সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-২৪)

নয়ন রহস্য

ভদ্রলােক হাত বাড়িয়ে দিলেন লালমােহনবাবুর দিকে । জটায়ু দেখলাম নিজেকে সামলে নিয়েছেন, আর বেশ ভাটের সঙ্গেই হ্যান্ডশেকটা করলেন। মনে পড়ল ফেলুদাই একবার জটায়ুকে বলেছিল—‘হ্যান্ডশেকটা পুরােপুরি সাহেবী ব্যাপার, তাই ওটা করতে হলে সাহেবী মেজাজেই করবেন, মিনমিনে বাঙালি মেজাজে নয়। মনে রাখবেন—গরুষােরের গ্রিপ আর মাছখােরের গ্রিপ এক জিনিস নয়।’

মনে হয় সেটা মনে রেখেই জটায়ু বেশ শক্ত করে আগন্তুকের হাতটা ধরে দুবার সারা শরীর দুলিয়ে ঝাকুনি দিয়ে হাতটা টেনে নিয়ে বললেন, ‘সিট ডাউন, মিস্টার– ভদ্রলােক একটা সােফায় বসে বললেন, “আমার নাম বললে আপনারা চিনবেন না। আমি এসেছি মিঃ তেওয়ারির কাছ থেকে । ওঁর সঙ্গে আমার বহুদিনের আলাপ। এ ছাড়া আমার আরেকটা পরিচয় আছে—আমিও আপনারই মতাে একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। আমার কোম্পানির নাম ছিল ডিটেকনীক ।

সাতাশ বছর আগে কলকাতায় এই কোম্পানি স্টার্ট করে । নাইনটীন সিক্সটি এইটে, আজ থেকে বাইশ বছর আগে, আমি বষে চলে যাই আমার কোম্পানি নিয়ে । তাই আপনার নাম শুনলেও আপনার | চেহারার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি । আই অ্যাম সারপ্রাইজড—কারণ আপনার চেহারা দেখে গােয়েন্দা বলে মনেই হয় না। কিছু মনে করবেন , মিস্টার মিটার, বাট ইউ লুক ভেরি অর্ডিনারি।

নয়ন রহস্য (পর্ব-২৪)

বরং একে— আগন্তুক ফেলুদার দিকে দৃষ্টি ঘােরালেন। জটায়ু গলাটা রীতিমতাে চড়িয়ে বললেন, “হি ইজ মাই ফ্রেন্ড মিস্টার লালমােহান গ্যাঙ্গুলী, পাওয়ারফুলি আউটস্ট্যান্ডিং রাইটার।। ‘আই সী।’ ‘আপনি কোথাকার লােক ? ভদ্রলােক যা বললেন, তাতে ছাগলের গলায় খাড়ার কোপ পড়ার মতাে শব্দ হল । 

‘ক । ‘কচ্ছ ? ‘ইয়েস..যাই হােক, যে কারণে আসা…’ ভদ্রলােক কোটের পকেট থেকে একটা পােস্টকার্ড সাইজের ফোটো বার করে জটায়ুর দিকে এগিয়ে দিলেন। আমি খুব যে কাছে ছিলাম, তা, নয়, কিন্তু তাও বুঝতে পারলাম সেটা হিঙ্গেরানির ছবি । 

‘এই লােকের হয়ে আপনি কাজ করছেন প্রােফেশানালি, তাই না ? ফেলুদা নির্বিকার । জটায়ুর চোখ এক মুহূর্তের জন্য কপালে উঠে নেমে এল। আমাদের ধারণা ফেলুদা যে হিঙ্গেরানির হয়ে কাজ করছে সেটা বাইরের কেউ জানে না । ইনি জানলেন কী করে ? | ‘তাই যদি হয়’, বললেন আগন্তুক, তাহলে আমি আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী। কারণ আমি তেওয়ারির দিকটা দেখছি ।

ওর ব্যাপারটা আমি কাগজে পড়ে ওর সঙ্গে যােগাযােগ করি। বাইশ বছর পরে আমার হদিস পেয়ে সে আনন্দে লাফিয়ে ওঠে। কলকাতায় থাকতে আমি ওকে অনেক ব্যাপারে হেলপ করি, সেটা ও ভােলেনি। বলল—আই নীড ইওর হেল্প এগেন।—আমি রাজি হই, আর তক্ষুনি কাজে লেগে যাই । প্রথমেই | হিঙ্গেরানির বাড়িতে ফোন করে জানতে পারি ও কলকাতায় নেই। ওর এক ভাইপাে ফোন ধরেছিল; বলল—আল কোথায় যাচ্ছেন তা বলে যাননি।—আমি এয়ারলাইনসে খােজ করে ম্যাড্রাসের প্যাসেঞ্জার লিস্টে ওর নাম পাই।

নয়ন রহস্য (পর্ব-২৪)

বুঝতে পারি তেওয়ারির শাসানির ফলে সে ভয়ে চম্পট দিয়েছে। এর পর আমি ওর বাড়িতে যাই। ওর বেয়ারার কাছে জানতে পারি যে কদিন আগে তিনজন বাঙালী হিরানির সঙ্গে দেখা করতে আসেন, তাদের একজনের নাম মিত্তর। আমার সন্দেহ হয়। আমি ডাইরেক্টরি থেকে আপনার নম্বর বার করে ফোন করি। একজন সার্ভেন্ট ফোন ধরে বলে যে আপনি ম্যাড্রাস গেছেন। আমি দুয়ে দুয়ে চার হিসেব করে ম্যাড্রাস যাওয়া স্থির করি । কাল এখানে এসেই ফোনে সব হােটেলে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি হিরােনি করােমণ্ডলে আছেন। আমি জিজ্ঞেস 

করি—মিটার বলে আছেনকেউ ?-উত্তর পাই, হ্যা আছেন ; পি. মিটার। তখনই স্থির করি আপনার সঙ্গে দেখা করে লেটেস্ট সিচুয়েশনটা জানাবাে। এটা আপনি স্বীকার করছেন ত যে হিঙ্গোরানি আপনাকে অ্যাপয়েন্ট করেছে তাকে প্রােটেক্ট করার জন্য ? ‘এনি অবজেকশন ? ‘মেনি। আমরা তিনজনেই চুপ। ফেলুদা কিন্তু মাঝে মাঝে সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়ার রিং ছাড়ছে, দেখে বােঝার কোন উপায় নেই তার মনে কী আছে। ‘তেওয়ারির সিন্দুকের ঘটনা এখন কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে জানেন ? বললেন আগন্তুক ।। 

কলকাতার কাগজে বেরিয়েছে কি ? জটায়ুর প্রশ্ন। ইয়েস। সম্পূর্ণ নতুন তথ্য। এতে কেসটার চেহারাটাই পালটে যায়। কাগজ পড়েই আমি তেওয়ারির সঙ্গে যােগাযােগ করি। আপনি যাঁর প্রাণরক্ষার ভার নিয়েছেন তিনি কেমন লােক জানেন ? হি ইজ এ স্বীক, স্কাউড্রেল অ্যান্ড নাম্বার ওয়ান লায়ার। 

নয়ন রহস্য (পর্ব-২৪)

ভদ্রসােক শেষের কথাগুলাে বললেন ঘর কাঁপিয়ে। জটায়ু প্রাণপণ চেষ্টা করেও তার কথায় আতঙ্কের রেশ ঢাকতে পারলেন না। ‘হা-হাউ টু ইউ নােহাে ? ‘তার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। হিঙ্গেরানি তেওয়ারির সিন্দুক থেকে পাঁচ লক্ষের উপর টাকা চুরি করেছে। সিন্দুকের তলা থেকে হিঙ্গারানির আংটি পাওয়া গেছে—পলা বসানাে সােনার আংটি। ওর আপিসের প্রত্যেকে ওই আংটি চিনেছে ।

আংটিটা গড়িয়ে একেবারে পিছন দিকে চলে গিয়েছিল। তাই এতদিন বেরােয়নি। পরশু বেয়ারা মেঝে সাফ করতে গিয়ে পায়। এটাই হচ্ছে আমার রঙের তুরুপ। দিস্ উইল ফিনিশ হিঙ্গেরানি । ‘কিন্তু যখন চুরিটা হয় তখন ত হিঙ্গোরাজ—ঘুড়ি, হিরােনি—আপিসে ছিলেন না। ননসেন্স ! গর্জিয়ে উঠলেন ডিটেকটিভ ! ‘হিঙ্গোরানি চুরিটা করে মাঝরাত্তিরে, আপিস টাইমে নয়। গােয়েঙ্কা বিন্ডিং-এ টি এইচ সিন্ডিকেটের আপিস।

সেই বিল্ডিং-এর দারােয়ানকে পাঁচশাে টাকা ঘুষ দিয়ে হিরােনি আপিসে ঢেকে রাত দুটোয় । একথা দারােয়ান পুলিশের দাবড়ানিতে স্বীকার করেছে। সিন্দুকের কম্বিনেশন তেওয়ারি হিঙ্গোরানিকে বলেছিল, সেটা তেওয়ারির এখন পরিষ্কার মনে পড়েছে। প্রায় বছর পনের আগে তেওয়ারির জনডিস হয়, হাসপাতালে ছিল, খুব খারাপ অবস্থা। হিঙ্গোরানি তখন তার পার্টনার আর ঘনিষ্ঠ বন্ধু

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-২৫)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *