কফি চলে এল। মারলা লি’ নিজের হাতে পট থেকে কফি ঢাললেন। ভাল কফি বলাই বাহুল্য। কফির গন্ধ সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। মারলা লি কফির কাপ এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, মেন্টলিস্টরা সাধারণ মানুষের অকারণ ঘৃণার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আপনি সাধারণ মানুষ নন। আপনি হচ্ছেন মহামতি ফিহা। বলা হয়ে থাকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পদার্থবিদ। আপনিও যদি সাধারণ মানুষের মত ভাবেন তাহলে কি করে হয় ?

এসব থাক, কাজের কথায় আসুন। | ‘কফি শেষ হােক, তারপর আমরা কাজের কথায় আসব। যদিও এখন যে-কথা বলছি তা আপনার কাছে অকাজের কথা হলেও, আমার কাছে কাজের কথা। ফিহা, আপনার কোটের পকেটে আজকের একটা খবরের কাগজ দেখা যাচ্ছে। আপনি কি কাগজটা পড়েছেন ?
‘হা।
তাহলে নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন একটা খবর ছাপা হয়েছে। কুদ্ধ জনতার হাতে কুড়ি বছর বয়েসী একজন তরুণী এবং তার চার বছর বয়েসী কন্যার মৃত্যু। এদের
অপরাধ এরা মেন্টালিস্ট। মহামতি ফিহা, ক্ষিপ্ত মানুষের হাতে অসংখ্য মেন্টালিস্টদের মৃত্যু ঘটেছে কিন্তু আপনি একটি উদাহারণও পাবেন না যেখানে মেন্টালিস্টদের হাতে সাধারণ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে।
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
ফিহা কফির কাপ নামিয়ে রেখে শান্ত গলায় বললেন, কফি শেষ হয়েছে। এখন বলুন কি বলবেন।।
‘শুনতে পাই আপনি চতুর্মাত্রিক সময় সমীকরণের সমাধান করেছেন? ‘কোথায় শুনতে পান ?” ‘শুনতে পাই বললে ভুল হবে, অনুমান করছি। ‘অনুমানের ভিত্তি কি ?
‘এই বিষয়টি নিয়ে আপনি দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন। পড়াশােনা করছেন। আপনার কাজের ধরণ আমরা জানি। যখন কিছু শুরু করেন অন্য কোন দিকে তাকান না। কাজটা যখন শেষ হয় তখন আনন্দিত ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়ান। পাবলিক কফি শপে কফি খেতে যান। এই সময় আপনি রঙচঙে কাপড় পড়তে ভালবাসেন। এইসব লক্ষণ থেকে মনে হচ্ছে।
‘মনে হচ্ছে আমি সময় সমীকরণের সমাধান করেছি ?”
‘হঁ্যা। বড় কোন কাজ শেষ হলে আপনি বিজ্ঞান একাডেমীর সঙ্গে সব রকম যােগাযােগ বেশ কিছু দিন বন্ধ রাখেন। তাদের নির্দেশ দিয়ে দেন তারাও যেন আপনার সঙ্গে যােগাযােগ না করে। গত একুশ দিন ধরে বিজ্ঞান একাডেমীর সঙ্গে আপনার কোন যােগাযােগ নেই। এই থেকেই অনুমান করছি সমীকরণটির সমাধান আপনি করেছেন।
‘যদি করেই থাকি তাতে আপনার আগ্রহের কারণ কি?
‘আমি বিজ্ঞান তেমন জানি না। যতটুক জানি তার থেকে বলতে পারি আপনার সমীকরণ পরীক্ষা করার জন্যে বিপুল অর্থের প্রয়ােজন। থিওরী এক জিনিস, থিওরীর ইনজিনীয়ারিং প্রয়ােগ অন্য জিনিস। আমরা প্রয়ােগের দিকটি দেখতে চাই।
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
আমরা আপনাকে বলতে চাই যে অর্থ কোন সমস্যা নয়।
‘শুনে সুখী হলাম। আপনি শুনে দুঃখিত হবেন যে আমি সময় সমীকরণের সমাধান বের করতে পারি নি।
‘পারেন নি?”
‘না পারি নি। আমার কথা বিশ্বাস না হলে আমার মাথার ভেতর ঢুকে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।
‘ছিঃ ছিঃ এসব কি বলছেন? আপনার মুখের কথাই যথেষ্ট। আরেকটু কফি কি দিতে বলব ?”
ফিহা উঠে দাঁড়ালেন। মারলা লি তাঁকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। মধুর ভঙ্গিতে বললেন, কষ্ট করে এসেছেন সে জন্যে অসংখ্য ধন্যবাদ । মহামতি ফিহ্য, এই সামান্য উপহার কি আপনি গ্রহণ করবেন ?
মারলা লি বড় একটা প্যাকেট এগিয়ে দিলেন। ফিহা বললেন, কি আছে এখানে?
‘কফি বিনস। প্রথম শ্রেণীর কফি। অনেক ঝামেলা করে আপনার জন্যে জোগাড় করেছি। গ্রহণ করলে আনন্দিত হব।
ফিহা প্যাকেটটা হাতে নিলেন। উপহার পেয়ে তিনি যে খুব আনন্দিত হয়েছেন তা মনে হল না। প্যাকেটটা ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলতে পারলে তিনি সবচে’ আনন্দিত হতেন। তা সম্ভব নয়। মেন্টালিস্টর সঙ্গে সঙ্গে তা বুঝতে পারবে। তার ফলাফল শুভ হবে না।
আচ্ছা কফির এই প্যাকেটটা লাইব্রেরির মেয়েটাকে দিয়ে দিলে কেমন হয় ? বেচারীকে তিনি কিছুটা হলেও আহত করেছেন। কফির প্যাকেট পেলে খুশি হবে। মেয়েটার কাছ থেকে অতিপ্রাকৃত গল্পের বইটাও চেয়ে নেয়া যায়। একটা গল্প পড়লে কিছু যায় আসে না। | ফিহা লাইব্রেরির সঙ্গে যােগাযােগ করলেন। যােগাযােগ হাঁটতে হাঁটতেই করা গেল। পকেটে রাখা কমুনিকেটর তৎক্ষণাৎ বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরির সঙ্গে যােগাযােগ করিয়ে দিল। ফিহাকে পরিচয় দিতে হল না। যে বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সির কমুনিকেটর তিনি ব্যবহার করেন তা সবারই মোটামুটি পরিচিত।
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
লাইব্রেরির ডিরেক্টর খানিকটা ভীত গলায় বলল, কি ব্যাপার স্যার? ‘কোন ব্যাপার না। আপনাদের একজন ক্যাটালগারের সঙ্গে কথা বলতে চাই। ‘তার নামটা কি বলবেন? | ফিহার ভুরু কুঞ্চিত হল। নামটা তাঁর মনে পড়ছে না। নাম মনে রাখার চেষ্টা করেন নি বলেই মনে নেই। অপ্রয়ােজনীয় কিছু মনে রাখার চেষ্টা করে মস্তিষ্ক ভারাক্রান্ত করার তিনি কোন কারণ দেখেন না।।
‘নাম মনে পড়ছে না। অল্পবয়েসী একটা মেয়ে। অতিপ্রাকৃত গল্প পছন্দ করে। কফি খেতে ভালবাসে।
‘স্যার, আপনি যার সঙ্গে কথা বলেছেন তার নাম কি ‘নুহাশ’? ‘হা নুহাশ। ‘স্যার, আমি তাকে ডেকে দিচ্ছি, একটু ধরুন স্যা। এক মিনিট।
তিনি কমুনিকেটরের বােতাম চেপে রাখলেন। এক মিনিট অপেক্ষা করার কথা, এক মিনিট কুড়ি সেকেণ্ডের মাথায় লাইব্রেরির ডিরেক্টরের গলা পাওয়া গেল –
‘স্যার, একটি ক্ষুদ্র সমস্যা হয়েছে। মেয়েটি বাড়ি চলে গেছে। কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে গেছে। ক্যাটালগ সেকশনে গিয়ে জানতে পারলাম কি একটা কারণে খুব মন খারাপ করে আজ সে লাইব্রেরিতে এসেছিল। একটা বই ছিড়ে কুটিকুটি করেছে। বইটা হল “অতিপ্রাকৃত গল্পগুচ্ছ”। তারপর বাসায় চলে গেছে। স্যার আমি কি বেশি কথা বলছি ?”
‘তা বলছেন।
‘ক্ষমা প্রার্থনা করছি স্যার। মেয়েটা থাকে সাধারণ আবাসিক প্রকল্পের ১১৮ নং কক্ষে। তাকে আনার জন্যে লােক পাঠাচ্ছি।”
‘তার কোন প্রয়ােজন নেই।
‘মেয়েটির কমুনিকেটর সুবিধা নেই, থাকলে এক্ষুণি আপনার সঙ্গে যােগাযােগ করিয়ে দিতাম। অত্যন্ত দুঃখিত স্যার।
‘আপনার এত দুঃখিত হবার কিছু নেই। ‘তাকে কি কিছু বলতে হবে ? ‘কিছুই বলতে হবে না। ধন্যবাদ।
Read More