাতুড়ির বেয়াড়া আঘাত বা ছেনির বেয়াড়া অ্যাঙ্গেলের চিহ্ন পাবেন না । এ ত মাটি নয় যে আঙুলের চাপে এদিক ওদিক করে ত্রুটি সংশােধন হয়ে যাবে ; পাথরের ত্রুটি শুধরানাের কোনাে উপায় নেই। এ যুগে সেই পারফেকশনের সহস্রাংশও আর অবশিষ্ট নেই। কোথায় গেল কে জানে! 

তরফদার আর শঙ্করবাবু এগিয়ে গিয়েছিলেন ; ফেলুদা বলল, ‘যা, তােরা গিয়ে পঞ্চপাণ্ডব আর মহিষমণ্ডপ গুহাগুলাে দেখে আয়। আমি এটা আরেকটু খুঁটিয়ে দেখছি। তাই সময় লাগবে। | ফেলুদার কাছ থেকে গাইড বুকটা চেয়ে প্ল্যান দেখে বুঝে নিলাম গুহা দুটো দেখতে কোনদিকে যেতে হবে । লালমােহনবাবুকে মুখে বলে বুঝিয়ে দিলাম। তবে তিনি এখন মহাবলীপুম ছেড়ে অতলান্তিকে চলে গেছেন, তাই আমার কথা কানে গেল কি না জানি না ।

না গেলেও, আমি এগােনর আগেই তিনি গল্প শুরু করে নয়নকে নিয়ে এগিয়ে গেলেন। কিছুদূর গিয়ে ডাইনে ঘুরে দেখি একটা কাঁচা রাস্তা পাহাড়ের গা দিয়ে ওপরে উঠে গেছে। প্ল্যান বলেছে এটা দিয়েই যেতে হবে। ঢেউয়ের আওয়াজ এখানে কম ; তার চেয়ে বেশি জোরে শুনছি লালমােহনবাবুর গলা। মনে হচ্ছে গল্প ক্লাইম্যাক্সে পৌছচ্ছে। 

একটু এগিয়ে গিয়েই দেখি পঞ্চপাণ্ডব গুহায় পৌছে গেছি—অন্তত বাইরের সাইনবাের্ডে তাই বলছে। আমি ঢােকার আগেই জটায়ু নয়নকে নিয়ে গুহা থেকে বেরিয়ে রাস্তা দিয়ে আরাে উপরে উঠে গেলেন । বুঝলাম আশ্চর্য সব শিল্পের নমুনা লালমােহনবাবুর কাছে মাঠে মারা যাচ্ছে। ফেলুদার আদেশ, তাই পঞ্চপাণ্ডব গুহায় খানিকটা সময় দিলাম।

নয়ন রহস্য (পর্ব-২২)

একটা ঘাড় ফেরানাে গরু আর তার পাশে দাঁড়ানাে বাছুরের দৃশ্য দেখে মনে হল যে ঠিক এই দৃশ্য আজও বাংলার যে কোনাে গ্রামে দেখা যায়। শুধু গরু বাছুর কেন, মহাবলীপুরমের হাতি হরিণ বাঁদর ষাঁড় ইত্যাদি দেখে বুঝতে পারি তেরশাে বছরেও এদের চেহারার কোনাে পরিবর্তন হয়নি। অথচ পােশাক বদলের জন্য সেযুগের মানুষকে আজ আর চেনার কোনাে উপায় নেই। গুহা থেকে বেরিয়ে কয়েকটা পরিবর্তন লক্ষ করলাম, যেগুলাে কানে আর চোখে ধরা পড়ল । 

এক, সূর্য ঢেকে গেছে ছাই রঙের মেঘে । গুড়গুড়নি যে মেঘের ডাক তাতে কোন সন্দেহ নেই রােদের তেজটা চলে গিয়ে এখন সমুদ্রের হাওয়াটা আরাে বেশি টের পাওয়া যাচ্ছে । সবচেয়ে বেশি তফাত ধরা পড়ে কানে। সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাস ছাড়া চারিদিকে কোনাে শব্দ নেই।আমি গুহাতে পাঁচ মিনিটের বেশি থাকিনি। সামনে মহিষমর্দিনী গুহা । তার ভিতর থেকে লালমােহনবাবুর গলা পাওয়া উচিত। কারণ গল্পের বেশ জমাটি অংশে তিনি গুহায় পৌছেছিলেন ।

অবিশ্যি তিনি গুহাতে না ঢুকেই এগিয়ে গিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু কেন ? ওদিকে ত আর কিছু দেখার নেই ! কোথায় গেলেন ভদ্রলােক নয়নকে নিয়ে ? | কেমন জানি একটা সংশয়ের ভাব আমাকে চেপে ধরল। আমি দেখলাম মহিষমর্দিনী গুহার দিকে আমি দৌড়তে শুরু করেছি। | গুহার পাশে পৌছতেই আরেকটা শব্দ আমার আতঙ্ক সপ্তমে চড়িয়ে দিল । ‘হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ টি- এন টি-র হাসি ! | ঊর্ধ্বশ্বাসে সামনে ছুটে গিয়ে মােড় ঘুরে একটা সাংঘাতিক দৃশ্য দেখে আমার নিশ্বাস মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল । 

নয়ন রহস্য (পর্ব-২২)

দেখলাম একটা লাল-সাদা ডুরে-কাটা জামা আর কালাে প্যান্ট পরা এক অতিকায় কৃষ্ণকায় প্রাণী—যাকে দানব বললে খুব ভুল হয়  —এক বগলে জটায়ু আর অন্য বগলে নয়নকে নিয়ে দ্রুত পা ফেলে ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে। | ভয়াবহ দৃশ্য, কিন্তু তখন আমার মাথায় খুন চেপে গেছে, আর তার ফলে শরীরে এনার্জি আর মনে সাহস এসে গেছে। আমি ‘ফেলুদা! বলে একটা চীৎকার দিয়ে প্রাণপণে ছুটে গেলাম দানবটার দিকে—আমার উদ্দেশ্য পিছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার একটা পা জাপটে ধরে তার হাঁটা বন্ধ করব । 

কিন্তু যা ভেবেছিলাম সেটা করেও কোনাে ফল হল না। পা জড়িয়ে ধরতেই প্রথমে দানবটা একটি বিকট চীৎকার দিল বুঝলাম যেখানে বাদশা কামড়েছিল ঠিক সেখানেই আমি চাপ দিয়েছি। তার পরমুহূর্তে দেখলাম সেই জখম পায়ের ঝটকানিতে আমি মাটি থেকে শুন্যে উঠে গেছি।

তারপর চোখের পলকে দেখি আমি নয়নের সঙ্গে একই বগলের নীচে বন্দী হয়ে হাওয়া কেটে এগিয়ে চলেছি, আমার পা দুটো পেণ্ডুলামের মতাে দুলছে। দৈত্যটার মাংসপেশীর চাপে আমার নিশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে এলেও আমি শুনতে পাচ্ছি অন্য বগলের তলা থেকে লালমােহনবাবুর মাগাে ! মাগাে ! আর্তনাদ। 

আর হাসি ? সামনে বিশ হাত দূরে তারকনাথ হাসতে হাসতে লাফাচ্ছেন আর দুনি হাত মাথার উপর তুলে লাঠি ঘােরাচ্ছেন। ‘কেমন ? গাওয়াঙ্গি কাকে বলে দেখলে ? তারস্বরে প্রশ্ন করলেন টি এন টি। কিন্তু এখন ত আর তিনি একা নেই। তাঁর পিছন থেকে এগিয়ে এসে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে দুজন লােক। তার মধ্যে একজন অদ্ভুতভাবে সামনে ঝুঁকে পড়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে বকের মতাে এগিয়ে আসছেন আমাদের দিকে। 

 

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-২৩)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *