বাদল দিনের দ্বিতীয় কদম পর্ব:০৭ হুমায়ূন আহমেদ

বাদল দিনের দ্বিতীয় কদম

সেতু টেলিফোন রেখে বাথরুমে ঢুকে চোখ-মুখে পানি দিয়ে বের হলো। রবিনের দিকে তাকিয়ে বলল, গল্প শুরু করো।রবিন বলল, তুমি এবং তোমার হাসব্যান্ডের কনভারসেশন আমি পাশের ঘরের লাইন থেকে শুনেছি। সরি ফর দ্যাট।সরি হবার কিছু নেই। আমরা তো প্রেমালাপ করছিলাম না।রবিন বলল, আমার কাছে প্রেমালাপের মতোই মনে হয়েছে। কী সহজস্বাভাবিক কথাবার্তা! একটু হিংসাও বোধ করলাম।হিংসা কেন?

এত সহজভাবে তুমি কখনো আমার সঙ্গে কথা বলো না।তুমি তো সহজ মানুষ না। তোমার সঙ্গে সহজ কথা কেন বলব? ভালো কথা, গাড়িটা আমার বাসায় পাঠাও। কয়েকটা ক্যান্ডি ফ্লস নিয়ে আসবে।গাড়ি পাঠাতে হবে? অবশ্যই। হেদায়েত শুয়ে পড়েছে। সে সামান্য চিন্তিত। ভুল করে ঘুমের ওষুধ দুটা খেয়ে ফেলেছে। ভাত খাওয়ার পর পর যে একটা খেয়েছিল সেটা মনে ছিল না বলে কিছুক্ষণ আগে আরেকটা খেয়ে ফেলেছে।

এতক্ষণে ঘুমে চোখ-মুখ বন্ধ। হয়ে যাবার কথা। মজার ব্যাপার, ঘুম আসছে না। মাথার ভেতর টেলিফোন বাজার মতো শব্দ হচ্ছে। খুবই হালকা শব্দ। ঘরের ভেতর হালকা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। সেন্টের গন্ধ না, টাটকা কোনো ফুলের গন্ধ। অপরিচিত ফুল। মেয়েটা কি চলে এসছে লা-কি? হেদায়েত চারদিকে তাকালো কাউকে দেখা গেল না। মেয়েটার নাম জিজ্ঞেস করতে হবে।

একবারেই ঘুম আসছে না। হেদায়েতের আরেকটা সিগারেট খেতে ইচ্ছা করছে। বিছানায় শুয়ে সিগারেট খাওয়া যাবে না। এক্সিডেন্ট হয়। এক্সিডেন্টে অনেকে মারাও যায়। বিছানা থেকে নেমে সিগারেট খেতে হবে। হেদায়েত সিগারেটের জন্য বালিশের নিচে হাত বাড়াতেই নরম একটা হাতের উপর তার হাত পড়ল। হেদায়েত চোখ বন্ধ করে ফেলল। ফুলের গন্ধ তীব্র হয়েছে। এখন হেদায়েত ফুলের গন্ধটা চিনতে পারছে। কদম ফুলের গন্ধ। হেদায়েত বিড়বিড় করে বলল তোমার নাম কী?

মিষ্টি গলায় থেমে থেমে একটি মেয়ে উত্তর দিল, আমার কোনো নাম নেই। আপনি আমার একটা নাম দিন।আমি তোমার নাম দিলাম সেতু।সেতু নাম কেন দেবেন? সেতু আপনার স্ত্রীর নাম। ভালো কোনো নাম দিন।আমার মাথায় কোনো নাম আসছে না। তুমি নিজেই তোমার একটা নাম দাও। আচ্ছা। আমি দিলাম।কী নাম দিয়েছ? মাহজাবিন?

আমাকে জড়িয়ে ধরুন তারপর বলছি।হেদায়েত মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে গাঢ় ঘুমে তলিয়ে গেল। ফুলের গন্ধ তীব্র থেকে তীব্রতর হলো।সেতুর ঘুম আসছে না। সে নিজেও একটা ঘুমের ওষুধ খেয়েছে। তাতে লাভ হচ্ছে না। মনে হয় দুটা খাওয়ার দরকার ছিল। খাবার জিনিস কম করে হলেও দু’বার নিতে হয়। তা না হলে খালে পড়ে। সেতু এপাশ-ওপাশ করছে। তারপাশে হেদায়েত থাকলে বলতে পারত— এই আমাকে এক গ্লাস পানি আরেকটা ওষুধ এনে দাও। রবিন ভাইকে সেটা বলা যায় না।

রবিন বলল, ঘুমাচ্ছ?না।কোনো কিছু নিয়ে টেনশন? না।গরম এক কাপ কফি খাবে? ঘুম আসছে না, এর মধ্যে কফি খাব কেন? মাঝে মাঝে ক্যাফিন ঘুম আনতে সাহায্য করে। বিষে বিষক্ষয় টাইপ ব্যাপার। এসো কফি খেতে খেতে কিছুক্ষণ গল্প করি। আমার নিজের ঘুম আসছে না। শুয়ে শুয়ে হেদায়েত সাহেব নামের অদ্ভুত মানুষটার কথা ভাবছিলাম।

সেতু উঠে বসতে বসতে বলল, সবাই অদ্ভুত। তুমি নিজেও অদ্ভুত। আমি অদ্ভুতেরও বেশি। আমি কিস্তুত।হেদায়েত সাহেবের সঙ্গে তোমার বিয়েটা কিভাবে হলো। এরেনজড মারেজ তো বটেই। এরেনজটা কে করল? সেতু হাই তুলতে তুলতে বলল, আমি করেছি।তার মানে? আমি অংকে খুব কাঁচা ছিলাম। এসএসসি পরীক্ষার আগে আগে আমার বড় মামা অংকের জন্যে একজন প্রাইভেট টিচার ঠিক করলেন।হেদায়েত সাহেব সেই টিচার?

হুঁ।খুব ভালো টিচার? হুঁ। অংকে আমি নব্বই পেয়েছিলাম।একজন লোক ভালো অংক শেখায় বলে তুমি তার প্রেমে পড়ে গেলে? তার কথাবার্তা আচার-আচরণে আমার মনে হয়েছিল সে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষ।এখন মনে হয় না?এখনও মনে হয়।সেতু বিছানা থেকে নামল। ওয়ার ড্রবের দিকে তাকাল।

রবিন বলল, কোথায় যাচ্ছ? সেতু বলল, আমার এখন ঘুম পাচ্ছে। আমি বাসায় গিয়ে ঘুমাব।রবিন বলল, তার মানে? সেতু বলল, চোখ বন্ধ কর। আমি কাপড় চেঞ্জ করব।রবিন বলল, রাত কটা বাজে জানো? জানি। দুটা দশ। ঢাকা শহরে এমন কোনো রাত নয়। রাস্তায় ট্রাফিক আছে।তুমি আশা করছ রাত দু’টা দশ মিনিটে আমি তোমাকে তোমার বাসায় নামিয়ে দেব?

সেতু বলল, তুমি নামিয়ে না দিলেও তোমার ড্রাইভার নামিয়ে দেবে। সে একতলায় ড্রাইভারের ঘরে ঘুমুচ্ছে।রবিন সিগারেট ধরতে ধারাতে বলল, তুমি যদি এখন চলে যাও আর কোনোদিন কিন্তু আমার এখানে আসতে পারবে না।আসতে না পারলে আসব না।রবিন বলল, আমি পাগলামী প্রশ্রয় দেই না।সেতু বলল, পাগলামী প্রশ্রয় না দেয়াই ভালো। পাগলদের কাজকর্মের কোনো ঠিক নেই হঠাৎ দেখা গেল ঘুমের মধ্যেও তোমার মুখে আমি বালিশ চাপা দিলাম।তুমি সত্যি সত্যি চলে যাবে? হুঁ।একটা ভালো সাজেশন দেই?

দাও।যে-কোনো কারণেই হোক তোমার মন অস্থির হয়েছে। তুমি তোমার স্বামীর সঙ্গে টেলিফোনে কিছুক্ষণ কথা বলো। তারপরেও যদি বাসায় যেতে চাও আমি নিজে তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসব। It is a deal. কিছুক্ষণ চিন্তা করে সেতু বলল, ঠিক আছে।তুমি নিরিবিলি কথা বললো, আমি পাশের ঘরে যাচ্ছি।

তোমাকে পাশের ঘরে যেতে হবে না। আমি এমন কোনো কথা বলব না। যে তুমি শুনতে পারবে না। আমি রাধা না, আমার স্বামীও কৃষ্ণ না।পাশের ঘরে যাচ্ছি কফি বানাতে। আমার কফি খেতে ইচ্ছা করছে। মনে হয় আমার জ্বর আসবে। জ্বর আসার আগে আগে আমার খুব কফির তৃষ্ণা হয়। ব্যাপারটা অদ্ভুত।অনেকক্ষণ রিং বাজার পর হেদায়েত টেলিফোন ধরে ক্লান্ত গলায় বলল, কে সেতু?হুঁ। ঘুমিয়ে পড়েছিলে?

হুঁ।তোমার পাঠানো হাওয়াই মেঠাই খেয়েছি। খুব ভালো হয়েছে। এটা বলার জন্যে টেলিফোন করেছি।ক্যান্ডিফ্লস তো আমি পাঠাই নি। তুমি গাড়ি করে নিয়ে গেছ।একই কথা।না একই কথা না। দুটা দুরকম কথা।আচ্ছা ঠিক আছে দু’টা দু’রকম কথা। তোমার হাওয়াই মেঠাই খেতে। ভালো হয়েছে এটাই মূল বিষয়।থ্যাংক য়্যু! ঘুম কি ভালো হচ্ছে? হুঁ।যেভাবে হুঁ বললে তাতে মনে হচ্ছে ঘুম ভালো হচ্ছে না। দুঃস্বপ্ন দেখছ? ঠিক দুঃস্বপ্ন না, মেয়েটাকে দেখছি।কোন মেয়েটা? যে হাত ধরাধরি করে টানাটানি করে?

হুঁ। তোমাকে বলতে ভুলে গেছি। প্রায়ই একটা মেয়েকে দেখি যে। বিছানায় আমার সঙ্গে ঘুমিয়ে থাকে।কী সর্বনাশ! সর্বনাশের কিছু না। সে ভালো মেয়ে। কিছুই করে না।কথাও বলে না।একটা দুটা কথা বলে।মেয়েটা দেখতে কেমন? সুন্দর।সুন্দর তো বুঝলাম। দেখতে কার মতো? আমার ক্লাসের একজন ছাত্রীর চেহারার সঙ্গে কিছু মিল আছে। রোল নাইনটিন।মেয়েটা কি এখনও আছে? এখন নেই। তুমি টেলিফোন করলে, টেলিফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে দেখি সে নেই।তোমাকে তার নাম জিজ্ঞেস করতে বলেছিলাম। নাম জিজ্ঞেস করেছিলে?না।ঠিক আছে ঘুমাও।আচ্ছা।

সেতু টেলিফোন নামিয়ে রাখতেই রবিন দু’মগ কফি হাতে ঘরে ঢুকল। সে সেতুর দিকে কফির মগ এগিয়ে দিল। সেতু মগ নিয়ে কফিতে চুমুক দিল।রবিন বলল, বাসায় যাবার পরিকল্পনা কি এখনও আছে, না বাদ দিয়েছ? বাদ দিয়েছি।ভেরি গুড।রবিন সিগারেট ধরিয়েছে। আরাম করে ধোয়া ছাড়ছে। সেতু বলল, আমাকে একটা সিগারেট দাও। রবিন আগ্রহের সঙ্গে সিগারেট এগিয়ে দিল। রবিন বলল, মেয়েরা সিগারেট খাচ্ছে এই দৃশ্যটা দেখতে আমার কেন জানি খুব ভালো লাগে।

সেতু বলল, এইজন্যেই তো খাচ্ছি। আমার মাথা ঘুরছে। বমি বমি লাগছে, তারপরেও টানছি।রবিন বলল, সত্যি করে বলো তো সেতু, আমাকে কি তুমি ভালোবাস? হুঁ।হেদায়েত সাহেবের চেয়ে বেশি না কম? সমান সমান।অংক ঠিকমতো শিখতে পারলে আমার পাল্লা সামান্য ভারী হতো! ঠেক খেয়ে গেছি অংকে। আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি জানতে চাও? না।

জানতে না চাইলেও শোন। আমার প্রায়ই ইচ্ছা করে প্রফেশনাল কোনো কিলারকে দিয়ে হেদায়েত সাহেবকে খুন করে ঝামেলা শেষ করে দেই। ভিলেন মঞ্চ থেকে প্রস্থান করবে, আমরা রূপকথার এল্ডিং এর মতো সুখে ঘর সংসার করতে থাকব।তুমি কি সত্যি আমাকে বিয়ে করবে? Yes, Yes এবং Yes, আমার কথা কি বিশ্বাস হচ্ছে? বুঝতে পারছি না।রবিন বলল, মানুষ মিথ্যা কথাগুলি সহজেই বিশ্বাস করে। সত্যিটা বিশ্বাস করতে চায় না। বল তো কার কথা?

জানি না কার কথা। যারই হোক কথা সত্যি না। তবে তুমি বিয়ে করতে চাইলে আমি তোমাকে বিয়ে করব। হেদায়েতকে সব জানিয়েই বিয়ে করব। সে পুরো বিষয়টা সহজভাবে নেবে। যে-কোনো জটিল বিষয় সহজ ভাবে গ্রহন করার ক্ষমতা তার আছে।রবিন বলল, এমন কি হতে পারে যে জীবনের জটিলতা বুঝার ক্ষমতাই মানুষটার নেই?

হতে পারে। মানুষটা মানসিকভাবে অসুস্থ। তুমি তাকে সুস্থ করার ব্যবস্থা কর, তারপর তোমার সব কথা আমি শুনব। সিনেমা করতে বললে সিনেমা করব। সিগারেট খেতে বললে সিগারেট খাব। তোমার সামনে নেংটো হয়ে নাচানাচি করতে বললে নেংটো হয়ে নাচানাচি করব। Free pass, শুধু একটাই শর্ত।রবিন বলল, আরেকটা সিগারেট ধরাও। তুমি অদ্ভুত করে ধোয়া ছাড়, দেখতে ভালো লাগে।সেতু দ্বিতীয় সিগারেট ধরাল। ঠোঁট গোল করে ধোয়া ছাড়তে লাগল।

রবিন বললেন, তোমার স্বামীকে তোমাদের বাসার কেউ পছন্দ করেন না। তাদের কথাবার্তায় এ রকম মনে হলো।সেতু বলল, কেউ তার সঙ্গে কথা বলে না। কথা বললে পছন্দ করত। তার বড়ভাই একজন আছেন। তিনিও ভালো মানুষ। তাঁর নাম বেলায়েত। সরি তার নাম মুখে নিলাম। ভাসুরের নাম মুখে নেয়া ঠিক না। এতে তাকে অপমান করা হয়।তুমি এসব মান? আমি খুবই খারাপ মেয়ে কিন্তু মানি।বেলায়েত সাহেব কি তোমার হাসবেন্ডের মতো একসেনট্রিক?

জানি না।তোমার মা ঐদিন খরগোশ খরগোশ বলছিলেন। বেলায়েত সাহেবকে কি খরগোশ ডাকা হয়।আমাদের বাসায় ডাকা হয়।কেন? জানি না কেন। প্লিজ এই প্রসঙ্গ অফ।ঠিক আছে অফ।আমি উনাকে অত্যন্ত পছন্দ করি।বেলায়েত জেগে আছে। রেস্টুরেন্টের হিসাব দেখছে। তাঁর সামনে পরিমল বাবু বসে আছেন। পরিমল বাবুর সামনে কাগজ কলম। হিসাব মেলানো হচ্ছে।হঠাৎ পরিমল বাবু উঠে দাঁড়ালেন। বেলায়েত বলল, কী ব্যাপার?

পরিমল বাবু বললেন, আরো কিছুক্ষণ থাকলে আপনাকে অসম্মান করা হবে। এই জন্যে উঠে পড়লাম।অসম্মান হবে কেন? ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। আপনার সামনে ঘুমানোর অর্থ আপনাকে অসম্মান করা।যান ঘুমান।পরিমল বাবু বেলায়েতের বাড়ির একতলায় একটা ঘরে থাকেন। নিজে বেঁধে খান। একা মানুষ। তার কোনো অসুবিধা হয় না। এই বাড়িতে তিনি সুখেই আছেন।হেনা দরজা ধরে দাঁড়িয়েছে। বেলায়েত বলল, কিছু বলবে?

হেনা বলল, ঘুমাবে না? হিসাব শেষ করে তারপর ঘুমাব।বুড়াটাকে হিসাব করতে দাও। অনেক রাত হয়েছে।বেলায়েত বলল, হোক রাত। হিসাব শেষ না করে উঠব না। আরেকটা কথা, পরিমল বাবুকে বুড়া বুড়া বলবে না। বৃদ্ধ হওয়া কোনো অপরাধ না। তুমি ঘুমাতে যাও।হেনা গেল না। দরজা ধরেই দাঁড়িয়ে থাকল। বেলায়েত বলল, আর কিছু বলার বাকি আছে?সেতুর বিষয়ে একটা কথা ছিল। অনেক আজেবাজে কথা তার বিষয়ে শুনা যাচ্ছে। মুখে বলা যায় না এমন সব কথা।

বেলায়েত বলল, মানুষের মধ্যে ভালো আছে মন্দ আছে। হেদায়েতের স্ত্রীর বিষয়ে ভালো কিছু যদি শুনে থাক সেটা বল আমি শুনব। মন্দটা শুনব না। ভালো কিছু শুনেছ? না।তাহলে ঘুমাতে যাও। আমার দেরি হবে। এমনও হতে পারে আজ রাতে ঘুমাবই না।বেলায়েত হিসাবে মন দিল। তার কাছে মনে হচ্ছে হেদায়েত আশেপাশে থাকলে ভালো হতো, ফটাফট যোগ-বিয়োগ করে ফেলত।

প্রিন্সিপাল হাজি এনায়েত করিমের সামনে হেদায়েত বসে আছে। প্রিন্সিপাল সাহেব হেদায়েতকে খবর দিয়ে এনেছেন। তার ঘরের দরজা খোলা। কলেজের কিছু মেয়েকে খোলা দরজা দিয়ে উঁকিঝুকি দিতে দেখা যাচ্ছে। প্রিন্সিপাল সাহেবের সামনে প্লেটভর্তি গরম সিঙ্গাড়া। আরেক প্লেটে পেঁয়াজ-কাচামরিচ।এনায়েত করিম সিঙ্গাড়ার প্লেট এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, সিঙ্গাড়া খান।হেদায়েত বলল, আমি সিঙ্গাড়া খাই না স্যার। সেতু পছন্দ করে খায়। আমি খাই না।সেতু কে?

আমার স্ত্রী। ভালো নাম রুমানা। ডাক নাম সেতু।ও আচ্ছা। আচ্ছা। কে যেন বলছিল আপনার স্ত্রী সিনেমা করেন। সত্যি -কি?প্রথম ছবি করছে। কাজ এখনও শুরু হয় নি। ছবির নামটা খুব সুন্দর বাদল দিনের দ্বিতীয় কদম ফুল।দ্বিতীয় কদম ফুল মানে? মানে আমি ঠিক জানি না। Script রাইটার জানেন। তার সঙ্গে দেখা হলে মানে জিজ্ঞেস করব।আপনাকে ডেকেছি কি জন্যে বুঝতে পারছেন? না।

আপনার বিষয়ে আমরা ডিসিসন চেঞ্জ করেছি। আপনি আবার জয়েন করুন। ম্যাথের নতুন যে টিচার নেয়া হয়েছে ছাত্রীরা কেউ তাকে পছন্দ করছে না। উনি ঠিক মতো না-কি বোঝাতে পারেন না।ও আচ্ছা।আপনি আগামীকাল থেকে ক্লাস শুরু করে দিন। একটাই শুধু শর্ত পড়াশোনার বাইরে কোনো আলাপ না। ক্লাসরুম বাড়ির বৈঠকখানা না। এটা মনে থাকলেই চলবে।হেদায়েত বলল, আমার পক্ষে পড়ানো এখন সম্ভব না।সম্ভব না কেন?

হেদায়েত বলল, আমার মাথা খারাপ হওয়া শুরু হয়েছে। যতই দিন যাচ্ছে ততই বেশি খারাপ হচ্ছে। এই অবস্থায় আমার পক্ষে ক্লাস নেয়া ঠিক না। কী বলতে কী বলব।আপনার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে এটা কে বলেছে? ডাক্তার? ডাক্তার সেইভাবে কিছু বলছে না। আমি নিজে নিজেই বের করছি।আপনার যে মাথা খারাপ হচ্ছে তার প্রধান লক্ষণ কী? হেদায়েত বলল, আপনার সঙ্গে আর কথা বলতে ভালো লাগছে না। স্যার আমি উঠি? চাকরি তাহলে করছেন না?

না।বসুন আরও কিছুক্ষণ। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করুন। ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করুন।দুপুরে ভাইজানের সঙ্গে খাব। উনি অপেক্ষা করে থাকবেন। আজ বৃহস্পতিবার। বৃহস্পতিবার দুপুরে সব সময় ভাইজানের সঙ্গে খাই। তিনি নানান জায়গা থেকে ভালো ভালো খাবার যোগাড় করেন। আজ আমরা খাব হরিয়াল পাখির ভুনা মাংস।

হেদায়েত উঠে দাঁড়াল। এনায়েত করিম বললেন, ডিসিসান চেঞ্জ করলে আমাকে জানাবেন। আপনাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার আগের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। সরি ফর দ্যাট।হেদায়েত বলল, স্যার আপনার টেলিফোন থেকে একটা টেলিফোন করে দেখি পাই কি-না।কী পান কি-না? দ্বিতীয়।এনায়েত করিম অবাক হয়ে বললেন, দ্বিতীয়টা কী? ঐ যে ছবির নামের অর্থ। দ্বিতীয় কদম ফুল।ও আচ্ছা আচ্ছা। বাদ দিন। দরকার নাই।

হেদায়েত বলল, দরকার থাকবে না কেন? আপনার মনে একটা কৌতূহল জেগেছে। কৌতূহল মেটানো দরকার।সব কৌতূহল মেটানো ঠিক না। আপনি চলে যাচ্ছেন যান। যদি ডিসিসান চেঞ্জ করেন আমাকে জানাবেন।জি আচ্ছা স্যার।এনায়েত করিম তাকিয়ে আছেন। এখন তাঁর মন কিছুটা খারাপ। অংক জানা মানুষটার মাথা মনে হয় সত্যি সত্যি খারাপ হয়েছে।

বেলায়েতের মেজাজ ভালো না। আজ সকাল থেকে যার সঙ্গেই দেখা হচ্ছে তার সঙ্গেই সে ঝগড়া করছে। তার এসিসটেন্ট পরিমল বাবুর চাকুরি চলে গেছে। তার চাকরি যাবার কারণ তিন বস্তা সিমেন্টের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না।পরিমল বাবু বললেন, স্যার আপনার কি ধারণা এই তিন বস্তা সিমেন্ট আমি চুরি করেছি? বেলায়েত বললেন, Yes you, স্যার আপনার এই কথার পর আমার উচিত বাসার সামনে আম গাছে ফাঁসি নেয়া।বেলায়েত বলল, তাই নিন। Hang Mango free.

প্রচণ্ড রেগে গেলে বেলায়েত ইংরেজি বলে। ইংরেজি হচ্ছে কি না হচ্ছে তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। হেদায়েত ভাইয়ের সামনে বসে আছে। টিফিন কেরিয়ারে খাবার চলে এসেছে। পরিমল বাবুর সঙ্গে হৈচৈ হচ্ছে বলে খাবার দেয়া হচ্ছে না।বেলায়েত বলল, আপনি এখন যান। আমরা দুই ভাই খাব। খাবার সময় পারিবারিক কথাবার্তা হবে, এর মধ্যে আপনি থাকবেন না। Go street রাস্তায় যান।পরিমল বাবু চলে গেলেন। হেদায়েত বলল, এত রাগারাগি করা ঠিক না।

বেলায়েত বলল, ঠিক না আমি জানি। সকালে পত্রিকায় ছবি দেখে রাগ উঠে গেল। ঝুম রাগ।কী ছবি দেখে রাগ উঠল? তোর বৌয়ের ছবি। বিনোদন পাতায় বিরাট ছবি। সে না-কি সিনেমা করবে। আমি তো কিছুই জানি না।হঠাৎ ঠিক হয়েছে। ছবির নাম ‘বাদল দিনের দ্বিতীয় কদম ফুল’।তুই নিষেধ করলি না? হেদায়েত অবাক হয়ে বলল, নিষেধ কেন করব? শখ করে একটা কাজ করছে। তুমি যখন শখ করে কোনো কাজ করো, আমি নিষেধ করি?

বেলায়েত বলল, তোর কথায় যুক্তি আছে। কঠিন যুক্তি। ফেলে দেবার মতো না। তবে পত্রিকায় ছবি দেয়া ভুল হয়েছে।হেদায়েত বলল, ভুল কেন হবে? ছবি না দিলে লোকে জানবে কীভাবে? লোকে জানবে তারপর হলে গিয়ে ছবি দেখবে।তোর এই কথারও যুক্তি আছে। তবে যে ছবিটা ছাপা হয়েছে সেটা ভালো না।হেদায়েত বলল, ছবির আবার ভালো মন্দ কী?

বেলায়েত বিব্রত গলায় বলল, নাভি দেখা যায়। নাভিতে আবার দুল পরেছে। দুল পরবে কানে। নাভিতে দুল পরবে কেন? আল্লাহপাক তো নাভি দুল পরার জন্যে তৈরি করেন নাই। এখন বল আমার এই কথাটার যুক্তি আছে কি-না!হেদায়েত বলল, যুক্তি নাই। নিজেকে সুন্দর দেখানোর জন্যে মেয়েরা নানা কর্মকাণ্ড করে। এক সময় তারা দাঁতে কালো রঙ দিত। একে বলে মিশি।

চীনা মেয়েরা লোহার জুতা পরে পা ছোট করতো। আফ্রিকান মেয়েরা জিহ্বা ফুটো করে বড় বড় রিং পরতো।বেলায়েত বিস্মিত হয়ে বলল, জিহ্বায় রিং পরে ভাত খেত কীভাবে? হেদায়েত বলল, জানি না।তুই একটা বিষয় জানবি না এটা কেমন কথা! জানার দরকার না? হেদায়েত বলল, আচ্ছা জানব। জেনে তোমাকে জানাব। থালা-বাটি এইসব দিতে বলে ভাইজান। ক্ষিধে লেগেছে।

বেলায়েত বলল, ক্ষিদে লেগেছে এটা আগে বলবি না? এতক্ষণ খামাকা বকবক করছি। একটা দুঃসংবাদ আছে, হরিয়াল পাওয়া যায় নি। ঘুঘু পাওয়া গেছে। তবে ঘুঘুর টেস্টও ভালো। সফট মাংস।খাওয়া-দাওয়া শেষ করেই বেলায়েত চুল কাটতে বসল। সকাল থেকেই নাপিত এনে বসিয়ে রাখা হয়েছে। ভাত খাওয়ার আগে চুল কাটলে খাবারে চুলের টুকরা চলে যেতে পারে। চুল পাকস্থলিতে গেলে বিরাট সমস্যা। যে কারণে বেলায়েত সব সময় খাবারের পরে চুল কাটে।

হেদায়েত ভাইয়ের সামনে বসে আছে। চুল কাটা দেখছে। বেলায়েত নাপিতকে বলল, মাথাটা পুরো কামায়ে দাও। ইদানীং অল্পতেই মাথা গরম হচ্ছে। মাথা কামানো থাকলে গরম কমবে। বৎসরে একবার এমনিতেই মাথা কামানো দরকার। খুশকি, উকুন এইসব তখন আর জীবনেও হবে না।নাপিত মাথা কামিয়ে দিল। হেদায়েত বলল, ভাইজান তোমাকে সুন্দর দেখাচ্ছে। আমিও মাথা কামাব।

বেলায়েতের চোখে পানি আসার উপক্রম হলো। এই না হলে ভাই? বড় ভাইকে মাথা কামাতে দেখেছে বলে সেও মাথা কামাবে। তার ধারণা, কোনো কারণে যদি সে ঝাঁপ দিয়ে ছাদ থেকে রাস্তায় পড়ে হেদায়েতও তাই করবে। ভাইয়ের প্রতি এত শ্রদ্ধা ভক্তি যদিও ঠিক না। বেলায়েত বলল, মাথা কামালে কামা। বাসায় গিয়ে হেভি গোসল দিবি। চুলের কাটা টুকরা গিলা আর বিষ গিলা একই। মাথা কামানোর সিদ্ধান্তটা ভালো নিয়েছিস। মাথা কামাবার।

পরপরই মেজাজ অনেকখানি নেমে গেছে। পরিমল বাবুকে আবার চাকরিতে বহাল করব বলে ঠিক করেছি।ভালো করেছ।বেলায়েত বলল, মাথা কামানোর পর চল দুই ভাই স্টুডিওতে গিয়ে একটা ছবি তুলে আসি। স্মৃতি থাকুক।হেদায়েত বলল, আচ্ছা।সেতু হেদায়েতকে ডিভোর্সের কাগজ পাঠাবে। রবিন একজন লইয়ার নিয়ে এসেছে। কী কারণে ডিভোর্স চাওয়া হচ্ছে তা গুছিয়ে লিখতে হবে। লইয়ার একটা মুশিবিদা তৈরি করে এসেছে। সেখানে লেখা–

“আমার মক্কেল শারীরিক এবং মানসিকভাবে নির্যাতিত। প্রায় দিনই তাকে মদ্যপ স্বামীর কাছে প্রহৃত হতে হয়েছে। এতে সে এখন মানসিক ভারসাম্যহীনতার দ্বার প্রান্তে উপস্থিত। আমার মক্কেলের সন্তানের শখ কিন্তু কিছুতেই তার স্বামী তাকে সন্তান ধারণ করতে দিবে না। এমতাবস্থায় দু’জনের ছাড়াছাড়ি ছাড়া আর করণীয় কিছুই নাই।”

সেতু বলল, এইসব কী হাবিজাবি লিখে নিয়ে এসেছেন? আমার স্বামী জীবনে কখনও আমাকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করে নি। সে কোনোদিন এক ফোঁটা মদ খায় নি অথচ আপনি লিখেছেন মদ্যপ। সে সব সময় বাচ্চা চেয়েছে। আমি চাই নি। একবার কনসিভ করে ফেললাম, তাকে জানিয়ে বাচ্চা Abort করলাম। পরে অবশ্যি তাকে জানিয়েছি। সে কিছুই বলে নি। এমন একজন মানুষ সম্পর্কে কুৎসিত কথা আমি লিখব?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *