নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

তিনি রানুর কাছে লেখা চিঠিটি আবার পড়লেন এবং অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন চিঠির কোথাও পুষ্পের কথা নেইরানু এই চিঠি পড়ে বুঝতেও পারবে । 

নীল অপরাজিতাবাড়িতে পুষ্প নামের রূপবতী একটি মেয়ে আছেতিনি এই কাজটি কেন করলেন? ইচ্ছাকৃতভাবে করেন নিঅবচেতন মন তাকে বাধা দিয়েছে। 

স্যার আসব

শওকত সাহেব দেখলেন দরজার কাছে বাবু পঁড়িয়েপান খেয়ে ঠোট লালকরে এসেছে। 

আপনার সাথে পরিচয় করবার জন্য আসলামআপনাদের মত মানুষের দেখা পাওয়া আর হাতে আসমানের চঁান পাওয়া এক কথা। 

আমাকে তুমি চেন? জ্বি না পুষ্প আমারে বলেছে। 

তাকে ভেতরে আসার কথা বলতে হল নাসে নিজ থেকেই ঘরে ঢুকে পালঙ্কে পা তুলে বসলতার মধ্যে অপরিচিত একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলার প্রাথমিক সংকোচটুকুও পুরােপুরি অনুপস্থিত। 

তুমি কি পড়াশােনা কর?। 

জিবি. দিছিলাম রেফার্ড হয়ে গেলঅবশ্য আই একচান্সে পাশকরেছি” 

এস, এস, সি এক চান্সে পার নি

জি নাএস, এস, সি এক চান্দে পাশ করা খুবই কঠিন ব্যাপারজুয়েল ছেলেমেয়েরা পারে। 

তুমি নিজেকে জুয়েল মনে করাে না ? আরে নাকি যে স্যার আপনে বলেনপাশ করার পর কি করবে চাকরিবাকরি ?” 

চাকরিবাকরি আমারে কে দিবে? তারপরেও ধরেন যদি ভুল করে কেউ দেয় তা হইলেও তাে সাড়ে সর্বনাশ। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

সাড়ে সর্বনাশ কেন?” 

লেখাপড়া কিছুই জানি নাআই তে তাও কিছু পড়েছিলামবি. এতে কিছুই পাড়ি নাইনকলের উপর পাশ করেছি। এইবার বাইরে থাইক্যা খুব 

ষ্ট্যাণ্ডার্ড নকল আসছে। 

তারপরেও রেফার্ড পেয়ে গেলে

না পাইয়া উপায় কি বলেন দিন হঠাৎ ম্যাজিষ্ট্রেট আইসা উপস্থিতসাপ্লাই বন্ধএই এক পেপারে আমার সর্বনাশ হইছেঅন্য গুলোয় ফিফটি ওয়ান পার্সেন্ট নম্বর আছে” 

নাম্বারতাে খুব ভাল পেয়েছ। 

আপনারে কি বললাম স্যার খুব ষ্ট্যাণ্ডার্ড নকল ছিল এই বৎসরভেরি হাই ষ্ট্যান্ডার্ড। 

পাশ করে কি করবে তা কিন্তু এখনাে বলনি – 

আমাদের মত ছেলেদের ব্যবসা ছাড়া গতি কি বলেনবাবার একটা ফার্মেসী আছে নেত্রকোনা সদরে আল মদিনা ড্রাগ ষ্টোরঐটা দেখাশােনা করবআপনে স্যার আমার জন্য দোয়া রাখবেনআপনি জ্ঞানী মানুষপুষ্প যে সব কথা আপনার সম্বন্ধে বলল, শুনে চোখে পানি এসে গেল। 

শওকত সাহেব চুপ করে বসে রইলেনপুষ্প তাঁর সম্পর্কে এমন কি বলতে পারে যে বাবু নামের এই ছেলের চোখে পানি এসে যায়। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৮)

পুষ্প কি বলেছে আমার সম্পর্কে?” 

যে স্যার ঝড়ের মধ্যে পড়লেন তারপর ব্রেইন ডিফেক্ট হয়ে গেল খালি উল্টাপাল্টা কবিতা! স্যার এখন তাহলে যাইস্নামালিকুম। 

তিনি সালামের উত্তর দিলেন নাউত্তর দেবার মত অবস্থা তার ছিল নাতিনি পুরােপুরি হতভম্ব। 

গত দুদিন ধরে শওকত সাহেব বজরায় বাস করছেন| প্রথম রাতে বেশ অস্বস্তি লেগেছেবজরার দুলুনি ঠিক সহ্য হয়নিবজরা দূলছিল না কিন্তু তার কাছে মনে হচ্ছিল খুব সূক্ষ্মভাবে দুলছেনদীর জলস্রোতের শব্দও মনে হল মাথায় চাপ ফেলছেদ্বিতীয় দিনে সব অস্বস্তি দূর হয়ে গেলমনে হল রাত্রি যাপনের এরচে ভাল কিছু থাকতে পারে না| বজরাটা চমৎকারবসার ঘর, শােবার ঘরখুব সুন্দর বাথরুমভেতরের চেয়ে বাইরের ব্যবস্থা আরাে ভালছাদের উপর আরাম কেদারাআরামকেদারার পাশে টেবিলআরাম কেদারায় শুয়ে পা দুটিও যাতে খানিকটা উঁচুতে রাখা যায় তার জন্যে ছােট্ট টুল যার নাম পাটুল” 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

করিম সাহেব আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে বললেন, স্যার ব্যবস্থা কেমন? ব্যবস্থা ভালস্যার পছন্দ হয়েছে তাে?হয়েছে। 

তাহলে স্যার ওসি সাহেবকে ধন্যবাদ দিয়ে একটা চিঠি দিয়ে দিবেনউনি খুব খুশী হবেনলােক ভাল। 

আমি চিঠি দিয়ে দেব। 

উনি জিজ্ঞেস করছিলেন, উনার বাসায় চায়ের দাওয়াত দিলে আপনি কবুল করবেন কিনাউনার খুব শখ। 

যাবচা খেয়ে আসবআরেকটা কথা স্যার, ময়নাতলা স্কুলে একদিন যাওয়া লাগেঐখানে কি ব্যাপার

কিছুই নাটিচারদের সাথে চাপানি খাবেনছাত্রদের দুই একটা কথা বলবেন। 

সেটা কবে

এই সােমবারেমহাপুরুষদের কথা শুধু শুনলেই হয় নাচোখে দেখতেও হয়এতে পুণ্য যেমন হয় তেমনি  

শওকত সাহেব কথা শেষ করতে দিলেন না, বললেন, আমি যাবআমাকে দেখলে যদি আপনার ছাত্রদের পূণ্য হয় তাহলে তােক কিছুটা পুণ্য। 

ওসি সাহেবের বাসায় চায়ের দাওয়াত রাতের খাবারে রূপান্তরিত হলপােলাও কোমর সমারােহপ্রকাণ্ড কাতল মাছের মাথা বিশাল একটা থালায় সাজিয়ে শওকত সাহেবের সামনে ধরা হলও সি সাহেব হাত কচলাতে কচলাতে বললেন, স্যার আপনার জন্য মাছটা মােহনগঞ্জ থেকে আনা হয়েছে

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

শওকত সাহেব বললেন, মাছের মাথাতাে আমি খাই নাকখনাে নানা খেলেওএর উপর হাতটা রেখে একটু তাকিয়ে থাকুনকেন ? ছবি তুলব স্যার। 

তিনি তাই করলেনতিন দিক থেকে তিনবার ছবি তােলা হলশুধু মাছের মাথার সঙ্গে ছবি না, ওসি সাহেবের সঙ্গে ছবি, তার স্ত্রীর সঙ্গে ছবি, ওসি সাহেবের ছেলের সঙ্গে ছবি এবং শেষ পর্যায়ে ওসি সাহেবের শালাকে পাশে নিয়ে ছবি। 

ছবি তােলার পর্ব শেষ হবার পর ওসি সাহেবের স্ত্রী একটি দীর্ঘ কবিতা পড়লেনআঁকে উদ্দেশ্য করেই নাকি কবিতাটি লেখা হয়েছে। যদিও শওকত সাহেব সেই দীর্ঘ কবিতায় তার অংশ কি আছে কিছুই বুঝলেন না

 

Read more

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *