সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-৬)

নয়ন রহস্য

আজ্ঞে হ্যাঁআমি এখন অত্যন্ত হালকা বােধ করছিনয়নের মাস্টার, ডাক্তার, জামাকাপড়—সব কিছুর খরচ উনি দিচ্ছেনএকটা প্রশ্ন অবিশ্যি উনি আমাকে করেন, সেটা হল কলকাতার বাইরে ভারতবর্ষের অন্য বড় শহরে শশা করার আমবিশন আমার আছে কিনাআমি জানাই যে সেদিনই সকালে আমি ম্যাড্রাস থেকে একটা টেলিফোন পেয়েছি মিঃ রেড্ডি নামে এক থিয়েটারের মালিকের কাছ থেকে

রবিবার রাত্রে আমার শাে দেখে ভদ্রলােকের একজন কলকাতাবাসী সাউথ ইন্ডিয়ান বন্ধু রেড্ডিকে নয়নের কথা টেলিফোনে জানান তাই পরদিন সকালেই রেড্ডি আমাকে ফোন করেনখবরটা শুনে পৃষ্ঠপােষক জানতে চাইলেন আমি রেড্ডিকে কী বলেছিআমি বললাম—আমি ভাববার জন্য সময় চেয়েছি

তাতে পৃষ্ঠপােষক বলেন, তুমি এক্ষুনি রেড্ডির আমন্ত্রণ অ্যাক্সেপ্ট করছ বলে টেলিগ্রাম কর দক্ষিণ ভারত সফরে যাবে তুমি শুধু ম্যাড্রাস নয়, আরাে অন্য শহরে শাে করবে তুমিসব খরচ আমার| তােমাকে খরচের হিসাব দিতে হবে না ? জিজ্ঞেস করল ফেলুদা | ‘তা ত বটেই, বললেন তরফদারসে কাজের ভার নেবে আমার ম্যানেজার ও বন্ধু শঙ্কর। ও খুব এফিশিয়ান্ট লােক।

নয়ন রহস্য (পর্ব-৬)

পনের মিনিট যে চলে গেছে সেটা টের পেলাম যখন চাকর এসে বলল যে একটি সাহেব, আর তার সঙ্গে একটি বাঙালিবাবু এসেছেন। এখানে নিয়ে এস, বললেন তরফদারজটায়ু দেখলাম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নড়েচড়ে বসলেন, কারণ এখন থেকে ফেলুদা নিবাকসাহেবের মাথায় ধবধবে সাদা চুল হলেও বয়স যে বেশি না সেটা চামড়ার টান ভাব দেখেই বােঝা যায়। 

তরফদার উঠে দাঁড়িয়েছিলেন, আগন্তুকদের বসতে বলে নিজেও বসলেন। ফেলুদা জায়গা করে দেবার জন্য আমাদের সােফাতেই লালমােহনবাবুর পাশে এসে বসল ‘আমার নাম স্যাম কেলারম্যান, বললেন সাহেবআর ইনি আমার ইন্ডিয়ার রিপ্রেজেনটিটিভ মিস্টার ব্যাস্যাক।’ লালমােহনবাবু কাজে লেগে গেলেনইউ আর অ্যান ইমপ্রেসােরিয়া—থুড়ি, ইমপ্রেসারিও ?  ইয়েসআজকাল ভারতীয় কালচার নিয়ে আমাদের দেশে খুব মাতামাতি চলছে

মহাভারত নাটক হয়েছে, মুভিও হয়েছে, জানেন বােধহয়তাতে ভারতীয় ঐতিহ্যের একটা নতুন দিক খুলে গেছে। ‘সাে ইউ আর ইনটারেস্টেড ইন ইন্ডিয়ান কালচার ? আই অ্যাম ইনটারেস্টেড ইন দ্যাট কিডইউ মীন—সান অফ গােট ? আমি এটাই ভয় পেয়েছিলাম । আমেরিকানরা যে মানুষের বাচ্চাকেও কিড বলে সেটা লালমােহনবাবু জানেন না।এবার মিঃ বসাক মুখ খুললেন। ‘ইনি জ্যোতিষ্কর কথা বললেন; মিঃ তরফদারের শাে-তে যে ছেলেটি অ্যাপিয়ার করে। | ‘উনি ছেলেটি সম্বন্ধে কী জানতে চান সেটা বলবেন কি ?

নয়ন রহস্য (পর্ব-৬)

বললেন তরফদার। মিঃ বসাক প্রশ্নটা অনুবাদ করে দেওয়াতে কেলারম্যান বললেন, ‘আমি চাই এই আশ্চর্য ছেলেটিকে আমাদের দেশের দর্শকের সামনে হাজির করতে। এর যা ক্ষমতা তা ভারতবর্ষ ছাড়া কোনাে দেশে সম্ভব হত না। অবিশ্যি কিছু স্থির করার আগে আমি একবার ছেলেটিকে দেখতে চাই, এবং তার ক্ষমতারও একটু নমুনা পেতে চাই।’ 

বসাক বললেন, ‘মিঃ কেলারম্যান পৃথিবীর তিনজন সবচেয়ে বিখ্যাত ইমপ্রেসারিওর একজন। একুশ বছর ধরে এই কাজ করছেন। ছেলেটিকে পাবার জন্য ইনি অনেক মূল্য দিতে প্রস্তুত। তাছাড়া টিকিট বিক্রী থেকেও যা আসবে তার একটা অংশও ছেলেটি পাবে। সেটা চুক্তিতে লেখা থাকবে। 

তরফদার বললেন, ‘মিঃ কেলারম্যান, দ্য ওয়ান্ডার কিড ইজ পার্ট অফ মাই মাজিক শাে । তার আমাকে ছেড়ে আর কোথাও যাবার প্রশ্নই উঠতে পারে না। সামনে আমার দক্ষিণ ভারত ট্যুর আছে—ম্যাড্রাস দিয়ে শুরু । সেখানে এই ছেলের খবর পৌঁছে গেছে, এবং তারা উগ্রীব হয়ে আছে এর অদ্ভুত ক্ষমতা দেখার জন্য। ভেরি সরি, মিঃ কেলারম্যান—আমি আপনার অনুরােধ রাখতে পারলাম না।

নয়ন রহস্য (পর্ব-৬)

কেলারম্যানের মুখ লাল হয়ে গেছে। তাও তিনি ধরা গলায় অনুবােধ করলেন, ‘ছেলেটিকে একবার দেখা যায় ? আর সেই সঙ্গে যদি তার ক্ষমতার… ?  ‘তাতে অসুবিধে নেই।’ বললেন তরফদার। তারপর চাকরকে দিয়ে। নয়নকে ডেকে পাঠালেন। নয়ন এসে তরফদারের সােফার হাতলে কনুই রেখে দাঁড়াল।

দিনের বেলা তাকে এত কাছ থেকে দেখে অদ্ভুত লাগছিল। এমন একটা ক্ষমতা যে ওর মধ্যে আছে সেটা দেখে বােঝার কোনাে উপায় নেই—যদিও চাউনিতে বুদ্ধির ছাপ স্পষ্ট। কেলারম্যান অবাক হয়ে কিছুক্ষণ নয়নের দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর মৃদুস্বরে, নয়নের দিক থেকে চোখ না সরিয়ে, বললেন, ওকি আমার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের নম্বর বলে দিতে পারে ? 

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-৭)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *