সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৫)

‘গন্ধটা গ্রিপেক্স আঠার মতাে। ‘চমৎকার ধরেছ। 

কিন্তু আপনিও তাে ধরার ব্যাপারে কম যান না দেখছি।’ তিনকড়িবাবু হেসে বললেন, কিন্তু তােমার বয়সে আমি ডিটেকটিভ কথাটার মানে জানতুম কি না সন্দেহ ! | বাড়ি ফেরার পথে ফেলুদা বলল, “রাজেনবাবুর মিস্ট্রি সলভ করতে পারব কি না জানি

 ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড  

-কিন্তু সেই সূত্রে তিনকড়িবাবুর সঙ্গে আলাপটা বেশ ফাউ পাওয়া গেল। | আমি বললাম, তা হলে উনিই ব্যাপারটা তদন্ত করুন না । তুমি আর মিথ্যে মাথা ঘামাচ্ছ কেন ? 

‘আহা—বাংলা হরফের ব্যাপারটা জানা আছে বলে কি সবই জানবেন নাকি ? 

ফেলুদার কথাটা শুনে ভালই লাগল। ওর মতাে বুদ্ধি আশা করি তিনকড়িবাবুর নেই। মাঝে মাঝে ফোড়ন দিলে আপত্তি নেই, কিন্তু আসল কাজটা যেন ফেলুদাই করে। 

‘কাকে অপরাধী বলে মনে হচ্ছে ফেলুদা ? ‘তাপরা— কথাটার মাঝখানেই ফেলুদা থেমে গেল। তার দৃষ্টি দেখলাম একজন লােককে ফলাে করে পিছন দিকে ঘুরছে। ‘লােকটাকে দেখলি ? ‘কই, না তো? মুখ দেখিনি তাে।’ 

ল্যাম্পের আলােটা পড়ল, আর ঠিক মনে হল–ফেলুদা আবার থেমে গেল। কী মনে হল ফেলুদা ? নাঃ, বােধহয় চোখের ভুল। চ’ পা চালিয়ে চ’, ক্ষিদে পেয়েছে। 

ফেলুদা হল আমার মাসতুতাে দাদা। ও আর আমি আমার বাবার সঙ্গে দার্জিলিং-এ বেড়াতে এসে শহরের নীচের দিকে স্যানাটোরিয়ামে উঠেছি। স্যানাটোরিয়াম ভর্তি বাঙালি ; বাবা তাদেরই মধ্য থেকে সমবয়সী বন্ধু জুটিয়ে নিয়ে তাসটাস খেলে গল্পটল্প করে সময় কাটাচ্ছেন। আমি আর ফেলুদা কোথায় যাই, কী করি, তা নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামান না। 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৫)

 আজ সকালে আমার ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হয়েছে। উঠে দেখি বাবা রয়েছেন, কিন্তু ফেলুদার বিছানা খালি। কী ব্যাপার ? 

বাবাকে জিজ্ঞেস করতে বললেন, ‘ও এসে অবধি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখেনি। আজ দিনটা পরিষ্কার দেখে বােধহয় আগেভাগে বেরিয়েছে। 

আমি কিন্তু মনে মনে আন্দাজ করছিলুম যে ফেলুদা তদন্তের কাজ শুরু করে দিয়েছে, আর সেই কাজেই বেরিয়েছে। কথাটা ভেবে ভারী রাগ হল। আমাকে বাদ দিয়ে কিছু করার কথা তাে ফেলুদার নয়। 

যাই হােক, আমিও মুখটুখ ধুয়ে চা-টা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। লেডেন লা রােডে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডটার কাছাকাছি এসে ফেলুদার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আমি বললাম, বা রে, তুমি আমায় ফেলে বেরিয়েছ কেন ? 

‘শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছিল—তাই ডাক্তার দেখাতে গেলাম। ‘ফণী ডাক্তার ? ‘তােরও একটু একটু বুদ্ধি খুলেছে দেখছি।’ ‘দেখালে ? ‘চার টাকা ভিজিট নিল, আর একটা ওষুধ লিখে দিল। 

‘ভাল ডাক্তার ? ‘অসুখ নেই তাও পরীক্ষা করে ওষুধ দিচ্ছে—কেমন ডাক্তার বুঝে দ্যাখ ; তার পর বাড়ির যা চেহারা দেখলাম, তাতে পাের যে খুব বেশি তাও মনে হয় না।’ 

‘তা হলে উনি কখনওই চিঠিটা লেখেননি। ‘কেন ? ‘গবিব লােকের অত সাহস হয় ? ‘তা টাকার দরকার হলে হয় বইকী। কিন্তু চিঠিতে তাে টাকা চায়নি।’ ‘ওই ভাবে খােলাখুলি বুঝি কেউ টাকা চায় ? 

তবে ? ‘রাজেনবাবুর অবস্থা কাল কী রকম দেখলি বল তাে? ‘কেমন যেন ভিতু ভিতু।’ ‘ভয় পেয়ে মনের অসুখ হতে পারে, সেটা জানিস ? ‘তা তাে পারেই।’ ‘আর মনের অসুখ থেকে শরীরের অসুখ ? ‘তও হয় বুঝি ? 

‘ইয়েস! আর শরীরের অসুখ হলে ডাক্তার ভাকতে হবে, সেটা আশা করি তাের মতাে ক্যাবলারও জানা আছে।’ 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৫)

ফেলুদার বুদ্ধি দেখে আমার প্রায় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। অবিশ্যি ফণী ডাক্তার যদি সত্যিই এত সব ভেবে-টিৰে চিঠিটা লিখে থাকে, তা হলে ওরও বুদ্ধি সাংঘাতিক বলতে হবে । 

ম্যালের মুখে ফোয়ারার কাছাকাছি যখন এসেছি তখন ফেলুদা বলল, কিউরিও সম্বন্ধে একটা কিউরিয়সিটি বােধ করছি।’ | ‘কিউরিও’র মানে আগেই শিখেছিলাম, আর কিউরিয়সিটি মানে যে কৌতূহল, সেটা ইস্কুলেই শিখেছি ।। 

আমাদের ঠিক পাশেই ‘নেপাল কিউরিও শপ। রাজেনবাবু আর অবনীবাবু এখানেই আসেন 

ফেলুদা সটান দোকানের ভেতর গিয়ে ঢুকল। 

দোকানদারের গায়ে ছাই রঙের কোট, গলায় মাফলার আর মাথায় সােনালি কাজ করা কালাে টুপি। ফেলুদাকে দেখে হাসি হাসি মুখ করে এগিয়ে এল। দোকানের ভেতরটা পুরনাে জিনিসপত্রে গিজগিজ করছে, আলােও বেশি নেই, আর গন্ধটাও যেন সেকেলে। 

ফেলুদা এদিক-ওদিক দেখে গম্ভীর গলায় বলল, “ভাল পুরনাে থাঙ্কা আছে ? ‘এই পাশের ঘরে আসুন। ভাল জিনিস তাে বিক্রি হয়ে গেছে সব। তবে নতুন মাল আবার কিছু আসছে।’ 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৫)

পাশের ঘরে যাবার সময় আমি ফেলুদার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বললাম, “থাঙ্কা কী জিনিস ? 

(ফেলুদা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, দেখতেই তাে পাবি ! | পাশের ঘরটা আরও ছােট–যাকে বলে একেবারে ঘুপচি ।। দোকানদার দেওয়ালে ঝােলানাে সিল্কের উপর আঁকা একটা বুদ্ধের ছবি দেখিয়ে বলল, এই একটাই ভাল জিনিস আছে-~~-তবে একটু ভ্যামেজড়।’ 

একেই বলে থাঙ্কা ? এ জিনিস তাে রাজেনবাবুর বাড়িতে অনেক আছে। 

ফেলুদ ভীষণ বিজ্ঞের মতাে থাঙ্কাটার গায়ের উপর চোখ ঠেকিয়ে উপর থেকে নীচে অবধি প্রায় তিন মিনিট ধরে দেখে বলল, এটার বয়স তাে সত্তর বছরের বেশি বলে মনে হচ্ছে নাআমি অন্তত তিনশাে বছরের পুরনাে জিনিস চাইছি।

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৬)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *