রবিন বলল, এগুলি সবই গৎ বাধা কথা। লিখতে হয় বলে লেখা। নিয়ম রক্ষা। কেউ এইসব বিশ্বাস করে না।সেতু বলল, কেউ বিশ্বাস না করুক, ও বিশ্বাস করবে। মন খারাপ করবে। আমার মতে যেটা সত্যি সেটাই লেখা উচিত।রবিন বলল, সত্যটা কী?
সেতু কঠিন গলায় বলল, সত্যিটা হচ্ছে— আমি একজন দুষ্ট স্ত্রী। বেশ্যা টাইপ। আমার মতো স্ত্রীর উচিত না ওর মতো একজন ভালো মানুষের সঙ্গে থাকা।রবিন বলল, এইসব কী বলছ? তোমার কী মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে! সেতু বলল, উকিলের মুসিবিদ পড়ে মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এই জাতীয় মিথ্যা আমি তাকে কখনও পাঠাবো না। নেভার। নেভার।
রবিন বলল, চিৎকার করছ কেন? মুসিবিদ অন্যভাবে লেখা হবে। যেমন তোমাদের বনিবনা হচ্ছে না বলে তুমি ডিভোর্স চাচ্ছ।সেতু বলল, আমাদের বনিবনা হচ্ছে না, এটাও তো ঠিক না। সে আমাকে খুবই পছন্দ করে, আমিও তাকে করি।লইয়ার বলল, স্যার! আমি বরং অন্য আরেকদিন আসি?
রবিন বলল, অন্য আরেকদিন না। আজই আসুন। সন্ধ্যার পর আসুন। সমস্যা হবে না।সেতু কঠিন গলায় বলল, তোমার কী ধারণা সন্ধ্যার পর আমি দুই পেগ হুইস্কি খাব, তারপর তুমি যা বলবে আমি তাই করব? রবিন বলল, না করলে না করবে। এখন চুপ করো। অকারণে চিৎকার করে তুমি আমার মাথা ধরিয়ে দিচ্ছ। চিৎকার করার মতো কিছু হয় নি। Cool down please. কফি খাবে? কফি দিতে বলি?
হেদায়েত বসার ঘরে বসে আছে। তার হাতে টিভির রিমোট। History চ্যানেল বলে একটা চ্যানেলে মিশর নিয়ে কী যেন দেখাচ্ছে। একজন ফারাওদের পোশাক পরে কী যেন বলছে। কোনো কথাই পরিষ্কার না। মনে হচ্ছে লোকটা তোতলাচ্ছে। কোনো ফারাও কি ভোলা ছিল? নাদুর মা সামনে এসে দাঁড়াল। হেদায়েত বলল, কিছু বলবে নাদুর মা?
নাদুর মা বলল, জি ভাইজান বলব। আমি এইখানে আর কাজ করব না।হেদায়েত বলল, আগেও তো একবার বলেছ চলে যাবে। যাও নি।এইবার যাব। নাদুর মা বলল, দুই মাসের বেতন পাওনা আছে। ম্যাডাম জানেন। টাকাটা পাইলে চইলা যাব।কখন যাবে?
আজই যাওয়ার ইচ্ছা। সইন্ধায় বাস ছাড়ে।তোমার কত পাওনা হয়েছে? আটশ টাকা হিসাবে দুই মাসে ষোলশ।হেদায়েত পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল। মানিব্যাগে তিন হাজার টাকা আছে। সে পুরো টাকাটাই নাদুর মার হাতে দিল।নাদুর মা শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বলল, আপনার খাওয়াখাদ্যের কী ব্যবস্থা হইব ভাইজান? হেদায়েত বলল, একটা-কিছু ব্যবস্থা হবে। তুমি চিন্তা করবে না।ম্যাডামের সাথে দুইটা কথা বলতে ইচ্ছা ছিল ভাইজান। টেলিফোনে ধইরা দিবেন?
হেদায়েত অনেক চেষ্টা করল সেতুকে ধরা গেল না। রেকর্ডিং ভয়েস শোনা যায়- “ম্যাডাম দিলরুবা এখন ছবির কাজে ব্যস্ত। পরে যোগাযোগ করুন।” ম্যাডাম দিলরুবাটা কে হেদায়েত বুঝতে পারছে না। সেতু কি তার নাম বদলে দিলরুবা রেখেছে? সেতু নামটাই তো সুন্দর—বন্ধন।রাত ন’টা। হেদায়েত ৰাসার কাছেই একটা হোটেল থেকে তেহারি খেয়ে এসেছে। চল্লিশ টাকা প্লেট। খাবারটা যথেষ্টই ভালো।
রেস্টুরেন্টের মালিকের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তাদের হাউস সার্ভিস আছে। টিফিন ক্যারিয়ারে করে বাসায় খাবার পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা। হেদায়েত তার বাসার নাম-ঠিকানা দিয়ে এসেছে। রেস্টুরেন্টের মালিক বলেছে— খাবার যদি খারাপ পান, পচা-বাসি পান বা ঠাণ্ডা পান বাটা কোম্পানির জুতা দিয়া আমার গালে মারবেন। আমি যদি কিছু বলি তাইলে আমি মানুষের বাচ্চা না, আমি শকুনের বাচ্চা। আমার দোকানের নাম দি গ্রেট বিরানী হাউস বদলায়া রাখব ‘শকুন হাউস’।
রাতে আরাম করে সিগারেট ফুকতে ফুকতে হেদায়েত ঘুমুতে গেল। আজ সে দু’টা সিগারেট শুয়ে শুয়ে খাবে। পুরো বাড়ি খালি তার আলাদা আনন্দ আছে। ক্রিং ক্রিং শব্দে ল্যান্ডফোন বাজছে। টেলিফোন ধরবে না ধরবে না। করেও হেদায়েত টেলিফোন ধরল।স্যার বলছেন?কে? স্যার আমি নীতু।ও আচ্ছা নীতু। কী করছেন স্যার? সিগারেট খাচ্ছি।
কেন সিগারেট খাচ্ছেন? হার্টের অসুখ হবে। আচ্ছা স্যার আজ আপনি কলেজে এসেছিলেন না? হুঁ।অনেকেই আপনাকে দেখেছে। শুধু আমি দেখতে পাই নি। আমি কলেজে এসেছি আপনি যাবার পর। যখন শুনলাম আপনি এসে চলে গেছেন, তখন খুব। মন খারাপ হয়েছে। স্যার, কবে থেকে ক্লাস নেয়া শুরু করবেন?
আমি কোনো ক্লাস নে মা নীতু।কেন? আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি তো এই জন্যে ক্লাস নেব না।আপনি পাগল হয়ে যাচ্ছেন? হুঁ। ধীরে ধীরে পাগল হচ্ছি। আমাদের বংশে পাগলামি আছে। আমার দাদা পাগল ছিলেন।বলেন কি! উনি কি ছোটবেলা থেকে পাগল ছিলেন? না। তার বয়স যখন চল্লিশ তখন হঠাৎ একদিন পাগল হয়ে যান।আপনার বয়স কত স্যার?
চল্লিশের উপর।তাহলে তো স্যার টাইম হয়ে গেছে।হুঁ।স্যার, আমার টেলিফোন নাম্বারটা কি এখনো আপনার মনে আছে? মনে আছে।যখন পুরোপুরি পাগল হয়ে যাবেন, তখনও কি মনে থাকবে? বুঝতে পারছি না।আচ্ছা স্যার, আপনি যে একটা ইকুয়েশন বের করার চেষ্টা করেছিলেন ঐটার কী হলো? কোন ইকুয়েশন?
আত্মার ইকুয়েশন।ও আচ্ছা, একটা Wave Functin তৈরি করা কঠিন হবে। আত্মা বিষয়টা তো জানা নেই।আপনার জন্যে মোটেই কঠিন হবে না। পাগল হবার আগেই ইকুয়েশনটা শেষ করা উচিত না স্যার? পাগল হলে তো আর পারবেন না। স্যার আমি রাখি। মা কয়েকবার এসে দেখে গেছে আমি টেলিফোনে কথা বলছি। আমি যে একটা অতি জরুরি বিষয় নিয়ে স্যারের সঙ্গে কথা বলছি, Math নিয়ে কথা, এটা মা বিশ্বাস করবে না। মা ভাববে আমি প্রেম করছি। স্যার খোদা হাফেজ
খোদা হাফেজ। হেদায়েত শুয়ে পড়েছে। আত্মা নিয়ে চিন্তা করছে। আত্মাটা কী? নিশ্চয় কোনো বস্তু না। বস্তুর বিনাশ আছে। আত্মার বিনাশ নেই। এটাও তো ঠিক না। বস্তুর বিনাশ থাকবে না কেন? বস্তুরও বিনাশ নেই।আত্মা হলো কিছু অনুভূতির আধার। প্রেম, স্নেহ, মমতা… ভালো কথা, খারাপ অনুভূতির আধারও কি আত্মা ঘৃণা, রগি, বি১দ্বেষ। সহজভাবে কী লেখা যায়— আত্মা = f (Love) f (hate) লিমিট 0 থেকে ইনফিনিটি আচ্ছা চিন্তাটা কি আত্মার মধ্যে পড়বে?
হেদায়েত বিছানায় উঠে বসেছে। ঘুমের ওষুধ খাবার পরেও তার ঘুম আসছে না।রামানুজন বলে গেছেন সহজভাবে চিন্তা করতে। যদিও স্বপ্নে বলেছেন। স্বপ্নের বিষয়টা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। রসায়নবিদ মেন্ডেলিফ পেরিওডিক টেবিল স্বপ্নে পেয়েছিলেন। রামানুজন নিজেও স্বপ্নে অনেক থিওরি পেয়েছেন।সহজ ভাবে শুরু করা যাক।আত্মা = a^n তাহলে a কীসের ফাংশন?
আবার টেলিফোন বাজছে। মনে হয় নীতু মেয়েটাই করেছে। হেদায়েত অনেক চেষ্টা করেও মেয়েটার চেহারা মনে করতে পারল না।অল্প কিছুদিন মাত্র দেখা হয় নি অথচ চেহারা মনে নেই। পাগলের লক্ষণ। একজন মানুষের মাথা থেকে যখন পরিচিতজনদের ছবি মুছে যেতে থাকে। তখন বুঝতে হবে,… টেলিফোন বেজেই যাচ্ছে। হেদায়েত টেলিফোন উঠাল।জি ভাইজান।আমি কাল ভোরবেলা ময়মনসিংহ যাচ্ছি। যাবি আমার সঙ্গে? রাতে ফিরে আসব।যাব।আমি খুব ভোরে রওনা হব। এত ভোরে উঠতে পারবি?
পারব।না থাক, তোর যাবার দরকার নেই। ট্রাকে করে যাব ড্রাইভারের পাশে বসে যাওয়া। দু’জন বসলে চাপাচাপি হবে। আমার সমস্যা না, তোর কষ্ট হবে।হেদায়েত বলল, একটা গাড়ি কিনে ফেল।বেলায়েত বলল, তুই যখন বলছিস তখন কিনে ফেলব। ময়মনসিংহ থেকে ফিরেই কিনব। তোর কোন রঙ পছন্দ।মেরুন রঙ।মেরুন রঙ আবার কোনটা। আচ্ছা যা, যেটাই হোক তোকে নিয়ে তোর পছন্দে কিনব। তুই জেগে থাকিস না ঘুমিয়ে পড়। কবিতা আছে না- early to hed, early to rise. শরীর ঠিক রাখা দরকার। শরীর ঠিক থাকলেই মন ঠিক।
বেলায়েত টেলিফোন রাখার পরপরই হঠাৎ করে হেদায়েতের মনে হলোএমন কি হতে পারে যে আত্মার অবস্থান Planck স্তরে? Planck স্তর অতি জটিল স্তর সেখানে সবই এলোমেলো। Planck দৈর্ঘ্য হলো 10^-33 সেন্টিমিটার। Planck সময় হলো 10^-45 সেকেন্ড, ভর হলো 10^-5 gm ভর এত বেশি কেন?
হেদায়েত মূর্তির মতো বসে আছে। Planck ভর সমস্যায় এই মুহূর্তে সে কাতর।বেলায়েত নিখোঁজ হয়েছে। ভোরবেলা নিজের ট্রাকে করে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে ময়মনসিংহ গিয়েছিল। কাজ শেষ করে রাত আটটার মধ্যে তার ফেরার কথা। সে ফেরে নি। রাত একটায় ড্রাইভার মোবাইল ফোনে। জানিয়েছে, স্যারের কোনো খোঁজ নাই, এখন কী করি?
বেলায়েতের স্ত্রী হেনা টেনশন নিতে পারে না। সামান্যতে সে অস্থির হয়ে পড়ে। বেলায়েতের খবরে তার বুক ধড়ফর শুরু করল। তার মন বলছে মানুষটা খুন হয়েছে। অবশ্যই খুন হয়েছে। খুন করেছে ড্রাইভার কুদুস। ট্রাকের সামনে ধাক্কা দিয়ে ফেলে উপর দিয়ে ট্রাক নিয়ে চলে গেছে। এখন বলছে স্যারের কোনো খোঁজ নাই।
রাত তিনটায় টেলিফোনের পর টেলিফোন করে হেনা, হেদায়েতের ঘুম ভাঙালো। কাঁদতে কাঁদতে বলল, তোমার ভাইয়ের কোনো খবর জানো? হেদায়েত বলল, না তো। মনে হয় সে খুন হয়েছে।কে খুন করেছে? কে খুন করেছে এখনো পরিষ্কার না। ট্রাক ড্রাইভার কুদ্স সম্ভবত খুন করেছে। বাসায় চলে আস বিস্তারিত শুনবে।ভাবি আমি এক্ষুনি আসছি, আপনি কান্না বন্ধ করেন।হেনা কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমার স্বামী মারা গেছে আমি কাঁদব না! ঝিম ধরে বসে থাকব! কী রকম কথা বলো!
হেদায়েত তার ভাইয়ের বাসায় পৌঁছে দেখে প্রচুর লোকজন। হেনা তার আত্মীয়স্বজন সবাইকে খবর দিয়ে এনেছেন। একজন পুলিশ অফিসারও (ধানমণ্ডি থানার সেকেন্ড অফিসার) এসেছেন। পরিমল বাবু পুলিশের সঙ্গে কথা বলছেন। হেনার কথা বলার মতো অবস্থা না। সে কিছুক্ষণ পর পর এলিয়ে পড়ে যাচ্ছে। তার মুখ দিয়ে ফেনা ভাঙছে।সেকেন্ড অফিসার বিরক্ত গলায় বললেন, একজন মানুষের খবর পাওয়া যাচেছ না চব্বিশ ঘণ্টাও পার হয় নাই, আপনারা এরকম কেন করছেন?
পরিমল বাবু বললেন, স্যার, উনি কখনও রাতে ঢাকার বাইরে থাকেন না। নিজের ঘরে না শুলে তার ঘুম আসে না। এই জন্যই দুশ্চিন্তা।দুশ্চিন্তা দূর করুন। ময়মনসিংহের তার যেসব আত্মীয়স্বজন আছে তাদের বাড়িতে খোঁজ নিন। তাঁর সঙ্গে কি মোবাইল ফোন সেট আছে? জি স্যার আছে।টেলিফোন করে দেখেছেন? জি স্যার। রিং হয় কিন্তু কেউ ধরে না।আমাকে নাম্বারটা দিন। আমি টেলিফোন করে দেখি! নাম্বার কত?
নাম্বার হেদায়েত বলল। তার সব নাম্বারই মুখস্থ। হেদায়েতের কাছেই জানা গেল যে, তার বড় ভাইয়ের দু’টা মোবাইল সেট। একটা সাধারণ ব্যবহারের জন্যে, অন্যটা শুধু তার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য। দুটা নাম্বারেই চেষ্টা করা হলো। রিং হয় কিন্তু কেউ ধরে না।
সেকেন্ড অফিসার বললেন, হয়তো মোবাইল সেট রেখে কোথাও গেছেন। কিংবা সেট দু’টা ছিনতাই হয়েছে। আপনারা দুশ্চিন্তা করবেন না। ময়মনসিংহ থানায় আমি খবর দিয়ে দিচ্ছি। ট্রাক ড্রাইভার কুদুসকে বলুন যেন সে তার স্যারের জন্যে অপেক্ষা করে।হেনা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, কুদুসকে এ্যারেস্ট করবেন না?
সেকেন্ড অফিসার বিরক্তি গলায় বললেন, তাকে এ্যারেস্ট করার সময় পার হয়ে যায় নি। অল্পতে অস্থির হবেন না প্লিজ। আমি নিশ্চিত কাল দিনের মধ্যে আপনার স্বামী ফেরত আসবেন।সাতদিন পার হয়ে গেল, বেলায়েতের কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। এখন আর মোবাইলেও কোনো রিং হয় না। হেদায়েত সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভাইকে খোঁজে। পথে পথে হাঁটে। বেশির ভাগ দিন তার সঙ্গে পরিমল বাবু থাকেন। তিনি অদ্ভুত অদ্ভুত জায়গায় খুঁজতে যান। যেমন বুড়িগঙ্গা নদীর নৌকা, নারায়ণগঞ্জ উর্দু বস্তি নামের এক বস্তি।
অদ্ভুত অদ্ভুত কথাও বলেন। যেমন একদিন বললেন, আমার ধারণা স্যার বিবাগী হয়েছেন।হেদায়েত বলল, বিবাগী কেন হবেন? সংসারে শান্তি ছিল না। এই জন্যে বিবাগী হয়েছেন। মাডামের সঙ্গে খেঁচাখেছি ছিল। সংসারে শিশু ছিল না। পিতা-মাতা হলো ইট। আর শিশু সিমেন্ট। দুই ইট আটকায়ে রাখে।হেদায়েত বলল, ভাইজান বিবাগী হয়ে কোথায় যাবেন?
পরিমল বাবু বললেন, আগে বিবাগী হয়ে পুরুষ মানুষ আসাম চলে যেত। কামরূপ কামাক্ষ্যা। এখন পাসপোর্টের ঝামেলার কারণে দেশেই থাকে। সাধারণত পতিতাপল্লীতে আশ্রয় নেয়। মনের মতো মেয়ে খুঁজে বের করে সংসার পাতে।বলেন কি! আপনি চিন্তা করবেন না। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, দেশের সব কটা পতিতাপল্লীতে অনুসন্ধান করব। নিজেই যাব।কবে যাবেন? ঢাকার খোঁজটা শেষ করে শুভদিন দেখে রওনা হব। প্রথম যাব টাঙ্গাইল। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পতিতাপল্লী টাঙ্গাইলে। সেখানে কিছু মেয়ে আছে অত্যাধিক রূপবতী। আবার কুহকিনী। মায়াজালে আটকায়ে ফেলে।
মৃত্যু শোক সাতদিনের বেশি স্থায়ী হয় না। কারণ সবাই জানে, যে গেছে সে আর ফিরবে না। নিখোঁজ শোক দীর্ঘস্থায়ী হয়। কারণ একটাই, নিখোঁজ ব্যক্তির ফিরে আসার সম্ভাবনা। আনন্দের সম্ভাবনাই সেখানে শোকের প্রধান কারণ।স্বামী নিখোঁজ হওয়ায় হেনার বড় ধরনের উপকার হয়েছে। তার শরীর শুকিয়ে গেছে। চেহারায় সৌন্দর্য এবং লাবণ্য ফিরে এসেছে। স্বামীর নানান ব্যবসায় হাল ধরার জন্যেও প্রচুর ছোটাছুটি করছে। বেলায়েতের লোকজন কেউই তাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে না। এই মনকষ্টে সে আরো শুকাচ্ছে।
তার বাড়িতে মুনসি হাফিজ নামের এক মাওলানা স্থায়ী হয়েছেন। তিনি জিন সাধক এবং তার অধীনে সার্বক্ষণিক সঙ্গীর মতো একজন জিনও না-কি থাকে। জিনের নাম হাফসা।হেনা চেষ্টা করছে হাফসা জিনের মাধ্যমে স্বামীর সংবাদ বের করতে। প্রায় প্রতিদিনই জিনের আসর বসছে।
পঞ্চাশ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়ছে। রোজই নানান ধরনের লোকজন খোঁজ নিয়ে আসছে। সবার কথাই বিশ্বাস করার মতো। হেনা এদেরকে নিয়েও ব্যতিব্যস্ত। তার এখন নিঃশ্বাস ফেলারও সময় নেই। তাকে দেখে মনে হয় সে আনন্দেই সময় কাটাচ্ছে। হেনা একজন সেক্রেটারি রেখেছে। এম, এ, পাশ সেক্রেটারি। নাম শারমিন। এই সেক্রেটারি পুরুষ হলে মিস্টার বাংলাদেশ হত। এমন পুষ্ট শরীর। সে পেটমোটা চামড়ার ব্যাগ নিয়ে সারাক্ষণই হেনার সঙ্গে আছে।
নতুন করে এডমিনস্ট্রেশন শুরু করতে গিয়ে হেনা কয়েকজনের চাকরি খেয়েছে। তার একজন হচ্ছে পরিমল বাবু। তাঁকে চাকরি চলে যাওয়ায় মোটেই চিন্তিত মনে হচ্ছে না। বাসা ছেড়ে দিতে হয়েছে বলে তিনি এখন বেলায়েত টিম্বারের অফিসে ঘুমান। তিনি হেদায়েতকে সঙ্গে নিয়ে স্যারকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন এবং একেকদিন একেক গল্প ফাঁদছেন।
প্রাণীকুলের মধ্যে ভেড়া যাবে স্বর্গে আর ছাগল হবে নরকবাসী, এটা কি জানেন?না।ম্যাথুর গসপেলে পরিষ্কার লেখা আছে।আপনি খ্রিস্টান না-কি? না। কিছুদিন এক পাদ্রীর সঙ্গে ছিলাম। তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। আমার স্বভাবই হলো, যার সঙ্গে থাকি তার কাছে থেকেই কিছু না কিছু শিখি।ভাইজানের কাছ থেকে কী শিখেছেন?
উনার কাছ থেকে কিছু শিখতে পারি নাই। কারণ উনার ছিল ভালোমানুষি। এটা শেখা যায় না। জন্মসূত্রে নিয়া আসতে হয়। আপনার কাছ থেকে কী শিখেছি শুনবেন? না।মানুষ শুধু যে মানুষের কাছ থেকে শিখবে তা-না। পশুপাখির কাছ থেকে অনেক কিছু শেখা যায়। কাকের মতো নিকৃষ্ট যে পাখি, তার কাছেও অনেক কিছু শেখার আছে। কাক সবার সামনে ময়লা খায় না। আড়ালে খায়। কাকের কাছ থেকে এইটাই শিক্ষণীয়।
সারাদিন হাঁটাহাঁটি করে সন্ধ্যায় হেদায়েত ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে। গরম পানিতে গোসল সেরে টিভি দেখতে বসে। সে চ্যানেল টিপাটেপি করে না। টিভি চালু করার পর যে চ্যানেল আসে সেটাই দেখে। আগ্রহ নিয়েই দেখে। রাত নটায় টিফিন কেরিয়ার করে হোটেল থেকে খাবার আসে। হোটেলের বয় নান্টু (বয়স ১০) খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাড়িয়ে থাকে। খাওয়া শেষে থালাবাসন ধুয়ে সে টিফিন কেরিয়ার নিয়ে চলে যায়। যতক্ষণ খাওয়া না হয় ততক্ষণ সে হেদায়েতের পাশেই সোফায় বসে টিভি দেখে।
অনেকদিন পর সেতু টেলিফোন করল। হেদায়েত আনন্দিত গলায় বলল, ভালো আছ? হ্যাঁ। তুমি কেমন আছ? আমি ভালো আছি। তোমাদের ছবির কাজ কি শুরু হয়েছে? হা। এই জন্যেই এতদিন তোমাকে টেলিফোন করা হয় নি। দেশের বাইরে ছিলাম সাতদিন। ব্যাংককে একটা গানের পিকচারাইজেশন হয়েছে। খুব ভালো হয়েছে।হেদায়েত বলল, ছবির নামের অর্থটা কী বলো তো – দ্বিতীয় কদম ফুল মানে কী?
সেতু বলল, প্রথম এই নাম ছিল। রবিন ভাইয়ের দেয়া নাম। রবীন্দ্রনাথের গান থেকে নেয়া। এখন নাম চেঞ্জ হয়েছে। এখন ছবির নাম ‘দুষ্ট প্রজাপতি’। নাম সুন্দর না? বুঝতে পারছি না, সুন্দর কি-না।কমার্শিয়াল ছবির জন্যে খুব সুন্দর নাম। ভালো কথা, নাদুর মা ঠিকমতো কাজ করছে? ও তো চলে গেছে।বল কি! আমাকে তো কিছু বলো নি। কবে গেছে?
মনে নাই কবে গেছে।তোমার খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা কী? হোটেল থেকে খাওয়া আসে, কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।রাতে ঘুম ভালো হচ্ছে? খুব ভালো ঘুম হচ্ছে। সারাদিন খুব পরিশ্রম করি তো, এই জন্যে রাতে বিছানায় যাওয়া মাত্র ঘুম।কীসের এত পরিশ্রম? সারাদিন হেঁটে হেঁটে ভাইজানকে খুঁজি। উনি হারিয়ে গেছেন এই জন্যেই খুঁজা।বলো কি? কত দিন আগের ঘটনা?
প্রায় এক মাস। সেতু আমি রাখি। খুব ঘুম পাচ্ছে।হেদায়েত টেলিফোন রেখে ঘুমুতে গেল। ঘুমুতে যাওয়টি এখন তার জন্যে অনেক আনন্দময় হয়েছে। সারাদিনের পরিশ্রমের সঙ্গে যুক্ত হয় ঘুমের ওষুধ। আরামদায়ক তন্দ্রা নিয়ে আত্মা ইকুয়েশনের চিন্তা। টাইম ইনডিপেনডেন্ট ইকুয়েশন বের করতে হবে। কারণ আত্ম সময় নির্ভর না। আচ্ছা পশু-পাখি এদের কি আত্মা আছে?
নিম্ন শ্রেণীর আত্মা। এদের বোধশক্তি কিছু পরিমাণে আছে। বোধ কি আত্মার কোনো ধর্ম? আবার টেলিফোন বাজছে। সেতু কি আবার করেছে? না-কি ভাইজান? ভাইজান হবার সম্ভাবনা কতটুকু? হেদায়েতের ঘুম পুরোপুরি কেটে গেল।হ্যালো? স্যার আমি নীতু।ও আচ্ছা। আমি ভেবেছিলাম ভাইজান টেলিফোন করেছেন।
