প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২)

ঠিক আছে। আর কী কী লাগবে বল, লিস্টি করে ফেলা যাক। 

হাসপাতালে যেতে হলে কী কী নিতে হয় কে জানে!

টুথপেস্ট এবং টুথব্রাশ এই দুটি জিনিস নিশ্চয়ই লাগে।

টুথপেস্ট আছে।

এ মাসের দু’তারিখেই কেনা হয়েছে। চিরুনি নিতে হয় নিশ্চয়ই।

নাকি চিরুনি দিয়ে মাথা কেউ আঁচড়ায় না ? রােগীদের এসব করতে নেই।প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ 

হাসপাতাল সম্পর্কে আমার তেমন কোনাে অভিজ্ঞতা নেই। প্রায় একযুগ আগে বড় আপা হাসপাতালে গিয়েছিলেন। সেই যাওয়া ছিল উৎসবের যাওয়া। আমাদের মধ্যে দারুণ হৈ-চৈ ও উত্তেজনা। একটি প্রকাণ্ড স্যুটকেস ঠেসে বােঝাই করা হলাে। সেখানে সকালে পরার শাড়ি, বিকেলে পরার শাড়ি, গায়ে মাখার পাউডার, পানের মসলা সবই আছে। বড় আপা ক্রমাগত কাঁদছে। আমাদের খুব ফুর্তি। সবাই হাসছি। আমি এবং আমার মেজো ভাই ছুটে গিয়ে বেবিট্যাক্সি নিয়ে এলাম। বড় আপা তার বিশাল পেট নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে উঠল বেবিট্যাক্সিতে। বড় সুখের যাত্রা।

আমার বাবা, যিনি প্রায় কোনাে ব্যাপারেই উৎসাহ প্রকাশ করেন না, মুখ সবসময় আমশি করে রাখেন, তাঁকেও দেখা গেল হাতে সিগারেট নিয়ে হাসিমুখে কথা বলছেন। (কথা বলছেন মানে উপদেশ দিচ্ছেন। আমার বাবা উপদেশ দেয়ার প্রয়ােজন না হলে কথা বলেন না।) দুলাভাই লাজুক ভঙ্গিতে বড় আপার পাশে গিয়ে বসলেন। আমার মা বললেন, বজলু, তুমি বাঁ দিকে বসাে। মা’র অনেক ডান-বামের ব্যাপার ছিল। দুলাভাই বাধ্য ছেলের মতাে কথা শুনলেন। মা বেবিট্যাক্সিতে ওঠার আগে তিন মিনিট দাঁড়িয়ে লম্বা কী একটা দায়া পড়লেন। খুব সম্ভব সুরা আর রহমান। এই দোয়াটি তাঁর খুব পছন্দ। খুব কড়া দোয়া। খুব কাজের। 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

বিভিন্ন রকম দোয়া-দরুদ মার মুখস্থ। তাঁর কাছে এক কপি নেয়ামুল *অনি আছে। এই গ্রন্থটিকে তিনি যাবতীয় সমস্যার সমাধান বলে মনে করেন । একবার তার বালিশের নিচ থেকে আংটি চুরি হয়ে গেল। তার মুখ হয়ে গেল মরা মানুষের মুখের মতাে। দেখলাম, তিনি নেয়ামুল কুরআনের পাতা ওল্টাচ্ছেন। সেখানে নাকি হারানাে জিনিস খুঁজে পাওয়ার একটা দোয়া আছে । সারা দুপুর মা সেই দোয়া পড়লেন। মাঝারি সাইজের এক বালতি চোখের পানি ফেললেন। সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে আংটি পাওয়া গেল। মা গম্ভীর গলায় বললেন, বিশ্বাস তাে করিস না, দোয়ার মরতবা দেখলি? 

মা’র দোয়া অবশ্যি সবসময় কাজ করে না। কাজ করলে বড় আপা হাসপাতাল থেকে ফিরত। সে ফেরে নি। বারাে-তেরাে বৎসর আগের ব্যাপার। এখন আর সবকিছু পরিষ্কার মনে নেই। কষ্টের ব্যাপারগুলাে মানুষের ভালাে মনে থাকে না। সে কখনাে মনে রাখতে চায় না। কিন্তু সুখের ব্যাপার খুব ভালােভাবে মনে থাকে। কারণ এগুলাে নিয়ে প্রায়ই ভাবা হয়। যেমন আমার মেজো ভাইয়ের জার্মানি যাওয়ার ব্যাপারটা। একদিন সন্ধ্যাবেলা মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, সে জার্মানি যাচ্ছে। বাবা প্রচণ্ড ধমক লাগ্ৰীলন- কী বলছিস এসব? জার্মানি যাচ্ছি মানে, ফাজলামাে ? 

বাবা বিদেশযাত্রার পক্ষপাতি নন এবং এজন্যই ধমকাচ্ছেন তা কিন্তু নয়। তিনি না ধমকে কথা বলতে পারেন না। পরবর্তী সময়ে আমি এর কারণ বের করেছিলাম। বাবার চাকরিটা ছিল ছােট। অফিসে সবাই তাকে ধমকাত। বাসায় এসে তা ভুলতে চেষ্টা করতেন। এবং প্রায় প্রতিটি ব্যাপারে চেঁচাতেন। জার্মানির লাপারেও তিনি চেঁচাতে শুরু করলেন। পাখা উঠেছে ? জার্মানি— আমেরিকা ? টাকা দেবে কে ? গাছ থেকে আসবে ? বৃক্ষ থেকে আসবে ? টাকা দিতে হবে না। যাবি কীভাবে? সাঁতার দিয়ে? এ্যা, সন্তরণ ? মেজো ভাই থতমত খেয়ে বলল, টাকা ওরা দিচ্ছে। স্কলারশিপ। 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

আমাদের বিস্ময়ের সীমা রইল না। চিরকাল শুনে এসেছি, ওর ভাই বাইরে যাচ্ছে, ওর চাচা যাচ্ছে। মামা আমেরিকা থেকে জিনসের প্যান্ট পাঠিয়েছে। খালা জাপান থেকে হাওয়াই শার্ট পাঠিয়েছে। শুধু আমাদের এসব ব্যাপার কখনাে ছিল কাজেই মেজো ভাইয়ের ব্যাপারটা আমাদের কারাের বিশ্বাস হলাে না। তবু একদিন সে বেমানান একটা কর্ডের কোট পরে সত্যি সত্যিই জার্মানি চলে গেল। এয়ারপাের্টে বাবা কেঁদেকেটে তার চারপাশে ভিড় জমিয়ে ফেললেন। আরাে অনেকের আত্মীয়স্বজন যাচ্ছিল। তাদের হয়তাে কাঁদার ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু বাবার কান্না দেখে সবার চোখে পানি এলাে।

একজন অপরিচিত বয়স্ক লোেক বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদবেন না ভাই, কাঁদবেন না ভাই বলে নিজেও বাবার মতাে। আকাশ ফাটিয়ে কাঁদতে লাগলেন। সেই ভদ্রলােক গাড়িতে করে আমাদের বাসায় পৌছে দিলেন। অনেক টাকা বেঁচে গেল । এয়ারপাের্ট থেকে ফার্মগেট। বাস ভাড়াই নেয় দুটাকা। আমরা এতগুলাে মানুষ। বাবার শােকের ভঙ্গি সবসময়ই এরকম। বড় আপার মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি যে গভীর দুঃখের প্রকাশ দেখিয়েছিলেন, জগতের আর কোনাে বাবা এরকম দেখিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। তিনি অন্নজল স্পর্শ করেন নি। আমি সেদিন বাবার সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছিলাম। 

বড় আপার প্রতি বাবার একটি আলাদা পক্ষপাতিত্ব ছিল। তাকে তিনি কখনাে ধমক দিয়েছেন বলে মনে পড়ে না। খুব ছােটবেলায় নাকি একটা চড় দিয়েছিলেন, এতেই বড় আপা কাঁদতে কাঁদতে বিছানা নেন এবং তার টাইফয়েড হয়ে যায়। জীবনসংশয় যাকে বলে। ব্যাপারটা হাস্যকর। টাইফয়েড একটা জীবাণুঘটিত ব্যাপার। চড় দিয়ে কারাের টাইফয়েড় বাঁধিয়ে দেয়ার প্রশ্নই ওঠে । কিন্তু বাবাকে এসব কে বােঝাবে ? টাইফয়েডের এই গল্পটি তিনি কয়েক লক্ষ বার করেছেন এবং অনেককেই অস্বস্তিতে ফেলেছেন।

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

টাইফয়েডের জন্যই হােক বা অন্য কোনাে কারণেই হােক, বড় আগাঁর প্রতি তাঁর মমতা ছিল এবং এটা এত বেশি পরিমাণে ছিল যে সবার চোখে পড়ত। একবার ঈদের সময় বােনাস পেলেন । বােনাস না পেলে ঈদের কাপড় হয় না, আমরা জানতাম। কাজেই আমরা বেশ সহজভাবেই পুরনাে কাপড় লন্ড্রি থেকে ইস্ত্রি করিয়ে আনলাম। নতুন কাপড় কিছুই না দেয়াটা খারাপ বলে আমরা তিন ভাই তিন জোড়া মােজা পেলাম ! নতুন মােজার সঙ্গে ম্যাচ করাবার জন্যে আমরা বুটপালিশওয়ালার কাছ থেকে জুতা পালিশ করিয়ে আনলাম। এক টাকা নিল প্রতি জোড়া। 

ঈদের আগের রাতে দেখি, বাবা বড় আপার জন্যে সাদার মধ্যে লাল ফুল আঁকা একটা ফ্রক নিয়ে এসেছেন। আমাদের কারাে জন্যে কিছু আনেন নি। এবং এজন্য তাঁকে বিন্দুমাত্র লজ্জিত বা দুঃখিত মনে হলাে না। আমাদের মধ্যে সবচে জেদি হচ্ছে অনু। সে বলল, আমি ঈদ করব না। বাবা হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, তুই ঈদ না করলে ঈদ আটকে থাকবে ? যত ফালতু বাত। ঈদের দিন আমরা সবাই মুখ কালাে করে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। বাবা বড় আপার হাত ধরে নির্বিকার ভঙ্গিতে তার বন্ধুদের বাড়িতে বেড়াতে গেলেন। বড় আপা ছাড়াও যে তার আরাে ছেলেমেয়ে আছে তা বােধহয় তিনি মনে করতেন 

 

Read more

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৩)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *