বেণী ঘোষাল মুখুয্যেদের অন্দরের প্রাঙ্গণে পা দিয়াই সম্মুখে এক প্রৌঢ়া রমণীকে পাইয়া প্রশ্ন করিলেন, “এই যে মাসি, রমা কই গা?” মাসী আহ্নিক করিতেছিলেন, ইঙ্গিতে রান্নাঘর দেখাইয়া দিলেন। বেণী উঠিয়া আসিয়া রন্ধনশালার চৌকাঠের বাহিরে দাঁড়াইয়া বলিলেন, “তা হ’লে রমা, কি কর্বে স্থির করলে?” জ্বলন্ত উনান হইতে শব্দায়মান কড়াটা নামাইয়া রাখিয়া রমা মুখ তুলিয়া চাহিল,—“কিসের বড়দা?” বেণী কহিলেন, “তারিণী খুড়োর শ্রাদ্ধের কথাটা বোন্! রমেশ ত কা’ল এসে হাজির হয়েছে। বাপের শ্রাদ্ধ খুব ঘটা ক’রেই কর্বে ব’লে বোধ হচ্চে;—যাবে নাকি?”
রমা দুই চক্ষু বিস্ময়ে বিস্ফারিত করিয়া বলিল, “আমি যাব তারিণী ঘোষালের বাড়ী?” বেণী ঈষৎ লজ্জিত হইয়া কহিল—“সে ত জানি দিদি! আর যেই যাক্, তোরা কিছুতেই সেখানে যাবিনে। তবে শুন্চি নাকি, ছোঁড়া সমস্ত বাড়ী-বাড়ী নিজে গিয়ে বল্বে—বজ্জাতি বুদ্ধিতে সে তার বাপেরও ওপরে যায়—যদি আসে, তা হ’লে কি বল্বে?” রমা সরোষে জবাব দিল,—“আমি কিছুই বোল্বো না—বাইরের দরওয়ান তার উত্তর দেবে—” পূজানিরতা মাসীর কর্ণরন্ধ্রে এই অত্যন্ত রুচিকর দলাদলির আলোচনা পৌঁছিবামাত্রই তিনি আহ্নিক ফেলিয়া রাখিয়া উঠিয়া আসিলেন।
বোন্ঝির কথা শেষ না হইতেই অত্যুত্তপ্ত খৈএর মত ছিট্কাইয়া উঠিয়া কহিলেন, “দরওয়ান কেন? আমি বল্তে জানিনে? নচ্ছার ব্যাটাকে এম্নি বলাই বল্ব যে, বাছাধন জন্মে কখন আর মুখুয্যেবাড়ীতে মাথা গলাবে না। তারিণী ঘোষালের ব্যাটা ঢুকবে নেমত্যন্ন কর্তে আমার বাড়ীতে?
আমি কিছুই ভুলিনি বেণীমাধব! তারিণী তার এই ছেলের সঙ্গেই আমার রমার বিয়ে দিতে চেয়েছিল। তখনও ত আর আমার যতীন জন্মায় নি—ভেবেছিল, যদু মুখুয্যের সমস্ত বিষয়টা তা হ’লে মুঠোর মধ্যে আস্বে—বুঝলে না বাবা বেণি! তা যখন হ’ল না, তখন ঐ ভৈরব আচায্যিকে দিয়ে কি সব জপতপ, তুক্তাক্ করিয়ে মায়ের কপালে আমার এমন আগুন ধরিয়ে দিলে যে, ছ’মাস পেরুল না, বাছার হাতের নোয়া, মাথার সিঁদুর ঘুচে গেল! ছোট জাত হ’য়ে চায় কিনা যদু মুখুয্যের মেয়েকে বৌ কর্তে!
তেম্নি হারামজাদার মরণও হয়েছে—ব্যাটার হাতের আগুনটুকু পর্য্যন্ত পেলে না! ছোট-জাতের মুখে আগুন!” বলিয়া মাসী যেন কুস্তি শেষ করিয়া হাঁপাইতে লাগিলেন। পুনঃ পুনঃ ছোট জাতের উল্লেখে বেণীর মুখ ম্লান হইয়া গিয়াছিল, কারণ তারিণী ঘোষাল তাহারই খুড়া। রমা ইহা লক্ষ্য করিয়া মাসীকে তিরস্কারের কণ্ঠে কহিল, “কেন মাসি, তুমি মানুষের জাত নিয়ে কথা কও?
জাত ত আর কারুর হাতেগড়া জিনিস নয়? যে যেখানে জন্মেচে সেই তার ভাল।” বেণী লজ্জিতভাবে একটুখানি হাসিয়া কহিল,—“না, রমা, মাসী ঠিক কথাই বলচেন। তুমি কত বড় কুলীনের মেয়ে, তোমাকে কি আমরা ঘরে আন্তে পারি বোন্! ছোট খুড়োর এ কথা মুখে আনাই বেয়াদপি। আর তুক্তাকের কথা যদি বল, ত’ সে সত্যি। দুনিয়ায় ছোট খুড়ো আর ঐ ব্যাটা ভৈরব আচায্যির অসাধ্য কাজ কিছু নেই। ঐ ভৈরব ত হয়েচে আজকাল রমেশের মুরুব্বি।”
মাসী কহিলেন—“সে ত জানা কথা বেণি! ছোঁড়া দশ বারো বচ্ছর ত দেশে আসেনি—এতদিন ছিল কোথায়?” “কি ক’রে জান্ব মাসি? ছোট খুড়োর সঙ্গে তোমাদেরও যে ভাব, আমাদেরও তাই। শুন্চি, এতদিন নাকি বোম্বাই, না, কোথায় ছিল। কেউ বল্চে, ডাক্তারি পাশ ক’রে এসেচে, কেউ বল্চে, উকিল হয়ে এসেচে—কেউ বল্চে, সমস্তই ফাঁকি—ছোঁড়া নাকি পাঁড় মাতাল! যখন বাড়ী এসে পৌঁছল, তখন দুই চোখ নাকি জবাফুলের মত রাঙা ছিল।” “বটে?
তা হ’লে তাকে ত বাড়ী ঢুক্তে দেওয়াই উচিত নয়!” বেণী উৎসাহভরে মাথার একটা ঝাঁকানি দিয়া কহিল—“নয়ই ত! হাঁ রমা, তোমার রমেশকে মনে পড়ে?” নিজের হতভাগ্যের প্রসঙ্গ উঠিয়া পড়ায় রমা মনে মনে লজ্জা পাইয়াছিল। সলজ্জ মৃদু হাসিয়া কহিল,— “পড়ে বৈ কি। সে ত আমার চেয়ে বেশী বড় নয়। তা ছাড়া শীতলাতলার পাঠশালে দুজনেই পড়্তাম যে। কিন্তু তার মায়ের মরণের কথা আমার খুব মনে পড়ে। খুড়ীমা আমাকে বড় ভালবাস্তেন।” মাসী আর একবার নাচিয়া উঠিয়া বলিলেন,—“তার ভালবাসার মুখে আগুন! সে ভালবাসা কেবল নিজের কাজ হাসিল কর্বার জন্যে। তাদের মতলবই ছিল, তোকে কোনমতে হাত-করা।”
বেণী অত্যন্ত বিজ্ঞের মত সায় দিয়া কহিল, “তাতে আর সন্দেহ কি মাসি! ছোট খুড়ীমাও যে,—“কিন্তু তাহার বক্তব্য শেষ না হইতেই রমা অপ্রসন্নভাবে মাসীকে বলিয়া উঠিল,—“সে সব পুরণো কথায় দরকার নেই মাসি?” রমেশের পিতার সহিত রমার যত বিবাদই থাক, তাহার জননীর সম্বন্ধে রমার কোথায় একটু যেন প্রচ্ছন্ন বেদনা ছিল। এতদিনেও তাহা সম্পূর্ণ তিরোহিত হয় নাই। বেণী তৎক্ষণাৎ সায় দিয়া বলিলেন,—“তা বটে, তা বটে। ছোটখুড়ী ভালমানুষের মেয়ে ছিলেন। মা আজও তাঁর কথা উঠ্লে চোখের জল ফেলেন।”
কি কথায় কি কথা আসিয়া পড়ে দেখিয়া বেণী তৎক্ষণাৎ এসকল প্রসঙ্গ চাপা দিয়া ফেলিলেন। বলিলেন, “তবে এই ত স্থির রইল দিদি, নড়চড় হবে না ত?” রমা হাসিল। কহিল, “বড়দা, বাবা বল্তেন, আগুনের শেষ, ঋণের শেষ, আর শত্রুর শেষ কখনো রাখিস্নে মা। তারিণী ঘোষাল জ্যান্তে আমাদের কম জ্বালা দেয়নি—বাবাকে পর্য্যন্ত জেলে দিতে চেয়েছিল। আমি কিছুই ভুলিনি বড়দা,—যতদিন বেঁচে থাক্ব, ভুল্ব না। রমেশ সেই শত্রুরই ছেলে ত! তা ছাড়া আমার ত কিছুতেই যাবার জো নেই।
বাবা আমাদের দুই ভাইবোন্কে বিষয় ভাগ ক’রে দিয়ে গেছেন বটে, কিন্তু সমস্ত বিষয় রক্ষা কর্বার ভার শুধু আমারই উপর যে! আমার ত নয়-ই, আমাদের সংস্রবে যারা আছে, তাদের পর্যন্ত যেতে দেব না।” একটু ভাবিয়া কহিল, “আচ্ছা বড়দা, এমন কর্তে পার না যে, কোনও ব্রাহ্মণ না তাদের বাড়ী যায়?” বেণী একটু সরিয়া আসিয়া গলা খাটো করিয়া বলিল, “সেই চেষ্টাই ত কর্চি বোন্। তুই আমার সহায় থাকিস্, আর আমি কোনও চিন্তে করিনে।
রমেশকে এই কুঁয়াপুর থেকে না তাড়াতে পারি ত আমার নাম বেণী ঘোষাল নয়। তার পরে রইলাম আমি, আর ঐ ভৈরব আচায্যি! আর তারিণী ঘোষাল নেই; দেখি এ ব্যাটাকে এখন কে রক্ষা করে!” রমা কহিল, “রক্ষে কর্বে রমেশ ঘোষাল। দেখো বড়দা, এই আমি ব’লে রাখ্লুম, শত্রুতা কর্তে এও কম কর্বে না।” বেণী আরও একটু অগ্রসর হইয়া এক্বার এদিক্-ওদিক্ নিরীক্ষণ করিয়া লইয়া চৌকাঠের উপর উঁচু হইয়া বসিলেন।
তারপরে কণ্ঠস্বর অত্যন্ত মৃদু করিয়া বলিলেন, “রমা, বাঁশ নুইয়ে ফেল্তে চাও ত, এই বেলা। পেকে গেলে আর হবে না, তা নিশ্চয় ব’লে দিচ্চি। বিষয়-সম্পত্তি কি ক’রে রক্ষে কর্তে হয় শেখেনি—এর মধ্যে যদি না শত্রুকে নির্ম্মূল করতে পারা যায়, ত ভবিষ্যতে আর যাবে না; এই কথাটা আমাদের দিবারাত্রি মনে রাখ্তে হবে যে, এ তারিণী ঘোষালেরই ছেলে—আর কেউ নয়!” “সে আমি বুঝি বড়দা!” “তুই না বুঝিস্ কি দিদি! ভগবান্ তোকে ছেলে গড়্তে গড়্তে মেয়ে গড়ে ছিলেন বৈ ত নয়।
বুদ্ধিতে একটা পাকা জমিদারও তোর কাছে হটে যায়, এ কথা আমরা সবাই বলাবলি করি। আচ্ছা, কা’ল একবার আস্ব। আজ বেলা হ’ল যাই—” বলিয়া বেণী উঠিয়া পড়িলেন। রমা এই প্রশংসায় অত্যন্ত প্রীত হইয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া বিনয়-সহকারে কি একটু প্রতিবাদ করিতে গিয়াই তাহার বুকের ভিতর ছ্যাঁৎ করিয়া উঠিল। প্রাঙ্গণের এক প্রান্ত হইতে অপরিচিত গম্ভীর-কণ্ঠের আহ্বান আসিল—“রাণী, কই রে?” রমেশের মা এই নামে ছেলেবেলায় তাহাকে ডাকিতেন। সে নিজেই এতদিন তাহা ভুলিয়া গিয়াছিল।
বেণীর প্রতি চাহিয়া দেখিল, তাহার সমস্ত মুখ কালীবর্ণ হইয়া গিয়াছে। পরক্ষণেই রুক্ষমাথা, খালি পা, উত্তরীয়টা মাথায় জড়ানো—রমেশ আসিয়া দাঁড়াইল। বেণীর প্রতি চোখ পড়িবামাত্র বলিয়া উঠিল, “এই যে বড়দা, এখানে? বেশ, চলুন, আপনি না হ’লে কর্বে কে? আমি সারা গাঁ আপনাকে খুঁজে বেড়াচ্চি! কৈ রাণী কোথায়?” বলিয়াই কবাটের সুমুখে আসিয়া দাঁড়াইল। পলাইবার উপায় নাই, রমা ঘাড় হেঁট করিয়া রহিল।
রমেশ মুহুর্ত্তমাত্র তাহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া মহাবিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিয়া উঠিল—“এই যে! আরে ইস্, কত বড় হয়েছিস রে? ভাল আছিস্?” রমা তেম্নি অধোমুখে দাঁড়াইয়া রহিল। হঠাৎ কথা কহিতেই পারিল না। কিন্তু রমেশ একটুখানি হাসিয়া তৎক্ষণাৎ কহিল, “চিন্তে পাচ্ছিস্ ত রে? আমি তোদের রমেশ দা!” এখনও রমা মুখ তুলিয়া চাহিতে পারিল না। কিন্তু, মৃদু-কণ্ঠে প্রশ্ন করিল, “আপনি ভাল আছেন?”
“হাঁ ভাই, ভাল আছি। কিন্তু, আমাকে ‘আপনি’ কেন রমা?” বেণীর দিকে চাহিয়া একটুখানি মলিন হাসি হাসিয়া বলিল, “রমার সেই কথাটা আমি কোন দিন ভুল্তে পারিনি বড়দা! যখন মা মারা গেলেন, ও তখন ত খুব ছোট। সেই বয়সেই আমার চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘রমেশদা, তুমি কেঁদ না, আমার মাকে আমরা দু’জনে ভাগ ক’রে নেব।’ তোর সে কথা বোধ করি মনে পড়ে না রমা, না? আচ্ছা, আমার মাকে মনে পড়ে ত?” কথাটা শুনিয়া রমার ঘাড় যেন লজ্জায় আরও ঝুঁকিয়া পড়িল।
সে একটিবারও ঘাড় নাড়িয়া জানাইতে পারিল না যে, খুড়ীমাকে তাহার খুব মনে পড়ে। রমেশ বিশেষ করিয়া রমাকে উদ্দেশ করিয়াই বলিতে লাগিল—“আর ত সময় নেই, মাঝে শুধু তিনটি দিন বাকি, যা কর্বার ক’রে দাও ভাই, যাকে বলে একান্ত নিরাশ্রয়, আমি তাই হয়েই তোমাদের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েচি। তোমরা না গেলে এতটুকু ব্যবস্থা পর্য্যন্তও কর্তে পার্চি না।”
মাসী আসিয়া নিঃশব্দে রমেশের পিছনে দাঁড়াইলেন। বেণী অথবা রমা কেহই যখন একটা কথারও জবাব দিল না, তখন তিনি সুমুখের দিকে সরিয়া আসিয়া রমেশের মুখপানে চাহিয়া বলিলেন, “তুমি বাপু, তারিণী ঘোষালের ছেলে না?” রমেশ এই মাসীটিকে ইতিপূর্ব্বে দেখেন নাই; কারণ, সে গ্রামত্যাগ করিয়া যাইবার পরে ইনি রমার জননীর অসুখের উপলক্ষ্যে সেই যে মুখুয্যে বাড়ী ঢুকিয়াছিলেন, আর বাহির হন নাই।
রমেশ কিছু বিস্মিত হইয়াই তাঁহার দিকে চাহিয়া রহিল। মাসী বলিলেন, “না হ’লে এমন বেহায়া পুরুষমানুষ আর কে হবে? যেমন বাপ তেমনি ব্যাটা। বলা নেই, কহা নেই, একটা গেরস্তর বাড়ীর ভেতর ঢুকে উৎপাত করতে সরম হয় না তোমার?” রমেশ বুদ্ধিভ্রষ্টের মত কাঠ হইয়া চাহিয়া রহিল। “আমি চললুম” বলিয়া বেণী ব্যস্ত হইয়া সরিয়া পড়িলেন।
রমা ঘরের ভিতর হইতে বলিল, “কি বোক্চ মাসী, তুমি নিজের কাজে যাও না—” মাসী মনে করিলেন, তিনি বোনঝির প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতটা বুঝিলেন। তাই কণ্ঠস্বরে আরও একটু বিষ মিশাইয়া কহিলেন, “নে, রমা, বকিস্নে। যে কাজ করতেই হবে, তাতে আমার তোদের মত চক্ষুলজ্জা হয় না। বেণীর অমন ভয়ে পালানর কি দরকার ছিল?
ব’লে গেলেই ত হ’ত, আমরা বাপু তোমার গমস্তাও নই, খাস্ তালুকের প্রজাও নই যে, তোমার কর্ম্মবাড়ীতে জল তুল্তে, ময়দা মাখ্তে যাবো। তারিণী মরেচে, গাঁ শুদ্ধ লোকের হাড় জুড়িয়েচে; এ কথা আমাদের ওপর বরাত দিয়ে না গিয়ে নিজে ওর মুখের ওপর ব’লে গেলেই ত পুরুষ-মানুষের মত কাজ হ’ত।” রমেশ তখনও নিস্পন্দ অসাড়ের মত দাঁড়াইয়া রহিল। বস্তুতঃই এ-সকল কথা তাহার একান্ত দুঃস্বপ্নেরও অগোচর ছিল।
ভিতর হইতে রান্নাঘরে কবাটের শিকলটা ঝন্ঝন্ করিয়া নড়িয়া উঠিল। কিন্তু কেহই তাহাতে মনোযোগ করিল না। মাসী রমেশের নির্ব্বাক ও অত্যন্ত পাংশুবর্ণ মুখের প্রতি চাহিয়া পুনরপি বলিলেন, “যাই হোক, বামুনের ছেলেকে আমি চাকর দরওয়ান দিয়ে অপমান করাতে চাইনে,—একটু হুঁস করে কাজ কর বাপু,—যাও। কচি খোকাটি নও যে, ভদ্দরলোকের বাড়ীর ভেতর ঢুকে আবদার ক’রে বেড়াবে! তোমার বাড়িতে আমার রমা কখন পা ধুতেও যেতে পারবে না, এই তোমাকে আমি ব’লে দিলুম।”
হঠাৎ রমেশ যেন নিদ্রোত্থিতের মত জাগিয়া উঠিল, এবং পরক্ষণেই তাহার বিস্তৃত বক্ষের ভিতর হইতে এম্নি গভীর একটা নিঃশ্বাস বাহির হইয়া আসিল যে, সে নিজেও সেই শব্দে সচকিত হইয়া উঠিল। ঘরের ভিতর কবাটের অন্তরালে দাঁড়াইয়া রমা মুখ তুলিয়া চাহিয়া দেখিল। রমেশ একবার বোধ করি ইতস্ততঃ করিল, তাহার পরে, রান্নাঘরের দিকে উদ্দেশ করিয়া কহিল,
“যখন যাওয়া হতেই পারে না, তখন আর উপায় কি! কিন্তু আমি ত এত কথা জান্তাম না—না জেনে যে উপদ্রব ক’রে গেলাম, সেজন্য আমাকে মাপ কোরো রাণি!” বলিয়া ধীরে ধীরে চলিয়া গেল। ঘরের ভিতর হইতে এতটুকু সাড়া আসিল না। যাহার কাছে ক্ষমা-ভিক্ষা করা হইল, সে যে অলক্ষ্যে নিঃশব্দে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল, রমেশ তাহা জানিতেও পারিল না।
বেণী তৎক্ষণাৎ ফিরিয়া আসিয়া দাঁড়াইল। সে পলায় নাই, বাহিরে লুকাইয়া অপেক্ষা করিতেছিল মাত্র। মাসীর সহিত চোখাচোখি হইতেই তাহার সমস্ত মুখ আহ্লাদে ও হাসিতে ভরিয়া গেল, সরিয়া আসিয়া কহিল, “হাঁ, শোনালে বটে মাসি! আমার সাধ্যিই ছিল না অমন ক’রে বলা! এ কি চাকর-দরোয়ানের কাজ রমা! আমি আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখ্লাম কি না, ছোঁড়া মুখখানা যেন আষাঢ়ের মেঘের মত ক’রে বা’র হয়ে গেল! এই ত—ঠিক হ’ল!” মাসী ক্ষুণ্ণ অভিমানের সুরে বলিলেন, “খুব ত হ’ল জানি; কিন্তু এই দুটো মেয়েমানুষের ওপর ভার না দিয়ে, না স’রে গিয়ে নিজে ব’লে গেলেই ত আরও ভাল হ’ত! আর নাই যদি বল্তে পার্তে আমি কি বল্লুম তাকে, দাঁড়িয়ে থেকে শুনে গেলে না কেন বাছা?
অমন স’রে পড়া উচিত কাজ হয়নি!” মাসীর কথার ঝাঁজে বেণীর মুখের হাসি মিলাইয়া গেল।সে যে এই অভিযোগের কি সাফাই দিবে, তাহা ভাবিয়া পাইল না, কিন্তু অধিকক্ষণ ভাবিতে হইল না, হঠাৎ রমা ভিতর হইতে তাহার জবাব দিয়া বসিল; এতক্ষণ সে একটি কথাও কহে নাই। কহিল, “তুমি যখন নিজে বলেছ মাসি, তখন সেই ত সকলের চেয়ে ভাল হয়েচে। যে যতই বলুক না কেন, এতখানি বিষ জিভ দিয়ে ছড়াতে তোমার মত কেউ ত পেরে উঠ্ত না!” মাসী এবং বেণী উভয়েই যার-পর-নাই বিস্ময়াপন্ন হইয়া উঠিলেন। মাসী রান্নাঘরের দিকে ফিরিয়া কহিলেন, “কি বল্লি লা?” “কিছু না।
আহ্নিক কর্তে বসে ত সাতবার উঠ্লে—যাও না, ওটা সেরে ফেল না—রান্নাবান্না কি হবে না?” বলিতে বলিতে রমা নিজেও বাহির হইয়া আসিল এবং কাহাকেও কোন কথা না বলিয়া বারান্দা পার হইয়া ও দিকের ঘরে গিয়া প্রবেশ করিল। বেণী শুষ্কমুখে চুপি চুপি জিজ্ঞাসা করিল, “ব্যাপার কি মাসি?” “কি ক’রে জান্ব বাছা? ও রাজ-রাণীর মেজাজ বোঝা কি আমাদের দাসীবাঁদীর কর্ম্ম?” বলিয়া ক্রোধে, ক্ষোভে, তিনি মুখখানা কালীবর্ণ করিয়া তাঁহার পূজার আসনে গিয়া উপবেশন করিলেন, এবং বোধ করি বা মনে মনে ভগবানের নাম করিতেই লাগিলেন। বেণী ধীরে ধীরে প্রস্থান করিল।
এই কুঁয়াপুরের বিষয়টা অর্জ্জিত হইবার একটু ইতিহাস আছে, তাহা এইখানে বলা আবশ্যক। প্রায় শতবর্ষ পূর্ব্বে মহাকুলীন বলরাম মুখুয্যে, তাঁহার পিতা বলরাম ঘোষালকে সঙ্গে করিয়া, বিক্রমপুর হইতে এদেশে আসেন। মুখুয্যে শুধু কুলীন ছিলেন না, বুদ্ধিমান্ও ছিলেন। বিবাহ করিয়া বর্দ্ধমান রাজসরকারে চাক্রি করিয়া, এবং আরও কি কি করিয়া, এই বিষয়টুকু হস্তগত করেন। ঘোষালও এই দিকেই বিবাহ করেন।
কিন্তু পিতৃঋণ শোধ করা ভিন্ন আর তাঁহার কোন ক্ষমতাই ছিল না; তাই, দুঃখে কষ্টেই তাঁহার দিন কাটিতেছিল। এই বিবাহ উপলক্ষ্যেই নাকি দুই মিতায় মনোমালিন্য ঘটে। পরিশেষে তাহা এমন বিবাদে পরিণত হয় যে, এক গ্রামে বাস করিয়াও বিশ বৎসরের মধ্যে কেহ কাহারও মুখদর্শন করেন নাই। বলরাম মুখুয্যে যে দিন মারা গেলেন, সে দিনেও ঘোষাল তাঁহার বাটীতে পা দিলেন না। কিন্তু তাঁহার মরণের পরদিন অতি আশ্চর্য্য কথা শুনা গেল।
তিনি নিজেই সমস্ত বিষয় চুল-চিরিয়া অর্ধেক ভাগ করিয়া নিজের পুত্র ও পিতার পুত্রগণকে দিয়া গিয়াছেন। সেই অবধি এই কুঁয়াপুরের বিষয় মুখুয্যে ও ঘোষালবংশ ভোগদখল করিয়া আসিতেছে। ইঁহারা নিজেরাও জমিদার বলিয়া অভিমান করিতেন, গ্রামের লোকও অস্বীকার করিত না। যখনকার কথা বলিতেছি, তখন ঘোষালবংশও ভাগ হইয়াছিল।
সেই বংশের ছোট-তরফের তারিণী ঘোষাল মকদ্দমা-উপলক্ষ্যে জেলায় গিয়া দিন ছয়েক পূর্ব্বে হঠাৎ যে দিন, আদালতের ছোটবড় পাঁচসাতটা মুলতুবি মকদ্দমায় শেষফলের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করিয়া, কোথাকার কোন্ অজানা আদালতের মহামান্য শমন মাথায় করিয়া নিঃশব্দে প্রস্থান করিলেন, তখন তাঁহাদের কুঁয়াপুর গ্রামের ভিতরে ও বাহিরে একটা হুলস্থূল পড়িয়া গেল।
বড়-তরফের কর্ত্তা বেণী ঘোষাল খুড়ার মৃত্যুতে গোপনে আরামের নিঃশ্বাস ফেলিয়া বাড়ী ফিরিয়া আসিলেন, এবং আরও গোপনে দল পাকাইতে লাগিলেন, কি করিয়া খুড়ার আগামী শ্রাদ্ধের দিনটা পণ্ড করিয়া দিবেন। দশ বৎসর খুড়া-ভাইপোয় মুখ দেখাদেখি ছিল না। বহু বৎসর পূর্ব্বে তারিণীর গৃহ শূন্য হইয়াছিল। সেই অবধি পুত্র রমেশকে তাহার মামার বাড়ী পাঠাইয়া দিয়া তারিণী বাটীর ভিতরে দাসদাসী এবং বাহিরে মকদ্দমা লইয়াই কাল কাটাইতেছিলেন। রমেশ রুড়কি-কলেজে এই দুঃসংবাদ পাইয়া পিতার শেষ-কর্ত্তব্য সম্পন্ন করিতে সুদীর্ঘকাল পরে কাল’ অপরাহ্নে তাহার শূন্যগৃহে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিল।
কর্ম্মবাড়ী। মধ্যে শুধু দুটো দিন বাকী। বৃহস্পতিবারে রমেশের পিতৃশ্রাদ্ধ। দুই একজন করিয়া ভিন্ন গ্রামের মরুব্বিরা উপস্থিত হইতেছেন। কিন্তু নিজেদের কুঁয়াপুরের কেন যে কেহ আসে না, রমেশ তাহা বুঝিয়াছিল,—হয় ত, শেষ পর্য্যন্ত কেহ আসিবেই না, তাহাও জানিত। শুধু ভৈরব আচার্য্য ও তাহার বাড়ীর লোকেরা আসিয়া কাজকর্ম্মে যোগ দিয়াছিল। স্বগ্রামস্থ ব্রাহ্মণদিগের পদধূলির আশা না থাকিলেও, উদ্যোগ-আয়োজন রমেশ বড়লোকের মতই করিতেছিল।
আজ অনেকক্ষণ পর্য্যন্ত রমেশ বাড়ীর ভিতরে কাজকর্ম্মে ব্যস্ত ছিল। কি জন্যে বাহিরে আসিতেই দেখিল, ইতিমধ্যে জন-দুই প্রাচীন ভদ্রলোক আসিয়া, বৈঠকখানার বিছানায় সমাগত হইয়া ধূমপান করিতেছেন। সম্মুখে আসিয়া সবিনয়ে কিছু বলিবার পূর্ব্বেই, পিছনে শব্দ শুনিয়া ফিরিয়া দেখিল, এক অতি বৃদ্ধ ৫।৬টি ছেলেমেয়ে লইয়া কাসিতে কাসিতে বাড়ী ঢুকিলেন।
তাঁহার কাঁধের উপর মলিন উত্তরীয়, নাকের উপর একযোড়া ভাঁটার মত মস্ত চস্মা,—পিছনে দড়ি দিয়া বাঁধা শাদা চুল, শাদা গোঁফ—তামাকের ধুঁয়ায় তাম্রবর্ণ। অগ্রসর হইয়া আসিয়া তিনি সেই ভীষণ চস্মার ভিতর দিয়া রমেশের মুখের দিকে মুহূর্ত্তকাল চাহিয়া বিনা বাক্যব্যয়ে কাঁদিয়া ফেলিলেন। রমেশ চিনিল না ইনি কে, কিন্তু যেই হোন্, ব্যস্ত হইয়া কাছে আসিয়া তাঁহার হাত ধরিতেই, তিনি ভাঙা-গলায় বলিয়া উঠিলেন,—“না বাবা রমেশ, তারিণী যে এমন ক’রে ফাঁকি দিয়ে পালাবে, তা স্বপ্নেও জানিনে, কিন্তু আমারও এমন চাটুয্যে–বংশে জন্ম নয় যে, কারু ভয়ে মুখ দিয়ে মিথ্যা কথা বেরুবে।
আসবাব সময় তোমার বেণী ঘোষালের মুখের সাম্নে ব’লে এলুম, আমাদের রমেশ যেমন শ্রাদ্ধের আয়োজন কর্চে, এমন করা চুলোয় যাক্, এ অঞ্চলে কেউ চোখেও দেখেনি।” একটু থামিয়া বলিলেন, “আমার নামে অনেক শালা অনেক রকম ক’রে তোমার কাছে লাগিয়ে যাবে বাবা’, কিন্তু এটা নিশ্চয় জেনো, এই ধর্ম্মদাস শুধু ধর্ম্মেরই দাস,আর কারো নয়।
” এই বলিয়া বৃদ্ধ সত্য-ভাষণের সমস্ত পৌরুষ আত্মসাৎ করিয়া লইয়া, গোবিন্দ গাঙ্গুলীর হাত হইতে হুঁকাটা ছিনিয়া লইয়া তাহাতে এক টান্ দিয়াই প্রবলবেগে কাসিয়া ফেলিলেন।ধর্ম্মদাস নিতান্ত অত্যুক্তি করে নাই। উদ্যোগ-আয়োজন যেরূপ হইতেছিল, এদিকে সেরূপ কেহ করে নাই। কলিকাতা হইতে ময়রা আসিয়াছিল, তাহারা প্রাঙ্গণের একধারে ভিয়ান চড়াইয়াছিল। সেদিকে পাড়ার কতকগুলা ছেলেমেয়ে ভিড় করিয়া দাঁড়াইয়াছিল। কাঙ্গালীদের বস্ত্র দেওয়া হইবে।
চণ্ডীমণ্ডপের ও-ধারের বারান্দায় অনুগত ভৈরব আচার্য্য থান ফাড়িয়া পাট করিয়া, গাদা করিতেছিল—সে দিকেও জনকয়েক লোক থাবা পাতিয়া বসিয়া এই অপব্যয়ের পরিমাণ হিসাব করিয়া, মনে মনে রমেশের নির্ব্বুদ্ধিতার জন্য তাহাকে গালি পাড়িতেছিল। গরীব-দুঃখী সংবাদ পাইয়া অনেক দূরের পথ হইতেও আসিয়া জুটিতেছিল। লোকজন, প্রজাপাঠক বাড়ী পরিপূর্ণ করিয়া, কেহ কলহ করিতেছিল, কেহ বা মিছামিছি শুধু কোলাহল করিতেছিল। চারিদিকে চাহিয়া ব্যয়বাহুল্য দেখিয়া, ধর্ম্মদাসের কাসি আরও বাড়িয়া গেল।
প্রত্যুত্তরে রমেশ সঙ্কুচিত হইয়া ‘না না’ বলিয়া আরও কি বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু ধর্ম্মদাস হাত নাড়িয়া থামাইয়া দিয়া ঘড় ঘড় করিয়া কত কি বলিয়া ফেলিলেন; কিন্তু কাসির ধমকে তাহার একটি বর্ণও বুঝা গেল না।গোবিন্দ গাঙ্গুলী সর্ব্বাগ্রে আসিয়াছিলেন। সুতরাং ধর্ম্মদাস যাহা বলিয়াছিল, তাহা বলিবার সুবিধা তাঁহারই সর্ব্বাপেক্ষা অধিক থাকিয়াও নষ্ট হইয়াছে ভাবিয়া তাঁহার মনে মনে ভারি একটা ক্ষোভ জন্মিতেছিল। তিনি এ সুযোগ আর নষ্ট হইতে দিলেন না।
ধর্ম্মদাসকে উদ্দেশ করিয়া তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিলেন,—“কা’ল সকালে, বুঝ্লে ধর্ম্মদাসদা, এখানে আস্ব ব’লে বেরিয়েও আসা হ’ল না—বেণীর ডাকাডা—‘গোবিন্দ খুড়ো, তামাক খেয়ে যাও।’ একবার ভাবলুম, কাজ নেই—তার পরে মনে হ’ল, ভাবখানা বেণীর দেখেই যাই না। বেণী কি বল্লে, জান বাবা রমেশ! বলে, খুড়ো, বলি তোমরা ত রমেশের মুরুব্বি হয়ে দাঁড়িয়েচ’, কিন্তু জিজ্ঞেস করি, লোকজন খাবে-টাবে ত?
আমি বা ছাড়ি কেন? তুমি বড়লোক আছ না আছ, আমার রমেশও কারো চেয়ে খাটো নয়—তোমার ঘরে ত এক মুঠো চিঁড়ের পিত্যেশ কারু নেই।—বললুম, বেণীবাবু, এই ত পথ, একবার কাঙ্গালী বিদেয়টা দাঁড়িয়ে দেখো।’ কালকের ছেলে রমেশ, কিন্তু বুকের পাটা ত বলি একে! এতটা বয়েস হ’ল, এমন আয়োজন কখনও চোখে দেখিনি।
কিন্তু, তাও বলি ধর্ম্মদাস দা, আমাদের সাধ্যই বা কি! যাঁর কাজ তিনি উপর থেকে করাচ্চেন। তারিণী-দা শাপভ্রষ্ট দিক্পাল ছিলেন বৈ ত নয়!” ধর্ম্মদাসের কিছুতেই কাসি থামে না, সে কাসিতেই লাগিল, আর তাহার মুখের সাম্নে গাঙ্গুলী মশাই বেশ বেশ কথাগুলি অপরিপক্ক তরুণ জমিদারটিকে বলিয়া যাইতে লাগিলেন দেখিয়া, ধর্ম্মদাস আরও ভাল কিছু বলিবার চেষ্টায় যেন আকুলি-বিকুলি করিতে লাগিল।
গাঙ্গুলী বলিতে লাগিল, “তুমি ত আমার পর নও বাবা,—নিতান্ত আপনার। তোমার মা যে আমার একেবারে সাক্ষাৎ পিসতুত বোনের মামাত ভগিনী। রাধানগরের বাঁড়ুয্যে-বাড়ী—সে সব তারিণী দা’ জান্তেন। তাই যে কোন কাজকর্ম্মে—মামলা-মোকদ্দমা কর্তে, সাক্ষী দিতে—ডাক্ গোবিন্দকে!” ধর্ম্মদাস প্রাণপণবলে কাসি থামাইয়া খিঁচাইয়া উঠিলেন; “কেন, বাজে বকিস্ গোবিন্দ?
খক্—খক্—খক্—আমি আজকের নয়—না জানি কি? সে বছর সাক্ষী দেবার কথায় বল্লি, ‘আমার জুতো নেই, খালি-পায়ে যাই কি ক’রে? খক্—খক্—তারিণী অম্নি আড়াই-টাকা দিয়ে একজোড়া জুতো কিনে দিল। তুই সেই পায়ে দিয়ে বেণীর হয়ে সাক্ষী দিয়ে এলি! খক্-খক্-খক্-খ—” গোবিন্দ চক্ষু রক্তবর্ণ করিয়া কহিল, “এলুম?”
“এলিনে?” “দূর মিথ্যাবাদী!” “মিথ্যাবাদী তোর বাবা!”
গোবিন্দ তাহার ভাঙা-ছাতি হাতে করিয়া লাফাইয়া উঠিল—“তবে রে শালা!”—ধর্ম্মদাস তাহার বাঁশের লাঠি উঁচাইয়া ধরিয়া হুঙ্কার দিয়াই প্রচণ্ডভাবে কাসিয়া ফেলিল। রমেশ শশব্যস্তে উভয়ের মাঝ্খানে আসিয়া পড়িয়া স্তম্ভিত হইয়া গেল। ধর্ম্মদাস লাঠি নামাইয়া কাসিতে কাসিতে বসিয়া পড়িয়া বলিল, “ও-শালার সম্পর্কে আমি বড়-ভাই হই কি না, তাই শালার আক্কেল দেখ—” “ওঃ, শালা আমার বড় ভাই!” বলিয়া গোবিন্দ গাঙ্গুলীও ছাতি গুটাইয়া বসিয়া পড়িল।
Read more
