ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৬)

চল্লিশ বছর ধরে তােমার মঙ্গল কামনা করছি। 

‘আপনাদের ধন্যবাদ। ‘নুহাশ মেয়েটি ভাল। তুমি সুখী হবে।” আপনাদের আবারাে ধন্যবাদ।। ‘আমরা তােমার স্ত্রীর জন্যে ফুল আনিয়ে রেখেছি। ফুলগুলি নিয়ে যেও। ‘অবশ্যই নিয়ে যাব।ফিহা সমীকরণফিহা লক্ষ্য করলেন খাটের এক পাশে প্রচুর গােলাপ। টকটকে রক্তবর্ণের গােলাপ। ফিহার চোখ আবারাে ভিজে উঠছে। ‘তুমি ছােটবেলায় যে সব খেলনা নিয়ে খেলতে তার কোনটাই আমরা নষ্ট করিনি। তুমি কি সেগুলি দেখতে চাও? 

‘না।। 

বৃদ্ধা এবার কথা বললেন। অতি ক্ষীণ স্বরে বললেন, খুব ছােট বেলায় তুমি পিঠে ব্যথা পেয়েছেলে। ছেবেলায় ক্ষত চিহ্ন ছিল। এখনাে কি আছে? ‘তুমি ছােটবেলায় বার বার ছুটে ছুটে আসতে, আমাকে বলতে, মা আমার ব্যথায় চুমু দিয়ে দাও। তােমার কি মনে আছে ? 

ফিহা সমীকরণ

‘আছে।‘তুমি যদি খুব লজ্জা না পাও তাহলে আমি সেখানে আরেকবার চুমু দিতে চাই।’ 

ফিহা গায়ের কাপড় খুললেন। তাঁর কোন রকম লজ্জা লাগল না। বরং মনে হল এই তাে স্বাভাবিক। বৃদ্ধা গভীর আবেগে চুমু খেলেন। বৃদ্ধার চোখ দিয়ে পানি পড়তে। লাগল। ফিহা বললেন, যাই। ‘আর একটু বস। আমার পাশে বস। 

ফিহা বসলেন। বৃদ্ধ বললেন, আমার হাত ধরে বস। পক্ষাঘাত হয়েছে। আমি হাত নাড়াতে পারি না। পারলে আমি তােমার হাত ধরতাম। ফিহা বৃদ্ধের হাত ধরলেন। বৃদ্ধ বললেন, তুমি সময় সমীকরণের সামাধান করতে যাচ্ছ? ‘হ্যা। ‘তুমি চাচ্ছ অতীতে ফিরে যেতে। যাতে আদি মেন্টালিস্ট তৈরীর এক্সপেরিমেন্ট কেউ করতে না পারে। 

‘আপনারা মেন্টালিস্ট। আমি কি ভাবছি তার সবই আপনারা জানেন। | ‘হা জানি। কিন্তু তুমি জান না তােমার চিন্তায় বড় ধরনের ভুল আছে। তুমি যেই মুহুর্তে সমাধান বের করবে সেই মুহুর্তে মেন্টালিস্টরা তা জেনে যাব। অতীতে তুমি যেতে পারবে না ফিহা, তােমাকে যেতে দেয়া হবে না। তােমার বিদ্যা কাজে লাগিয়ে একটি রােবট পাঠানাে হবে। তাকে মেন্টালিস্ট তৈরীর বিদ্যা শিখিয়ে দেয়া হবে। এই ভাবেই চক্র সম্পন্ন হবে।  ‘আপনি নিশ্চিত ?” ‘চক্র ভাঙ্গা যাবে না? 

‘তুমি যদি সময় সমীকরণ বের না কর তাহলেই চক্র ভেঙ্গে যাবে। অতীতে কেউ যেতে পারবে না। মেন্টালিস্ট তৈরী হবে না। চক্র সম্পূর্ণ করার জন্যেই তােমাকে দরকার। ধর্মগ্রন্থে তা আছে। 

ফিহা সমীকরণ

‘ধর্মগ্রন্থে কি আছে?” 

‘ধর্মগ্রন্থে লেখা আছে – জ্ঞানী শত্রুদের প্রতি মমতা রাখিও কারণ জ্ঞানী শত্রুরা জগতের মহৎ কর্ম সম্পাদন করে। তােমাদের মহা শত্রুর কারণেই তােমরা চক্র সম্পন্ন করবে। সে মিরানের পালক পুত্র। সে জ্ঞানী।। ‘ধর্মগ্রন্থে আমার উল্লেখ আছে বলেই কি মেন্টালিস্টরা আমাকে আলাদা করে দেখে ?” 

‘হ্যা। তােমার জ্ঞান তাদের প্রয়ােজন। তােমার জ্ঞান ছাড়া চক্র সম্পূর্ণ হবে না।” 

ফিহা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। বৃদ্ধা বললেন, আমরা দু’জন সর্বশক্তি দিয়ে। তােমার মস্তিষ্ক রক্ষা করে চলেছি। চল্লিশ বছর ধরেই করছি। যে কারণে এখনো কেউ তােমার মস্তিষ্ক থেকে কিছু জানে না। আমরা বেশিদিন বাঁচব না। তখন সবাই জানবে। আমাদের যা বলার তােমাকে বললাম, এখন তুমি তােমার বিবেচনা অনুযায়ী কাজ করবে। 

ফিহা বললেন, আমি আপনাদের ভালবাসি। ‘জানি। ভালবাসার কথা বলার প্রয়ােজন হয় না। বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধা দু’জনই কাঁদতে লাগলেন। ফিহা দীর্ঘ সময় চুপচাপ বসে রইলেন তারপর উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, আমি যদি মারা যাই তাহলে চক্র ভেঙ্গে যাবে। কারণ সময় সমীকরণ বের হবে না । বৃদ্ধ মিরাণ হ্যা সূচক মাথা নাড়লেন। 

ফিহা বললেন, চক্র ভেঙ্গে গেলে মেন্টালিস্ট তৈরী হবে না। মেন্টালিস্টদের বিষয়ে বই লেখা হবে না। মেন্টালিস্টদের যাবতীয় ধর্মগ্রন্থের সমস্ত লেখা মুছে যাবে। বৃদ্ধ বৃদ্ধা দু’জনই হ্যা সূচক মাথা নাড়লেন। 

‘আমার যে হঠাৎ আপনাদের কাছে আসার ইচ্ছা হল তার কারণ কি এই যে আপনারা আমাকে ডেকেছেন ?  ‘হ্যা। তুমি যেভাবে ভাঙতে চাচ্ছ সেভাবে তা সম্ভব নয়। এই কথাটি তােমাকে জানিয়ে যেতে চেয়েছিলাম।  ‘আপনারা চান চক্র ভেঙ্গে যাক ? 

‘চাই। এই চক্র অন্যায় চক্র। ‘আপনাদের কাছে কি কোন বিষ আছে ? ‘হ্যা। আমরা জোগাড় করে রেখেছি। আমরা জানি তুমি চাইবে। বৃদ্ধা বিষের শিশি বের করে আনলেন। দশ বছর ধরে তাঁরা এই শিশি আগলে রেখেছেন। এখন আর আগলে রাখার প্রয়ােজন নেই। 

ফিহা বললেন, বিষের ক্রিয়া কতক্ষণ পর শুরু হবে

‘ঘন্টা খানিক লাগবে। ক্রিয়া করবে খুব ধীরে। ব্যথা বােধ হবে না। আমরা তােমাকে ব্যথা পেতে দেব না। তুমি তােমার স্ত্রীর কাছে পৌছতে পারবে। 

হুমায়ূন আহমেদ – ফিহা সমীকরণ

ফিহার হাতে এক রাশ গােলাপ। বাড়ি ফিরছেন হেঁটে হেঁটে। বিষের ক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিনি বুঝতে পারেছেন। তাঁর চিন্তা চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে আসছে। তবু গভীর আনন্দে তাঁর মন পরিপূর্ণ। চক্র ভেঙ্গে যাচ্ছে। ভয়ংকর একটি চক্র ভেঙ্গে যাচ্ছে। ফিহা দ্রুত পা ফেলতে চেষ্টা করছেন। যে করেই হােক নুহাশের কাছে পৌছতে হবে ।

তার গল্পটির শুরুটা হলেও শুনতে হবে। মনে হয় ভাের হতে বেশি দেরি নেই। চারদিকে আলাে হতে শুরু করেছে। ফিহার হাতের ফুলগুলি রাস্তায় পড়ে যাচ্ছে। তিনি দূরে ঘণ্টার ধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন। কোত্থেকে আসছে এই ঘণ্টাধ্বনি? 

রাস্তার মানুষ অবাক হয়ে দেখছে ফুল বিছিয়ে বিছিয়ে একজন মানুষ এগিয়ে যাচ্ছে। সে পা ফেলছে এলােমেলাে ভঙ্গিতে। অন্ধকারে মানুষটিকে চেনা যাচ্ছে না। যারা ফুল ছড়িয়ে এগিয়ে যায় তাদের চেনারও তেমন প্রয়ােজন নেই। 

 

Read More

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *