রাজেনবাবু হেসে বললেন, ‘আর তা ছাড়া আমার চাকরটা খুব ভাল রান্না করে। আজ মুরগির মাংস রাঁধতে বলেছি। স্যানাটোরিয়ামে অমনটি খেতে পাবে না। রাজেনবাবু আমাদের ঘরটা দেখিয়ে দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন।

ফেলুদা সৃটান খাটের উপর শুয়ে পড়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে কড়িকাঠের দিকে তাগ করে পর পর পাঁচটা ধোঁয়ার রিং ছাড়ল ।
তার পর আধবােজা চোখে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “মণী মিত্তির কাল সত্যিই রুগি দেখতে গিয়েছিলেন। কার্ট রােড়ে একজন ধনী পাঞ্জাবি ব্যবসায়ীর বাড়ি। আমি খোঁজ নিয়েছি। সাড়ে এগারােটা থেকে সাড়ে বারােটা অবধি ওখানে ছিলেন।’
“তা হলে ফণী মিত্তির অপরাধী নন ?
ফেলুদা আমার কথার জবাব না দিয়ে বলল, ‘প্রবীর মজুমদার যােলাে বছর ইংলন্ডে থেকে বাংলা প্রায় ভুলেই গেছেন।’
তা হলে ওই চিঠি ওর পক্ষে লেখা সম্ভব নয় ? ‘আর ওর টাকার কোনও অভাবই নেই। তা ছাড়া দার্জিলিং-এ এসেও লেং-এ ঘােড়দৌড়ের বাজিতে উনি অনেক টাকা করেছেন । আমি দম আটকে বসে রইলাম। ফেলুদার আরও কিছু বলার আছে সেটা বুঝতে পারছিলাম।
আধখাওয়া জ্বলন্ত সিগারেটটা ক্যারমের খুঁটি মারার মতাে করে প্রায় দশ হাত দূরের জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়ে ফেলুদা বলল, “আজ চা বাগানের গিলমাের সাহেব দার্জিলিং-এ এসেছে। প্লান্টারস ক্লাবে গিয়ে ওর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। লামার প্রাসাদের আসল ঘণ্টা একটাই আছে, আর সেটা গিলমােরের কাছে। রাজেনবাবুরটা নকল। অবনী ঘােষাল সেটা জানে।’
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১০)
‘তা হলে রাজেনবাবুর ঘণ্টা তেমন মূল্যবান নয় ? ‘না।..আর অবনী ঘােষাল কাল রাত্রে একটা পার্টিতে প্রবীর মজুমদারের সঙ্গে রাত নটা থেকে ভাের তিনটে অবধি মাতলামি করেছে।
‘ও। আর মুখােশ পরা লােকটা এসেছিল বারােটার কিছু পরেই।’
আমার বুকের ভেতরটা কেমন খালি খালি লাগছিল । বললাম, তা হলে ? ফেলুদা কিছু না বলে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে খাট থেকে উঠে পড়ল। ওর ভুরু দুটো, যে এতটা কুঁচকোতে পারে, তা আমার জানাই ছিল না।
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে কী যেন ভেবে ফেলুদা বৈঠকখানার দিকে চলে গেল। যাবার সময় বলল, “একটু একা থাকতে চাই। ডিস্টার্ব করিস না।”
কী আর করি। এবার ওর জায়গায় আমি বিছানায় শুলাম।
সন্ধে হয়ে আসছে। ঘরের বাতিটা আর জ্বালতে ইচ্ছে করল না। খােলা জানলা দিয়ে অবজারভেটরি হিলের দিকটায় অন্যান্য বাড়ির আলাে দেখতে পাচ্ছিলাম। বিকেলে মাল থেকে একটা গােলমালের শব্দ পাওয়া যায়। এখন সেটা মিলিয়ে আসছে। একটা ঘােড়ার খুরের আওয়াজ পেলাম। দূর থেকে কাছে এসে আবার মিলিয়ে গেল ।
সময় চলে যাচ্ছে। জানালা দিয়ে শহরের আলাে কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছে। ৰােধহয় কুয়াশা হচ্ছে। ঘরের ভিতরটা এখন আরও অন্ধকার। একটা ঘুম-ঘুম ভাব আসছে। মনে হল।
চোখের পাতা দুটো কাছাকাছি এসে গেছে, এমন সময় মনে হল, কে যেন ঘরে ঢুকছে। মনে হতেই এমন ভয় হল যে, যে দিক থেকে লােকটা আসছে, সে দিকে না তাকিয়ে আমি জোর করে নিশ্বাস বন্ধ করে জানালার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১০)
কিন্তু লােকটা যে আমার দিকেই আসছে আর আমার সামনেই এসে দাঁড়াল যে !
জানালার বাইরে শহরের দৃশ্যটা ঢেকে দিয়ে একটা অন্ধকার কী যেন এসে আমার সামনে দাঁড়িয়েছে।
তার পর সেই অন্ধকার জিনিসটা নিচু হয়ে আমার দিকে এগিয়ে এল। এইবার তার মুখটা আমার মুখের সামনে, আর সেই মুখে একটামুখােশ ।
আমি যেই চিৎকার করতে যাৰ অমনি অন্ধকার শরীরটার একটা হাত উঠে গিয়ে মুখােশটা খুলতেই দেখি-~~-ফেলুদা !
“কী রে—ঘুমিয়ে পড়েছিলি নাকি ? | ‘ওঃ—ফেলুদা-তুমি ?
‘তা আমি না তাে কে ? তুই কি ভেবেছিলি… ?
ফেলুদা ব্যাপারটা বুঝে একটা অট্টহাস্য করতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গম্ভীর হয়ে গেল। তার পর খাটের পাশটায় বসে বলল, “রাজেনবাবুর মুখােশগুলাে সব কটা পরে দেখছিলাম। তুই এইটে একবার পর তাে।’
ফেলুদা আমাকে মুখােশটা পরিয়ে দিল। ‘অস্বাভাবিক কিছু লাগছে কি ? ‘কই না তাে। আমার পক্ষে একটু বড়, এই যা। ‘আর কিছু না ? ভাল করে ভেবে দেখ তাে।
একটু…একটু যেন…গন্ধ । কীসের গন্ধ ? ‘চুরুট।’ ফেলুদা মুখােশটা খুলে নিয়ে বলল, ‘এগজ্যাক্টলি।’
আমার বুকের ভিতরটা আবার টিপ টিপ করছিল। মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ‘তি-তিনকড়িবাবু ?
ফেলুদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সুযােগের দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি ছিল ওঁরই । বাংলা উপন্যাস, খবরের কাগজ, ব্রেড, আঠা কোনওটারই অভাব নেই। আর তুই লক্ষ করেছিলি নিশ্চয়ই—স্টেশনে আজ যেন একটু খোঁড়াচ্ছিলেন। সেটা বােধহয় কাল জানালার বাইরে লাফিয়ে পড়ার দরু। কিন্তু আসল যেটা রহস্য, সেটা হল-~-কারণটা কী ? রাজেনবাবুকে তাে মনে হয় রীতিমতাে সমীহ করতেন ভদ্রলােক। তা হলে কী কারণে, কী উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি এই চিঠি লিখেছিলেন ? এটার উত্তর বােধ হয় আর জানা যাবে না…কোনও দিনও না।’
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১০)
রাত্রে কোনও দুর্ঘটনা ঘটেনি।
সকালে খাবার ঘরে বসে রাজেনবাবুর সঙ্গে চা খাচ্ছি, এমন সময় নেপালি চাকরটা একটা চিঠি নিয়ে এল। আবার সেই নীল কাগজ-~-আর খামের উপর দার্জিলিং পােস্ট মার্ক ।
রাজেনবাবু ফ্যাকাশে মুখ করে কাঁপতে কাঁপতে চিঠির ভাঁজ খুলে ফেলুদাকে দিয়ে বললেন, “তুমিই পড়াে। আমার সাহস হচ্ছে না।’
ফেলুদা চিঠিটা নিয়ে জোরে জোরে পড়ল। তাতে লেখা আছে | ‘প্রিয় রাজু, কলকাতায় জ্ঞানেশের কাছ থেকে তােমার ঘরের খবর পেয়ে যখন তােমায় চিঠি লিখি, তখনও জানতাম না আসলে তুমি কে। তােমার বাড়িতে এসে তােমার ছেলেবয়সের ছবিখানা দেখেই চিনেছি, তুমি সেই পঞ্চাশ বছর আগের বাঁকুড়া মিশনারি স্কুলের আমারই সহপাঠী রাজু !
‘এতকাল পরেও যে পুরনাে আক্রোশ চাগিয়ে উঠতে পারে, সেটা আমার জানা ছিল না। অন্যায়ভাবে ল্যাং মেরে তুমি যে শুধু আমায় হান্ড্রেড ইয়ার্ডস-এর নিশ্চিত পুরস্কার ও রেকর্ড থেকে বঞ্চিত করেছিলে, তাই নয়—আমাকে রীতিমতাে জখমও করেছিলে। বাবা বদলি হলেন তখনই, তাই তােমার সঙ্গে বােঝাপড়াও হয়নি, আর তুমিও আমার মন আর শরীরের কষ্টের কথা জানতে পারােনি। তিন মাস পায়ে প্লাস্টার লাগিয়ে হাসপাতালে পড়ে ছিলাম।
এখানে এসে তােমার জীবনের শান্তিময় পরিপূর্ণতার ছবি আমাকে অশান্ত করেছিল। তাই তােমার মনে খানিকটা সাময়িক উদ্বেগের সঞ্চার করে তােমার সেই প্রাচীন অপরাধের শাস্তি দিলাম। শুভেচ্ছা নিও। ইতি–তিনু (শ্রীতিলকড়ি মুখােপাধ্যায়)।
Read More