আমার খালাতাে ভাইয়ের দিক থেকে। ও আচ্ছা।
আমাদের বাসায় অবশি রহমান ভাইয়ের যাতায়াত তারও আগে থেকে। আমরা এক পাড়ায় থাকি।
তাই নাকি? হঁা, মালিবাগে । ওয়ারলেস অফিসের কাছে। ওয়ারলেস অফিস দেখেছেন আপনি ?
হ্যা।।
ওর উত্তর দিকে। আমাদের অবশ্যি ভাড়া বাড়ি, রহমান ভাইয়ের মতো নিজের বাড়ি নয়। ঐ বাড়ি রহমানদের নিজের নাকি ? হা। আপনি কি ভেবেছিলেন ভাড়া বাড়ি ? হ্যা। না, ভাড়া না। রহমান ভাইয়ের দাদা বানিয়েছিলেন।
মেয়েটি আমাকে মােটেই পছন্দ করল না, কিন্তু তবুও অনর্গল তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কথা বলে যেতে লাগল। এই অল্প সময়ের মধ্যে আমি জেনে ফেললাম, ওর এক মামাতাে বােনের ইউটেরিয়া অপারেশন হয়েছে। এখন আর তাদের বাচ্চাকাচ্চা হবে না। অথচ ভদ্রমহিলার খুব বাচ্চার শখ। ঘরভর্তি শুধু বাচ্চাদের ছবি। আর ওর বরটি এতই অমানুষ যে, দ্বিতীয়বার বিয়ের কথা ভাবছে। ছেলেরা খুৰ হৃদয়হীন হয়। নিজেদের ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারে না।
রিকশা থেকে নামবার সময় পেরেকে লেগে মেয়েটির শাড়ি অনেকখানি ছিড়ে গেল। তার মুখ মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকার হয়ে গেল। কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল, এখন বাসায় গিয়ে আমি বলব কী?
প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ
বাসায় কিছু বলতে হবে নাকি ? বলতে হবে না ? শাড়িটা আমার নাকি ? কার শাড়ি ? | ছােট আপার শাড়ি। রাজশাহী সিল্ক। একদিনও পারে নি। সে আজ আমাকে মেরেই ফেলবে।
ছিড়েছে যে এটা বললেই হয়। ভাঁজ করে রেখে দেবেন। ঠাট্টা করছেন ? এরকম অবস্থায় কেউ ঠাট্টা কার?
মেয়েদের ব্যাপার আমি ভালাে জানি না। হয়তাে নতুন শাড়ি ছিড়ে ফেলা একটা ভয়াবহ ব্যাপার। মেয়েটির চোখে জল ছলছল করছে। কেঁদেই ফেলবে কি-না কে জানে। বিচিত্র কিছু নয়।
বােটানিক্যাল গার্ডেনে জেসমিনের সঙ্গে আমার আর কোনাে কথা হয় নি। সবার হাসি-ঠাট্টা হজম করে দূরে দূরেই থেকেছি। কিন্তু আধঘণ্টা রিকশায় পাশাপাশি বসার মধ্যে অদ্ভুত কোনাে ম্যাজিক আছে। আমি সত্যি সত্যি ওর প্রেমে পড়ে গেলাম।
এরপর ছুটিছাটা হলেই মগবাজার ওয়ারলেস অফিসের সামনে ঘােরাঘুরি করতাম, যদি কখনাে দেখা হয়। আশেপাশের যে কয়টি হলুদ রঙের বাড়ি আছে সব কটির সামনে দিয়ে কতবার যে গিয়েছি। দেখা হয় নি কখনাে। একদিন শুধু রহমানের সঙ্গে দেখা হলাে। সে অবাক হয়ে বলল, এই দিকে কোথায় ? একজনকে খুঁজছি।। বলে পাশ কাটিয়ে চলে এসেছি, ‘থচ খুব সহজেই জেসমিনের ঠিকানা জিজ্ঞেস করা যেত। ইচ্ছা করে নি। আমি চাচ্ছিলাম কারাে সাহায্য নিয়ে নয়, নিজেই তাকে খুঁজে বার করি।
প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ
তারপর সত্যি সত্যি একদিন দেখা হয়ে গেল। মেয়েদের সঙ্গে আমি কখনাে সহজভাবে কথা বলতে পারি না, কথা জড়িয়ে যায়। কিন্তু আশ্চর্য, সেদিন নিউমার্কেটের সমস্ত ভিড় উপেক্ষা করে হাসিমুখে এগিয়ে গিয়ে বললাম, চিনতে পারছেন ?
জেসমিন তাকিয়ে রইল অবাক হয়ে। মনে হলাে চিনতে পারছে না। ঐ যে বােটানিক্যাল গার্ডেনে গেলাম রহমানের সঙ্গে? মনে আছে। মনে থাকবে না কেন ?
জেসমিনকে আজ আর সেদিনের মতাে রূপসী লাগছিল না। সাধারণ বাঙালি মেয়েদের মতাে দেখাচ্ছিল। সাজগােজ মেয়েদের সম্ভবত অনেকটা বদলে দেয়। আমি অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বললাম, অনেক দিন থেকেই আমি আপনাকে মনে মনে খুঁজছিলাম।
কেন? আপনার ছােট আপা কী বলল সেটা জানতে চাচ্ছিলাম। ছােট আপা আবার কী বলবে? কিসের কথা বলছেন ? ঐ যে শাড়ি ছিড়ে গেল। আপনি সত্যি সত্যি জানতে চান ? হ্যা, চাই।
আপা কিছু বলে নি। ওর অনেক শাড়ি। ছিড়ে গেলে কী আর হবে। ইচ্ছা করে তাে ছিড়ি নি। জেসমিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, শুধু এই কথা জিজ্ঞেস করবার জন্যে আপনি আমাকে খুঁজছিলেন ? হ্যা।
বাসায় গেলেন না কেন ? ১২১ নং মালিবাগ । বাসার সামনে একটা নারকেল গাছ আছে। রহমান ভাইকে জিজ্ঞেস করলেই ঠিকানা জানতে পারতেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন না কেন?
আমি কিছু বললাম না। জেসমিন কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। আমার কিছু বলার ছিল না। কিংবা ছিল, বলতে পারলাম না । ঠিক সময়ে আমরা ঠিক কথাটি কখনাে বলতে পারি না। ভুল কথাটা শুধু মনে আসে।
চমৎকার লাগল লেবু-চা। আরেক কাপ খেতে ইচ্ছে করছে। করিম সাহেবকে দ্বিতীয় কাপের কথাটা বলা ঠিক হবে কি-না বুঝতে পারছি না। তিনি হয়তাে বিরক্ত হবেন।
প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ
জানালার পর্দা সরাতেই দেখলাম আচার-খাওয়া মেয়েটি স্কুলের জামা কাপড় পরে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, এদের বাড়ির সামনে দিয়ে এতবার আসা-যাওয়া করি, কখনাে তার সঙ্গে মুখােমুখি দেখা হয় একবার দেখা হলে বুঝতাম সত্যি সত্যি নীলিমার সঙ্গে এই মেয়েটির চেহারার মিল আছে কি-না। ওদের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব নাকি ? বত্রিশ বৎসরের একজন লােক তের-চোদ্দ বছরের একটি বালিকার মুখ দেখবার জন্য দাঁড়িয়ে আছে, ব্যাপারটা খুব হাস্যকর। মাঝে মাঝে আমরা সবাই বােধহয় এরকম উদ্ভট কিছু করি। আমি রাস্তায় নেমে এলাম। এত ভােরে মেয়েটি কোথায় যাচ্ছে ? মর্নিং শিফট স্কুল নাকি?
আনন্দ বাের্ডিং হাউসের মালিক আমাকে দেখে বললেন, স্লমালিকুম ফরিদ সাহেব, কোথায় যান?
নাশতা খাব। দেখি রেষ্টুরেন্ট খুলেছে কি না। আজ মনে হয় সকালে উঠেছেন ?
জি। আজ হাসপাতালে যাচ্ছি। গনি সাহেব, আপনার রেন্ট কত হয়েছে। হিসাব করেন। দিয়ে যাব। -০২)
এখনই কেন ? মাস শেষ হোক, তারপর দেবেন। অসুখটা ভালাে না। হাসপাতাল থেকে নাও ফিরতে পারি। | গনি সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। বিড়বিড় করে কী যেন বললেন। এই লোকটিকে আমি বেশ পছন্দ করি। নির্বিরােধী ভালােমানুষ টাইপের লােক। এরকম মানুষ বাের্ডিংয়ের ব্যবসা করে টিকে আছে কীভাবে কে জানে!
ফরিদ সাহেব। জি ?
এইরকম কথা বলা ঠিক না। আল্লাহ নারাজ হন। হায়াত-মউত মানুষের হাতে না। আল্লাহপাকের হাতে। তা ঠিক। গনি সাহেব, আমার চিঠিপত্র রেখে দেবেন যদি আসে, আসবে না হয়তাে।
জি আচ্ছা। আর শােনেন ভাই, আমি এখন যাচ্ছি, বারােটার দিকে ফিরব। আমার বন্ধু বান্ধবদের আসার কথা, ওদের বসতে বলবেন। চাবিটা রাখেন।
Read more