লীনা ও পান্ন হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ততক্ষণে রঙ–খেলা চরমে উঠেছে ভেতরের বাড়ির উঠোনে বালতি বালতি পানি ঢেলে ঘন কাদা করা হয়েছে। মাঝ বয়েসী একটি ভদ্রমহিলাকে সবাই মিলে গড়াগড়ি খাওয়াচ্ছে সেই কাদায়। ভদ্রমহিলার শাড়ি জড়িয়ে গেছে, ব্লাউজের বােতাম গিয়েছে খুলে। তিনি ক্রমাগত গাল দিচ্ছেন। কিন্তু সেদিকে কেউ কান দিচ্ছে না।
সবাই হাসছে, সবাই চেচাচ্ছে। লীনা ও পন্নির বিমর্ষ ভাব কেটে গিয়েছে। তারাও মহানন্দে জুটে পড়েছে সে খেলায়। পান্না ঘূর্তিতে ঘন ঘন চেঁচাচ্ছে। এমন মজার ব্যাপার সে বহু দিন দেখে নি।
জরী এসে দাঁড়িয়েছে বারান্দায়। সে সবার দিকে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসছে। তার একটু লজ্জা–লজ্জা করছে। পরী কাদামাখা শরীরে জরীকে জড়িয়ে ধল। জরী বলল, ‘আপা, কখন এসেছিস?
এই তাে এখন তাের কেমন লাগছে জরী? ‘কী কেমন লাগছে? ‘বিয়ে। জরী হাসতে লাগল।
রঙ ছোঁড়াছুড়ির হাত থেকে বাঁচবার জন্য হােসনে সাহেব অতিরিক্ত ব্যস্ততায় দোতলায় উঠে এসেছেন। তাঁর গায়ে শার্ক–স্কিনের দামী কোট—নষ্ট হলেই গেল। বিয়েটিয়ের সময় মেয়েদের কোনাে কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। উঠোনের কাদায় গড়াগড়ি করাতেও তাদের বাধবে না।
নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ
দোতলায় তিনি আনিসের ঘরটি খুঁজে পেলেন না। হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলেন শেষ প্রান্তে। সেখানে কিশােরী মেয়েদের দলটি সিগারেট টানছে। তারা হােসেন
সাহেবকে দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। তিনি নিজেও বিস্মিত, তবু হা হা * মুখে বললেন, ‘আনিসের ঘরটা এক জন দেখিয়ে দাও তাে।’
কেউ নড়ল না।
আনিসের ব্যথা এখন একেবারেই নেই। শরীর বেশ হালকা ও ঝরঝরে লাগছে। জমাদার এসেছিল ঘর ঝাঁট দিতে, কেডপ্যান সরিয়ে নিতে, তাকে দিয়ে পানি আনিয়ে আনিস দাড়ি কামাল। মুখ ধােওয়া, চুল ব্রাশ করা আগেই হয়েছে। হালকা গােলাপী একটা সিল্কের শার্ট বের করে পরল। বিয়েবাড়ি উপলক্ষে কত লােকজন আসে, এ সময় কি বাসি কাপড়ে ভূত সেজে শুয়ে থাকা যায়? বেশ লাগছে আনিসের।
মাঝে মাঝে এক চমৎকার সময় আসে। মনে হয় বেঁচে থাকাটা খুব একটা মন্দ ব্যাপার নয়। খবরের কাগজ দিয়ে গেছে খানিক আগে। আনিস আধশোওয়া হয়ে বসে আছে খবরের কাগজ কোলে নিয়ে। খবরের কাগজ কোলে নিয়ে বসে থাকাটাও রােমাঞ্চকর ব্যাপার। আনকোরা নতুন কাগজ। এখনাে ভাঁজ ভাঙা হয় নি। ইচ্ছা করলেই পড়া শুরু করা যায়। তবে আনিস এইভাবে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। তার পড়া শুরু হয় ভেতরের পাতা থেকে। হারান–বিজ্ঞপ্তি, পড়াইতে চাই, রেকর্ড
নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ
প্রয়ার বিক্রি, পাত্রী চাই—এইগুলিই তার কাছে বড়াে খবর। পড়তে আনিসের দরুণ ভালাে লাগে। এ থেকেই কত মজার মজার জিনিস চোখে পড়ে। একার বইসুদ্দিন নামের এক ভদ্রলােক বিজ্ঞাপন দিল, ‘আকবর ফিরিয়া আস, যাহা চাও, তাহাই হইবে। জ্যোমার মা রােজ প্যানপ্যান করেন। রােজ প্যানপ্যান করে শব্দটি আনিসের খুব মনে ধরেছিল এবং সে রীতিমত চিন্তিত হয়ে পড়েছিল, আকবর তার মায়ের কাছে ফিরেছে কিনা তাই ভেবে। আরেক বার আরেকটি বিজ্ঞাপন ছাপা ইল-–রােকেয়া সুলতানা নামের এক স্কুল–শিক্ষিকার।
বর্ণনার ভঙ্গিটি ছিল এই রকম— আমার বয়স পঁয়ত্রিশ। অবিবাহিতা। নিকট–আত্মীয়স্বজন কেউ বেঁচে নেই। কোনাে সহৃদয় ছেলে আমাকে বিয়ে করলে চিরকৃতজ্ঞ থাকব। আমার চেহারা। ভালাে নয়।’ শেষ লাইনের ‘আমার চেহারা ভালাে নয়’ বাক্যটি একেবারে বুকে বেধে। ভদ্রমহিলাকে একটি চিঠি লিখবার দরুণ ইচ্ছে হয়েছিল। কিন্তু কী লিখবে ভেবে পায় নি বলে লেখা হয় নি।
নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ
‘আনিস, কী খবর?
আনিস তাকিয়ে দেখল, হােসেন সাহেব হাসিমুখে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। এই লােকটিকে আনিস খুব পছন্দ করে। দেখা-সাক্ষাৎ তেমন হয় না, কিন্তু যখনি হয়, আনিসের সময়টা চমক্কার কাটে। হােসেন সাহেব বললেন, বাইরে খুব রঙ খেলা হচ্ছে, তােমার এখানে আশ্রয় নিতে এলাম।
‘খুব ভালাে করেছেন। কখন এসেছেন?”
এইমাত্র, কেমন আছ বল?
Read More