ময়মনসিংহের মেজোখালার বাসায় যে অসুখের শুরু সেই অসুখ আমি এখনো লালন করছি। এখনো আমি একা ঘুমাই না। একা ঘুমালেই বড় বোবাটা বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে উপস্থিত হয়। যখন কেউ আমার সঙ্গে থাকে, তখনো উপস্থিত হয়। তবে তখন আমার গোঙানির শব্দে পাশের জনের ঘুম ভাঙে। সে আমাকে ডেকে তোলে। যে দায়িত্ব এখন বর্তেছে শাওনের কাঁধে।
বোবার হাতে আক্রান্ত হবার পর মেজোখালার বাসায় যাওয়া আমি একেবারেই কমিয়ে দিলাম। খালার বাড়িতে যাওয়ার ভৌতিক কারণ ছাড়াও একটা লৌকিক কারণও ছিল। লৌকিক কারণটা ব্যাখ্যা করি।খালার ধারণা হলো, বিয়ের পাত্র হিসাবে আমি অতি
উত্তম। তিনি তার শ্বশুরবাড়ির দিকের মেয়েদের সঙ্গে আমার বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাতে লাগলেন। তার বাসায় মফস্বলের আধুনিকতায় আধুনিক তরুণীরা আসা- যাওয়া করতে লাগল। মফস্বলের আধুনিকতা হচ্ছে সারা শরীর দুলিয়ে কথা বলা, অকারণে হাসা এবং অকারণে লম্বা গলায় বলা ‘সরি’। তখনো ‘oh Shit’ বলা চালু হয় নি।
খালা এদের বলতেন, আমি রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত।আমার ভাইগ্না একা বসে আছে। যাও তার সঙ্গে গল্প কর।তাদের গল্পের নমুনা দেই। একজন গল্প করতে এল।অকারণে হেসে ভেঙে পড়তে পড়তে বলল, আপনি নাকি রাইটার?
হুঁ।আমি কিন্তু বাংলাদেশের কোনো রাইটারের বই পড়ি না। সরি।সরি হবার কিছু নেই।আরেকটা কথা আপনাকে বলি—-টিচার আমার দুই চোখের বিষ। আপনি রাগ করলেন নাকি? সরি।সুপাত্র হিসেবে ইউনিভার্সিটিতে আমার সমস্যা শুরু হলো। কোনো এক ফ্যাকাল্টি ডিন এসে বললেন, আমার মেয়ে দিলরুবা (নকল নাম দিলাম। আপনার ছাত্রী। সে আপনার খুব প্রশংসা করে। আপনি আজ সন্ধ্যায় আমার বাসায় আসবেন। আমাদের সঙ্গে খাবেন।
মেস করে থাকেন। কী খান তার নাই ঠিক। আমার স্ত্রী নাটোরের মেয়ে। রান্নার হাত অসাধারণ। বাসা চিনবেন? না-কি দিলরুবাকে পাঠিয়ে দেব আপনাকে নিয়ে যেতে।বাসা চিনব।সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে চলে আসবেন। কিছুক্ষণ গল্পগুজব করব। দিলরুবা ভালো গান জানে। গান শুনবেন। গানবাজনার প্রতি কি আগ্রহ আছে? শুধু। লেখাপড়া নিয়ে থাকলে হয় না, জীবনে সুকুমার কলারও প্রয়োজন আছে।
সুকুমার কলার সন্ধানে গেলাম। দিলরুবা হারমোনিয়াম নিয়ে তৈরি। তার গানের টিচার এসেছেন। তিনি তবলা বাজাবেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত দিয়ে শুরু হলো—‘খোল খোল দ্বার রাখিও না আর…’। তারপর নজরুল ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’।দিলরুবার বাবা বললেন, হুমায়ূন সাহেব, এইবার আপনার পছন্দের গান হবে। বলুন আপনার কোন গান পছন্দ? দিলরুবা বলল, আমার কোনো গানই স্যারের পছন্দ হচ্ছে না। আমি লক্ষ করেছি, আমি গান গাওয়ার সময় স্যার অন্যদিকে তাকিয়ে থাকেন। আমি আর গানই করব না।
বলতে বলতে দিলরুবার গলা ভারি হয়ে গেল। সে বসার ঘর থেকে ছুটে ভেতরের দিকে চলে গেল। দিলরুবার মা বললেন, আমার মেয়ে বড়ই অভিমানী। এখন বাথরুমে দরজা বন্ধ করে কাদবে। বাবা, তোমার কি খিদে লেগেছে? টেবিলে খাবার লাগাতে বলি।বলুন। খাওয়াদাওয়া শেষ হলো। দিলরুবা আমাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসে বলল, স্যার, একটা আইটেম আমি রান্না করেছি। বলুন তো কোনটা?
আমি বললাম, এটা বলা তো খুব কঠিন।দিলরুবা বলল, মোটেই কঠিন না। সবচেয়ে পচা হয়েছে যে আইটেমটা সেটা আমি বেঁধেছি।আমি বললাম, তাহলে তো মনে হয় সবই তোমার রান্না।দিলরুবা চোখে আঁচল চাপা দিয়ে আবারো ঘরের দিকে ছুটে গেল। মনে হয় বাথরুমে ঢুকে কাঁদবে।তিন মাস পার করার পর চাকরিতে ইস্তফা দিলাম।
চেয়ারম্যান স্যার থমথমে গলায় বললেন, কেন চাকরি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন? এখানে সমস্যা কী হচ্ছে? আমি বললাম, কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারারের পোস্ট খালি হয়েছে।আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করব।চেয়ারম্যান স্যার হতাশ গলায় বললেন, আমি বলেছিলাম না, এটা হচ্ছে আপনার মতো ছেলেদের ট্রানজিট পয়েন্ট।জি আপনি বলেছিলেন।
সেকেন্ড থট দিন। আমি চেষ্টা করব যেন অতি দ্রুত আমাদের ইউনিভার্সিটির স্কলারশিপ নিয়ে পিএইচডি করতে যেতে পারেন।স্যার। আমাকে ছেড়ে দিন। ময়মনসিংহ আমার শহর। কিন্তু আমাকে শহর টানছে না।আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করলাম। ময়মনসিংহ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কোনো অর্জন নেই। সবই বিসর্জন।ছোট্ট একটা অর্জন আছে—এক বর্ষার রাতে ‘সৌরভ’ নামে একটা ছোটগল্প লিখেছিলাম। গল্পটা বিচিত্রায়
প্রকাশিত হয়েছিল। সৌরভ আমার লেখা প্রথম ছোটগল্প, যা হারিয়ে যায় নি। ছফা ভাইয়ের পত্রিকায় ছাপা হওয়া গল্পটার এখন কোনো অস্তিত্ব নেই।কৌতূহলী পাঠকদের জন্য গল্পটা দিয়ে দিলাম। গল্পের পটভূমি ময়মনসিংহ শহর, এটা কি বোঝা যায়?
সৌরভ আজহার খাঁ ঘর থেকে বেরুবেন, শার্ট গায়ে দিয়েছেন, তখনি লিলি বলল, বাবা আজ কিন্তু মনে করে আনবে।তিনি তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকালেন মেয়ের দিকে। মেয়ে বড় হয়েছে, ইচ্ছে করলেও ধমক দিতে পারেন না। সেই জন্যেই রাগী চোখে তাকিয়ে রইলেন খানিকক্ষণ।লিলি বলল, রোজ রোজ মনে করিয়ে দেই। আজ আনবে কিন্তু।সামনের মাসে আনব।না, আজই আনবে।রাগে মুখ তেতো হয়ে গেল আজহার খার। প্রতিটি ছেলেমেয়ে এমন উদ্ধত হয়েছে।
বাবার প্রতি কিছুমাত্র মমতা নেই। আর নেই বলেই মাসের ছাব্বিশ তারিখে দেয়ালে হেলান দিয়ে দৃঢ় গলায় বলতে পারে, না, আজই আনতে হবে।তিনি নিঃশব্দে শার্ট গায়ে দিলেন। চুল আঁচড়ালেন।জুতা পরলেন। জুতার ফিতায় কাদা লেগেছিল, ঘষে ঘষে সাফ করলেন। লিলি সারাক্ষণই বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। তিনি বেরুবার জন্যে উঠে দাঁড়াতেই বলল, বাবা, আনবে তো?
মেয়েটার গালে প্রচণ্ড একটি চড় কষিয়ে দেবার ইচ্ছা প্রাণপণে দমন করে তিনি শান্ত গলায় বললেন, টাকা নেই,সামনের মাসে আনব।লিলি নিঃশব্দে উঠে গেল। তিনি ভেবে পেলেন না সবাই বৈরি হয়ে উঠলে কী করে বেঁচে থাকা যায়। তিনি তো কিছু বলেন নি। শুধু শান্ত গলায় বলেছেন, হাতে টাকা নেই। এটা তাকে বলতে হলো কেন? যে মেয়ে বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে তার অভাব বুঝতে পারে না সে কেমন মেয়ে?
তার মন খারাপ হয়ে গেল। ইদানীং অল্পতেই তার মন খারাপ হয়ে যায়, সামান্য সব কারণে হতাশ বোধ করেন।বেঁচে থাকা অনাবশ্যক বলে মনে হয়।‘হতাশা গুণনাশিনী। হতাশা মানুষের সমস্ত গুণ নষ্ট করে দেয়। তবুও তো ভালোবাসার মতো মহত্তম সগুণটি আমার এখনো নষ্ট হয় নি। তোমাদের সবাইকে আমি ভালোবাসি।
তোমাদের জন্যে সারাক্ষণ আমার বুক টনটন করে, আর লিলি তুমি তোমার বাবার দিকে ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে থাক। মাসের ছাব্বিশ তারিখে তোমার একটি শখের জিনিস আমি কিনে আনতে পারি না। কিন্তু তুমি তো আমারই মেয়ে। তুমি তোমার মায়ের মতো অবুঝ হবে কেন?’
আজহার খাঁর কান্না পেতে লাগল। যদিও সন্ধ্যা হয়ে আসছে, তাঁকে এক্ষুনি বাইরে বেরুতে হবে। তবু তিনি চৌকিতে বসে বাইরের আকাশ দেখতে লাগলেন।বাবা, এই নাও টাকা।লিলি তিনটি দশ টাকার নোট টেবিলে বিছিয়ে দিল।তিনি অবাক হয়ে বললেন, টাকা কোথায় পেয়েছিস? আমার টাকা। আমি জমিয়েছি। আনবে তো বাবা।আনব।নাম মনে আছে তোমার? আছে। লজ্জা ও হতাশার মিশ্র অনুভূতি নিয়ে তিনি বেরিয়ে এলেন। বাইরে ঝিরঝির করে হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল। সন্ধ্যা এখনো মিলায় নি। এর মধ্যেই চারদিকের তরল অন্ধকার গাঢ় হয়ে এসেছে। পরিচিত পথঘাটও অপরিচিত লাগছে।
দশ বছর ধরে আমি এই শহরে পড়ে আছি। দশ বছর খুব দীর্ঘ সময়। এই দীর্ঘ সময়ে আমি রোজ একই রাস্তায় হাঁটছি।একই ধরনের লোকজনের সঙ্গে কথা বলছি। এই দীর্ঘ সময়ে কোথাও যাই নি। তোমাদের কথা ভেবেই প্রতিটি পয়সা আমাকে সাবধানে খরচ করতে হয়েছে। অফিসে টিফিন আওয়ারে সবাই যখন চায়ের সঙ্গে দুটি করে বিস্কিট খায় আমি সেখানে এক কাপ চা নিয়ে বসি। সেও তোমাদের কথা ভেবেই। তোমরা তার প্রতিদানে কী দিয়েছ আমাকে? আমাকে লজ্জা দেবার জন্যে লিলি, তুমি তোমার দীর্ঘদিনের জমানো টাকা বের করে আন।
তোমর মা তার ভাইদের কাছে টাকা চেয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে চিঠি লেখে।তাঁর মনে হলো তিনি কুকুরের জীবনযাপন করছেন। সাধ- আহ্লাদহীন বিরক্তিকর জীবন। তিনি একটি নিঃশ্বাস ফেললেন। বৃষ্টির ছাটে আধভেজা হয়ে আজহার খাঁ বাজারে ঢুকলেন। খারাপ আবহাওয়ার জন্যে বাজার তেমন জমে নি। সন্ধ্যাবেলা যেমন জমজমাট থাকে চারদিক সেরকম নয়। কেমন ফাঁকা ফাঁকা। তিনি বড়সড় দেখে একটি স্টেশনারি দোকানে ঢুকে পড়লেন। ইভিনিং ইন প্যারিস সেন্টটা আছে আপনাদের?
না, অন্য সেন্ট আছে। দেখবেন? উঁহু, এইটাই চাই।তখন ঝমঝম করে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নেমেছে। বৃষ্টি অগ্রাহ্য করে তিনি রাস্তায় নেমে পড়লেন। তিন-চারটি দোকান ঘুরতেই কাদায় পানিতে মাখামাখি। তার গাল বেয়ে পানির স্রোত বইতে লাগল। তাঁর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল, সেন্টের শিশিটি তাঁর এই মুহূর্তেই প্রয়োজন।বৃষ্টি কখন ধরবে তার জন্যে অপেক্ষা করতে পারছেন না —এমনি তাড়া। পঞ্চম দোকানে সেটি পাওয়া গেল।দোকানি শিশিটি কাগজে মুড়ে বলল, ইশ, একেবারে যে ভিজে গেছেন? রিকশা করে চলে যান।কত দাম?
ছাব্বিশ টাকা পঞ্চাশ পয়সা।দরদাম করবার ধৈর্য নেই আর। টাকার জন্যে পকেটে হাত দিয়ে আজহার খাঁ স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। সেখানে দুটি এক টাকার নোট আর একটি আধুলী ছাড়া কিছুই নেই।দোকানি নীরবে শিশিটি আগের জায়গায় রেখে দিল।তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল এরকম ঘটনা যেন প্রতিদিন ঘটে। কাস্টমার জিনিস কিনে পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখে পয়সা নেই। এ যেন খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার।
অজিহার খাঁ ভাবলেশহীন মুখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বৃষ্টির ভেতর নেমে গেলেন। হু-হুঁ করে হাওয়া বইছে। ঝড় উঠবে কিনা কে জানে। চশমার কাছে বৃষ্টির ফোঁটা জমে চারদিক ঝাপসা দেখাচ্ছে। আজহার খাঁ নীরবে হেঁটে চলেছেন। দু’একটি রিকশা তার ঘাড়ের ওপর পড়তে পড়তে সামলে উঠছে। দ্রুতগামী। ট্যাক্সির উজ্জ্বল আলো মাঝে মাঝে তার চোখ ঝলকে দিচ্ছে। তিনি আচ্ছনের মতো হাঁটছেন। এই বৃষ্টি, এই শীতল হাওয়া, পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ডুবে যাওয়া ময়লা পানির স্রোত, কিছুই যেন নজরে আসছে না তার।
‘আহা, আমার মেয়ে শখ করে একটা জিনিস চেয়েছে।আশা করে বসে আছে হয়তো। এমন লক্ষ্মী মেয়ে আমার বাবার সংসারে কত কষ্ট পাচ্ছে। তার। নিজের সংসার হোক, সেখানে কোনো দুঃখ-কষ্ট থাকবে না, আমি কসম খেয়ে বলতে পারি।’
এই জাতীয় অসংলগ্ন ভাবনা ভাবতে ভাবতে তিনি নয়াপাড়া ছাড়িয়ে হাইস্কুল ছাড়িয়ে সেইজখালী পর্যন্ত চলে গেলেন। কোথায় যাচ্ছেন, কী জন্য যাচ্ছেন, এসব তাঁর মনে রইল না। একসময় ইটে ধাক্কা খেয়ে পানিতে পড়ে গেলেন। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে বুঝলেন তাঁর পা টলছে; মাথায় অসম্ভব যন্ত্রণা। পাগলের মতো ঘুরছি কী জন্যে?
এই ভেবে ফিরে চললেন উল্টো পথে! বাজারের সীমানা ছাড়িয়ে পোস্ট অফিসের কাছে আসতেই সশব্দে বাজ পড়ল কোথাও। রাত কত হয়েছে কে জানে। বাতি-টাতি বিশেষ দেখা যাচ্ছে না। লোকজন শুয়ে পড়েছে। আজহার খাঁর হঠাৎ মনে হলো রফিকের বাসায় গিয়ে বিশটা টাকা নিয়ে এলে হয়। কিন্তু দোকান খোলা থাকবে কতক্ষণ! তিনি ডানদিকের গলিতে ভেজা স্যান্ডেল টানতে টানতে দ্রুত হাঁটতে লাগলেন।
ঘন অন্ধকার রাস্তা, বিজলির আলোয় একআধবার সব ফর্সা হয়ে ওঠে। পরক্ষণে নিকষ কালো।রফিকের বাসায় কড়া নাড়তে গিয়ে বুঝলেন তাঁর শরীর সুস্থ নয়। প্রবল জ্বর এসেছে। পিপাসায় গলা বুক শুকিয়ে কাঠ। রফিক আঁতকে উঠে বলল, কী হয়েছে আজহার ভাই?
না, কিছু হয় নি। এক গ্লাস পানি খাওয়াও! বাসার সবাই ভালো আছে তো? ভাবির জ্বর কেমন? সব ভালোই আছে, এক গ্লাস পানি আন আগে।আজহার খাঁ উদ্ভ্রান্ত শূন্যদৃষ্টিতে তাকাতে লাগলেন।রফিক তার হাত ধরল, এহ্, তোমার ভীষণ জ্বর। কী হয়েছে বলো? টাকা আছে তোমার কাছে?
কত টাকা? গোটা বিশেক।দিচ্ছি। তুমি একটা শুকনো কাপড় পরো। আমি রিকশা আনিয়ে দিই। আগে একটু পানি দাও।ঘর বন্ধ করে দোকানিরা শুয়ে পড়েছিল। আজহার খা হতভম্ব হয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন।রিকশাওয়ালা বিরক্ত হয়ে বলল, ধাক্কা দেন না স্যার, ভিতরে লোক আছে। তিনি প্রাণপণে দরজায় ঘা দিলেন। ভেতর থেকে শব্দ এল —কে? তিনি ভাঙা গলায় বললেন, আমি। একটু খুলেন ভাই।কী ব্যাপার?
টাকা নিয়ে এসেছি। সেন্টের শিশিটা দিন।খুট করে দরজা খুলে গেল। সন্দেহজনক দৃষ্টিতে দোকানদার তাকিয়ে রইল তার দিকে। তিনি পকেট হাতড়ে টাকা বের করলেন।দোকানদার বলল, আপনার কী হয়েছে? কিছু হয় নি।এত রাতে আসলেন কেন? সকালে আসলেই পারতেন।রাত কত হয়েছে? সাড়ে বারো।দ্রুতগতিতে রিকশা চলছে। তিনি শক্ত হাতে হুড চেপে ধরে আছেন। তার সমস্ত শরীর অবসন্ন হয়ে আসছে। তার মনে হলো তিনি যে-কোনো সময় ছিটকে পড়ে যাবেন।বাড়ির কাছাকাছি সমস্ত অঞ্চলটা অন্ধকারে ডুবে আছে।
একটি লাইটপোস্টেও আলো নেই। অল্প ঝড়-বাদলা হলেই এ দিককার সব বাতি নিভে যায়। রিকশা আজহার খাঁর বাড়ি থেকে একটু দূরে টগরদের বাড়ির সামনে থামল।তিনি দেখলেন, হারিকেন জ্বালিয়ে লিলি আর তার মা বারান্দায় বসে আছে। রিকশার বাতি দেখে দু’জনই উঠে দাঁড়িয়েছে। অন্ধকারের জন্যে বুঝতে পারছে না কে এল।আজহার খাঁ ডাকলেন, লিলি! লিলি?
জমে থাকা পানিতে ছপছপ শব্দ তুলে মা ও মেয়ে দুজনেই দ্রুত আসছিল। তিনি ব্যস্ত হয়ে রিকশা থেকে নামতে গিয়ে উল্টে পড়লেন। যে জায়গাটায় তিনি হুমড়ি খেয়ে পড়লেন, সেখানটায় অদ্ভুত মিষ্টি সুবাস। তিনি ধরা গলায় বললেন, লিলি, তোর শিশিটা ভেঙে গেছে রে।লিলি ফোঁপাতে ফেঁপাতে বলল, আমার শিশি লাগবে না।তোমার কী হয়েছে বাবা?
গভীর জ্বরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আছেন আজহার খাঁ। রঞ্জু অকাতরে ঘুমুচ্ছে। লিলি আর লিলির মা ভয়কাতর চোখে জেগে বসে আছেন। বাইরে বৃষ্টিস্নাত গভীর রাত। ঘরের ভেতরে হারিকেনের রহস্যময় আলো। জানালা গলে ভিজে হিমেল হাওয়া আসছে।সেই হাওয়া সেন্টের ভাঙা শিশি থেকে কিছু অপরূপ সৌরভ উড়িয়ে আনল।
০৯.
‘টাকশাল থেকে সদ্য বের হওয়া ঝকঝকে কাঁচা রুপার টাকা’। এই উপমা বাংলা সাহিত্যে আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করার পর আমার নিজেকে ঝকঝকে রুপার টাকা মনে হতে লাগল। চেষ্টা করলাম চেহারায় আলগা গাম্ভীর্য নিয়ে আসতে চলনে-বলনে শিক্ষকসুলভ স্থিরতা। হালকা কথাবার্তা বন্ধ। চপলতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শোভা পায় না।
একটা প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস, দুটো সাবসিডিয়ারি কেমিস্ট্রি ক্লাস এবং M.Sc. Preliminary-তে কোয়ান্টাম মেকানিক্স। এই হলো আমার দায়িত্ব।আমি অর্থনৈতিক সমস্যা সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম দেওয়া। একটা প্যাড় ছাপিয়ে ফেললাম।প্যাডের এক কোনায় লেখা হুমায়ূন আহমেদ, লেকচারার, রসায়ন বিভাগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যাকে চিঠি লিখব সে যেন। আমার অবস্থানটা বুঝতে পারে। আমাকে এলেবেলে কেউ ভেবে না বসে।শিক্ষক পরিচয় ছাড়াও আমার লেখক পরিচয়ও আছে।
কাজেই লেখকের একটা উদাসী ভাবও চেহারায় আনার চেষ্টা করি। অন্যমনস্ক ভঙ্গি, খেয়ালি দৃষ্টি ইত্যাদি।যখন ক্লাস থাকে না তখন চলে যাই দৈনিক বাংলা পত্রিকার অফিসে। দৈনিক বাংলার সহ-সম্পাদক সালেহ চৌধুরীর সঙ্গে গল্প করি। তিনি প্রায়ই নিয়ে যান কবি শামসুর রাহমান সাহেবের কামরায়। কবি তখন দৈনিক বাংলার সম্পাদক। তাকে ঘিরে সব সময় ভিড়।
দর্শনার্থীদের সঙ্গে কবি নানান ধরনের কথা বলেন।আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি এবং প্রায়ই ভাবি আমি এদের দলেরই মানুষ। আমাদের অবস্থান জাতির আত্মার কাছাকাছি।আমাদের জন্মই হয়েছে জাতিকে পথ দেখানোর জন্যে।বড় ভালো লাগে। নিজের ভেতরে পবিত্র ভাব হয়।দৈনিক বাংলা অফিসেই বিচিত্রার ঘরবাড়ি। বিচিত্রার সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী কোনার দিকের একটা ঘরে বসেন।
তিনি তখন কাগজ ছেঁড়া নামক বিচিত্র রোগে ভুগছেন। সবসময় কাগজ ছিঁড়ছেন। ছেঁড়া কাগজের শব্দ না শুনে এক সেকেন্ডও থাকতে পারেন না। গাদা গাদা নিউজপ্রিন্ট তাঁর কাছে রাখা হয় ছেঁড়ার জন্যে।মাঝে মাঝে শাহাদত ভাইয়ের ঘরে গিয়ে বসি। শাহাদত ভাই কাগজ ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলেন, ভালো? জি ভালো।চা খান। এই চা দাও।চা দেওয়া হয়। আমি চা খাই। শাহাদত ভাই অন্যদিকে তাকিয়ে কাগজ ছিঁড়তে থাকেন।বিচিত্রা অফিসে অনেকেই তখন কাজ করে। তাদের সবার নাক বেশ উঁচু। নাক উঁচু পত্রিকার কারণে। একটি ক্ষমতাধর পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত সবাই ক্ষমতার আঁচ অনুভব করেন।
সেটাই স্বাভাবিক। তারা খুব একটা কথা বলেন না।লেখকশ্রেণীকে পাত্তা দেন না। লেখকরা তাদের তোয়াজ করে চলবে এটাই আশা করেন। আমি তোয়াজটা কীভাবে করব বুঝতে না পেরে কিছুটা কনফিউজড বোধ করি।বিচিত্রার শাহাদত ভাইয়ের অফিসে একদিন বসে আছি, তিনি যথারীতি কাগজ ছিঁড়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, পশ্চিমবঙ্গে পূজাসংখ্যা বের হয়। আমাদের দেশে ঈদসংখ্যা বলে কিছু নেই।
ঈদ মানেই কোলাকুলি এবং সেমাই। ঠিক করেছি এবার ঈদসংখ্যা বের করব। আপনি একটা উপন্যাস দেবেন।আমি বললাম, অবশ্যই।আনন্দে ঝলমল করছি। বিচিত্রা আমার কাছে উপন্যাস চাচ্ছে, আমি তাহলে লেখক হয়েই গেছি। এই প্রথম উপন্যাস লিখছি একজনের ফরমায়েশে। কী লেখা যায়? গ্রামের পটভূমিতে কিছু লিখি নি। গ্রামে গল্পটা শুরুকরলে কেমন হয়? গ্রামের স্মৃতি তেমন নেই। ঠিক করলাম দশদিনের ছুটি নিয়ে গ্রামে যাব। দাদার বাড়ি, কিংবা নানার বাড়ি। উপন্যাসটা সেখানেই লিখে শেষ করব।
ইউনিভার্সিটিতে ছুটির দরখাস্ত করতে হয় রেজিস্ট্রারের কাছে। সেই দরখাস্ত রেকমন্ড করবেন বিভাগীয় চেয়ারম্যান।দরখাস্ত করলাম। অফিসে জমা দিলাম। খন্দকার স্যার বিরক্ত গলায় বললেন, মাত্র সেদিন জয়েন করেছ। এখনি ছুটি? কী জন্য ছুটি চাও? কী উত্তর দেব বুঝতে পারছি না, লেখালেখির জন্য ছুটি চাচ্ছি শুনলে স্যার সম্ভবত আরো রাগবেন।আমি মুখ শুকনো করে দাঁড়িয়ে আছি। স্যার বললেন, লিখেছ অতি জরুরি। কারণে ছুটি দরকার। অতি জরুরি কারণটা কী?
স্যার, ছুটি লাগবে না।গুড। যাও ঠিকমতো ক্লাস নাও।আমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে চলে এলাম। গ্রামের পটভূতিতে উপন্যাস লিখতে হবে এটা মাথা থেকে দূর করে দিলাম। ঠিক করলাম শহরকেন্দ্রিক উপন্যাসই লিখব।মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প। বাবা-মা ও দুই বোন। গল্পটা মাথার ভেতর তৈরি হতে থাকল। যতক্ষণ ক্লাসে থাকি ততক্ষণ মাথায় গল্প থাকে না। ক্লাস। থেকে বের হলেই মাথায় গল্প ঘুরঘুর করতে থাকে।
কোয়ান্টাম মেকানিক্স পড়িয়ে তখন খুবই আরাম পেতাম।বিজ্ঞান মানেই যে’শুষ্কং কাষ্ঠং তিষ্টতি অগ্রে’ না।বিজ্ঞানে অপূর্ব রহস্য আছে। রহস্য জানা এবং না- জানার আনন্দ আছে তা ছাত্রদের বলতে পেরে ভালো লাগত। প্রাণপণ চেষ্টা করতাম অতি জটিল বিষয়। সহজে ব্যাখ্যা করার।একদিন ক্লাসে বললাম, মনে করো God লুডু খেলছেন।তিনি যখন দান দেবেন তখন ছক্কার গুটিতে কত উঠবে তাকি আগে থেকে বলতে পারবেন?
সবাই একসঙ্গে বলল, অবশ্যই পারবেন।আমি বললাম, তোমাদের চিন্তার সঙ্গে আইনস্টাইনের চিন্তার মিল আছে। আইনস্টাইনও ভাবতেন, পারবেন।আসলে কিন্তু তা-নী। মানুষের ক্ষেত্রে যে অনিশ্চয়তা, গডের ক্ষেত্রেও তা। একটি বস্তুর গতি এবং অবস্থান যেমন মানুষ একই সঙ্গে বলতে পারবে না, অনিশ্চয়তা থাকবে, গডের ক্ষেত্রেও তা।আমার অতি সরল ব্যাখ্যা ছাত্রছাত্রীদের খুব যে কাজে এল তা না। পরীক্ষার খাতায় তারা উদ্ভট উদ্ভট উত্তর লিখতে লাগল।
একটা প্রশ্ন ছিল, ক্ল্যাসিক্যাল মেকানিক্স এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মূল প্রভেদটা কী? এক ছাত্র উত্তর লিখল—ক্ল্যাসিক্যাল মেকানিক্সে ঈশ্বর পাশা খেলেন। কোয়ান্টাম মেকানিক্সে তিনি পাশা খেলেন না।আমি তখনি ঠিক করলাম, ছাত্রদের জন্য কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একটা টেক্সট বই লিখব। যেখানে অতি Abstract এই বিষয়টি বোধগম্য ভাষায় লেখা হবে। ছাত্ররা সেই বই ভয় নিয়ে পড়বে না, আনন্দ নিয়ে পড়বে। পিএইচডি করে ফেরার পর সেই বই লিখেছিলাম। নাম কোয়ান্টাম রসায়ন।
বিচিত্রার উপন্যাসে ফিরে যাই। লেখা শুরু করার পরে দেখি গল্প শুরু হয়েছে গ্রাম্য পটভূমিতে। কিছুতেই পাত্রপাত্রীদের ঢাকা শহরে আনা যাচ্ছে না। সেদিন প্রথম মনে হলো লেখালেখির পুরোটা লেখকের হাতে থাকে না। তার পেছনে অন্যকেউ থাকে।মূল সুতা যার হাতে।বিচিত্রার প্রথম ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত আমার উপন্যাসটির নাম অচিনপুর।বিস্ময়কর মনে হলেও সত্যি আমাকে লেখকখ্যাতি এনে দিল এই উপন্যাসটি। কারণ বিচিত্রার কারণে বহু পাঠক এই লেখাটা পড়ল।
উপন্যাসের জন্য আমি তিনশ’ টাকা পেলাম। সেই দিনই খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানির খান সাহেবও আমার হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিলেন নন্দিত নরকে এবং শঙ্খনীল কারাগার উপন্যাসের রয়েলটি বাবদ, যেখানে চারশ’ টাকা আছে। টাকা নিয়ে ফিরছি, স্টুডেন্ট ওয়েজের মালিক ডেকে দোকানে বসালেন। তারা আমার একটা উপন্যাস ছাপতে চান। এই উপলক্ষে দুশ টাকা অ্যাডভান্স দিলেন। জীবনে প্রথম কোনো উপন্যাসের
জন্য অ্যাডভান্স টাকা পাওয়া। বেতনের ডবল টাকা নিয়ে বাসায় ফিরেছি। কেমন যেন অস্থির লাগছে। মনে হচ্ছে এই টাকার ওপর আমার কোনো অধিকার নেই। এই টাকা অন্য কারোর। অচিনপুর উপন্যাসের কিছুটা পড়লে কেমন হয়? অচিনপুর মরবার পর কী হয়? আট-ন’ বছর বয়সে এর উত্তর জানবার ইচ্ছে হলো। কোনো গূঢ় তত্ত্ব নিয়ে চিন্তার বয়স সেটি ছিল না, কিন্তু সত্যি সত্যি সেই সময়ে আমি মৃত্যুরহস্য নিয়ে ভাবিত হয়ে পড়েছিলাম।
সন্ধ্যাবেলা নবু মামাকে নিয়ে গা ধুতে গিয়েছি পুকুরে।চারদিকে ঝাপসা করে অন্ধকার নামছে। এমন সময় হঠাৎ করেই আমার জানবার ইচ্ছে হলো, মরার পর কী হয়? আমি ফিসফিস করে ডাকলাম, নবু মামা, নবু মামা।নবু মামা সাঁতরে মাঝপুকুরে চলে গিয়েছিলেন। তিনি আমার কথা শুনতে পেলেন না। আমি আবার ডাকলাম, নবু মামা, রাত হয়ে যাচ্ছে।আর একটু।ভয় লাগছে আমার।একা একা পাড়ে বসে থাকতে সত্যি আমার ভয় লাগছিল। নবু মামা উঠে আসতেই বললাম, মরার পর কী হয় মামা?
নবু মামা রেগে গিয়ে বললেন, সন্ধ্যাবেলা কী বাজে কথা বলিস? নবু মামা ভীষণ ভীতু ছিলেন, আমার কথা শুনে তার ভয় ধরে গেল। সে সন্ধ্যায় দুজনে চুপি চুপি ফিরে চলেছি। রইসুদ্দিন চাচার কবরের পাশ দিয়ে আসবার সময় দেখি, সেখানে কে দুটি ধূপকাঠি জ্বালিয়ে রেখে গেছে। দুটি লিকলিকে ধোয়ার শিখা উড়ছে সেখান থেকে। ভয় পেয়ে নবু মামা আমার হাত চেপে ধরলেন।
শৈশবের এই অতি সামান্য ঘটনাটি আমার খুব স্পষ্ট মনে আছে। পরিণত বয়সে এ নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। ছোট একটি ছেলে মৃত্যুর কথা মনে করে একা কষ্ট পাচ্ছে—এ ভাবতেও আমার খারাপ লাগত। সত্যি তো, সামান্য কোনো ব্যাপার নিয়ে ভাববার মতো মানসিক প্রস্তুতিও যার নেই, সে কেন কবরে ধূপের শিখা দেখে আবেগে টলমল করবে? কেন সে একা একা চলে যাবে সোনাখালি? সোনাখালি খালের বাঁধানো পুলের ওপর বসে থাকতে থাকতে একসময় তার কাঁদতে ইচ্ছে হবে?
