নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ

এখানে তাে স্যার গােমাংস পাওয়া যায় নাআশেপাশে মাংসের দোকান নাইহাটবারে গরু জবেহ হয়আজ সেঁজুতখালির হাটঐখানে লােক পাঠিয়েছি। 

নীল অপরাজিতাআচ্ছা। 

সেঁজুতখালির হাটে আজেবাজে গরু জবেহ করেবাছাবাছা গরু জবেহ হয় হলদিয়া হাটেসােমবারে হাট আছেআমি নিজেই যাবতবে সেঁজুতখালির হাটে মাঝে মধ্যে ভাল গােশত পাওয়া যায় এখন দেখি আপনার ভাগ্য। 

গােশত কেমন তা দিয়ে আমার ভাগ্য বিচার করবেন? ছিঃ ছিঃ স্যার এটা কি বললেন? আমি একটা কথার কথা বলেছি। 

বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা মিলিয়ে গেলউঠোনে জলচৌকি পেতে কে একজন বসে আছেবারান্দায় একটা বেতের ঝুড়ি এবং একটা স্যুটকেস। যে বসে আছে তার বয়স বাইশ তেইশবেঁটেখাট একজন যুবকবেশ স্বাস্থ্যবানমনে হচ্ছে সম্প্রতি গোফ রেখেছেগোফের পেছনে অনেক যত্ন এবং সাধনা আছে তা বােঝা যাচ্ছে। 

তাকে দেখেই পুষ্প দূর থেকে চেঁচিয়ে উঠল ওমা বাবু ভাইবাবু ভাই তুমি কোত্থেকে

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ

শওকত সাহেব লক্ষ্য করলেন, বাবু ভাই নামধারী যুবক এই উচ্ছাসের প্রতি বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দেখাল নাযেন সে ধরেই নিয়েছে তাকে দেখামাত্র এমন রূপবতী একটি মেয়ে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠবে। 

করিম সাহেব বললেন, আমার দূর সম্পর্কের ভাগ্নে হয়পুষ্পের সঙ্গে তার খুব ভাব। 

শওকত সাহেব বললেন, আচ্ছা। 

তিনি দোতলায় উঠে এলেনরেনুকে আরেকটা চিঠি লেখা দরকারপ্রথম চিঠিটিও পাঠানাে হয় নিআশ্চর্য ব্যাপার এখানে এসে পা দেয়ার পর রেনুর কথা তার মনে হয় নিস্বাতীর কথাও নাযেন জীবন তিনি পিছনে ফেলে এসেছেনসেখানে ফিরে যাবার আর প্রয়ােজন নেই। 

তিনি জানালার পাশে দাড়িয়ে আছেনএখান থেকে কুয়ােতলাটা দেখা যাচ্ছেপুষ্প কুয়ােতলায় দাড়িয়ে ছেলেটি কি যেন নাম বাবু। হ্যা বাবু, বালতি বালতি পানি তুলে পুষ্পের পায়ে ঢালছেকিছু বােধ হয় বলছেও কারণ পুষ্প কিছুক্ষণ পর পর খিল খিল করে হেসে উঠছেআশ্চর্য, এত আনন্দিত হয়েছে মেয়েটা? তিনি কি কখনাে কাউকে এত আনন্দিত করতে পেরেছেন

শওকত সাহেবের মনে পড়ল কাদা পায়েই তিনি তার ঘরে ঢুকেছেনসারা ঘর কাদায় মাখামাখিতিনি ঘর ছেড়ে বাথরুমে ঢুকলেনদীর্ঘ সময় নিয়ে গা ধুলেনকাজটা বােধ হয় ঠিক হল নাআবার জ্বর না এলে হয়। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ

গােসল শেষ করে ঘরে ঢুকে দেখেন ময়নাতলা স্কুলের দপ্তরি ইউনুস মিয়া ঘরে কেরােসিন ল্যাম্প জ্বালাচ্ছে। 

ইউনুস মিয়া ! জ্বি স্যার। 

কাদাপায়ে ঘরে ঢুকে ঘরের অবস্থা কি করেছি দেখএকটু পরিষ্কার করে দিবে

দিছি স্যারনীচে গিয়ে পুষ্পকে বলবে এক কাপ চা দিতে ?জি স্যার, বলতাছিতােমার কি মনে হয় আজ রাতে বৃষ্টি হবে? এইটা স্যার ক্যামনে বলব? আল্লাহতালার ইচ্ছার উপরে সব নির্ভরতা ঠিক। 

শওকত সাহেব লেখার টেবিলে বসলেনরেনুকে চিঠি লিখতে হবে। ভাগ্যিস চশমার কাচে ডান হাত কাটে নিডান হাত কাটলে কিছুই লিখতে পারতেন নাবা হাতে যন্ত্রণা হচ্ছেসারাদিন এই যন্ত্রণা টের পাননি কেন

কল্যাণীয়াসু, রানু, প্রথম চিঠি (যা নৌকায় লেখা) তােমাকে পাঠাতে পারি নিএর মধ্যে দ্বিতীয় চিঠি লেখা হলদুটোই এক সঙ্গে পাঠাচ্ছিএখানে কেমন আছি তা বলেলাভ নেইভাল আছিমহাকবি বজলুর রহমান যেমন বলেছেন বাড়ি তেমন 

নয় তাতাে বুঝতেই পারছতবু খারাপ নামােফাজ্জল করিম সাহেব যত্নের চূড়ান্ত করছেনআলাদা বাবুচির ব্যবস্থা করা যায় নিশুরুতে বেশ কয়েকবার বলেছি অজ পাড়াগাঁয় তা বােধ হয় সম্ভবও নয়এখানকার বর্ষা খুব enjoy করছিএর মধ্যে ঝড়ের মধ্যে পড়েছিলামঅনেকদিন পর ছেলেবেলার মত বৃষ্টিতে ভিজলামসেই রাতে একটু জ্বরের মত হয়েছিলতুমি এই খবরে আঁৎকে উঠবে নাএমন জ্বর যা থার্মোমিটারেও মাপা যায় নাএখন তােমার বিরুদ্ধে একটি গুরুতর অভিযােগ তুমি অষ্টাঙ্গ সগ্রহ বলে একটি বই সুটকেসে ঢুকিয়ে দিয়েছ

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ

আমার যতদূর ধারণা এইসব বই সাধু সন্ন্যাসীদের জন্যে। তুমি কি ভাবছ আমি সন্ন্যাসী হবার জন্যে এখানে এসেছি ? অষ্টাঙ্গ সংগ্রহ থেকে কিছু অংশ তুলে দিচ্ছিপড়লেই বুঝবে কি জিনিস পাঠিয়েছ যে ব্যক্তি সপ্তর্ষি মণ্ডলের সীমান্তে অরুন্ধতী নক্ষত্র দেখিতে পায় না সেই ব্যক্তি এক বৎসর পর মৃত্যু বরণ করে। ভক্তি, সদাচার, স্মৃতি, দানশীলতা, বুদ্ধি বল এই ছয়টি গুণ যাহার নষ্ট হয় তাহার মৃত্যু ছয় মাসের মধ্যে ঘটে

বই পড়ার পর অরুন্ধতী নক্ষত্র দেখার চেষ্টা করে বিফল হয়েছি কাজেই ভয়ে ভয়ে আছিছয়টি সৎগুণের মধ্যে মাত্র দুটি বুদ্ধি স্মৃতি এখনাে আছেএই দুটি চলে গেলে কি যে হবে কে জানেএতক্ষণ রসিকতা করলেও মৃত্যু নিয়ে আমি কিন্তু প্রায়ই ভাবিএতদিন যা লিখেছি তার কিছু কি টিকে থাকবে? স্বাতীর ছেলেমেয়েরা কি পড়তে পারবে

তার আগেই সব শেষ? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলেছেন – 

আমার কীর্তিরে আমি করি না বিশ্বাস। 

জানি, কাল সিন্ধু তারে 

নিয়ত তরঙ্গাঘাতে দিনে দিনে দিবে লুপ্ত করি” 

সেখানে আমি কে? আজ এই পর্যন্তইপুনশ্চঃ আমার স্মৃতিশক্তি যে এখনাে আছে কবিতার চারটি চরণ লিখে তা প্রমাণ করলামকাজেই আরাে কিছু দিন টিকে থাকবকি সর্বনাশ, আসল খবর দিতে ভুলে গিয়েছি লেখা খুব ভাল এগুচ্ছে পঁয়ত্রিশ পৃষ্ঠা লিখে ফেলেছি। 

স্যার আপনের চা। 

চা নিয়ে এসেছেইউনুস মিয়াশওকত সাহেবের মন খারাপ হয়ে গেলতিনি কি মনে মনে আশা করছিলেন পুষ্প আসবে

ইউনুস মিয়া। 

‘পুষ্প কি করছে?গল্প করতেছেনকার সঙ্গে

যে আসছেন বাবু ভাইসে কি প্রায়ই আসে?জে আসেনপুষ্প গল্প করলে রান্নাবান্না কে করছে?মতির মা চইল্যা আসেছেআচ্ছা ঠিক আছে, তুমি যাও। 

 

Read more

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *