সহরের ময়রারা ভিয়ান ছাড়িয়া চাহিয়া রহিল। চতুর্দ্দিকে যাহারা কাজকর্ম্মে নিযুক্ত ছিল, চেঁচামিচি শুনিয়া তাহারা তামাসা দেখিবার জন্য সুমুখে ছুটিয়া আসিল; ছেলেমেয়েরা খেলা ফেলিয়া হাঁ করিয়া মজা দেখিতে লাগিল; এবং এই সমস্ত লোকের দৃষ্টির সম্মুখে রমেশ লজ্জায়, বিস্ময়ে, হতবুদ্ধির মত স্তব্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। তাহার মুখ দিয়া একটাও কথা বাহিল হইল না। কি এ?
উভয়েই প্রাচীন, ভদ্রলোক—ব্রাহ্মণ-সন্তান! এত সামান্য কারণে এমন ইতরের মত গালিগালাজ করিতে পারে? বারান্দায় বসিয়া ভৈরব কাপড়ের থাক্ দিতে দিতে সমস্তই দেখিতেছিল, শুনিতেছিল। এখন আসিয়া রমেশকে উদ্দেশ করিয়া কহিল, “প্রায় শ’-চারেক কাপড় ত হ’ল, আরও চাই কি?” রমেশের মুখ দিয়া হঠাৎ কথাই বাহির হইল না।ভৈরব রমেশের অভিভূতভাব লক্ষ্য করিয়া হাসিল।
মৃদু অনুযোগের স্বরে কহিল, “ছিঃ গাঙ্গুলী মশাই! বাবু একেবারে অবাক্ হয়ে গেছেন। আপনি কিছু মনে কর্বেন না বাবু, এমন ঢের হয়। বৃহৎ কাজকর্ম্মের বাড়ীতে কত ঠেঙা-ঠেঙি রক্তারক্তি পর্য্যন্ত হ’য়ে যায়—আবার যে-কে সেই হয়। নিন্ উঠুন, চাটুয্যে মশাই,—দেখুন দেখি, আরও থান ফাড়্ব কি না?” ধর্ম্মদাস জবাব দিবার পূর্ব্বেই গোবিন্দ গাঙ্গুলী সোৎসাহে শিরশ্চালনপূর্ব্বক খাড়া হইয়া বলিলেন, “হয়ই ত! হয়ই ত! ঢের হয়! নইলে বিরদ কর্ম্ম বলেচে কেন?
শাস্তরে আছে, লক্ষ কথা না হলে বিয়েই হয় না যে! সে বছর তোমার মনে আছে ভৈরব, যদু মুখুয্যে মশায়ের কন্যা রমার গাছ পিতিষ্ঠের দিনে সিধে নিয়ে রাঘব ভট্চায্যিতে, হারাণ চাটুয্যেতে মাথা-ফাটাফাটি হ’য়ে গেল! কিন্তু আমি বলি ভৈরব ভায়া, বাবাজীর এ কাজটা ভাল হচ্চে না। ছোটলোকদের কাপড় দেওয়া, আর ভস্মে ঘি ঢালা এক কথা। তার চেয়ে বামুনদের একজোড়া, আর ছেলেদের একখানা ক’রে দিলেই নাম হ’ত।
আমি বলি বাবাজী সেই যুক্তিই করুন, কি বল ধর্ম্মদাসদা?” ধর্ম্মদাস ঘাড় নাড়িতে নাড়িতে বলিলেন, “গোবিন্দ মন্দ কথা বলেনি, বাবাজী! ও ব্যাটাদের হাজার দিলেও নাম হবার জো নেই। নইলে আর ওদের ছোটলোক বলেছে কেন? বুঝলে না বাবা রমেশ?” এখন পর্য্যন্ত রমেশ নিঃশব্দে ছিল। এই বস্ত্র-বিতরণের আলোচনায় সে একেবারে যেন মর্ম্মাহত হইয়া পড়িল।
ইহার সুযুক্তি-কুযুক্তি সম্বন্ধে নহে; এখন এইটাই তাহার সর্ব্বাপেক্ষা অধিক বাজিল যে, ইহারা যাহাদিগকে ছোটলোক বলিয়া ডাকে, তাহাদেরই সহস্র চক্ষুর সম্মুখে এইমাত্র যে এত বড় একটা লজ্জাকর কাণ্ড করিয়া বসিল, সে জন্য ইহাদের কাহারও মনে এতটুকু ক্ষোভ বা লজ্জার কণামাত্রও নাই। ভৈরব মুখপানে চাহিয়া আছে দেখিয়া, রমেশ সংক্ষেপে কহিল, “আরও দু’শ কাপড় ঠিক ক’রে রাখুন।” “তা নইলে কি হয়?
ভৈরব ভায়া, চল, আমিও যাই—তুমি একা আর কত পার্বে বল?” বলিয়া কাহারও সম্মতির অপেক্ষা না করিয়া গোবিন্দ উঠিয়া বস্ত্ররাশির নিকট গিয়া বসিল। রমেশ বাটীর ভিতর যাইবার উপক্রম করিতেই ধর্ম্মদাস তাহাকে একপাশে ডাকিয়া লইয়া চুপিচুপি অনেক কথা কহিল। রমেশ প্রত্যুত্তরে মাথা নাড়িয়া সম্মতি-জ্ঞাপন করিয়া ভিতরে চলিয়া গেল। কাপড় গুছাইতে গুছাইতে গোবিন্দ গাঙ্গুলী আড়চোখে সমস্ত দেখিল। “কৈ গো, বাবাজী কোথায় গো?
”বলিয়া একটি শীর্ণকায় মুণ্ডিতশ্মশ্রূ প্রাচীন ব্রাহ্মণ প্রবেশ করিলেন। ইহার সঙ্গেও গুটিতিনেক ছেলে-মেয়ে। মেয়েটি সকলের বড়। তাহারই পরণে শুধু একখানি অতি জীর্ণ ডুরে-কাপড়। বালক দু’টি কোমরে এক-একগাছি ঘুন্সি ব্যতীত একেবারে দিগম্বর। উপস্থিত সকলেই মুখ তুলিয়া চাহিল। গোবিন্দ অভ্যর্থনা করিল—“এস দীনুদা, বোসো।
বড় ভাগ্যি আমাদের যে, আজ তোমার পায়ের ধূলো পড়্ল। ছেলেটা একা সারা হয়ে যায়, তা’ তোমরা—” ধর্ম্মদাস গোবিন্দের প্রতি কট্মট্ করিয়া চাহিল। সে ভ্রূক্ষেপমাত্র না করিয়া কহিল, “তা তোমরা ত কেউ এ দিক্ মাড়াবে না, দাদা”—বলিয়া তাঁহার হাতে হুঁকাটা তুলিয়া দিল। দীনু ভট্চায আসন গ্রহণ করিয়া দগ্ধ হুঁকাটায় নিরর্থক গোটাদুই টান দিয়া বলিলেন, “আমি ত ছিলাম না ভায়া—তোমার বৌঠাক্রুণকে আন্তে তাঁর বাপের বাড়ী গিয়েছিলুম। বাবাজী কোথায়?
শুন্চি নাকি ভারি আয়োজন হচ্চে? পথে আস্তে ও-গাঁয়ের হাটে শুনে এলুম, খাইয়ে-দাইয়ে ছেলে বুড়োর হাতে ষোলখানা ক’রে লুচি আর চার-জোড়া ক’রে সন্দেশ দেওয়া হবে।” গোবিন্দ গলা খাটো করিয়া কহিল, “তা’ ছাড়া হয় ত একখানা ক’রে কাপড়ও। এই যে রমেশ বাবাজী, তাই দীনুদা’কে বল্ছিলুম বাবাজী—তোমাদের পাঁচজনের বাপ-মায়ের আশীর্ব্বাদে যোগাড়-সোগাড় একরকম করা ত যাচ্চে, কিন্তু বেণী একেবারে উঠে পড়ে লেগেচে। এই আমার কাছেই দু’বার লোক পাঠিয়েছে।
তা আমার কথা না হয় ছেড়েই দিলে, রমেশের সঙ্গে আমার যেন নাড়ির টান্ রয়েচে; কিন্তু এই যে দীনু-দা, ধর্ম্মদাস-দা, এঁরাই কি, বাবা তোমাকে ফেল্তে পার্বেন? দীনু-দা ত পথ থেকে শুন্তে পেয়ে ছুটে আস্চেন। ওরে ও ষষ্ঠীচরণ, তামাক দে না রে! বাবা রমেশ, একবার এদিকে এস দেখি, একটা কথা ব’লে নিই!” নিভৃতে ডাকিয়া লইয়া গোবিন্দ ফিস্ফিস্ করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “ভেতরে বুঝি ধর্ম্মদাস-গিন্নী এসেছে?
খবরদার, খবরদার, অমন কাজটি কোরো না বাবা! বিট্লে বামুন যতই ফোস্লাক্, ধর্ম্মদাস-গিন্নীর হাতে ভাঁড়ারের চাবিটাবি দিয়ো না বাবা, কিছুতে দিয়ো না—ঘি, ময়দা, তেল, নুন অর্দ্ধেক সরিয়ে ফেল্বে। তোমার ভাবনা কি বাবা? আমি গিয়ে তোমার মামীকে পাঠিয়ে দেব।
সে এসে ভাঁড়ারের ভার নেবে, তোমার একগাছি কুটো পর্যন্ত লোকসান্ হবে না।” রমেশ ঘাড় নাড়িয়া “যে আজ্ঞে” বলিয়া মৌন হইয়া রহিল। তাহার বিস্ময়ের অবধি নাই। ধর্ম্মদাস যে তাঁহার গৃহিণীকে ভাঁড়ারের ভার লইবার জন্য পাঠাইয়া দিবার কথা এত গোপনে কহিয়াছিল, গোবিন্দ ঠিক তাহাই আন্দাজ করিল কিরূপে?
উলঙ্গ শিশু-দুটো ছুটিয়া আসিয়া দীনু-দার কাঁধের উপর ঝুলিয়া পড়িল, “বাবা, সন্দেশ খাব।” দীনু একবার রমেশের প্রতি, একবার গোবিন্দের প্রতি চাহিয়া কহিল, “সন্দেশ কোথায় পাব রে?” “কেন, ঐ যে হচ্চে” বলিয়া তাহারা ওদিকের ময়রাদের দেখাইয়া দিল।
“আঁমরাও দাঁদামশাই”—বলিয়া নাকে কাঁদিতে কাঁদিতে আরও তিন-চারিটি ছেলে—মেয়ে ছুটিয়া আসিয়া বৃদ্ধ ধর্ম্মদাসকে ঘিরিয়া ধরিল। “বেশ ত, বেশ ত” বলিয়া রমেশ ব্যস্ত হইয়া অগ্রসর হইয়া আসিল, “ও আচায্যি মশাই, বিকেলবেলায় ছেলেরা সব বাড়ি থেকে বেরিয়েছে, খেয়ে ত আসেনি; ওহে ও কি নাম তোমার? নিয়ে এস ত ঐ থালাটা এদিকে।” ময়রা সন্দেশের থালা লইয়া আসিবামাত্র ছেলেরা উপুড় হইয়া পড়িল; বাঁটিয়া দিবার অবকাশ দেয় না, এমনি ব্যস্ত করিয়া তুলিল।
ছেলেদের খাওয়া দেখিতে দেখিতে দীননাথের শুষ্কদৃষ্টি সজল ও তীব্র হইয়া উঠিল—“ওরে ও খেঁদি, খাচ্চিস ত, সন্দেশ হয়েচে কেমন বল্ দেখি?” “বেশ বাবা।” বলিয়া খেঁদি চিবাইতে লাগিল। দীনু মৃদু হাসিয়া ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন, “হাঃ তোদের আবার পছন্দ! মিষ্টি হলেই হ’ল। হাঁ হে কারিকর, এ কড়াটা কেমন নামালে? কি বল, গোবিন্দ ভায়া, এখনো একটু রোদ আছে ব’লে মনে হচ্চে না?
ময়রা কোন দিকে না চাহিয়াই তৎক্ষণাৎ কহিল, “আজ্ঞে আছে বৈ কি! এখনো ঢের বেলা আছে, এখনো সন্ধ্যে আহ্নিকের—” “তবে কৈ, দাও দেখি একটা গোবিন্দ ভায়াকে চেখে দেখুক, কেমন কল্কাতার কারিকর তোমরা! না, না, আমাকে আবার কেন? তবে আধখানা—আধখানার বেশী নয়। ওরে ও ষষ্ঠীচরণ, একটু জল আন্ দিকি বাবা, হাতটা ধুয়ে ফেলি—” রমেশ ডাকিয়া বলিয়া দিল, “অমনি বাড়ীর ভিতর থেকে গোটা-চারেক থালাও নিয়ে আসিস্ ষষ্ঠীচরণ।
” প্রভুর আদেশমত ভিতর হইতে গোটাতিনেক রেকাবি ও জলের গেলাস আসিল এবং দেখিতে দেখিতে এই বৃহৎ থালার অর্দ্ধেক মিষ্টান্ন এই তিনটি প্রাচীন ম্যালেরিয়াক্লিষ্ট, কৃশ, সদ্ব্রাহ্মণের জলযোগে নিঃশেষিত হইয়া গেল। “হাঁ, কল্কাতার কারিকর বটে! কি বল ধর্ম্মদাসদা?” বলিয়া দীননাথ রুদ্ধনি:শ্বাস ত্যাগ করিলেন। ধর্ম্মদাস-দা’র তখনও শেষ হয় নাই, এবং যদিচ তাঁহার অব্যক্ত কণ্ঠস্বর সন্দেশের তাল ভেদ করিয়া সহজে মুখ দিয়া বাহির হইতে পারিল না, তথাপি বোঝা গেল, এ বিষয়ে তাঁহার মতভেদ নাই।
“হাঁ, ওস্তাদি হাত বটে” বলিয়া গোবিন্দ সকলের শেষে হাত ধুইবার উপক্রম করিতেই ময়রা সবিনয়ে অনুরোধ করিল, “যদি কষ্টই করলেন ঠাকুর মশাই, তবে মিহিদানাটাও অমনি পরখ ক’রে দিন।” “মিহিদানা? কৈ, আন দেখি বাপু?” মিহিদানা আসিল এবং এতগুলি সন্দেশের পরে এই নূতন বস্তুটির সদ্ব্যবহার দেখিয়া রমেশ নিঃশব্দে চাহিয়া রহিল! দীননাথ মেয়ের প্রতি হস্ত প্রসারিত করিয়া কহিলেন, “ওরে ও খেঁদি, ধর্ দিকি মা, এই দুটো মিহিদানা।
” “আমি আর খেতে পার্ব না বাবা।” “পার্বি, পার্বি।” এক ঢোক জল খেয়ে গলাটা ভিজিয়ে নে দিকি, মুখ মেরে গেছে বৈ ত নয়! না পারিস্, আঁচলে একটা গেরো দিয়ে রাখ্, কা’ল সকালে খাস্। হাঁ বাপু, খাওয়ালে বটে! যেন অমৃত! তা’ বেশ হয়েচে। মিষ্টি বুঝি দুরকম কর্লে বাবাজী!” রমেশকে বলিতে হইল না। ময়রা সোৎসাহে কহিল, “আজ্ঞে না, রসগোল্লা, ক্ষীরমোহন—”
“অ্যাঁ, ক্ষীরমোহন! কৈ, সে ত বা’র করলে না বাপু?” বিস্মিত রমেশের মুখের পানে চাহিয়া দীননাথ কহিল, “খেয়েছিলুম বটে, রাধানগরের বোসেদের বাড়ীতে। আজও যেন মুখে লেগে রয়েচে। বল্লে বিশ্বাস করবে না বাবাজী, ক্ষীরমোহন খেতে আমি বড্ড ভালোবাসি।” রমেশ হাসিয়া একটুখানি ঘাড় নাড়িল। কথাটা বিশ্বাস করা তাহার কাছে অত্যন্ত কঠিন বলিয়া মনে হইল না।
রাখাল কি কাজে বাহিরে যাইতেছিল। রমেশ তাহাকে ডাকিয়া কহিল, “ভেতরে বোধ করি আচায্যিমশাই আছেন; যা ত রাখাল, কিছু ক্ষীরমোহন তাঁকে আন্তে ব’লে আয় দেখি।” সন্ধ্যা বোধ করি উত্তীর্ণ হইয়াছে। তথাপি ব্রাহ্মণেরা ক্ষীরমোহনের আশায় উৎসুক হইয়া বসিয়া আছেন। রাখাল ফিরিয়া আসিয়া বলিল, “আজ আর ভাঁড়ারের চাবি খোলা হবে না বাবু।” রমেশ মনে মনে বিরক্ত হইল। কহিল, “বল্ গে, আমি আন্তে বল্ছি।”
গোবিন্দ গাঙ্গুলী রমেশের অসন্তোষ লক্ষ্য করিয়া চোক ঘুরাইয়া কহিল, “দখ্লে দীনু দা ভৈরবের আক্কেল? এ যে দেখি মায়ের চেয়ে মাসীর বেশী দরদ। সেইজন্যই, আমি বলি—” তিনি কি বলেন, তাহা না শুনিয়াই রাখাল বলিয়া উঠিল—“আচায্যিমশাই কি কর্বেন? ও-বাড়ী থেকে গিন্নীমা এসে ভাঁড়ার বন্ধ করেছেন যে!” ধর্ম্মদাস এবং গোবিন্দ উভয়ে চমকিয়া উঠিল—“কে, বড়-গিন্নী?” রমেশ সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করিল, “জ্যাঠাইমা এসেছেন?” “আজ্ঞে হাঁ, তিনি এসেই ছোট বড় দুই ভাঁড়ারই তালাবন্ধ ক’রে ফেলেচেন।” বিস্ময়ে, আনন্দে, রমেশ দ্বিতীয় কথাটি না বলিয়া দ্রুতপদে ভিতরে চলিয়া গেল।
“জ্যাঠাইমা?” ডাক শুনিয়া বিশ্বেশ্বরী ভাঁড়ার ঘর হইতে বাহিরে আসিলেন। বেণীর বয়সের সঙ্গে তুলনা করিলে তাহার জননীর বয়স পঞ্চাশের কম হওয়া উচিত নয়; কিন্তু দেখিলে কিছুতেই চল্লিশের বেশী বলিয়া মনে হয় না। রমেশ নির্নিমেষচক্ষে চাহিয়া রহিল। আজও সেই কাঁচাসোনার বর্ণ। একদিন যে রূপের খ্যাতি এ অঞ্চলে প্রসিদ্ধ ছিল, আজও সেই অনিন্দ্য সৌন্দর্য্য তাঁহার নিটোল পরিপূর্ণ দেহটিকে বর্জ্জন করিয়া দূরে যাইতে পারে নাই।
মাথার চুলগুলি ছোট করিয়া ছাঁটা, সুমুখের দুই একগাছি কুঞ্চিত হইয়া কপালের উপর পড়িয়াছে। চিবুক, কপোল, ওষ্ঠাধর, ললাট সবগুলি যেন কোন বড় শিল্পীর বহুযত্নের বহু সাধনার ফল। সব চেয়ে আশ্চর্য্য তাঁহার দুটি চক্ষুর দৃষ্টি। সেদিকে ক্ষণকাল চাহিয়া থাকিলে সমস্ত অন্তঃকরণ যেন মোহাবিষ্ট হইয়া আসিতে থাকে।
এই জ্যাঠাইমা রমেশকে এবং বিশেষ করিয়া তাহার পরলোকগতা জননীকে একসময় বড় ভালবাসিতেন। বধূ-বয়সে যখন ছেলেরা হয় নাই—শাশুড়ি-ননদের যন্ত্রণায় লুকাইয়া বসিয়া এই দু’টি জায়ে যখন একযোগে চোখের জল ফেলিতেন—তখন এই স্নেহের প্রথম গ্রন্থি-বন্ধন হয়। তার পরে, গৃহবিচ্ছেদ, মামলা-মকদ্দমা, পৃথক্-হওয়া, কত রকমের ঝড়ঝাপটা এই দুটি সংসারের উপর দিয়া বহিয়া গিয়াছে; বিবাদের উত্তাপে বাঁধন শিথিল হইয়াছে; কিন্তু, একেবারে বিচ্ছিন্ন হইতে পারে নাই।
বহুবর্ষ পরে সেই ছোট বৌয়ের ভাঁড়ারঘরে ঢুকিয়া, তাহারি হাতের সাজানো এই সমস্ত বহু পুরাতন হাঁড়ি-কলসির পানে চাহিয়া, জ্যাঠাইমার চোখ দিয়া জল ঝরিয়া পড়িতেছিল। রমেশের আহ্বানে যখন তিনি চোখ মুছিয়া বাহির হইয়া আসিলেন, তখন সেই দুটি আরক্ত আর্দ্র চক্ষু-পল্লবের পানে চাহিয়া রমেশ ক্ষণকালের জন্য বিস্ময়াপন্ন হইয়া রহিল। জ্যাঠাইমা তাহা টের পাইলেন। তাহাতেই, বোধ করি, এই সদ্য-পিতৃহীন রমেশের প্রতি দৃষ্টিপাত করিতেই তাঁহার বুকের ভিতরটা যেভাবে হাহাকার করিয়া উঠিল, তাহার লেশমাত্র তিনি বাহিরে প্রকাশ পাইতে দিলেন না। বরং একটুখানি হাসিয়া বলিলেন, “চিনতে পারিস্, রমেশ?
” জবাব দিতে গিয়া রমেশের ঠোঁট কাঁপিয়া গেল। মা মারা গেলে, যতদিন না সে মামার বাড়ী গিয়াছিল, ততদিন, এই জ্যাঠাইমা তাহাকে বুকে করিয়া রাখিয়াছিলেন এবং কিছুতে ছাড়িতে চাহেন নাই। সেও মনে পড়িল; এবং এও মনে হইল, সেদিন ওবাড়ীতে গেলে জ্যাঠাইমা বাড়ী নাই বলিয়া দেখা পর্য্যন্ত করেন নাই। তার পর, রমাদের বাটীতে বেণীর সাক্ষাতে এবং অসাক্ষাতে তাহার মাসীর নিরতিশয় কঠিন তিরস্কারে সে নিশ্চয় বুঝিয়া আসিয়াছিল, এ গ্রামে আপনার বলিতে তাহার আর কেহ নাই।
বিশ্বেশ্বরী রমেশের মুখের প্রতি মুহূর্ত্তকাল চাহিয়া থাকিয়া বলিলেন, “ছি, বাবা, এ সময়ে শক্ত হ’তে হয়।” তাঁহার কণ্ঠস্বরে কোমলতার আভাসমাত্র যেন ছিল না। রমেশ নিজেকে সামলাইয়া ফেলিল। সে বুঝিল, যেখানে অভিমানের কোন মর্য্যাদা নাই, সেখানে অভিমান প্রকাশ পাওয়ার মত বিড়ম্বনা সংসারে অল্পই আছে। কহিল, “শক্ত আমি হয়েচি, জ্যাঠাইমা! তাই যা পার্তুম, নিজেই করতুম; কেন তুমি আবার এলে? জ্যাঠাইমা হাসিলেন।
কহিলেন, “তুই ত আমাকে ডেকে আনিস্নি, রমেশ, যে, তোকে তার কৈফিয়ৎ দেব? তা শোন্ বলি। কাজকর্ম্ম হবার আগে আর আমি ভাঁড়ার থেকে খাবার-টাবার কোনো জিনিস বা’র হ’তে দেব না। যাবার সময় ভাঁড়ারের চাবি তোর হাতেই দিয়ে যাব, আবার কা’ল এসে তোর হাত থেকেই নেব। আর কারু হাতে দিস্নি যেন! হাঁ রে, সে দিন তোর বড়দার সঙ্গে দেখা হয়েছিল?” প্রশ্ন শুনিয়া রমেশ দ্বিধায় পড়িল। সে ঠিক বুঝিতে পারিল না, তিনি পুত্রের ব্যবহার জানেন কি না।
একটু ভাবিয়া কহিল, “বড়দা তখন ৎ বাড়ী ছিলেন না।” প্রশ্ন করিয়াই জ্যাঠাইমার মুখের উপর একটা উদ্বেগের ছায়া আসিয়া পড়িয়াছিল; রমেশ স্পষ্ট দেখিতে পাইল, তাহার এই কথায় সেই ভাবটা যেন কাটিয়া গিয়া মুখখানি প্রসন্ন হইয়া উঠিল। হাসিমুখে, সস্নেহ-অনুযোগের কণ্ঠে বলিলেন, “আ আমার কপাল! এই বুঝি? হাঁ রে, দেখা হয়নি ব’লে আর যেতে নেই?
আমি জানি রে, সে তোদের ওপর সন্তুষ্ট নয়; কিন্তু, তোর কাজ ত তোর করা চাই! যা, একবার ভাল ক’রে বল্গে যা, রমেশ! সে বড় ভাই, তার কাছে হেঁট হতে তোর কোন লজ্জা নেই। তা’ ছাড়া এটা মানুষের এম্নি দুঃসময় বাবা, যে, কোন লোকের হাতে পায়ে ধরে মিট্মাট ক’রে নিতেও লজ্জা নেই। লক্ষ্মী মাণিক আমার, যা একবার—এখন বোধ হয়, সে বাড়ীতেই আছে।
” রমেশ চুপ করিয়া রহিল। এই আগ্রহাতিশয্যের হেতুও তাহার কাছে সুস্পষ্ট হইল না, মন হইতে সংশয়ও ঘুচিল না। বিশ্বেশ্বরী আরও কাছে সরিয়া আসিয়া মৃদুস্বরে কহিলেন, “বাইরে যাঁরা ব’সে আছেন, তাঁদের আমি তোর চেয়ে বেশি জানি। তাঁদের কথা শুনিস্নে। আর আমার সঙ্গে তোর বড়দার কাছে একবার যাবি চল্।” রমেশ ঘাড় নাড়িয়া বলিল, “না জ্যাঠাইমা, সে হবে না। আর বাইরে যাঁরা ব’সে আছেন, তাঁরা যাই হোন, তাঁরাই আমার সকলের চেয়ে আপনার।
” সে আরও কি কি বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু হঠাৎ জ্যাঠাইমার মুখের প্রতি লক্ষ্য করিয়া সে মহাবিস্ময়ে চুপ করিল। তাহার মনে হইল, জ্যাঠাইমার মুখখানি যেন সহসা চারিদিকের সন্ধ্যার চেয়েও বেশি মলিন হইয়া গিয়াছে। খানিক পরে তিনি একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, “আচ্ছা, তবে তাই। যখন তার কাছে যাওয়া হতেই পার্বে না, তখন আর সে নিয়ে কথা কয়ে কি হবে। যা হোক, তুই কিছু ভাবিস্নে বাবা, কিছুই আট্কাবে না। আমি আবার খুব ভোরেই আস্ব।
” বলিয়া বিশ্বেশ্বরী তাঁহার দাসীকে ডাকিয়া লইয়া খিড়কির দ্বার দিয়া ধীরে ধীরে বাহির হইয়া গেলেন। বেণীর সহিত রমেশের ইতিমধ্যে দেখা হইয়া যে একটা কিছু হইয়া গিয়াছে, তাহা তিনি বুঝিলেন। তিনি যে পথে চলিয়া গেলেন, সেই দিকে চাহিয়া কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়াইয়া থাকিয়া, রমেশ ম্লানমুখে যখন বাহিরে আসিল, তখন গোবিন্দ ব্যগ্র হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “বাবাজী, বড়গিন্নী এসেছিলেন না?” রমেশ ঘাড় নাড়িয়া বলিল, “হাঁ।” “শুন্লুম, ভাঁড়ার বন্ধ ক’রে চাবি নিয়ে গেলেন না।
” রমেশ তেমনি মাথা নাড়িয়া জবাব দিল। কারণ, অবশেষে কি মনে করিয়া তিনি যাইবার সময় ভাঁড়ারের চাবি নিজেই লইয়া গিয়াছিলেন। “দেখলে ধর্ম্মদাস-দা, যা বলেচি তাই। বলি, মৎলবটা বুঝ্লে বাবাজী?” রমেশ মনে মনে অত্যন্ত ক্রূদ্ধ হইল। কিন্তু নিজের নিরুপায় অবস্থা স্মরণ করিয়া সহ্য করিয়া চুপ করিয়া রহিল। দরিদ্র দীনু ভট্চায তখনও যায় নাই।
কারণ তাহার বুদ্ধি-শুদ্ধি ছিল না। সে ছেলে-মেয়ে লইয়া যাহার দয়ায় পেট ভরিয়া সন্দেশ খাইতে পাইয়াছিল, তাহাকে আন্তরিক দুটো আশীর্ব্বাদ না করিয়া, সকলের সম্মুখে উচ্চকণ্ঠে তাহার সাতপুরুষের স্তব-স্তুতি না করিয়া আর ঘরে ফিরিতে পারিতেছিল না। সে ব্রাহ্মণ নিরীহভাবে বলিয়া ফেলিল, “এ মৎলব বোঝা আর শক্ত কি ভায়া? তালাবন্ধ ক’রে চাবি নিয়ে গেচেন, তার মানে ভাঁড়ার আর কারো হাতে না পড়ে।
তিনি সমস্তই ত জানেন।” গোবিন্দ বিরক্ত হইয়াছিল; নির্ব্বোধের কথায় জ্বলিয়া উঠিয়া তাহাকে একটা ধমক দিয়া কহিল, “বোঝো না, সোঝো না, তুমি কথা কও কেন বল ত। তুমি এ-সব ব্যাপারের কি বোঝ যে মানে কর্তে এসেচ?” ধমক খাইয়া দীনুর নির্ব্বুদ্ধিতা আরও বাড়িয়া গেল। সেও উষ্ণ হইয়া জবাব দিল, “আরে, এতে বোঝাবুঝিটা আছে কোনখানে? শুন্চ না, গিন্নী-মা স্বয়ং এসে বন্ধ ক’রে চাবি নিয়ে গেছেন? এতে কথা কইবে আবার কে?
” গোবিন্দ আগুন হইয়া কহিল, “ঘরে যাও না ভট্চায। যে জন্যে ছুটে এসেছিলে—গুষ্টিবর্গ মিলে খেলে, বাঁধ্লে, আর কেন, ক্ষীরমোহন পরশু খেয়ো, আজ আর হবে না। এখন যাও আমাদের ঢের কাজ আছে।” দীনু লজ্জিত ও সঙ্কুচিত হইয়া পড়িল। রমেশ ততোধিক কুণ্ঠিত ও ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিল। গোবিন্দ আরও কি বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু সহসা রমেশের শান্ত অথচ কঠিন কন্ঠস্বরে থামিয়া গেল—“আপনার হ’ল কি গাঙুলীমশাই?
যাকে-তাকে এমন খামকা অপমান কর্চেন কেন?” গোবিন্দ ভর্ৎসিত হইয়া প্রথমটা বিস্মিত হইল। কিন্তু পরক্ষণেই শুষ্ক-হাসি হাসিয়া বলিল, “অপমান আবার কাকে কর্লুম্ বাবাজী? ভাল, ওকেই জিজ্ঞাসা ক’রে দেখ না, ঠিক সত্যি কথাটি বলেচি কি না? ও ডালে-ডালে বেড়ায় ত আমি পাতায় পাতায় বেড়াই যে! দেখ্লে ধর্ম্মদাস-দা, দীনে বামনার আস্পর্দ্ধা? আচ্ছা—” ধর্মদাস-দা কি দেখিল, তাহা সেই জানে, কিন্তু রমেশ এই লোকটার নির্লজ্জতা ও স্পর্দ্ধা দেখিয়া অবাক্ হইয়া গেল।
তখন দীনু রমেশের দিকে চাহিয়া নিজেই বলিল, “না বাবা, গোবিন্দ সত্য কথাই বলেচেন। আমি বড় গরীব, সে কথা সবাই জানে। ওঁদের মত আমার জমি-জমা চাষবাস কিছুই নেই। একরকম চেয়ে-চিন্তে ভিক্ষেসিক্ষে করেই আমাদের দিন চলে। ভালজিনিস ছেলেপিলেদের কিনে খাওয়াবার ক্ষমতা ত ভগবান্ দেননি—তাই, বড় ঘরে কাজকর্ম্ম হ’লে ওরা খেয়ে বাঁচে।
কিন্তু মনে কোরো না, বাবা, তারিণীদাদা বেঁচে থাক্তে তিনি আমাদের খাওয়াতে বড় ভালবাস্তেন। তাই, আমি তোমাকে নিশ্চয় বল্চি বাবা, আমরা যে আশ মিটিয়ে খেয়ে গেলুম, তিনি ওপর থেকে, দেখে খুসীই হয়েচেন।” হঠাৎ দীনুর গভীর শুষ্ক চোখদুটো জলে ভরিয়া উঠিয়া, টপ্টপ্ করিয়া দুফোঁটা সকলের সুমুখেই ঝরিয়া পড়িল। রমেশ মুখ ফিরিয়া দাঁড়াইল।
দীনু তাহার মলিন ও শতচ্ছিন্ন উত্তরীয়প্রান্তে অশ্রু মুছিয়া ফেলিয়া বলিল, “শুধু আমিই নই বাবা! এদিকে আমার মত দুঃখী-গরীব যে যেখানে আছে, তারিণীদার কাছে, হাত পেতে কেউ কখনো অমনি ফেরেনি। সে কথা কে আর জানে বল? তাঁর ডান হাতের দান বাঁ হাতটাও টের পেত না যে! আর তোমাদের জ্বালাতন কর্ব না। নে, মা, খেঁদি ওঠ, হরিধন, চল্ বাবা ঘরে যাই, আবার কাল সকালে আস্ব, আর কি বল্ব বাবা রমেশ, বাপের মত হও, দীর্ঘজীবী হও।”
রমেশ তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে পথে আসিয়া আর্দ্রকন্ঠে কহিল, “ভট্চায্যি মশাই, এই দুটো তিনটে দিন আমার ওপর দয়া রাখ্বেন। আর বল্তে সঙ্কোচ হয়, কিন্তু এ বাড়ীতে হরিধনের মায়ের যদি পায়ের ধুলো পড়ে ত ভাগ্য ব’লে মনে কর্ব।” ভট্চায্যি মশায় ব্যস্ত হইয়া নিজের দুই হাতের মধ্যে রমেশের দুই হাত চাপিয়া ধরিয়া কাঁদ-কাঁদ হইয়া বলিলেন, “আমি বড় দুঃখী, বাবা রমেশ, আমাকে এমন ক’রে বল্লে যে লজ্জায় ম’রে যাই।”
Read more
