ছাতে উঠে দেখি, কোণের টেবিলটায় চুরুট হাতে তিনকড়িবাবু বসে কফি খাচ্ছেন। ফেলুদাকে দেখতে পেয়েই হাত তুলে তাঁর টেবিলে গিয়ে বসতে বললেন আমাদের।
আমরা তিনকড়িবাবুর দু দিকে দুটো টিনের চেয়ারে বসলাম । তিনকড়িবাবু ফেলুদাকে বললেন, ‘ডিটেশনে তােমার পারদর্শিতা দেখে খুশি হয়ে আমি তােমাদের দুজনকে দুটো হট চকোলেট খাওয়াব—আপত্তি আছে ? | হট চকোলেটের নাম শুনে আমার জিভে জল এসে গেল। তিনকড়িবাবু তুড়ি মেরে একটা বেয়ারাকে ডাকলেন।
বেয়ারা এসে অডার নিয়ে গেলে পর তিনকড়িবাবু কোটের পকেট থেকে একটা বই বার করে ফেলুদাকে দিয়ে বললেন, “এই নাও । একটা এক্সট্রা কপি ছিল–আমার লেটেস্ট বই। তােমায় দিলুম।’
বইয়ের মলাটটা দেখে ফেলুদার মুখটা হাঁ হয়ে গেল। ‘আপনার বই মানে ? আপনার লেখা ? আপনিই ‘গুপ্তচর’ নাম নিয়ে লেখেনি ?” তিনকড়িবাবু আধ-বােজা চোখে অল্প হাসি হেসে মাথা নেড়ে ‘া বললেন ।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৭)
ফেলুদার অবাক ভাব আরও যেন বেড়ে গেল । ‘সে কী ! আপনার সব কটা উপন্যাস যে আমার পড়া। বাংলায় আপনার ছাড়া আর কারুর রহস্য উপন্যাস আমার ভাল লাগে না। | ‘থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ ! ব্যাপারটা কী জানাে ? এখানে একটা প্লট মাথায় নিয়ে লেখার জন্যই এসেছিলাম। এখন দেখছি, বাস্তব জীবনের রহস্য নিয়েই মাথা ঘামিয়ে ছুটিটা ফুরিয়ে গেল।’
‘আমার সত্যিই দারুণ লাক—আপনার সঙ্গে এভাবে আলাপ হয়ে গেল । | ‘দুঃখের বিষয় আমার ছুটির মেয়াদ সত্যিই ফুরিয়ে এসেছে। কাল সকালে চলে যাচ্ছি আমি । আশা করছি, যাবার আগে তােমাদের আরও কিছুটা হেলপ করে দিয়ে যেতে পারব।’
ফেলুদা এবার তার এক্সাইটিং খবরটা তিনকড়িবাবুকে দিয়ে দিল।
রাজেনবাবুর ছেলেকে আজ দেখলাম। বল কী হে ? ‘এই দশ মিনিট আগে। তুমি ঠিক বলছ ? চিনতে পেরেছ তাে ঠিক ? ‘চোদ্দ আনা শিওর। মাউন্ট এভারেস্ট হােটেলে গিয়ে খোঁজ করলে বাকি দু আনাও পুরে যাবে বােধ হয়।
তিনকড়িবাবু হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘রাজেনবাবুর মুখে তার ছেলের কথা শুনেছ ? ‘কাল যা বললেন, তার বেশি শুনিনি।’
‘আমি শুনেছি অনেক কথা। ছেলেটি অল্পবয়সে বখে গিয়েছিল। বাপের সিন্দুক থেকে টাকা চুরি করে ধরা পড়েছিল। রাজেনবাবু তাকে ত্যাজ্যপুত্র করেন। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। ছেলেটি গিয়েওছিল তাই। ২৪ বছর বয়স তখন তার। একেবারে নিখোঁজ । রাজেনবাবু অনেক অনুসন্ধান করেছিলেন, কারণ পরে তাঁর অনুতাপ হয় । কিন্তু ছেলে কোনও খোঁজখবর নেয়নি বা দেয়নি। বিলেতে তাকে দেখেছিলেন রাজেনবাবুরই এক বন্ধু । তাও সে দশ বারাে বছর আগে।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৭)
‘রাজেনবাবু তাহলে জানেন না যে তাঁর ছেলে এখানে আছে ? ‘নিশ্চয়ই না। আমার মনে হয় ওঁকে না জানানােই ভাল। একে এই চিঠির শক, তার উপর…’
তিনকড়িবাবু হঠাৎ থেমে গেলেন। তার পর ফেলুদার দিকে ফিরে বললেন, আমার বুদ্ধিশুদ্ধি সব লােপ পেয়েছে। রহস্য উপন্যাস লেখা ছেড়ে দেওয়া উচিত।’
ফেলুদা হাসতে হাসতে বলল, ‘প্রবীর মজুমদার যে চিঠি লিখে থাকতে পারেন, সেটা আপনার খেয়াল হয়নি তাে ? ‘এগজ্যাকুলি । কিন্তু…’ তিনকড়িবাবু অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন।
বেয়ারা হট চকোলেট এনে টেবিলে রাখতে তিনকড়িবাবু যেন একটু চাগিয়ে উঠলেন। ফেলুদার দিকে ফিরে বললেন, ‘ফণী মিত্তিরকে কেমন দেখলে ?
ফেলুদা যেন একটু হকচকিয়ে গেল। | ‘সে কি, আপনি কী করে জানলেন আমি ওখানে গেসলাম ?
‘তুমি যাওয়ার অল্পক্ষণ পরেই আমিও গেলাম।
‘আমাকে রাস্তায় দেখেছিলেন বুঝি ?
‘তবে ?
ডাক্তারের ঘরের মেঝেতে একটি মরা সিগারেট দেখে জিজ্ঞেস করলাম, কে খেয়েছে । ডাক্তার ধূমপান করেন না। ফণীবাবু তখন বর্ণনা দিলেন। তাতে তােমার কথা মনে হল, যদিও তােমাকে আমি সিগারেট খেতে দেখিনি। কিন্তু এখন তােমার আঙুলের গায়ে হলদে রং দেখে বুঝেছি, তুমি খাও।
ফেলুদা তিনকড়িবাবুর বুদ্ধির তারিফ করে বলল, “আপনারও কি ফণী মিত্তিরকে সন্দেহ হয়েছিল না কি ?
‘তা হবে না ? লােকটাকে দেখলে অভক্তি হয় কি না ? ‘তা হয়। রাজেনবাবু যে কেন ওকে আমল দেন জানি না।’
‘তাও জানাে না বুঝি ? দার্জিলিং-এ আসার কিছু দিনের মধ্যে রাজেনবাবুর ধম্মকম্মের দিকে মন যায়। তখন ফণীবাবুই তাকে এক গুরুর সন্ধান দিয়েছিলেন। একই গুরুর শিষ্য হিসেবে ওদের যে প্রায় ভাই-ভাই সম্পর্ক হে!
ফেলুদা জিজ্ঞেস করল, ফণী মিত্তিরের সঙ্গে কথা বলে কী বুঝলেন ?
কথা তে ছুতাে । আসলে বইয়ের আলমারিগুলাের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলুম।’
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৭)
বাংলা উপন্যাস আছে কিনা দেখার জন্য ? ‘ঠিক বলেছ।’ ‘আমিও দেখেছি, প্রায় নেই বললেই চলে। আর যা আছে, তাও আদ্যিকালের।’ ‘ঠিক।’
তবে ফণী ডাক্তার অন্যের বাড়ির বই থেকেও কথা কেটে চিঠি তৈরি করতে পারে। ‘ত পারে। তবে লােকটাকে দেখে ভারী কুঁড়ে বলে মনে হয়। এ ব্যাপারে অতটা কাঠখড় পােড়াবে, সেটা কেন যেন বিশ্বাস হয় না।’ | ফেলুদা এবার বলল, “অবনী ঘােষাল লােকটা সম্বন্ধে আপনার কী ধারণ?
‘বিশেষ সুবিধের লােক নয় বলেই আমার বিশ্বাস। ভারী ওপর-চালাক। আর ও সব প্রাচীন শিল্প-টিল্প কিছু না। ওর আসল লােভ হচ্ছে টাকার। এখন খরচ করে জিনিস কিনছে, পরে বিদেশিদের কাছে বিক্রি করে পাঁচগুণ প্রফিট করবে।’
‘ওর পক্ষে এই হুমকি-চিঠি দেওয়ার কোনও কারণ থাকতে পারে বলে আপনার মনে হয়
“সেটা এখনও তলিয়ে দেখিনি।’ ‘আমি একটা কারণ আবিষ্কার করেছি।’
Read More