নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ

নীল অপরাজিতা

শওকত সাহেব লেখা কাগজগুলি স্যুটকেসে ঢুকিয়ে ফেললেনতিনি এখন হাঁটতে বের হবেনবৃষ্টির পানি এসে লেখাগুলি আবার নষ্ট না হয়। 

এই অবেলায় ভাত খেতে বসার কোন মানে হয় নারেনু চার পাচটা টিনের কৌটা দিয়ে দিয়েছেএকটায় পনির, দুটা কৌটায় বিস্কিট, একটিতে কাজু বাদামরাত জেগে লেখার সময় তার ক্ষিধে পায়ক্ষিধের রসদপনিরগুলি টুকরাে করে কাটদু স্লাইস পনির এবং কয়েকটা কাজু বাদাম মুখে দেয়া মাত্র ক্ষিধে কমে গেলতিনি ঘর থেকে বের হয়ে এলেনতার মিনিট দশেকের ভেতর আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলশো শো শব্দে বাতাস বইতে লাগলপুষ্প ছুটে দোতলায়ঘর তালাবন্ধমানুষটা গেল কোথায়? সত্যি সত্যি ঝড় হচ্ছে। 

আষাঢ় মাসে এমন ঝড় কি হওয়ার কথা

কাল বৈশাখী হবে বৈশাখেআশ্বিন মাসে আশ্বিনা ঝড়আষাঢ় মাসে প্রবলবৃষ্টিপাত ছাড়াতাে কিছু হবার কথা নাশওকত সাহেব খানিকটা দিশাহারা হলেনঝড়ের প্রথম ঝাপ্টার সময় তিনি একটা পুকুর পাড়ে। আশেপাশে কোন জনমানব নেইখুঁটিতে বাধা একটা গরু তারস্বরে চিৎকার করছেপুকুরপাড়ে পাকা কালি মন্দিরসেই মন্দিরের দরজা তালাবন্ধ

নীল অপরাজিতা-পর্ব-১১-হুমায়ূন আহমেদ

উত্তর দিকে ধান ক্ষেতকি ধান এগুলি? আউস ধান নিশ্চয়মন্দিরের পাশ দিয়ে কাঁচা রাস্তা গিয়েছে নদীর দিকেঝড়ের সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা কি ঠিক হবে ? মাথার উপর গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়তে পারেখােলা মাঠে থাকাইতাে সবচে ভালআউসের ক্ষেতে নেমে পড়বেন

বৃষ্টি নেমেছে মুষল ধারেবৃষ্টির পানি কন কনে ঠাণ্ডাসূচের মত গায়ে বিধছেতিনি ভিজে পুরােপুরি জবজবে হয়ে গেছেনচশমার কাচ বৃষ্টির পানিতে অস্পষ্ট হয়ে আছেএখন চশমা থাকা না থাকার মধ্যে কোন বেশ কম নেইতিনি চশমা খুলে হাতে নিয়ে নিয়েছেনএখন একজন অন্ধের সঙ্গে তার কোন তফাৎ নেই। 

ঝড়ের আরেকটা প্রবল ঝাপ্টা এলবাতাসের কি প্রচণ্ড শক্তিতাঁকে প্রায় উড়িয়ে নিয়ে যায়। 

হুই হুই হুই...... তিনি এদিকওদিক তাকাচ্ছেনকেউ কি ডাকছে তাঁকে? শিষ দেয়ার মত তীক্ষ্ণ শব্দ হচ্ছে বাতাসেরএই শব্দ ছাপিয়ে মানুষের গলা ভেসে আসার কথা হুই হুই, ভদ্রলােক ! হুই|  তাকেই ডাকছেগামছা পরা একজন কে এগিয়ে আসছেঅতি দ্রুত অসিছে। 

আপনে কোন দেশী বেকুব? ঝড়ের সময় নাইরকেল গাছের নীচে ?” 

