খাঁচাগুলােতে আলাের ব্যবস্থা এখনও করে উঠতে পারিনি।’ আমরা গাইডকে বকশিশ দিয়ে ছাত থেকে সােজা সিঁড়ি দিয়ে একদম নীচে নেমে এলাম। | গেটের বাইরে এসে দেখলাম মহাবীর আরও দুজন ভদ্রলােককে নিয়ে সেই কালাে স্ট্যান্ডার্ড গাড়িটায় উঠছে।

বনবিহারীবাবুর বাড়িতে পৌঁছতে প্রায় চারটে বাজল। বাইরে থেকে বােঝার কোনও উপায় নেই যে ভিতরে একটা চিড়িয়াখানা আছে, কারণ যা আছে তা বাড়ির পিছন দিকটায়। | ‘মিউটিনিরও প্রায় ত্রিশ বছর আগে এক ধনী মুসলমান সওদাগর এ বাড়ি তৈরি করেছিলেন বনবিহারীবাবু বললেন। আমি বাড়িটা কিনি এক সাহেবের কাছ থেকে।
দেখেই বােঝা যায় বাড়িটা অনেক পুরনাে। আর দেওয়ালের গায়ে যে সব কারুকার্য আছে তা থেকে নবাবদের কথাই মনে হয়। | বাড়ির ভিতর ঢুকে বনবিহারীবাবু বললেন, আপনারা সবাই কফি খান তাে ? আমার বাড়িতে কিন্তু চায়ের পাট নেই।’
আমাকে বাড়িতে বেশি কফি খেতে দেওয়া হয় না, কিন্তু আমার খেতে খুব ভাল লাগে, তাই আমার তাে মজাই হয়ে গেল। কিন্তু কফি পরে—আগে জানােয়ার দেখা। * বৈঠকখানা পেরিয়ে একটা বারান্দা, তার পরেই প্রকাণ্ড বাগান, আর সেই বাগানেই এদিকে ওদিকে রাখা বনবিহারীবাবুর সব খাঁচা। বাগানের মাঝখানে ছুঁচলাে শিক দিয়ে ঘেরা একটা পুকুর । সেটায় একটা কুমির রােদ পােহাচ্ছে।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৭)
বনবিহারীবাবু বললেন, এটাকে বছর দশেক আগে মুঙ্গের থেকে এনেছিলাম একেবারে বাচ্চা অবস্থায়। প্রথমে আমার কলকাতার বাড়ির চৌবাচ্চায় ছিল। একদিন দেখি বেরিয়ে
এসে একটা আস্ত বেড়ালছানা খেয়ে ফেলেছে।‘ | পুকুরের চারপাশ থেকে বাঁধানাে রাস্তা অন্য খাঁচাগুলাের দিকে গেছে। একটা খাঁচার দিক
থেকে ফাঁস ফ্যাঁস শব্দ শুনে আমরা কুমির ছেড়ে সেইদিকেই গেলাম । | গিয়ে দেখি খাঁচার ভেতরে একটা মাঝারি গােছের কুকুরের সাইজের বেড়াল, তার চোখ দুটো সবুজ আর জ্বলজ্বলে, আর গায়ের রং ডােরাকাটা খয়েরি। এত বড় বেড়ালকে বাঘ বলতেই ইচ্ছে করে। বনবিহারীবাবু বললেন, ‘এটার বাসস্থান আফ্রিকা। এটা কিনি কলকাতায় রিপন স্ট্রিটের এক ফিরিঙ্গি পশু ব্যবসায়ীর কাছ থেকে। এ জিনিস আলিপুরের চিড়িয়াখানাতেও নেই।’
বেড়ালের পর হাইনা, হাইনার পর নেড়ে, নেকড়ের পর আমেরিকান র্যাটল স্নেক। দারুণ বিষাক্ত সাপ। একরকম সরু কুঁচলাে শামুক পুরী থেকে আমরা অনেকবার এনেছি ; এই সাপের ল্যাজের ডগায় সেইরকম একটা শামুকের মতাে জিনিস আছে। সাপটা এদিক ওদিক চলার সময় ল্যাজটাকে কাঁপায়, আর তাতে ওই জিনিসটা মাটিতে লেগে একটা ঝুমঝুমির মতাে করকর করকর শব্দ হয়। আমেরিকার জঙ্গলে অনেকদূর থেকেই এরকম শব্দ
শুনতে পেয়ে নাকি লােকে বুঝতে পারে যে র্যাটল স্নেক ঘােরাফেরা করছে।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৭)
আরও দুটো জিনিস দেখে ভয়ে গা শিউরে উঠল। একটা কাচের বাক্সর মধ্যে দেখলাম নীল রঙের বিশ্রী বিরাট এক কাঁকড়া বিছে। এটাও আমেরিকার বাসিন্দা। এর নাম ব্লু স্করপিয়ন। আর আরেকটা কাচের বাক্স দেখলাম, একটা মানুষের আঙুল ফাঁক করা হাতের ই মতাে বড় কালাে রোঁয়াওয়ালা মাকড়সা–আফ্রিকার বিষাক্ত ‘ব্ল্যাক উইডাে মাকড়সা।
বনবিহারীবাবু বললেন, ‘ওই বিছে আর ওই মাকড়সা—ওই দুটোরই বিষ হল যাকে বলে উিরােটক্সিক। অর্থাৎ এক কামড়ে একটা আস্ত মানুষ মেরে ফেলার শক্তি রাখে ওই দুটোই।
চিড়িয়াখানা দেখে আমরা বৈঠকখানায় এলাম। আমরা সােফায় বসার পর নিজে একটা চেয়ারে বসে বনবিহারীবাবু বললেন, ‘রাত্রে চারিদিক নিস্তব্ধ হলে মাঝে মাঝে আমার বাগান থেকে বনবেড়ালের ফ্যাঁসফ্যাঁসানি, হাইনার হাসি, নেকড়ের খ্যাঁকরানি আর র্যাটল স্নেকের করকরানি মিলে এক অদ্ভূত কোরাস শুনতে পাই। তাতে ঘুমটা হয় বড় আরামের। এরকম বডিগার্ডের সম্ভার আর কজনের আছে বলুন। অবিশ্যি চোর এলে এরা খুব হেল্প করতে পারে না বটে, কারণ এরা খাঁচায় বন্দি। তার জন্যে আমার আলাদা ব্যবস্থা আছে।বাদশা !
হাঁক দিতেই পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এল এক বিরাট কালাে হাউন্ড কুকুর। এটাকেই নাকি বনবিহারীবাবু পাহারার জন্য রেখেছেন। শুধু যে বাড়ি পাহারা তা নয়—চিড়িয়াখানারও কোনও অনিষ্ট নাকি এই বাদশা করতে দেবে না । ফেলুদা আমার পাশেই বসে ছিল। কুকুরটা দেখে আমার কানে ফিস্ ফিস্ করে বলল, ‘ল্যাব্রেডর হাউন্ড। বাস্করভিলের কুকুরের জাত।
বাবা এতক্ষণ একটাও কথা বলেননি। এবার বললেন, ‘আচ্ছা, সত্যিই আপনার এইসব হিংস্র জানােয়ারের মধ্যে বাস করতে ভাল লাগে ?
Read More