না মানায় না। আপনার টাকা আমি নিয়েছি। সংসারে খরচ করেছি।তুমি তোমার একটা চুলের ফিতাও ফেলে রেখে গিয়েছিলে। রেশমা চোখ তুলে তাকাল। লোকটির কাণ্ডকারখানা সে ঠিক বুঝতে পারছে না। এই লোক তার কাছে কী চায়। খারাপ মেয়েদের নিয়ে নানান ধরনের মজা করতে লোকজন ভালবাসে। এও কি মজা করছে? লোকটা জানে না যে ইচ্ছে করলেই রেশমাও লোকটাকে নিয়ে মজা করতে পারে। না রেশমা পারে না। টেপী পারে। টেপী নানান ধরনের মজা করে।
কিন্তু এখন সে টেপী না, সে এখন রেশমা। রেশমা মোটামুটিভাবে ভদ্র মেয়ে। আর মিতু কেমন মেয়ে? এই ভদ্রলোক জানেন না মিতু কেমন মেয়ে। শুধু মবিন ভাই জানেন।এই লোকটার সামনে সে কি কিছুক্ষণের জন্যে মিতু হবে? লোকটা তাকে চমকে দেয়ার চেষ্টা করছে। নানান ধরনের চশমা পরে, নানানভাবে তাকাচ্ছে। চুলের ফিতার প্রসঙ্গ তুলেছে–তার মানে চুলের ফিতা সঙ্গে নিয়ে এসেছে। রেশমা সহজ হয়ে বসল। মিষ্টি করে হাসল, একটু ঝুঁকে এসে বলল, আপনি কি আমার চুলের ফিতা নিয়ে এসেছেন?
হ্যাঁ।চুলের ফিতা ফেরত দেবার দরকার ছিল না। চুলের ফিতা আমি ইচ্ছা করে রেখে এসেছিলাম।কেন? উপহার। একটা খারাপ মেয়েরও তো উপহার দেবার ইচ্ছা হতে পারে। পারে না? হুঁ পারে। কাজেই তুমি বলতে চোচ্ছ যে আমি ঐ ফিতা রেখে দিতে পারি?
হ্যাঁ। পারেন।তুমি কথা তো খুব গুছিয়ে বলছি।নানান ধরনের মানুষের সঙ্গে মিশি। নানান রকমের কথা বলা শিখি।আমার সঙ্গে তো বেশ কিছু সময় ছিলো। আমার কাছ থেকে কী শিখেছ? আপনার কাছ থেকে শিখেছি মানুষকে কী করে ভয় দেখাতে হয়। আপনার কর্মচারীরা নিশ্চয়ই আপনাকে অসম্ভব ভয় পায়।হ্যাঁ পায়।আপনার স্ত্রীও খুব ভয় পান তাই না?
মনে হয় পায়। সে রাতে তুমি ভয় পেয়েছিলে, এখন তো মনে হয় পাচ্ছ না।না এখন পাচ্ছি না।পাচ্ছ না কেন? আমার যা মনে আসছে সেটা যদি বলে ফেলি আপনি রাগ করবেন না তো? বল, রাগ করব না।আপনাকে ভয় পাওয়ার মতো প্রচুর লোকজন আপনি চারদিকে জড়ো করে রেখেছেন, কিন্তু আপনার কথা বলার লোক নেই। যে জন্যে আপনার লোকজন আমার মতো মেয়েদের খুঁজে খুঁজে নিয়ে আসে।আমার সঙ্গে খানিকক্ষণ থেকে তোমার এই ধারণা হয়েছে?
জ্বি। অনেকের সঙ্গে মিশেছে তো। মানুষের অনেক কিছু চট করে ধরে ফেলতে পারি।তোমার জীবনের পরিকল্পনা কী? কোনো পরিকল্পনা নেই।সে কী! কোনো পরিকল্পনা নেই? না।বিয়ে করে সংসারী হবার পরিকল্পনাও নেই? রেশমা চুপ করে রইল। মোবারক সাহেব আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ছবির জগতের সঙ্গে যুক্ত আছ। তোমার কি ইচ্ছে করে না কোনো একটা ছবির নায়িকা হবে? সুপারস্টার হবে? ইচ্ছে করে?
রেশমার খুব ইচ্ছা করে। মিতুর করে না।বুঝতে পারছি না।বাবা আমার নাম রেখেছিলেন মিতু। আমার ছবির নাম রেশমা। আর রাতে যখন আপনাদের মতো মানুষদের কাছে যাই তখন আমি টেপী।তোমাকে আমি কোন নামে ডাকব? টেপী নামে ডাকবেন। টেপী নামটা খুব খারাপ লাগলে রেশমা ডাকবেন।মিতু ডাকা যাবে না? না। আপনি টেপীকে চেনেন। মিতুকে চেনেন না।চা খাবে?
না।খাও, চা খাও।মোবারক সাহেব ইন্টারকমে চা দিতে বললেন। চোখ থেকে চশমা খুলে ফেললেন। বেশিক্ষণ তিনি চোখে চশমা রাখতে পারেন না। মাথায় সূক্ষ্ম যন্ত্রণা হয়। তিনি চোখের ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেছেন।ডাক্তারের ধারণা–চশমার জন্যে চোখে যন্ত্রণা হবার কোনো কারণ নেই। ব্যাপারটা মনস্তাত্ত্বিক। একজন সাইকিয়াট্রিন্টের সঙ্গে এক ফাঁকে কথা বলতে হবে।
মোবারক সাহেব চশমা ড্রয়ারে রাখলেন। সেখান থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে সিগারেট ধরালেন। এটি দিনের প্রথম সিগারেট। প্ৰথম সিগারেট খেতে ভালো লাগে না। দ্বিতীয়টি ভালো লাগে। তিনি ঠিক করে ফেললেন, মেয়েটি থাকতে থাকতেই দ্বিতীয় সিগারেট ধরবেন। কফির সঙ্গে সিগারেট–ভালো লাগবে। মোবারক সাহেব খানিকটা ঝুঁকে এসে বললেন, তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে। খুব পছন্দ হয়েছে। তোমাকে চমৎকার কোনো গিফট আমি দিতে চাই। কী গিফট পেলে তুমি খুশি হবে বল? যা চাই তাই দেবেন?
দিয়ে ফেলতেও পারি। পরীক্ষা করে দেখ।রেশমা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, আমি কারো কাছ থেকে গিফট নেই না।তুমি তো ঠিক কথা বললে না টেপী। তুমিও গিফট নাও। মবিন বলে এক ভদ্রলোক তোমাকে গিফট দেন না? রেশমা বিস্মিত হয়ে বলল, আপনি সব খবর জানেন? হ্যাঁ। কেন?পরে এক সময় বলা যাবে।আজ বলবেন না?
না। একটা বেজে গেছে। একটার সময় আমার অন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট।স্যার আমি যাই।আচ্ছা যাও। কোথায় যাবে নিচে গিয়ে বল গাড়ি তোমাকে পৌঁছে দেবে।গাড়ি লাগবে না।মোবারক সাহেব সাধারণত আধকাপের বেশি কফি খান না। আজ পুরোকাপ শেষ করলেন। কয়েকটা জরুরি টেলিফোন কল সারলেন। তবে কোথাও খুব মন বসাতে পারলেন না।
ইনক্যামট্যাক্স লইয়ারকে এগারটায় আসতে বলেছিলেন। সে এসেছে, নিচে অপেক্ষা করছে–তার সঙ্গে বসতে ইচ্ছা করছে না। তাকে চলে যেতে বলতেও মন সায় দিচ্ছে না। অস্থির ভাবটা হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে চলে যাব–ইনক্যামট্যাক্স লইয়ারের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করবে। সে চলে গেলে হয় কী করে। অপেক্ষা করুক। টেবিলের উপর সেক্রেটারির হাতে লেখা নোট পড়ে আছে। তাকে মনে করিয়ে দেবার জন্যে নোটগুলো লেখা। দু’টা পয়েন্টে লাল স্টার মার্ক দেয়া।
১. শিক্ষামন্ত্রী আফসারউদ্দিন খাঁ দু’বার টেলিফোন করেছেন। তিনি দু’টা পর্যন্ত দপ্তরে আছেন।
২. গুলশান থেকে আম্মা টেলিফোন করেছেন। খুব জরুরি খবর আছে।
৩. চেম্বার অব কমার্সের মিটিং সোনারগাঁ হোটেলের বলরুম—সন্ধ্যা ৭টায়।
৪. বিথোভেনের স্মরণে জার্মান দূতাবাসে ককটেল পার্টি—সন্ধ্যা ৭টায়।
এক এবং তিন নম্বর আইটেমে লাল স্টার মার্ক দেয়া।
দু’ নম্বর আইটেম মোটেই জরুরি নয়। তারপরেও মোবারক সাহেব পিএকে বললেন তার স্ত্রীকে লাইনে দিতে। সঙ্গে সঙ্গে লাইন পাওয়া গেল।হ্যালো রেহানা! জরুরি কী খবর যেন দেবে বলেছিলে।তোমাকে তো টেলিফোন করে করে আমি হয়রান হয়ে গেলাম। কখনোই লাইন দেয় না। তোমার সেক্রেটারির দল কি ইচ্ছা করে আমাকে এভায়েড করে? ওদের দোষ নেই–মিটিঙে ছিলাম। জরুরি খবরটা কি বল?
তুমি যে স্বপ্নতথ্যের দু’টা বই এনেছ, দু’টা বই সম্পূর্ণ দু’রকম। একটাতে লেখা হাতি স্বপ্নে দেখলে ধন লাভ হয়। আরেকটায় লেখা হাতি স্বপ্ন দেখা বিপদের পূর্বাভাস। সম্পূর্ণ উলটা না? তা তো বটেই।এখন আমি কোনটা বিশ্বাস করব? যেটা ভালো সেটা বিশ্বাস করাই তো নিরাপদ। তুমি কি হাতি স্বপ্নে দেখেছি?
না।তাহলে হাতি দেখা নিয়ে মাথা ঘামোচ্ছ কেন? একটা বইয়ের সঙ্গে অন্যটা মিলিয়ে দেখছি–কিছু করার নেই তো… যতই ঘাটছি ততই অবাক হচ্ছি। অবশ্যি কিছু কিছু জায়গায় দু’টা বইয়ের একই অর্থ, যেমন ধর–পানি স্বপ্নে দেখলে অসুখবিসুখ হবে।ও আচ্ছা।আমি করছি কি যে সব স্বপ্লের অর্থ দু’টা বইয়ে একই লেখা সেগুলো সবুজ কালি দিয়ে দাগাচ্ছি।দাগাদাগির কাজ তো সাধারণত লাল কালি দিয়ে করা হয়, তুমি সবুজ কালি ব্যবহার করছ কেন?
আচ্ছা আচ্ছা দাঁড়াও দাঁড়াও এক সেকেন্ড খুব একটা জরুরি কথা, পরে বলতে ভুলে যাব–সিমির যমজ মেয়ে হয়েছে। আমি হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলাম–খুব সুন্দর হয়েছে।সিমিকে মোবারক সাহেব চিনতে পারলেন না, তারপরেও যথেষ্ট উদ্বেগের সঙ্গে বললেন, সিমি ভালো আছে তো? হ্যাঁ ভালো। যমজ মেয়ে দেখে একটু মন খারাপ করেছে।মন খারাপের কী আছে?
আগে আরো দু’টা মেয়ে আছে এই জন্যে একটু মন খারাপ।ও আচ্ছা, আগেও তো দু’টা মেয়ে আছে–ভুলে গিয়েছিলাম। রেহানা শোন, একটু পরে তোমাকে আবার টেলিফোন করব। ইনক্যামট্যাক্সের এক উকিল এসেছে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে।মোবারক সাহেব রেহানাকে আর কিছু বলার সুযোগ দিলেন না। টেলিফোন নামিয়ে রেখে লাল কালি দিয়ে তাঁর সামনে রাখা নোটের দু’নম্বর আইটেম কেটে দিলেন। পিএকে বললেন শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে।
শিক্ষামন্ত্রী আফসারউদ্দিন খাঁ অত্যন্ত আন্তরিক ভঙ্গিতে বললেন, মোবারক সাহেব নাকি? আরে ভাই আপনাকে তো পাওয়াই যায় না।খুবই ব্যস্ততার ভেতর আছি স্যার।ব্যস্ত মানুষ ব্যস্ততা থাকবে না? তাই বলে একেবারে যোগাযোগ বাদ দিবেন। এটা কেমন কথা!এই তো স্যার যোগাযোগ করলাম–এখন বলুন কী করতে পারি।খেদমত আপনি কী করবেন? খেদমত করব আমরা। আমরা হলাম জনগণের খেদমতগার।গরিবকে স্মরণ করেছেন কী জন্যে স্যার বলুন।আমার মেজ মেয়ের বিয়ে।
বাহ্ বাহ্ খুব ভালো সংবাদ।ভালো সংবাদ মন্দ সংবাদ জানি না। মেয়ে যখন আছে পার তো করতে হবে–আপনার ছেলেপুলে নাই–ঝাড়া হাত-পা মানুষ, ছেলেপুলের বিয়েশাদির যন্ত্রণা আপনাকে পোহাতে হচ্ছে না। You are a lucky man.মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে যদি আপনার কোনো কাজে লাগি বলতে লজ্জা করবেন না।
আরে লজ্জা করব কেন? আপনি তো বাইরের কেউ না। আপনার ভাবি কাল রাতেও বলছে–মোবারক সাহেবকে কিন্তু টেলিফোনে দাওয়াত দেবে না। নিজে গিয়ে দাওয়াত দেবে।আপনি কিন্তু স্যার ভাবির কথা শোনেন নি, টেলিফোনে দাওয়াত সেরেছেন।আরো ছিঃ ছিঃ কী যে বলেন! বিয়ের খবরটা ইন অ্যাডভান্স আপনাকে দিলাম–দাওয়াতের তো কার্ডই ছাপা হয় নি।স্যার বিয়েটা কবে?
এখানো দেরি আছে। ২৫ তারিখ শুক্রবার, সেনাকুঞ্জে।আপনার মেয়েকে একটু জিজ্ঞেস করে দেখবেন সে চাচার কাছ থেকে কী উপহার চায়। নাকি আমি নিজেই জিজ্ঞেস করব? সর্বনাশ ঐ কাজ করতে যাবেন না। সে গাড়ি চেয়ে বসবে। ঐ দিন সে তার মাকে বলছিল মোবারক চাচার অভ্যাস উপহার দেয়ার আগে জিজ্ঞেস করা কী উপহার চাই। আমাকে যদি জিজ্ঞেস করে আমি বলব–লাল রঙের টয়োটা সিভান।লাল রঙের টয়োটা সিভানের শখ?
আরে ভাই ছিঃ ছিঃ আমার এই পাগলি মেয়ের কথার কোনো গুরুত্ব দেবেন না। যদি কিছু দিতে হয় একটা কোরান শরিফ দেবেন। মোবারক সাহেব।জ্বি।মেয়ের লাল গাড়ির শখের কথা আপনাকে বলা উচিত হয় নি। আপনি তো আবার ছেলেমেয়ের শখের অত্যধিক গুরুত্ব দেন–ভাই শুনুন আমার নিজের ব্যক্তিগত ধারণা–আল্লাহপাকের পাক কালামের চেয়ে ভালো গিফট কিছুই হয় না। এখন এর কারণে আপনারা আমাকে প্রাচীনপন্থী মনে করেন বা না করেন–কিছু যায় আসে না…
আফসারউদ্দিন খাঁ সাহেবও রেহানার মতো দীর্ঘ সময় কথা বললেন। মোবারক সাহেব ছাড়া পেলেন আধঘণ্টা পর। পিএকে বললেন–নোট করে রাখুন মন্ত্রী আফসারউদিনের মেয়ের বিয়ে ২৫ তারিখ। সেনাকুঞ্জে। বিয়ের টাইমটা জেনে নেবেন। গিফট আইটেম–একটা কোরান শরিফ সুন্দর করে র্যাপিং পেপারে মোড়া।কোরআন শরিফ?
হ্যাঁ।মোবারক সাহেব মনে মনে হাসলেন। মন্ত্রী আফসারউদিনের সঙ্গে এই রসিকতা করা যায়। সে নিশ্চিত ধরে নিয়েছে লাল রঙের টয়োটা সিভান আসছে। সে জানে না। এই জগতের কোনো কিছুই নিশ্চিতভাবে নেয়া ঠিক না। জগতের কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়।ঢাকা সেন্ট্রাল জেল থেকে চিঠি এসেছে। রফিক লিখছে–সে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তার শরীর খারাপ। মা যেন একবার তাকে দেখতে যায়।
শাহেদাকে সেই চিঠি দেখানো হয়েছে। তিনি কিছু বলেন নি। ঝুমুর বলল, তুমি কি দেখতে যাবে? শাহেদা তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়েছেন। সেই প্রশ্নেরও জবাব দেন নি। ঝুমুর বলল, তুমি যদি যেতে চাও, আপাকে বলতে হবে। দেখা করতে চাইলেই তো দেখা হয় না। ঘুস-টুস খাওয়াতে হয়। আগে থেকে না জানালে আপা ব্যবস্থা করবে কীভাবে? শাহেদা তারপরেও জবাব দিলেন না। ঝুমুর বলল, তুমি কি আপার সঙ্গে কথা বলবে? আপা ঘরেই আছে। আজ সে কোথাও যাবে না।তুই স্কুলে যা। তোকে এত কথা বলতে হবে না।
আমি আজ স্কুলে যাব না। আপার সঙ্গে সারাদিন গল্প করব।কর যা ইচ্ছা।মিতু দরজা ভিজিয়ে শুয়ে আছে। ছোট বোনের সঙ্গে গল্প করার ব্যাপারে তার তেমন আগ্ৰহ দেখা যাচ্ছে না। ঝুমুর কয়েকবার কাছে গেল, বিছানার পাশে বসল। মিতু তাকিয়ে দেখল–কিছু বলল না আপা মাথা বিলি দিয়ে দেব? মিতু না-সূচক মাথা নাড়ল।শুয়ে আছ কেন? শরীর খারাপ লাগছে? শরীর খারাপ লাগছে না। শরীর ভালোই, আরাম করছি। বিকেল পর্যন্ত শুয়ে থাকব।তারপর? বিকেলে বেরুব।ঝুমুর আপার চোখের উপর থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল, রাতে শুটিং আছে?
হুঁ।সারারাত শুটিং চলবে? মিতু হাঁ-সূচক মাথা নেড়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে পাশ ফিরল। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলল, ঝুমুর তুই কি আমার একটা কাজ করে দিবি? অবশ্যই দেব।একটা চিরুনি কিনে আনবি। সুন্দর একটা চিরুনি।চিরুনি দিয়ে কী করবে?
চিরুনি দিয়ে মানুষ কী করে।তোমার তো চিরুনি আছে এই জন্যেই জিজ্ঞেস করছি।মবিন ভাইকে দেব। ঐ দিন দেখলাম ওর চিরুনি নেই।আমিও তাই আন্দাজ করছিলাম।জানালার পর্দা টেনে দে তো।ঝুমুর উঠে পড়ল। জানালার পর্দা টেনে দিতে বলার অর্থ–আমি এখন ঘুমুব। আপা তাকে খুব ভদ্রভাবে বলছে, তুই উঠে চলে যা।আপা তুমি চা খাবে? চা বানিয়ে আনব?
না।ঝুমুর ইতস্তত করে বলল, তোমাকে আমি একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম। আপা, জরুরি কথা।বল।আমি এই বছর পরীক্ষা দেব না। সামনের বছর দেব।মিতু কিছু বলছে না। চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। মনে হচ্ছে সে ঘুমিয়ে পড়েছে।আপা আমি একদম পড়াশোনা করতে পারছি না। বই নিয়ে বসি অন্য কথা ভাবি। সামনের বছর আমি খুব মন দিয়ে পড়ব। পরীক্ষায় দেখবে খুব ভালো করব। ঠিক আছে আপা? মিতু চোখ না মেলেই বলল, আমার হ্যান্ডব্যাগ থেকে টাকা নিয়ে একটা চিরুনি কিনে না।এখনি যাব?