তাইতাে? তিনি এতক্ষণ কয়েকটা নারিকেল গাছের নীচেই দাড়িয়ে আছেনতিনি সরে এলেনবেশীদূর সরতে পারলেন না বাতাস তাকে ধানক্ষেতে নিয়ে ফেললহাতের মুঠিতে ধরা চশমা মট করে ভেঙ্গে গেলহাত জ্বালা করছেকেটেছে নিশ্চয়ইকতটা কেটেছে কে জানে

নীল অপরাজিতা-পর্ব-১১-হুমায়ূন আহমেদ

নারকেল গাছের নীচ থেকে যে তাকে সরতে বলল, দেখা গেল সেই খুটিতে বাধা গরুটির মালিকগরু ছেড়ে দিয়ে সেও পলকের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলশওকত সাহেব কাদা পানিতে মাখা হয়ে বৃষ্টি এবং ঝড় কমার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলেনঝড় পুরােপুরি থামার জন্যে তাকে আধঘন্টার মত অপেক্ষা করতে হলএই আধঘন্টায় ময়নাতলী গ্রামের উপর ছােটখাট তাণ্ডব ঘটে গেলবেশ কিছু কাচা বাড়ি ধ্বসে গেলকয়েকটা বাড়ির টিনের চাল উড়ে গেলময়নাতলা হাই স্কুলের প্রাইমারী সেকশানের কোন চিহ্নই রইল না। 

শওকত সাহেব বাড়ির দিকে রওনা হয়েছেনচশমা নেই বলে কিছুই দেখতে পাচ্ছেন নাচশমা থাকলেও খুব যে লাভ হত তা নাঘন অন্ধকারআকাশ এখনাে মেঘে মেঘে ঢাকাঘন ঘন বিজলি চমকাচ্ছেযে ব্যাঙের ডাক শোনা যাচ্ছে না বলে অনেক গবেষণা করেছেন সেই ব্যাঙের ডাক এখন চারদিক থেকেই শােনা যাচ্ছেসেই ডাকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঝিরি ডাক। 

হারিকেন হাতে কে যেন আসছেশওকত সাহেব অপেক্ষা করতে লাগলেনলােকটি কাছে এসে অবাক হয়ে বলল, আপনে কেড়া

আমার নাম শওকতকোন বাড়ির ?মােফাজ্জল করিম সাহেবের বাড়িতে থাকিআপনেতাে যাইতেছেন উল্টা পথেএই পথ গেছে সােহাগী নদীর ঘাটলায়কি নদী বললেন? সােহাগীনদীর নাম ছােট গাঙ না?আমরা মুখের কথায় বলি ছােট গাঙ ভাল নাম সােহাগী। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-১১-হুমায়ূন আহমেদ

শুনে খুশী হলামআপনি কি আমাকে মােফাজ্জল করিম সাহেবের বাড়িতে নিয়ে যাবেন? চশমা ভেঙ্গে যাওয়ায় কিছুই দেখছি না। 

দেখনের কিছু নাইআপনে ডাইনের রাস্তা ধইরা নাক বরাবর যান। 

শওকত সাহেব নাক বরাবর রওনা হলেনজোনাকী পােকাগুলি আজ নেই। থাকলে খানিকটা আলাে কি আর ওদের কাছ থেকে পাওয়া যেত না? ঝড় সম্ভবত বেচারীদের উড়িয়ে নিয়ে গেছে। 

 পূষ্প কখন থেকে হারিকেন হাতে বারান্দায় দাড়িয়ে আছেভয়ে তার আত্মা শুকিয়ে গেছেএত বড় একটা ঝড় সে খালি বাড়িতে পার করেছেবিকট শব্দে আতা গাছের একটা ডাল ভেঙ্গেছেসে ভেবেছিল পুরাে বাড়িটাই বুঝি ভেঙ্গে পড়ে গেছেতার চেয়েও বড় ভয় এই ঝড়ে বিদেশী মানুষটা কোথায় ঘুরছেকোন বিপদআপদ হয়নি তাে? বাবাই বা কোথায়? নৌকায় থাকলে নির্ঘাৎ নৌকা ডুবে গেছে। 

 

Read more

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *