নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

নীল অপরাজিতা

করিম সাহেব বললেন, স্যার আমার মেয়ে পুষ্পআমার একটাই মেয়ে। 

ময়মনসিংহে থাকেহােস্টেলে থেকে পড়েএইবার আইদেবেপরীক্ষার ছুটি দিয়েছেভেবেছিল হােস্টেলে থেকে পড়াশােনা করবে। আমি বললাম, মা চলে আয়একা একা থাকিসে চলে এসেছেচলে আসায় খুবই ক্ষতি হয়েছেঘর সংসার সবই এখন তার দেখতে হয়এখন ভাবছি হােস্টেলে দিয়ে আসব। 

পুষ্প মেঝেতে ট্রে রেখে গিয়ে এসে পা ছুঁয়ে সালাম করলশওকত সাহেব খানিকটা বিব্রত বােধ করলেনকদমবুসি করলে মাথায় হাত দিয়ে আশীবাদের কিছু কথা বলার নিয়ম আছেতিনি কখনাে তা পারেন না। 

পুষ্প বলল, স্যার আপনার শরীর কেমন

মেয়েও বাবার মতই তাকে স্যার ডাকছেপ্রশ্ন করেছে বােকার মততিনি যদি এখন শরীর ভাল, না বলে বলেন শরীর খুবই খারাপতাহলেই মেয়েটি হকচকিয়ে যাবেপরের কথাটা কি বলবে ভেবে পাবে না। 

তিনি অকিয়ে আছেন পুষ্পের দিকে| মেয়েটিকে অস্বাভাবিক রকমের স্নিগ্ধ লাগছেস্নান করার পর পর ক্ষণস্থায়ী যে স্নিগ্ধতা চোখে মুখে ছড়িয়ে থাকে সেই স্নিগ্ধতামেয়েটি কি এখানে আসার আগে স্নান করেছে? সম্ভবত করেছেচুল আদ্র ভাবমেয়েটির গায়ের রঙ অতিরিক্ত ফর্সাশুধুমাত্র ফর্সা রঙের কারণে এই মেয়েটির ভাল বিয়ে হবেমেয়েটার মুখ গােলাকারমুখটা একটু লম্বাটে হলে ভাল হতএকে কি রূপবতী বলা যাবে? হ্যা যাবেমেয়েটি রূপবতী তবে আকর্ষণীয় নয়

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

রূপবতীদের দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে কিন্তু কাছে যেতে ইচ্ছে করে নাযারা আকর্ষণীয়া তারা নিজেদের দিকে প্রবল ভাবে আকর্ষণ করে| মােফাজ্জল করিম সাহেব বললেন, ওর নাম স্যার আসলে পুষ্প নাওর ভাল নাম নাজনীনআমরা ডাকতাম নাজুএকদিন ওর বড় মামা এসে বললেন, নাজু, ফাজু আবার কি রকম নামএত সুন্দর মেয়ে এর নাম হল পুষ্পসেই থেকে পুষ্প নাম। 

শওকত সাহেব কেন জানি বিরক্তি বােধ করছেনপিতা এবং কন্যা আগ্রহ নিয়ে তার সামনে বসে আছেএরা তার কাছ থেকে মুগ্ধ বিস্মিত হবার মত কিছু শুনতে চায়এমন কিছু যা অন্য দশজন শুনাবে না, তিনিই বলবেনএক ধরনের অভিনয় করতে হবেঅন্যদের থেকে আলাদা হবার অভিনয়আশে পাশের মানুষদের চমৎকৃত করতে হবেপৃথিবীর সব বড় মানুষরাই গ্রহের মততাদের আশে পাশে যারা আসবে তারাই উপগ্রহ হয়ে গ্রহের চারপাশে পাক খেতে হবে। কোন মানে হয় না। 

মেয়েটা এসেছে। আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকেতাকে কিছু একটা বলতে হবেইন্টারেস্টিং কিছুকিছুই মাথায় আসছে নাতিনি এক ধরনের যন্ত্রণা বােধ করছেন। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

 তিনি থেমে থেমে বললেন, পুষ্প খুব ভাল নামতবে পূষ্প না হয়ে কোন বিশেষ ফুলের নামে নাম হলে আরাে ভাল হতঅনেক আজে বাজে ধরনের ফুলও কিন্তু আছেযেমন ধুতরা ফুলবিষাক্ত ফুলআবার কুমড়া ফুলও ফুল, সেই ফুল আমরা বড়া বানিয়ে খাই। 

পুষ্প তাকিয়ে আছেএক পলকের জন্যেও চোখ সরাচ্ছে নামেয়েটির চোখে এক ধরনের কাঠিন্য আছেসতেরো আঠারাে বছরের মেয়ের চোখে জাতীয় কাঠিন্যতো থাকার কথা নাএদের চোখ হবে হ্রদের জলের মতস্বচ্ছ, গভীর এবং আনন্দময়। 

করিম সাহেব বললেন, স্যার হাতটা ধুয়ে ফেলেনরাততাে অনেক হয়েছেআপনার নিশ্চয়ই ক্ষিধে লেগেছে। 

শওকত সাহেব বললেন, আপনি কিছু মনে করবেন নাআমি রাতে খাব নাসেকি ? শরীর ভাল লাগছে না” ভাল না লাগলেও চারটা খাওয়া দরকাররাতে না খেলে শরীরের এক ছটাক রক্ত চলে যায়। রক্ত চলে গেলেও কিছু করার নেইআমার যা ভাল লাগেনা আমি কখনােই তা করি না। কিছুই খাবেন না স্যার

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

পুষ্প মৃদুস্বরে বলল, এক গ্লাস দুধ দিয়ে যাই? নাদুধ আমি এম্নিতেই খাই নারাতে যদি ক্ষিধে লাগে আমার সঙ্গে বিস্কিট আছে। খেয়ে পানি খেয়ে নেবআমার সম্পর্কে আর কিছুই চিন্তা করতে হবে। করিম সাহেব বললেন, খাবারটা ঢাকা দিয়ে রেখে যাব? নাভাত তরকারী পাশে নিয়ে ঘুমুতে ভাল লাগবে না। করিম সাহেব মেয়ের দিকে তাকালেনবেচারী মুখ কালাে করে ফেলেছেআহা কত আগ্রহ নিয়ে সে রান্না বান্না করেছেনীচে ফিরে গিয়ে নিশ্চয়ই কাদবে

করিম সাহেব বললেন, আর কিছু না খানএক টুকরা ভাজা মাছ কি খাবেন? ডুবা তেলে ভাজা। ডুবা তেলে ভাজা হােক আর ভাসা তেলেই ভাজা হােক আমি খাব নাআমার একেবারেই ইচ্ছে করছে না। পিতা এবং কন্যা বের হয়ে গেল। 

দুজন অসম্ভব মন খারাপ করেছেঘর থেকে বেরুবার আগে পুষ্প এক পলকের জন্যে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকাল শওকত সাহেবের দিকেএবারের চোখের দৃষ্টি আগের মত নয়সম্পূর্ণ অন্য রকমচোখের মণিতে হ্রদের জলে আকাশের ছায়াযে আকাশে মেঘের পরে মেঘ জমেছে। 

শশাবার ঘরটা শওকত সাহেবের খুব পছন্দ হয়েছেহলঘরের মত বিরাট ঘরদুপাশেই জানালাজানালা দুটিও বিশালএক সঙ্গে অনেকখানি আকাশ দেখা যায়কালাে রঙের প্রাচীন খাট

খাটে বিছানাে চাদর থেকে ন্যাপথলিনের গন্ধ আসছেখাটের পাশের টেবিলে কেরােসিনেটেবিল ল্যাম্প জ্বলছেটেবিল ল্যাম্পের এই আলােতেও এক ধরনের রহস্য আছে

 

Read more

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *