সেতু বলল, হঠাৎ রবিন সাহেবের কথা উঠল কেন? উনি গেলে তোমার কোনো সমস্যা আছে। উনি তোমার মতো গর্ত-মানব না যে গর্ত খুঁড়ে গর্তে বসে থাকেন। উনি ঘুরতে পছন্দ করেন। উনার বারো সিটের একটা মাইক্রোবাস আছে। সেটা নিয়ে আমরা যাচ্ছি।ভালো তো।রবিন ভাইকে নিয়ে তোমার কি কোনো কনফিউশন আছে। কনফিউশন থাকলে ঝেড়ে কাশ।
কোনো কনফিউশন নেই।তোমাকে বলতে ভুলে গেছি উনি একটা ছবি প্রডিউস করতে চাচ্ছেন। ফুল লেংথ ছবি। ইন্টিলেকচুয়াল শুকনা গরুর খড় টাইপ ছবি না। কমার্শিয়েল ছবি। নাচ থাকবে, গান থাকবে, মারপিট থাকবে। হিরো থাকবে, ভিলেন থাকবে, কমেডিয়ান থাকবে। রবিন ভাই চাচ্ছেন আমি যেন সেই ছবিতে অভিনয় করি। তোমার কি আপত্তি আছে?
না।দিনের পর দিন আউটডোরে থাকতে হবে, এটা মাথায় রেখে তারপর বল। তোমার অসুবিধা হবে না? উঁহু।হেদায়েত খাওয়া শেষ করে বলল, আমি একটু ভাইজানের কাছে যাব।সেতু বলল, যাও। এমন ভাবে বললে যেন আমার পার্মিশন চাচ্ছ। তোমার সেখানে যেতে ইচ্ছা করলে যাবে। রাতে কী খাবে বল, আমি নিজেই রান্না কব। ইটালিয়ান খাবার করব? খাবে।
হুঁ।তোমার কি ফিরতে দেরী হবে? বুঝতে পারছি না। ভাইজান আমাকে এক পীর সাহেবের কাছে নিয়ে যাবেন। উনি তাবিজ দিবেন।তুমি ম্যাথের টিচার। টুয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরিতে গলায় তাবিজ বেঁধে ঘুরবে? ভাইজান আগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন। তাছাড়া আমি এখন ম্যাথের টিচার না। আমার চাকরি চলে গেছে।সেতু বলল, তোমার চাকরি চলে গেছে মানে?
হেদায়েত বিড় বিড় করে বলল, প্রিন্সিপ্যাল সাহেব নিজেই ডেকে বলেছেন। পুরো মাসের বেতন দিয়ে দিয়েছেন।চাকরি চলে গেল কেন?একটা মেয়ে আমার বিরুদ্ধে কমপ্লেইন করেছে।কী কমপ্লেইন করেছে? আমি না-কি গভীর রাতে ওদের টেলিফোন করি, পর্নোগ্রাফিক কথা বলি।সেতু বলল, মেয়েটা পাগল না অন্যকিছু? আমার তো ইচ্ছা করছে। মেয়েটাকে থাপড়াতে।হেদায়েত বলল, বাদ দাও।
সেতু বলল, বাদ দেব কেন? আমার তো রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে। একটা মেয়ে মিথ্যা করে একটা কথা বলল আর তাতেই তোমার চাকরি চলে গেল। এটা কি মগের মুল্লুক? হেদায়েত বলল, আমি এখন যাই। রাতে কথা হবে।বেলায়েতের পরিচিত পীর সাহেব ভক্তদের নিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে এক বজরা টাইপ নৌকায় বাস করেন। তার যোগাযোগ নাকি পানির পীর খিজির আলায়হেস্ সালামের সঙ্গে। তাকে কোনো প্রশ্ন করলে তিনি নদীর পানি ছুঁয়ে জবাব দেন। পানি থেকে তিনি না-কি ইশারা পান।
বেলায়েত ভাইয়ের সমস্যা বিস্তারিত বলতে গেল। পানি-পীরের এক মুরিদান বেলায়েতকে থামিয়ে দিয়ে উদাস গলায় বলল, পানি-পীর কেবলাকে কিছু বলা লাগে না। তিনি সবই জানেন। খামখো সময় নষ্ট। আপনার ভাইকে পীর সাহেবের সামনে হাঁটু গেড়ে বসতে বলেন।
হেদায়েত পানি-পীরের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। পানি-পীর ডান হাত নদীর পানিতে ভিজিয়ে হেদায়েতের মাথায় রেখে চোখ বন্ধ করলেন। কিছু সময় পার করার পর চোখ মেলে বললেন, বাধা! রাতে কি ঘুম একেবারেই হয় না।হেদায়েতের রাতের ঘুমের কোনো সমস্যা নেই। বিছানায় শোয়া মাত্রই ঘুম। তারপরেও বলল, জ্বি ঘুম হয় না।বদ হজম হয়? কোনো কিছুই হজম হয় না। চুয়া ঠেহর।হেদায়েতের হজমের কোনো সমস্যা নেই। তারপরেও সে ক্ষীণ স্বরে বলল, জ্বি।প্রসাবেরও সমস্যা আছে? প্রসাবের রাস্তায় জ্বালাপোড়া আছে? মাঝে মাঝে রক্ত যায়?
হেদায়েত ক্ষীণ স্বরে বলল, জ্বি। তার কাছে মনে হচ্ছে নোংড়া কম্বল গায়ে বসে থাকা মানুষটা ভয়ংকর প্রকৃতির। তার প্রতিটি কথা মেনে নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।বেলায়েত অসহায়ভাবে ভাইয়ের দিকে তাকাচ্ছে। হেদায়েত এইসব কঠিন সমস্যা তার কাছে গোপন করেছে এই ব্যাপারটাও তাকে দুঃখ দিচ্ছে।পানি-পীর বললেন, চিন্তার কিছু নাই। খিজির বাবার দোয়ায় সব সমস্যার আহসান হবে। আরেকবার আসতে হবে শনিবারে। শনি মঙ্গলবার ছাড়া খিজির বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব নয়।
বেলায়েত পানি-পীরকে কদমবুসি করে পাঁচশ টাকা দিল। পানি-পীর বললেন, আত্মা এতো ছোট কেন বাবা। আত্মা বড় কর। টাকা-পয়সার কোনো প্রয়োজন আমার নাই। বুড়িগঙ্গা নদীর পানি খেয়ে একবার তিনমাস কাটিয়েছি। টাকা দিয়ে আমি কী করব? টাকার দরকার আমার মুরিদানদের বুঝেছ? Understand? দিলে নিম্নে এক হাজার, না দিলে এক কাপ পানি হাতে ঢাইলা দিবা, তাতেও চলবে। Understand?
বেলায়েত আরও একটা পাঁচশ টাকার নোট দিয়ে ভাইকে নিয়ে রওনা হলো। বেলায়েতের মনটা অত্যন্ত খারাপ। ভাইয়ের এত সমস্যা, সে কাউকে কিছু বলছে না।হেদায়েত বলল, ভাইজান আমার চাকরি চলে গেছে।বেলায়েত হতভম্ব গলায় বলল, বলিস কি! চাকরি কেন গেল? হেদায়েত কিছু বলল না। বেলায়েত বলল, বৌকে কিছু জানানোর দরকার নাই। বেকার স্বামী কোনো স্ত্রী দেখতে পারে না। অকারণে ঝগড়াঝাটি করবে। কী দরকার? তুই কলেজ টাইমে বেলায়েত টিম্বারে চলে আসবি। বই-পুস্তক পড়বি। মাসের এক তারিখে বেতনের টাকা আমার কাছ থেকে নিয়ে যাবি।
আচ্ছা।দি নিউ বিরানী হাউস এন্ড রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার তোকে বানায়ে দিতে পারি। টাকা-পয়সার হিসাব রাখবি, পারবি না? পারব।অংকে তোর যেরকম মাথা না পারার কোনো কারণ নেই। তবে ভাইয়ের রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার হওয়া ঠিক না।হেদায়েত চুপ করে আছে। ভাইয়ের দুঃখে বেলায়েতের মন অদ্র। তার কেঁদে ফেলতে ইচ্ছা করছে। চোখে পানি চলে আসছে। ভাইয়ের সামনে চোখের পানি ফেলার প্রশ্নই উঠে না।
বেলায়েত আলোচনা অন্য খাতে নেয়ার চেষ্টা করল। গলা খাকাড়ি দিয়ে বলল, হাওয়াই মিঠাই বানানোর একটা যন্ত্র। কিনেছি। তোকে দিয়ে দেব। মাঝে মধ্যে হাওয়াই মিঠাই বানাবি।হেদায়েত বলল, আচ্ছা।এখন শুধু দুই কালারে বানানো যায়। লাল আর সাদা। তুই চেষ্টা করে দেখ কয়েকটা কালারের করা যায় কি-না। একই ষ্টিকে পাঁচ কালার— সাদা, লাল, সবুজ, হলুদ, নীল।
হেদায়েত বলল, ফুড কালার লাগবে।বেলায়েত বলল, ফুড কালার তুই ঘুরে ঘুরে জোগাড় করবি। তোর হাতে তো এখন কাজ-কর্ম নাই। তুই বেকার মানুষ।তা ঠিক।বেকার বলেছি বলে মনে কষ্ট পাস নাই তো? না।অন্য কোনো হোটেলে খান খাবি? চল দুই ভাই মিলে নতুন একটা রেস্টুরেন্টে খানা খাই। দি নিউ দিল্লী হাউস হোটেলের খানা অসাধারণ বলে শুনেছি। পরীক্ষা হয়ে যাক।
হেদায়েত বলল, সেতু আজ নিজের হাতে রান্না করবে। ইটালিয়ান খাবার। বাসায় না খেলে মন খারাপ করবে।তাহলে বাসায় গিয়ে খা। ভোর এখন প্রধান কাজ স্ত্রীকে তুষ্ট রাখা।হেদায়েত বলল, তুমি হোটেলে খাও, আমি সামনে বসে থাকব।বেলায়েতের চোখে আবার পানি আসার উপক্রম হলো। এই না হলে ভাই? বড় ভাই খাবে, সে সামনে বসে থাকবে। রক্তের বন্ধন ছাড়া এই জিনিস কখনও হবে না।হেদায়েত বাসায় ফিরে দেখে সেতু নেই। চিঠি লেখে চলে গেছে। চিঠিতে লেখা—
হ্যালো পতি! বিরাট ঝামেলা হয়েছে। রবিন ভাই সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পা পিছলে পড়েছেন। হাতের হাড়ি কনুইয়ের কাছে ভেঙেছে। কম্পাউন্ড ফ্রেকচার। এখন আছেন এ্যাপোলো হাসপাতালে। বেচারা খুবই ভয় পেয়েছে। আমি সান্ত্বনা দেবার। জন্যে যাচ্ছি। রাত দশটার মধ্যে চলে আসব। যদি না আসি, তাহলে বুঝবে আটকা পড়ে গেছি। রবিন ভাইয়ের নিকট আত্মীয় ঢাকায় কেউ নেই। বেচারা অল্পতেই অস্থির হয়ে পড়ে।
তুমি রাতে যা হয় কিছু খেয়ে নিও। নাদুর মাকে বলেছি কষানো মুরগী করতে। আলু চিকণ করে কেটে আলু ভাজি করতেও বলেছি। তোমার তো আলুভাজি পছন্দ। ইটালিয়ান খাবার করতে পারলাম না, সরি।
আরেকটা কথা চাকরি নিয়ে কোনো দুঃশ্চিন্তা করবে না। কোনো একটা ব্যবস্থা হবে।
ইতি
তোমার পত্নী
হেদায়েত ঘড়ি দেখল। সাড়ে দশটা বাজে। সেতু রাতে ফিরবে না। সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। বড় বিছানায় হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করে ঘুমানো যাবে। শুয়ে শুয়ে সিগারেট খাওয়া যাবে। ভাইজানের কাছ থেকে হাওয়াই মিঠাইয়ের বাক্সটা নিয়ে এসেছে। হাওয়াই মেঠাই বানানো যেতে পারে। ফুড কালার লাগবে। হেদায়েত ডাকল, নাদুর মা!
নাদুর মা বলল, টেবিলে খানা লাগিয়েছি ভাইজান।হেদায়েত বলল, আজ আর ভাত খাব না। দু’টা হাওয়াই মিঠাই খেয়ে শুয়ে পড়ব।কী খাইবেন? হাওয়াই মিঠাই। ক্যান্ডি ফ্লস। আচ্ছা শোনো, হলুদ বেটে কয়েক ফোঁটা হলুদের রস চিপে দিতে পারবে। চেষ্টা করে দেখতাম হলুদ রঙের হাওয়াই মিঠাই করা যায় কি-না।রাতে সত্যই খাবেন না?
না। তুমি আমাকে কয়েক ফোঁটা হলুদের রস দিয়ে শুয়ে পড়।নাদুর মা, এখনও দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে হতাশা। সে ঠিক করেছে এই বাড়িতে আর কাজ করবে না। চোখের সামনে এত কিছু ঘটতে দেখা ঠিক না।ভাইজান একটা কথা বলি? বল।দেশের বাড়িত জমি নিয়া মামলা-মোকদ্দমা চলতাছে, আমার যাওয়া দরকার।দরকার হলে অবশ্যই যাবে। কাল সকালে চলে যাও।
বেতন যা পাওনা আছে আমাকে বললেই দিয়ে দিব। আমার সঙ্গে টাকা আছে। আজ মাসের এগারো তারিখ কিন্তু পুরো মাসের বেতন পেয়ে গেছি। কাল সকালে যখন যাবে তখন আমার কাছ থেকে কিছু হাওয়াই মিঠাই নিয়ে যেও। বাচ্চাকাচ্ছাদের দেবে। তারা খুশি হবে। টেলিফোন বাজছে। হেদায়েত টেলিফোন ধরার জন্যে উঠে গেল। রিসিভার কানে লাগিয়ে বলল, কে সেতু? ওপাশ থেকে বলল, হুঁ।রবিন সাহেবের অবস্থা কী? ভালো।তুমি কি রাতে ফিরবে?
হুঁ।অনেক রাত হয়ে গেছে। রাতে না ফিরে বরং সকালে ফির। সেটাই ভালো হবে।ওপাশ থেকে বলল, আচ্ছা স্যার! আপনি কি ম্যাডামের গলাও চেনন না? আমি নীতু।ও আচ্ছা, তুমি নীতু।স্যার, আমি সরি বলার জন্যে টেলিফোন করেছি।সরি বলবে কেন? ঐ যে মিথ্যা করে প্রিন্সিপ্যাল স্যারের কাছে আপনার নামে লাগিয়েছি।মিথ্যা করে লাগালে কেন?
নীতু বলল, আপনাকে আমি টেলিফোন নাম্বার দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আপনি টেলিফোন করবেন। আপনি টেলিফোন করেন না। আমি রোজ রাতে অপেক্ষা করে থাকি। শেষে খুব রাগ উঠে গেল। তখন মিথ্যা করে আপনার নামে লাগিয়েছি। স্যার আপনি কি আমাকে ক্ষমা করেছেন? হুঁ।হুঁ না। পরিষ্কার করে বলুন ক্ষমা করেছি।ক্ষমা করেছি।আপনার চাকরি চলে যাবার খবর শুনেছি। আমরা খুব হৈচৈ করছি। ধর্মঘট হচ্ছে।কী জন্যে ধর্মঘট? আপনাকে যেন আবার নেয়া হয়, এই জন্যে ধর্মঘট।ও আচ্ছা।
আর আমি প্রিন্সিপাল স্যারকে কী বলেছি জানেন? আমি উনাকে বলেছি – আমার ভুল হয়েছে। অন্য এক লোক টেলিফোন করত। তার গলা হেদায়েত স্যারের মতো। ভালো করেছি না? বুঝতে পারছি না, ভালো করেছ কি-না। নীতু আমি এখন জরুরি কাজ করছি। টেলিফোনটা রাখি।এত রাতে কী জরুরি কাজ করছেন? হলুদ রঙের হাওয়াই মিঠাই বানানোর চেষ্টা করছি।আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। হলুদ রঙের হাওয়াই মেঠাই কেন বানাবেন?
হাওয়াই মেঠাই বানানোর একটা যন্ত্র আমার বড় ভাই আমাকে কিনে দিয়েছেন। ঐ যন্ত্রটা দিয়ে হাওয়াই মেঠাই বানাচ্ছি।স্যার সত্যি? হুঁ সত্যি। নীতু রাখি? হেদায়েত টেলিফোন রেখে হাওয়াই মেঠাই বানাতে গেল। তার মাথায় নূতন আইডিয়া এসেছে। হাওয়াই মিঠাই তৈরীতে যদি শুকনা মরিচের গুঁড়া দেওয়া হয় তা হলে কি ঝাল হাওয়াই মেঠাই তৈরী হবে? গোল মরিচের গুঁড়া দিলে কী হবে?
রাত সাড়ে তিনটা পর্যন্ত হেদায়েত হাওয়াই মিঠাই বানালো। মোট উনিশটা। প্রাইম নাম্বার। এর মধ্যে বারোটা মিষ্টি। বারো হচ্ছে পারফেক্ট নাম্বার। নয়টা ঝাল-মিষ্টি।রাত সাড়ে তিনটায় হাত-মুখ ধুয়ে বিছানায় ঘুমুতে এসে হেদায়েত অবাক হয়ে দেখল ঝলমলে শাড়ি পরে একটা তরুণী-মেয়ে বিছানায় বসে আছে। তার গায়ের রঙ শ্যামলা। চোখ বিষণ্ণ। মেয়েটাকে খুব চেনা-চেনা লাগছে। মেয়েটা বলল, অনেক রাত হয়েছে। শুয়ে পড়।
হেদায়েত বিড় বিড় করে বলল, আচ্ছা।মেয়েটা বলল, আজ ঠাণ্ডা-ঠাণ্ডা আছে। তারপরও এসি দেয়া যায়। এসি দেব।দাও।মেয়েটা রিমোট টিপে এসি ছাড়ল। হেদায়েতের দিকে তাকিয়ে বলল, শুয়ে পড়। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। বাতি নিভিয়ে দিই? দাও।মেয়েটা হেদায়েতের মাথার চুলে বিনি করে দিচ্ছে। মেয়েটার গায়ে কচি আমপাতার গন্ধ। কিছুক্ষণের মধ্যেই হেদায়েত গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
তার ঘুম ভাঙলেন ম্যাথমেটিসিয়ান রামনুজন। অর্থাৎ হেদায়েতের স্বপ্ন শুরু হলো। হেদায়েত সাহেব সরি আপনার ঘুম ভাঙলাম। রাত সাড়ে তিনটায় ঘুমাতে গেছেন। ঘুম ভাঙানোটা ঠিক হয় নি।হেদায়েত বলল, কোনো সমস্যা নেই স্যার। আমি আপনাকে চিনেছি। আপনি রামানুজন। যদি অনুমতি দেন পা ছুঁয়ে কদমবুসি করি। আমি আপনার একজন ভাবশিষ্য।
প্রাইম নাম্বার নিয়ে তোমার মাতামাতি দেখে সেটা বুঝা যায়।স্যার কি একটা ক্যান্ডি ফ্লস খাবেন? খেতে পারি।মিষ্টিটা খাবেন, না কি ঝাল-মিষ্টি।ঝাল-মিষ্টিটাই দাও। ডায়াবেটিস আছে তো।হেদায়েত অবাক হয়েছে। পরকালে ডায়াবেটিস থাকে এটা জানা ছিল না।রামানুজন বললেন, তোমার সমস্যাটার একটা সমাধান বের করেছি।কোন সমস্যার কথা বলছেন স্যার? ঐ যে একটা মেয়েকে তোমার বিছানায় দেখ। মেয়েটাকে চিনেছ? জি না স্যার।
ওর নাম মাহজাবিন। রোল নাইনটিন। প্রাইম নাম্বার। মেয়েটাকে তুমি অত্যান্ত পছন্দ কর বলে তোমার মস্তিস্ক তাকে দেখাচ্ছে।ও আচ্ছা।আমার ধারণা তুমি পাগল হয়ে যাচ্ছে।হতে পারে। আমার দাদা পাগল ছিলেন।ব্যাপারটা বংশগত কারণে নাও হতে পারে। অনেক বড় ম্যাথমেটিশিয়ানরা একটা পর্যায়ে পাগল হয়ে যায়। ক্যান্ডি ফ্লস আরেকটা দাও।হেদায়েত ক্যান্ডি দিল। রামানুজন বললেন, তুমি আত্মার ইকুয়েশন বের করার চেষ্টা করছ। আমি খুশি। শুরুতেই বেশি জটিলভাবে চিন্তা করবে না।জি আচ্ছা স্যার। আমি অত্যান্ত আনন্দিত যে আপনি এসেছেন।
সেতু আয়নার সামনে বসেছে। চুল আঁচড়াচ্ছে। তার হাতে কাঠের চিরুণি। চিরুণির বড় বড় দাঁত। এই চিরুণিতে চুল আঁচড়ানো যায় না। বড় আয়নার সামনে বসে চিরুণি দিয়ে চুল ঘষতে ভালো লাগে। রবিন হকের গেস্ট হাউস ওয়েসিসের আয়নাগুলি ছোট ছোট। তবে এই বিশেষ ডিলাক্স স্যুটের আয়নাটা প্রকাণ্ড। সেতু লক্ষ করল, আয়নায় রবিনকে দেখা যাচ্ছে। তার হাতে সিগারেট। ঘনঘন সিগারেটে টান দিচ্ছে। সিগারেট হাতে মানুষকে সব সময় চিন্তিত দেখায়।
রবিনকেও চিন্তিত দেখাচ্ছে।রবিন বলল, তুমি আজ থাকবে, না চলে যাবে? সেতু বলল, জানি না।ডিসিশান নিয়ে নিলে আমার জন্যে সুবিধা।কী সুবিধা? তুমি যদি থেকে যাও, তাহলে আমার এক ধরনের পরিকল্পনা হবে। না থাকলে অন্যরকম।যদি না থাকি তাহলে তোমার পরিকল্পনা কী? রবিন বিরক্তি মুখে বলল, সেতু! তুমি অকারণে কথা চালাচালি করছ। স্টপ ইট।সেতু বলল, Ok.
তুমি যদি আজ থেকে যাও তাহলে ওয়ালেদকে আসতে বলি।ওয়ালেটা কে? ফিল্ম ডিরেক্টর। আমি টাকা ঢালব, সে ছবি বানাবে।সেতু বলল, তাকে এখানে আসতে বলার দরকার কী? এই ঘরে তো ছবি বানাবে না।রবিন হাতের সিগারেট ছুড়ে ফেলে নতুন আরেকটা ধরাতে ধরাতে বলল, বোকার মতো কথা বলবে না। ছবির গল্প তোমাকে বুঝতে হবে না? ওয়ালেদ বুঝিয়ে দেবে।সেতু বলল, ছবির গল্পটা কী?
রবিন বলল, কাছে আসো গল্পটা বুঝিয়ে বলি। চা খেতে খেতে বলি। চা দিতে বলব? সেতু বলল, আমি যেখানে আছি সেখান থেকেই গল্প শুনব। কটা বাজে বলো তো?দশটা।সেতু বলল, রাত দশটা না দিন দশটা? রবিন বলল, তার মানে? তুমি জানো না রাত না দিন? সেতু বলল, তোমার এই বিশেষ স্যুটের দরজা-জানালা সব সময় বন্ধ থাকে। রাত-দিন কিভাবে বুঝব? কিছু কিছু জায়গা থাকে স্মোক ফ্রি’। তোমার এই জায়গাটা ডে-নাইট ফ্রি।
রবিন বলল, রাত দশটা। গল্পটা বলি? সেতু বলল, গল্প বলার ব্যাপারে তোমার এত আগ্রহ কেন? ছবির গল্প কি তোমার লেখা? আইডিয়া আমার। এখন কি গল্পটা শুনবে, না বকবক করেই যাবে? শুনব।তাহলে আয়নার দিকে তাকিয়ে না থেকে আমার দিকে ফেরো।সেতু বলল, আয়নায় তোমাকে পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। আয়নার কারণে দু’জন মুখোমুখি না বসেও মুখোমুখি। গল্প শুরু করো।রবিন এসে সেতুর পাশে বসল। হাতের সিগারটে ফেলে দিয়ে গল্প শুরু 09
শহরের একটা মেয়ে অর্থাৎ তুমি। ছবিতে তোমার নাম বৃষ্টি। তুমি প্রথম গ্রাম দেখতে বের হয়েছ। তোমার গায়ে হালকা আকাশী রঙের শাড়ি। মাথায় গাঢ় নীল রঙের স্কার্ফ। তুমি আপন মনে হাঁটছ। হঠাৎ একটা সাপ এসে তোমাকে ছোবল দিল। হাঁটুর কাছে ছোবল।আমি শাড়ি পরে আছি, আমাকে হাঁটুর কাছে ছোবল কীভাবে দেবে? আমি কি শাড়ি হাঁটু পর্যন্ত তুলে হাঁটছি?
ডিরেক্টর শট কীভাবে নেবেন আমি জানি না। পুরো গল্পটা আগে শোন, তারপর সমালোচনায় যাবে।যে সাপ আমাকে কাটল সেটা কী সাপ? কী সাপ মানে? সাপের একটা নাম থাকবে না? কেউটে, দাড়াস, শঙ্খচুড়।বরিন বলল, আমাকে কি গল্পটা শেষ করতে দেবে প্লিজ? Ok. একটা কথাও না। তুমি শুধু শুনে যাবে।আমাকে আধঘণ্টা সময় দাও। আধঘণ্টা পর শুনব।আধঘণ্টা কী করবে?
বাসায় টেলিফোন করব। হেদায়েতের সঙ্গে কথা বলব। আমার কেমন জানি অস্থির লাগছে। তার সঙ্গে কথা বললে অস্থিরতাটা কমবে।রবিন বলল, তুমি বাস করছ আমার সঙ্গে। অস্থিরতা কমাবার জন্যে স্বামীকে টেলিফোন করছ। পুরো ব্যাপারটা কতটা হাস্যকর, বুঝতে পারছ? পারছি।আমি তোমাকে একটা উপদেশ দেই? দাও।
তোমার স্বামী অসম্মানের ভেতর বাস করছে। তাকে ডিভোর্স দিয়ে অসম্মানের হাত থেকে বাঁচানো উচিত। আর আমাদের ছবির জন্যও ব্যাপারটা ভালো।কেন? বিবাহিতা মেয়েকে ছবির নায়িকা হিসেবে পাবলিক একসেপ্ট করে না।ডিভোর্সি মেয়ে একসেপ্ট করে? কুমারী মেয়ে হলে সবচেয়ে ভালো হয়। ডিভোর্সি হলো সেকেন্ড চয়েস।তুমি কিন্তু মন দিয়ে আমার কথা শুনছ না। চুল আঁচড়েই যাচ্ছে।চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে শুনছি। ঠিক আছে যাও চুল আঁচড়ানো বন্ধ করলাম।সেতু উঠে দাঁড়ালো। রবিন বলল, কোথায় যাচ্ছ?
সেতু বলল, হেদায়েতকে টেলিফোন করতে যাচ্ছি।টেলিফোন একটু পরে করো, গল্পটা আগে শুনে নাও।উঁহু। এখনই টেলিফোন করব।রবিন দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে আরেকটা সিগারেট ধরালো।হলো।কে সেতু? হুঁ। কী করছ? কান্ডি ফ্লস বানাচ্ছি।কী বানাচ্ছ? হাওয়াই মেঠাই। ভাইজান একটা যন্ত্র কিনে দিয়েছেন, এটা দিয়ে বানাচ্ছি।হচ্ছে? হ্যাঁ হচ্ছে। নানান রকম ফুড কালার দিয়ে Experiment করছি। সুন্দর সুন্দর রঙ হচ্ছে।বাহ ভালো তো! তুমি কি রাতে ফিরবে?
না। ফিল্মের ডিরেক্টর সাহেব আসবেন। তিনি ফিল্মের গল্প শোনাবেন। আড়াই ঘণ্টার গল্প ব্যাখ্যা করে শোনাবেন তো। গল্প শুনতে শুনতেই রাত কাভার হয়ে যাবে।হবারই কথা।খানিকটা গল্প, মানে গুরুটা আমি শুনেছি, আমাকে সাপে কাটবে।সত্যি কাটবে? আরে না। ফিল্ম পুরাটাই মিথ্যা। দেখা যাবে রাবারের সাপ। তুমি কি ভাত খেয়েছ? না।দেরি করছ কেন? খেয়ে ঘুমিয়ে পড়।আচ্ছা।ঘুমের ওষুধ খেতে ভুলে যেও না।ভুলব না।আচ্ছা শোন, ঐ মেয়েটা কি আরো এসেছিল? কোন মেয়েটা?
তোমার হাত ধরাধরি করে টানাটানি করে যে মেয়েটা।এসেছিল।পরেরবার যখন আসবে, তুমি অবশ্যই তার নাম জিজ্ঞেস করবে।আচ্ছা। টেলিফোন রেখে দেই।এক মিনিট ধরে রাখ। ফিল্ম লাইনের অদ্ভুত একটা ঘটনা শোন। কোনো বিবাহিত মেয়ে যদি ফিলো হিরোইনের পার্ট করে, তাহলে কেউ সেই ছবি দেখে না। ছবি ফ্লপ হয়।তাহলে তো তোমার খুব সমস্যা হবে।সমস্যা তো হবেই।কী করা যায় বলো তো? একটা কিছু ব্যবস্থা হবে, তুমি টেনশন করো না। আর শোন, আমি গাড়ি পাঠাচ্ছি। কয়েকটা হাওয়াই মেঠাই পাঠিয়ে দাও, খেয়ে দেখি।আচ্ছা।
