ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৩)

পাঠক নিচু গলায় বলল, মানুষের আনন্দ অনুভব করার ক্ষমতা আমার নেইতারপরেও মনে হয় আপনার আনন্দ আমি খানিকটা বুঝতে পারছি

ফিহা সমীকরণ

ধন্যবাদ পাঠক। 

‘সময় সমীকরণের অনেকগুলি ধাপ আপনি অতিক্রম করে এসেছেনসীমাহীন আপনার প্রতিভাশেষ ধাপটি অতিক্রম করতে আপনার স্ত্রী আপনাকে সাহায্য করবে। এই শুভ কামনা। 

 ‘সে কি করে সাহায্য করবে ? এই জটিল জগতে তার স্থান কোথায় ? 

‘সে তার মত করে আপনাকে সাহায্য করবে। গণিত এবং পদার্থবিদ্যার সাহায্যের প্রয়ােজন আপনার নেই, স্যার। 

‘া তাও বােধ হয় ঠিকএকটি ক্ষুদ্র জায়গায় আমি আটকে গেছিআমি জট খুলতে পারছি না। 

আপনি ‘জটটা বুঝতে পারছেনসারাক্ষণ তাকিয়ে আছেন জটটির দিকেএই জট আপনাআপনি খুলবে। 

না খুললে সমূহ বিপদ পাঠকজট খুলতে না পারলে মেন্টালিস্টরা আমাদের 

গ্রাস করে নেবে। সামনের পৃথিবী হবে মানবশূন্য পৃথিবী। সেই পৃথিবীতে থাকবে শুধু মেন্টালিস্ট আর কেউ না। মানুষের সংখ্যা দ্রুত কমে আসছে পাঠক। অতি দ্রুত কমে আসছে। 

পাঠক বলল, যে ক্ষতাধর সেই টিকে থাকবে। এ সত্য স্বীকার করে নেয়াই কি ভাল না স্যার? 

ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ 

‘তুমি মেন্টালিস্টদের ক্ষমতাধর বলছ ? 

‘হ্যা বলছি। ওরা যে টিকে যাচ্ছে এটিই কি সবচে বড় প্রমাণ নয় যে ওরা ক্ষমতাধর।।  সময় সীমকরণের আমি সমাধান বের করব। আমি নিজে যাব অতীতের পৃথিবতে। প্রফেসর এ্যাংগেল হাষ্ট্র যে বিশেষ পরীক্ষাটি করে প্রথম মেন্টালিস্ট শিশু তৈরী করেছিলেন সেই পরীক্ষা আমি করতে দেব না। 

‘তা যদি করতে পারেন তাহলে বুঝতে হবে মানুষই ক্ষমতাধর। মেন্টালিস্টরা নয়।। 

অবশ্যই মানুষ ক্ষমতাধর। আমি তা প্রমাণ করব পাঠক। আমি তা প্রমাণ করব। শােন পাঠক, আমার সমস্যা কোন জায়গাটায় হচ্ছে আমি তােমাকে বলি – খুব সাদামাটাভাবে বলা যায় সময়ের শুরু হচ্ছে বিগ বেংগে। তারপর সময় এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে 

‘আমাকে বলে কোন লাভ হবে না। আমি তাে স্যার এ ব্যাপারে আপনাকে কোন সাহায্য করতে পারব না — 

‘আমি জানি, আমি জানি, তবু তুমি শশান – একজন কাউকে শুনাতে ইচ্ছা করছে – সময়কে থার্মোডিনামিক্সের দ্বিতীয় সূত্রের সঙ্গে তুলনা কর। খুব সহজ অর্থে থার্মোডিনামিক্সের দ্বিতীয় সূত্র কি বলছে ? বলছে – সময় যতই এগুচ্ছে গরম জিনিস ততই শীতল হচ্ছে। ধর এক কাপ কফি টেবিলে রাখা হল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গরম কফি আরাে গরম হবে না। ঠাণ্ডা হতে থাকবে। 

ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ 

‘এই তথ্য স্যার আমি জানি।জান। অবশ্যই জান। কিন্তু এর মধ্যে একটি মজার ব্যাপার আছে। এটি একটি পরিসংখ্যানগত সূত্র। পরিসংখ্যান কাজ করে অসংখ্য অণুপরমাণু নিয়ে। সমষ্টিগতভাবে এই সব অণুপরমাণু গরম থেকে শীতল অবশ্যই হবে। কিন্তু পরিসংখ্যান আরাে বলে এর মধ্যে কিছু অণুপরমাণু গরম থেকে আরাে গরম হয়ে যেতে পারে। তাতে থার্মোডিনামিক্সের দ্বিতীয় সূত্র ব্যাহত হবে না। বুঝতে পারছ?” 

‘পারছি।” 

‘তাহলে বুঝতেই পারছ – এই সব অণু পরমাণু সময়ের উল্টো দিকে যাচ্ছে। আমার কাজ হচ্ছে তাদের নিয়ে। আমি প্রাথমিক ভাবে প্রমাণ করেছি যে সময়ের উল্টোদিকে যাওয়া সম্ভব।’ 

‘হ্যা অবশ্যই সম্ভব। “দেখ পাঠক বহু পুরাতন একটা সূত্র দেখা যাক 

 Tau-v1.v/c2) ধরা যাক vহচ্ছে একটি বস্তুর গতি। C আলাের গতি। 

অতীতে যেতে হলে তাঁর মান হতে হবে আলাের গতির চেয়ে বেশি। যখন তা হবে তখন বস্তুর ওজন, বস্তুর দৈর্ঘপ্রস্থ সব হয়ে যাবে কাল্পনিক সংখ্যা। সবার আগে চলে আসবে | আসবে না ? 

‘আসবে। 

‘এই সমস্যার সমাধান আমার কাছে খুব জটিল কখনাে মনে হয় নি। গণিত শাস্ত্রে আমরা কাল্পনিক সংখ্যা নিয়ে শুরু করি এবং এক সময় সেটাকে সত্যিকার সংখ্যায় রূপান্তরিত করি। আমি অগ্রসর হচ্ছি কোন দিকে জান ? 

ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ 

‘আমার জানার কথা নয় স্যার। 

‘হ্যা তােমার জানার কথা নয়। অবশ্যই তােমার জানার কথা নয় — দু’ধরনের বস্তুর কণার কথা চিন্তা করা যাক। আলার চেয়ে কম গতিসম্পন্ন বস্তুকণা যেমন ধর, ইলেকট্রন, প্রােটন, যাদের বলা হয় টারডিওনস’, আবার অন্য কণা চিন্তা কর যাদের গতি আলাের চেয়ে বেশি। এরা হচ্ছে টেকিওনস এরা কাল্পনিক কণা। এদের অস্তিত্ব নেই। 

‘যার অস্তিত্ব নেই তাকে অস্তিত্ব দিতে হলে কি করতে হবে ? তুমি স্পেস নিয়ে চিন্তা কর। স্পেসকে কি করলে এই কণা গুলি তৈরী হবে । 

‘স্যার আপনি কি গ্রেগরিয়ান এ্যানালিসিসের কথা বলছেন?” 

‘এ্যা আমি গ্রেগরিয়ান এ্যানালিসিসের কথা বলছি। আমি কতটা কাছাকাছি চলে এসেছি তুমি কি তা বুঝতে পারছ?” 

‘বুঝতে পারছি না। তবে আপনার আনন্দ দেখে খানিকটা অনুমান করতে পারছি। 

 ‘আমি খুব কাছাকাছি আছি। খুব কাছাকাছি। একটি মাত্র ‘জট’। সেই জট খুলে যাচ্ছে। 

‘স্যার আপনি বিশ্রাম করুন। পেছনের বাগানে চেয়ার পেতে দি। আপনি আপনার স্ত্রীর সঙ্গে গল্প করুন। 

‘সে এখনো আমার স্ত্রী নয় পাঠক। আমাকে মারলা লি’র কাছে যেতে হবে। লাইসেন্স নিয়ে আসতে হবে। 

‘কখন যাবেন?” ‘এখন যাব। ‘আমি কি স্যার আপনার সঙ্গে আসব ? ‘তুমি আসতে চাচ্ছ কেন? ‘আপনাকে খুব অস্থির লাগছে। সে জন্যেই আসতে চাচ্ছি। 

না আমি অস্থির না। আমি ঠিক আছি। আমি মারলা লি’র সঙ্গে দেখা করব। তার কাছ থেকে আমি আরাে কিছু গ্রন্থও আনতে চাই। তুমি আমার টুপি এনে দাও। 

‘আপনি কি আপনার স্ত্রীকে কিছু বলে যাবেন না? 

‘না। ওর সামনে পড়তে কেন জানি লজ্জাও লাগছে। আচ্ছা পাঠক, মেয়েরা কি উপহার পেলে সবচে খুশি হয় বলত? আমি ফেরার পথে ওর জন্যে কিছু উপহার আনতে চাই। 

পাঠক মৃদু স্বরে বলল, ভালবাসার চেয়ে বড় উপহার আর কি হতে পারে, স্যার! 

 

Read More

ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৪)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *