বেয়ারা তাতেও বলল হ্যাঁ। ‘তাজ্জব ব্যাপার!
হঠাৎ কী মনে করে ধীরুকাকা ঝড়ের মতাে শােবার ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। তারপর গােদরেজ আলমারি খােলার শব্দ পেলাম। আর তার পরেই শুনলাম ধীরুকাকার চিৎকার—
‘সর্বনাশ। বাবা, আমি আর ফেলুদা প্রায় একসঙ্গে হুড়মুড় করে ধীরুকাকার ঘরে ঢুকলাম। গিয়ে দেখি উনি আংটির কৌটোটা হাতে নিয়ে চোখ বড় বড় করে দাঁড়িয়ে আছেন।
কৌটোর ঢাকনা খােলা, আর তার ভিতরে আংটি নেই। ধীরুকাকা কিছুক্ষণ বােকার মতাে দাঁড়িয়ে থেকে ধপ্ করে তাঁর খাটের উপর বসে পড়লেন।
পরদিন সকালে মনে হল যে শীতটা একটু বেড়েছে, তাই বাবা বললেন গলায় একটা মাফলার জড়িয়ে নিতে। বাবার কপালে ভূকুটি আর একটা অন্যমনস্ক ভাব দেখে বুঝতে পারছিলাম যে উনি খুব ভাবছেন। ধীরুকাকাও কোথায় জানি বেরিয়ে গেছেন—-আর কাউকে কিছু বলেও যাননি। কালকের ঘটনার পর থেকেই কেবল বললেন~-শ্রীবাস্তবকে মুখ দেখাব কী করে ? বাবা অবিশ্যি অনেক সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করেছিলেন।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৯)
বিকেল বেলা সন্ন্যাসী সেজে চোর এসে তােমার বাড়ি থেকে আংটি নিয়ে যাবে সেটা তুমি জানবে কী করে। তার চেয়ে তুমি বরং পুলিশে একটা খবর দিয়ে দাও। তুমি তাে বলছিলে ইনস্পেক্টর গরগরির সঙ্গে তােমার খুব আলাপ আছে।’ এও হতে পারে যে ধীরুকাকা হয়তাে পৃলিশে খবর দিতেই বেরিয়েছেন। সকালে যখন চা আর জ্যামরুটি খাচ্ছি, তখন বাবা বললেন, “ভেবেছিলাম আজ তােদের রেসিডেন্সিটা দেখিয়ে আনব, কিন্তু এখনও মনে হচ্ছে আজকের দিনটা যাক। তােরা দুজনে বরং কোথাও ঘুরে আসিস কাছাকাছির মধ্যে।’
কথাটা শুনে আমার একটু হাসিই পেয়ে গেল, কারণ ফেলুদা বলছিল ওর একটু পায়ে হেঁটে শহরটা দেখার ইচ্ছে আছে, আর আমিও মনে মনে ঠিক করেছিলাম ওর সঙ্গে যাব। আমি জানতাম শুধু শহর দেখা ছাড়াও ওর অন্য উদ্দেশ্য আছে। আমি সন্ধেবেলা থেকেই দেখছি ওর চোখের দৃষ্টিটা মাঝে মাঝে কেমন জানি তীক্ষ হয়ে উঠছে।
আটটার একটু পরেই আমরা দুজনে বেরিয়ে পড়লাম। গেটের কাছাকাছি এসে ফেলুদা বলল, ‘তােকে ওয়ার্নিং দিচ্ছি—ব ব করলে বা বেশি প্রশ্ন করলে তােকে ফেরত পাঠিয়ে দেব। বােকা সেজে থাকবি, আর পাশে পাশে হাঁটিবি।’
‘কিন্তু ধীরুকাকা যদি পুলিশে খবর দেন ? ‘তাতে কী হল ? ‘ওরা যদি তােমার আগে চোর ধরে ফেলে ? ‘তাতে আর কী ? নিজের নামটা চেঞ্জ করে ফেলব।
ধীরুকাকার বাড়িটা যে রাস্তায় সেটার নাম ফ্রেজার রােড় । বেশ নির্জন রাস্তাটা। দুদিকে গেট আর বাগান-ওয়ালা বাড়ি, তাতে শুধু যে বাঙালিরা থাকে তা নয়। ফ্রেজার রােডটা গিয়ে পড়েছে সাপলিং রােডে }. লখনৌতে একটা সুবিধে আছে রাস্তার নামগুলাে বেশ বড় বড় পাথরের ফলকে লেখা থাকে। কলকাতার মতাে খুঁজে বার করতে সময় লাগে না।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৯)
ডালিং রােডটা যেখানে গিয়ে পার্ক রােডে মিশেছে, সেই মােড়টাতে একটা পানের দোলা দেখে ফেলুদা হেলতে দুলতে সেটার সামনে গিয়ে বলল, মিঠা পান হয় ? ‘মিঠা পান ? নেহি, বাবুজি। লেকিন মিঠা মাসাল্লা দেকে বানা দেনে সেকতা।’ ‘তাই দিজিয়ে। তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, বাংলা দেশ ছাড়লেই এই একটা প্রবলেম।
পানটা কিনে মুখে পুরে দিয়ে ফেলুদা বলল, হ্যাঁ ভাই, আমি এ-শহরে নতুন লােক। এখানকার রামকৃষ্ণ মিশনটা কোথায় বলতে পার ?
ফেলুদা অবিশ্যি হিন্দিতে প্রশ্ন করছিল, আর লােকটাও হিন্দিতে জবাব দিয়েছিল, কিন্তু আমি বাংলাতেই লিখছি।
দোকানদার বলল, রামকিষণ মিসির ?। ‘রামকৃষ্ণ মিশন। শহরে একজন বড় সাধুবাবা এসেছেন, আমি তাঁর খোঁজ করছি। শুনলাম তিনি রামকৃষ্ণ মিশনে উঠেছেন।
দোকানদার মাথা নেড়ে বিড় বিড় করে কী জানি বলে বিড়ি বাঁধতে আরম্ভ করে দিল। কিন্তু দোকানের পাশেই একটা খাটিয়ায় একটা ইয়াবড় গোঁফওয়ালা নােক একটা পুরনাে মরচে ধরা বিস্কুটের টিন বাজিয়ে গান করছিল, সে হঠাৎ ফেলুদাকে জিজ্ঞেস করল, কালাে গোঁফদাড়িওয়ালা কালাে চশমা পরা সাধু কি ? তাই যদি হয় তা হলে তাকে কাল সন্ধেবেলা টাঙ্গার স্ট্যান্ড কোথায় বলে দিয়েছিলাম।
‘কোথায় টাঙ্গার স্ট্যান্ড ? ‘এখান থেকে পাঁচ মিনিট। ওই দিকে প্রথম চৌমাথাটায় গেলেই সার সার গাড়ি দাঁড়ানাে আছে দেখতে পাবেন।’
‘শুক্রিয়া !
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৯)
শুক্রিয়া কথাটা প্রথম শুনলাম। ফেলুদা বলল ওটা হল উর্দুতে থ্যাঙ্ক ইউ। টাঙ্গা স্ট্যান্ডে পৌঁছে সাতটা টাঙ্গাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করার পর আট বারের বার সাতান্ন নম্বর গাড়ির গাড়ােয়ান বলল যে গতকাল সন্ধ্যায় একজন গেরুয়াপরা দাড়িগোঁফওয়ালা লােক তার গাড়ি ভাড়া করেছিল বটে।
‘কোথায় নিয়ে গিয়েছিলে সাধুবাবাকে ?’—ফেলুদা প্রশ্ন করল। গাড়ােয়ান বলল, ইস্টিশান।’ ‘স্টেশন ?
হাঁ।‘ ‘কত ভাড়া এখান থেকে ? ‘বারাে আনা। ‘কত টাইম লাগবে পৌঁছুতে? ‘দশ মিনিটের মতাে। ‘চার আনা বেশি দিলে আট মিনিটে পৌঁছে দেবে ? ‘টিরেন পাকাড়না হ্যায় কেয়া ? টিরেন বলে টিরেন। বটিয়া টিরেন বাদশাহী এক্সপ্রেস। গাড়ােয়ান একটু বােকার মতাে হেসে বলল, ‘চলিয়ে—আট মিনিটমে পৌছা দেঙ্গে!
গাড়ি ছাড়বার পর ফেলুদাকে একটু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, সেই সাধুবাবা কি এখনও বসে আছেন স্টেশনে আংটি নিয়ে ?
এটা বলতে ফেলুদা আমার দিকে এমন কটমট করে চাইল যে আমি একেবারে চুপ মেরে গেলাম।
কিছুক্ষণ যাবার পর ফেলুদা গাড়ােয়ানকে জিজ্ঞেস করল, ‘সাধুবাবার সঙ্গে কোনও মালপত্তর ছিল কি ?
গাড়ােয়ান একটুক্ষণ ভেবে বলল, মনে হয় একটা বাক্স ছিল। তবে, বড় নয়, ছােট।
স্টেশনে পৌঁছে টিকিট ঘরের লােক, গেটের চেকার, কুলি-টুলি এদের কাউকে জিজ্ঞেস করে কোনও ফল হল না। রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার বাঙালি ; তিনি বললেন, আপনি কি
পবিত্ৰানন্দ ঠাকুরের কথা বলছেন ? যিনি দেরাদুনে থাকেন ? তিনি তো তিনদিন হল সবে এসেছেন। তাঁর তাে এখনও ফিরে যাবার সময় হয়নি। আর তাঁর সঙ্গে তাে দেদার সাঙ্গোপাঙ্গ চেলাচামুণ্ডা!
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৯)
সবশেষে ক্লাস ওয়েটিং রুমের যে দারােয়ান, তাকে জিজ্ঞেস করতে সে বলল একজন গেরুয়াপরা দাড়িওয়ালা লােক গতকাল সন্ধ্যায় এসেছিল বটে।
ওয়েটিংরুমে বসেছিলেন ? “আজ্ঞে না। বসেননি।
‘বাথরুমে ঢুকেছিলেন। হাতে একটা ছােট বাক্স ছিল। ‘তারপর ? ‘তারপর তাে জানি না।’
সে কী ? বাথরুমে ঢােকার পর তাকে আর দেখােনি? ‘দেখেছি বলে তাে মনে পড়ছে না।’ ‘তুমি এখানেই ছিলে তাে ? ‘তা তাে থাকবই। ডুন এক্সপ্রেস আসছে তখন। ঘরে অনেক লােক যে।’ ‘তা হলে হয়তাে খেয়াল করেনি। এমনও হতে পারে তাে ? ‘ত পারে।’
কিন্তু লােকটার হাবভাব দেখে মনে হল যে সে বলতে চায় যে সাধুবাবা বেরােলে সে নিশ্চয়ই দেখতে পেত। কিন্তু তা হলে সে সাধুবাবা গেলেন কোথায় ?
সেশনে আর বেশিক্ষণ থেকে এ রহস্যের উত্তর পাওয়া যাবে না, তাই আমরা বাইরে বেরিয়ে এলাম।
এখানেও বাইরে টাঙ্গার লাইন, আর তারই একটাতে আমরা উঠে পড়লাম। টাঙ্গা জিনিসটাকে আর অবজ্ঞা করতে পারছিলাম না, কারণ সাতান্ন নম্বরের গাড়ােয়ান আমাদের ঠিক সাত মিনিট সাতান্ন সেকেন্ডে স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছিল ।
Read More