এক সময় গেলেই হবে।পরীক্ষার ব্যাপারে তো তুমি কিছু বললে না।মিতু চাপা গলায় বলল, পরীক্ষা দেয়া না-দেয়া তোর ব্যাপার। আমার আর বলার কী আছে? রাগ করছ না তো? না। তুই এখন ঘর থেকে যা।ঝুমুর চিরুনি কিনতে বের হয়ে গেল। তখন ঘরে ঢুকলেন শাহেদা। তাঁর হাতে চায়ের কাপ। পিরিচে দু’টা বিসকিট। মিতু বিছানায় উঠে বসতে বসতে বলল, চা খাব না। মা। তুমি খেয়ে ফেল। বিসকিটও খাব না।
সকালে নাশতাও খাস নি। খিদে জমাচ্ছি। দুপুরে এক গামলা ভাত খেয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুমুব।শাহেদা মেয়ের পাশে বসে চা খাচ্ছেন। মিতু বলল, বিসকিট খাও মা। তোমার খাওয়া দেখি।খাওয়া দেখার কী আছে? অনেক কিছুই আছে। পৃথিবীর সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো খাওয়া। সেই খাওয়া দেখাটা তুচ্ছ করার মতো কিছু না।বাড়িওয়ালা বাড়ি ছেড়ে দিতে বলেছে, শুনেছিস? হুঁ। ঝুমুরের কাছে শুনলাম।বাড়ি দেখেছিস?
না।এক তারিখের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে তো।বললেই তো বাড়ি ছেড়ে দেয়া যায় না।আমি বলেছি ছেড়ে দেব।বলেছ, ভালো করেছ। আমি বুঝিয়ে বলব।আমি এখানে থাকতে চাই না। লোকজন আজেবাজে কথা তোর নামে ছড়াচ্ছে।যেখানে যাবে সেখানেও তো ছড়াবে।শাহেদা চুপ করে গেলেন। চায়ে বিসকিট ভিজিয়ে তিনি বিসকিট খাচ্ছেন। মিতু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে।আজ রান্না কী মা?
নলা মাছ নিয়ে এসেছিল। রাতে খাবি। দুপুরে ডাল ভাত।দুপুরেই রাঁধ মা। আরাম করে খাই। রাতে আমি থাকব না। রাতে শুটিং আছে।আজ শুক্রবারে। শুক্রবার তো শুটিং থাকে না।আজ আছে।ঐ দিন না বললি ছবির কাজ শেষ হয়ে গেছে? প্যাঁচওয়ার্ক বাকি আছে। কিছু অংশ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল সেগুলো আবার করা হবে।রাতে ফিরবি না? না।শাহেদা মুখ শক্ত করে বসে আছেন। তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। চায়ের কাপে তিনি এখন আর চুমুক দিচ্ছেন না। বিড়বিড় করে কী যেন বললেন। মিতু শঙ্কিত গলায় বলল, কিছু বলছ মা?
শাহেদা ক্ষীণ স্বরে বললেন, তোর বাবাকে কাল রাতে স্বপ্নে দেখেছি। মুখটা খুব মলিন। তিনি বললেন–তুমি এত কষ্ট করছ, কেন? কষ্ট করার দরকার কি? এই টিনটা রাখ, এখানে ইঁদুর মারা বিষ আছে। তুমি নিজে খাও–মেয়ে দু’টাকে খাওয়াও, দেখবে সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। এই বলে তিনি একটা টিনের কৌটা আমার হাতে দিলেন।রাতদিন এইসব ভাব এই জন্যেই স্বপ্নে দেখেছি।তোর বাবা কথাটা কিন্তু ভুল বলে নি।মিতু হাসছে। শাহেদা বললেন, হাসছিস কেন?
এমনি হাসছি। তুমি ঝাল ঝাল করে নলা মাছ রাঁধ তো মা। ইঁদুর মারা বিষ আবার মিশিয়ে দিও না। আমার এখন মরার কোনো রকম ইচ্ছা নেই।শাহেদা নড়লেন না। বসেই রইলেন। মিতু বলল, এক কাজ করলে কেমন হয় মা, আজ আমি রান্না করি, রান্না করে তোমাকে খাওয়াই। তুমি চুপচাপ শুয়ে বিশ্ৰাম কর। আরেকটা কথা শোন, সংসারের সমস্যা নিয়ে তুমি মোটেও ভাববে না। আমি কী করব তোমাকে বলি, ঝুমুরকে বিয়ে দিয়ে দেব। ওর আর পড়াশোনা হবে না। ওর পড়াশোনায় মন নেই। মোটামুটি ধরনের একটা ছেলে দেখে ওর বিয়ে দিয়ে দিতে হবে। ওর চেহারা ভালো–ছেলে পাওয়া কোনো সমস্যা হবে না। তোমাকে আমি বলি নি।
এর মধ্যেই একটা সম্বন্ধ এসেছে। ছেলেটা ব্যাংকে চাকরি করে। ছোট চাকরি। তবে সংসারের দায়দায়িত্ব নেই। দু’জন মিলে ওরা সুখেই থাকবে। মবিন ভাই এর মধ্যে একটা চাকরি পেয়ে যাবে। তখন আমি বিয়ে করব। তুমি থাকবে আমার সংসারে। মাঝে মাঝে ঝুমুরকে গিয়ে দেখে আসবে। এখন তুমি আসি তো আমার সঙ্গে, রান্নার সময় যদি ভুল-টুল করি তুমি ধরিয়ে দেবে। আরেকটা কথা মা–এর পরে যদি কোনোদিন স্বপ্নে বাবাকে দেখ তোমার কাছে ইঁদুর মারা বিষ গছিয়ে দিতে চাচ্ছে তাহলে তুমি তাঁকে কিন্তু কঠিন ধমক দেবে।
মিতু বিছানা থেকে নামল। তার মাকে হাত ধরে তুলল। মিতুর মুখ হাসি হাসি।শাহেদা বললেন, ঝুমুরকে বিয়ে করতে চাচ্ছে যে তার নাম কি? আমানুল্লাহ্। অগ্ৰণী ব্যাংকে কাজ করে।কী রকম কাজ? দারোয়ান টারোয়ান না তো? না দারোয়ান না, ক্লার্ক।তোকে সরাসরি বলেছে? আমাকে বলে নি, মবিন ভাইকে বলেছে।ওকে কেন বলবে? ও কে? তার কিছু বলার থাকলে সরাসরি তোকে কিংবা আমাকে বলবে। ছেলেটার দেশ কোথায়? আমি মা কিছুই জানি না। আমি খোঁজ নিয়ে বলব।কবে খোঁজ নিবি?
আজই খোঁজ নেব। এফডিসিতে যাবার আগে মবিন ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে তারপর যাব।মবিন শুয়ে ছিল। মিতুকে দেখে ধড়মড় করে উঠে বসল। অবাক হয়ে বলল, আরো তুমি।মিতু বলল, অবেলায় শুয়ে আছ কেন? বেকার মানুষের আবার বেলা, অবেলা, কালবেলা? তুমি এই সময় যে? এটা কি নিষিদ্ধ সময়? না নিষিদ্ধ হবে কেন? এস ভেতরে এস? আমার চিরুনি এনেছ? হুঁ।সিগারেট? না। সিগারেট আনা হয় নি।কতক্ষণ থাকবে? রাত আটটা পর্যন্ত থাকতে পারি। কিন্তু তোমার তো সময় হবে না।সময় হবে না তোমাকে কে বলল? সন্ধ্যাবেলায় তোমার টিউশানি আছে না?
ছিল–এখন নেই। সন্ধ্যাটায় আমি এখন স্বাধীন। গতকাল সন্ধ্যায় কী করেছি। জান, একটা সিনেমা দেখে ফেললাম, ‘জানি দুশমন’। আশায় আশায় গিয়েছিলাম, হয়তো তোমাকে দেখব। জানি দুশমন ছবিতে তুমি কাজ কর নি। তাই না? না!টেপী কি করেছে? সুন্দর মতো একটা এক্সট্রা মেয়ে দেখলাম। নায়িকার সঙ্গে নদীতে পানি আনতে গেল।টেপী ঐ ছবিতে কাজ করেছে কিনা বলতে পারছি না।দেখা হলে জিজ্ঞেস কোরো তো। ওর সঙ্গে এখন দেখা হয় না?
কম হয়।ছবির ঐ মেয়েটাকে দেখে মনে হলো, এ নিশ্চয়ই টেপী। মেয়েটার মাথা ভর্তি চুল, জোড়া ভুরু।জোড়া ভুরু! তাহলে টেপী না। টেপীর জোড়া ভুরু না।মবিন আগ্রহের সঙ্গে বলল, টেপীর কথা আমার প্রায়ই মনে হয়। ওকে আমার দেখার খুব ইচ্ছা। একদিন তোমার সঙ্গে এফডিসিতে যাব। মেয়েটাকে দেখে আসব।আচ্ছা।ও আছে কেমন?ভালোই আছে। দারুণ এক বড়োলোকের সঙ্গে তার ভাব হয়েছে। সেদিন এফডিসি থেকে গাড়ি পাঠিয়ে তাকে নিয়ে গেল।বল কী! সত্যি? হ্যাঁ সত্যি।টেপী নিশ্চয়ই খুব খুশি।না খুশি না। ও দেখলাম খুব ভয়ে ভয়ে গাড়িতে উঠল। মুখটা কান্নাকান্না।কেন বল তো?
বড়লোকেরা গাড়ি পাঠিয়ে তো আর গল্প করার জন্যে নিয়ে যায় না, প্রেম করার জন্যেও নিয়ে যায় না–অন্য কারণে নিয়ে যায়। সবাই সেটা জানে। কাজেই সবার চোখের উপর দিয়ে বিরাট এক গাড়িতে করে যাওয়া খুব লজ্জার ব্যাপার না?অস্বস্তির ব্যাপার তো বটেই। দারুণ বড়লোকদের জন্যে দারুণ বড়লোক মেয়ে পাওয়া সমস্যা না–তারা পথেঘাটের মেয়েদের গাড়ি পাঠিয়ে নিয়ে যাবে কেন?
মিতু হাই তুলতে তুলতে বলল, পথের মেয়েদের সঙ্গে যত সহজ হওয়া যায় অন্যদের সঙ্গে তো তত সহজ হওয়া যায় না। পথের মেয়ের আলাদা আনন্দ আলাদা থ্রিল। যাই হোক টেপীকে নিয়ে আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। অন্য কিছু নিয়ে কথা বল।কী কথা শুনতে চাও?যা ইচ্ছা বল। তার আগে কাছে আস তো আমি তোমার চুল আঁচড়ে দিই। নাকি আমি চুল আঁচড়ে দিলে লজ্জা লাগবে?
না লজ্জা লাগবে না।মবিন এগিয়ে এল। খুব কাছে এল না। মাথা এগিয়ে দিল। যেন গায়ের সঙ্গে গা লেগে গেলে মস্ত বড়ো অন্যায় হয়ে যাবে। মিতু চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল, তুমি কি ঝুমুরের জন্যে একটা ছেলে যোগাড় করে দেবে? আমি ওর বিয়ে দিয়ে দেব।বাচ্চা মেয়ে বিয়ে দেবে কেন?
ওরা এখনই বিয়ে হওয়া ভালো। বিয়ে হলে মা মানসিক শান্তি পাবেন। মা ওকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা করেন। মা’কে আমি অবশ্যি বলেছি আমানুল্লাহ নামের এক ছেলে ঝুমুরকে বিয়ে করতে চায়। এতেই মা খুশি।আমানুল্লাহ কে?
মিতু হাসতে হাসতে বলল, আমানুল্লাহ কেউ না। আমার বানানো এক নাম। মা’কে খুশি করার জন্যে গল্পটা তৈরি করা।তিনি খুশি হয়েছেন? হ্যাঁ খুশি হয়েছেন। অভিনয় তো আমি ভালো পারি–যাই বলি এত সুন্দর করে বলি, সবাই বিশ্বাস করে।আমার বেলাতেও তাই করা? না।কখনো না?
Read more