এখানে কিছু রহস্য আছে।অতীন্দ্রিয় রহস্য। মাঝেমাঝে কড়া ফুলের গন্ধ পাওয়া যায়। এমন কড়া যে, গা ঝিমঝিম করে-মাথা ধরে যায়।জায়গাটা হচ্ছে রিং রোডের মাঝামাঝি শ্যামলী থেকে আদাবরের দিকে যাবার ইট-বিছানো রাস্তা। আশেপাশে কোনো ফুলের গাছ নেই যে, ফুলের গন্ধ আসবে। তাছাড়া ফুলের গন্ধে গা ঝিমঝিম করে না। নিশ্চয়ই অন্য কোনো ব্যাপার। কোনো জটিল রহস্য।
আহসান আজ আবার গন্ধটা পাচ্ছে। গতকাল ছিল না, তার আগের দিনও ছিল না। ব্যাপারটা কী? রাত প্রায় এগারটা। আহসান চিন্তিত মুখে সিগারেট ধরাল। এরকম নিৰ্জন রাস্তায় এত রাতে সিগারেট ধরিয়ে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। আশেপাশে খুব ছিনতাই হচ্ছে। দাড়ি-গোঁফ এখনো গজায় নি এমন সব ছেলেপুলেরা পেনসিল-কাটা ছুরি দেখিয়ে মানিব্যাগ নিয়ে যাচ্ছে। এরকম সময়ে গন্ধ-রহস্য ভেদ করার জন্যে মাঝরাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকার কোন অর্থ হয় না।
আশ্চর্য, গন্ধটা হঠাৎ মিলিয়ে গেল। এই রহস্যের কোন মানে হয়? এটা নিয়ে কারো সঙ্গে আলাপ করলে হয়। কিন্তু এই ব্যাপারটা আদাবরের রাস্তায় পা না-দেয়া পর্যন্ত মনে আসে না। যখন মনে আসে তখন আশেপাশে কেউ থাকে না যার সঙ্গে আলোচনা করা যায়।
আদাবরের দিক থেকে পাঁচ-টনি ট্রাক আসছে। রাস্তায় লোকজন নেই বলেই ট্রাক আসছে টিমে-তেলা গতিতে। লোজন থাকলে ঝড়ের গতিতে চলে আসত। আহসান একপাশে সরে দাঁড়াল। হেড-লাইটের আলোয় তার চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। তাকানো যাচ্ছে না, আবার চোখ ফিরিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না। কড়া আলোর একধরনের সম্মােহনী শক্তি আছে। শুধু পতঙ্গ না—এই আলো মানুষকে আকৃষ্ট করে।
ট্রাকটা আহসানের ঠিক গায়ের ওপর এসে আচমকা ব্ৰেক কষল। ড্রাইভার দরজা খুলে অর্ধেকটা শরীর বের করে তাকে হাত ইশারা করে ডাকছে। ড্রাইভার বা দারোয়ান শ্ৰেণীর কেউ হাত ইশারা করে ডাকলে মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। তবে এই ড্ৰাইভার আহসানের চেনা। তার বাড়িওয়াল করিম সাহেবের ড্রাইভার। বাড়িওয়ালার বাড়ির একতলায় থাকে। নাম নাজিম, নিজাম কিংবা এই ধরনের কিছু। আহসানের সঙ্গে দেখা হলে লাল চোখে তাকায় এবং পান খাওয়া হলুদ দাঁত বের করে হাসে। আবার মাঝে-মাঝে না-চেনার ভঙ্গি করে।
প্ৰবেসার সাব, খবর হুনছেন?
না। কি খবর?
করিম সাবের কথা কিছু হুনছেন?
না। যায়-যায় অবস্থা। অক্সিজেন চলছে….
কী হয়েছে?
এক্সিডেন—টেম্পোর লগে ধাক্কা–মাথা গুড়া। খুবই আফসোসের কথা, কি কন প্রবেসার সাব? আহসান কিছু বলল না। ফুলের গন্ধটা আবার পাওয়া যাচ্ছে। পেট্রল এবং ধোঁয়ার গন্ধ ছাপিয়ে মিষ্টি একটা গন্ধ। এর মানেটা কী? রহস্যটা কোথায়?
আরিচা থনে টিরিপ আইন্যা খবর হুনলাম। মিজাজ ঠিক নাই আমার বুঝছেন প্রবেসার সাব। দেখবার যাইতাছি।ড্রাইভার দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। গিয়ার বদলাতে-বদলাতে বলল, এর নাম হালার দুনিয়া। আজিব জাগা। প্ৰবেসার সাব, যাই।এবার ট্রাক ছুটছে ঝড়ের মতো। আহসানের মনে হল একটা ভুল হয়ে গেছে—তার উচিত ছিল ড্রাইভারের সঙ্গে যাওয়া। ব্যাপারটা মনে হয় নি। ফুলের গন্ধ সব এলোমেললা করে দিয়েছে।
করিম সাহেব লোকটিকে সে পছন্দ করে। বেঁটেখাটো মানুষ। মুখভর্তি পান। হাসিখুশি। পাশ দিয়ে গেলে জরদার চমৎকার গন্ধ পাওয়া যায়। ভদ্রলোক এমন ভঙ্গিতে পান খান যে, মনে হয় স্বগীয় কোনো খাদ্য চিবুচ্ছেন। তাঁকে দেখলেই পান খেতে ইচ্ছা করে।বাড়িওয়ালারা প্রায়ই বেশ নামাজি হয় ইনিও তাই। তাঁর গায়ে সবসময় পরিষ্কার ঝকঝকে একটা পাঞ্জাবি থাকে।
মাথায় তার চেয়েও পরিষ্কার একটা টুপি। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। বেশ নাদুসনুদুস। দেখলেই মনে হয়, খুব শিগগিরই এর হার্ট অ্যাটাক বা মাইল্ড স্ট্রোক জাতীয় কিছু হবে। কিন্তু হয় না। তাঁর তিন জন ভাড়াটে আছে। যাদের সবার সঙ্গেই তাঁর সুসম্পর্ক। দুজন ভাড়াটে তাঁকে চাচা ডাকে। আহসান তাঁকে কিছুই ডাকে না; তবে তিনি আকার-ইঙ্গিতে প্রায়ই বুঝিয়ে দেন যে, আহসানকে তিনি নিজের ছেলের মতো দেখেন।
ভদ্রলোকের পাঁচ মেয়ে, কোনো ছেলে নেই। বড় তিনটি মেয়ে স্কুল-কলেজে কোথাও যায় না। সম্ভবত বিয়ের জন্যে অপেক্ষা করে। ছোট দুটি স্কুলে যায়। আহসানের সঙ্গে দেখা হলে এই দুই স্কুল-যাত্রী মৌলানাদের মতো টেনে-টেনে বলে, আসোলামু আলায়কুম। আহসান তার উত্তরে সবসময় বলে, কী খবর ভালো?
এই প্রশ্নের উত্তর এরা দেয় না। গম্ভীর হয়ে থাকে। হাসেও না। মনে হয় খানিকটা বিরক্ত হয়।করিম সাহেব মাঝেমধ্যে তাকে খেতে ডাকেন। অন্য ভাড়াটেদের ডাকেন না। সে একা-একা থাকে, এই কারণেই হয়ত; কিংবা কে জানে হয়ত তাঁর কোনো পরিকল্পনা আছে। যাঁর বড়-বড় তিনটি মেয়ে বিয়ের জন্যে অপেক্ষা করছে তাঁর পরিকল্পনা থাকা অন্যায় নয়।
অবশ্যি তিনি এখন পর্যন্ত ইশারা বা ইঙ্গিতে এ বিষয়ে কিছু বলেন নি। মেয়েদের প্রসঙ্গে তিনি যা বলেন তার সারমর্ম হচ্ছে—মেয়েগুলো মহা অপদার্থ। সংসারের কিছু জানে না কিছু বোঝে না। দিনরাত ঝগড়া করে আর টাকা জমায়।আহসান অবাক হয়ে বলেছিল, টাকা জমায় মানে? জমায় মানে জমায়-সঞ্চয়।পায় কোথায় টাকা? আপনি দেন?
পাগল, আমি দিব কেন? ওরা চুরি করে। মার কাছ থেকে চুরি করে, মাঝে-মাঝে আমার পকেটে হাত দেয়; মহা হারামী। আগে চড়-থাপ্পড় দিতাম, এখন বড় হয়ে গেছে, চড়-থাপ্পড় দিতে পারি না। যখন মেজাজ ঠিক থাকে না দিই। তখন তাদের মা কান্দে। এরা হইল কান্দন পার্টি। মা কান্দে, মেয়ে কান্দে। একবার কী হইল শুনেন-প্রাইভেট মাস্টার আসছে। বড় মেয়েটাকে পড়াইছে, হঠাৎ কারেন্ট নাই। মাস্টার হারামজাদা সুযোগ বুইঝা গায়ে হাত দিছে। বুঝেন অবস্থা। মেয়ে কোন শব্দ করে না—ফিচ-ফিচ কইরা কান্দে। বুঝেন অবস্থা। মা যেমুন বোকা—আমার মেয়েগুলোও হইছে বোকা। বাজারের সেরা বোকা।
কোনো বাবা নিজের মেয়েদের নিয়ে এ জাতীয় কথা বলতে পারে তা আহসানের ধারণার বাইরে ছিল। এই লোক বলে।ভদ্রলোকের কথাবার্তার ভঙ্গি থেকে আহসানের মাঝে-মাঝে মনে হয় তাকে নিয়ে ভদ্রলোকের তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই। থাকলে মেয়েদের সম্পর্কে এ জাতীয় কথাবার্তা বলতেন না। তাছাড়া খেতে যখন ডাকেন তখনও মেয়েরা কেউ আসে না বা উকি-ঝুকি দেয় না। তাঁর বাড়ির পর্দা প্রথাটি বেশ কঠিন। মেয়েগুলো নিউমার্কেটে যায় বোরা পরে।
আহসানের বাসা তিনতলার ডানদিকে। বাঁদিকটা খালি। দরজা-জানালা এখনো লাগানো হয় নি। আহসানের বাসাও পুরোপুরি তৈরি হয় নি। চুনকাম বাকি আছে। দরজায় রঙ লাগানো হয় নি। তিনটি রুমের একটিতে এখনো দরজা-জানালা লাগানো বাকি। সেকারণেই ভাড়া কমতের শ টাকা। গ্যাস-ইলেকট্রিসিটি সবই এর মধ্যে। তবে গ্যাস লাইন এখনো বসে নি বলে এই সুবিধাটি পাওয়া যাচ্ছে না। ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে সুযোগ পেলেই করিম সাহেব এই কথা শুনিয়ে দেন
কয়েকটা দিন অপেক্ষা করেন। গ্যাস লাইন বসলে কত আরাম হবে দেখেন। এক পয়সা বাড়ি ভাড়া বাড়াব না। ভদ্রলোকের এক জবান। এত সস্তায় ঢাকা শহরে আর বাড়ি নাই। কী রকম আলো-হাওয়া, দেখতেছেন? ভাদ্র মাসেও ফ্যান ছাড়তে হয় না। দক্ষিণমুখী বাড়ি।বাড়ি দক্ষিণমুখী খুবই ঠিক কথা। আলোহাওয়াও প্রচুর অস্বীকার করার উপায় নেই; তবে তিনতলায় যেতে হয় বাড়িওয়ালার ঘরের ভেতর দিয়ে। বাইরে সিঁড়ি নেই।
ভাড়া দেওয়ার জন্যে যে বাড়ি বানায় সে কখনো এমন অদ্ভুত ব্যবস্থা রাখে? কিন্তু করিম সাহেব রেখেছেন। এবং তাঁর কথায় মনে হয় তিনি এটা রেখেছেন ইচ্ছা করেই।বাইরে সিঁড়ি থাকলে চুরি-চামারির সুবিধা। হুট করে চেনা-অচেনা লোক ঢুকে পড়বে। এখন সেটা পারবে না। সব থাকবে চোখে-চোখে। রাতের বেলা কলাপসেবল গেট বন্ধ করলে একেবারে নিশ্চিন্ত। দরজা-জানালা খোলা রেখে নাক ডাকিয়ে ঘুমান। কোনো অসুবিধা নাই।
আসতে-যেতে বারবার বিরক্ত করতে হয় আপনাদের।বিরক্ত করতে হলে করবেন। পয়সা দিচ্ছেন বিরক্ত করবেন না? মাগনা থাকলে একটা কথা ছিল। আর পরের বাড়ি মনে করেন কেন? নিজের বাড়ি মনে করবেন। একদম নিজের বাড়ি।করিম সাহেবের এই বাড়িটিকে নিজের বাড়ি মনে করার কোনোই কারণ আহসানের ঘটে নি। এই পরিবারের অন্য কারোর সঙ্গে তার সামান্যতম পরিচয়ও নেই। তাঁর স্ত্রীকে সে এখনো চোখে দেখে নি।
অথচ সে দুমাসের ওপর এ-বাড়িতে আছে। তাঁর বড় তিনটি মেয়ের সঙ্গে হঠাৎ-হঠাৎ দেখা হয়ে যায়, তবে তখন তারা এমন চমকে ওঠে যে আহসানের নিজেরই অস্বস্তি লাগে। মেয়ে তিনটি দেখা হলেই বিদ্যুতের মত মাথা ঘুরিয়ে নেয়। মহা বিরক্তির ব্যাপার। ছোটো দুটি এরকম না করলেও রোবটের মতো গলায় বলে—আসোলামু আলায়কুমসেটা আরো বিরক্তিকর। সালাম দেওয়ার অদ্ভুত কায়দা তারা কোথায় শিখেছে কে জানে!
করিম সাহেবের বারান্দায় আজ বাতি জ্বলছে। বারান্দায় সাত-আটটি চেয়ার পাতা। তাঁর বড় মেয়েটি ছোট দুটি বোনকে নিয়ে জড়সড় হয়ে বসে আছে। আহসানকে দেখে এরা তিনজনই উঠে দাঁড়াল। যেন তারা আহসানের জন্যেই অপেক্ষা করছিল। এই প্রথম বার ছোট মেয়ে দুটি আসোলামু আলায়কুম বলল না। বড় মেয়েটিও মাথা ঘুরিয়ে মূর্তির মতো হয়ে গেল না। আহসান কি করবে ভেবে পেল না। দাঁড়াবে খানিকক্ষণ? করিম সাহেবের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেবে নাকি সরাসরি সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাবে ওপরে? সে সবচেয়ে ছোট মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল তোমার আৰ্ব এখন কেমন আছেন?
জানি না।
দেখতে যাও নি?
সবাই গেছে। আমরা তিন জন শুধু আছি।
তোমরা যাও নি কেন?
মেয়েটি এই প্রশ্নের জবাব দিল না। কাল বড় বোনের দিকে। বড় মেয়েটি বলল, আপনি এখানে একটু বসুন।মেয়েটির গলার স্বর ঠাণ্ডা এবং কোমল। উচ্চারণ স্পষ্ট। বাবার মতো আঞ্চলিক সুর নেই; যদিও একটু টেনে-টেনে কথা বলছে। তার কথা বলার মধ্যে কোনো জড়তাও নেই। তাকিয়েও আছে সরাসরি আহসানের দিকে। সুন্দর চেহারা। বেশ ফর্সা—একটা স্নিগ্ধ ভাব আছে। সম্ভবত অনেকক্ষণ ধরে কেঁদেছে। চোখ-মুখ ফোলাফোলা, সেই কারণেই কি একটা আদুরে ভাব চলে এসেছে? করিম সাহেবের কথা অনুসারে এই মেয়েটিও টাকা চুরি করে এবং নিজের ট্রাংকে গোপনে জমায়। মেয়েটিকে দেখে এটা ভাবতে বেশ কষ্ট হয়।
আমাকে বসতে বলছ?
জ্বি। আপনি একটু বসুন। আমাদের ভয় লাগছে।
কীসের ভয়?
বাথরুমে অনেকক্ষণ ধরে কি যেন শব্দ করছে।
ইঁদুর-টিদুর হবে বোধ হয়। জ্বি না।
ইঁদুর না। অন্য কিছু।
অন্য কিছু কী?
বড় মেয়েটি তার জবাব দিল না। ছোট মেয়ে দুটি এ ওর দিকে তাকাতে লাগল। এদের কারোর নামই আহসানের জানা নেই। সবার নামই একই ধরনের। পাঁচটি একধরনের নাম মনে রাখা কষ্ট। আহসান বলল, চোর-টোর নাকি?
বড় মেয়েটি বলল, জ্বি না, চোর না। সাদা কাপড় পরা একজন কে যেন বাথরুমে। ঢুকল। আমি বাথরুমে গিয়ে দেখি কিছু নেই।ভূত-প্ৰেত? মেয়েটি জবাব দিল না। আহসান বলল, বাবার ব্যাপারে তোমাদের মন দুর্বল হয়ে আছে, তাই এইসব দেখেছ। ঢাকা শহরে অনেক কিছুই আছেভূত নেই।আমি এই সাদা কাপড় পরা মেয়েটাকে আগেও একদিন দেখেছি, ছাদে বসেছিল।বল কী তুমি?
মেয়ে তিনটি ভূতের ভয়েই মুখ শুকনো করে বসে আছে। বাবার অসুখের চেয়ে এই ভয়টিই বর্তমানে তাদের কাবু করেছে। ঠিক এই মুহূর্তে তারা সম্ভবত বাবার কথা ভাবছে না! আহসান বসল, ঠিক তখন সত্যি-সত্যি খটখট শব্দ শোনা গেল ভেতর থেকে। দারুণ চমকে উঠল মেয়ে তিনটি। আহসান বলল, চল দেখে আসি।আপনাকে কিছু দেখতে হবে না। আপনি এখানে খানিকক্ষণ বসুন। বেশিক্ষণ বসতে হবে না। জালাল মিয়া চলে আসবে।জালাল মিয়া কে? ট্রাকের ড্রাইভার।
ঠিক আছে আমি বসলাম। এত জায়গা থাকতে ভূতটা বাথরুমে গিয়ে বসে আছে। কেন? এই রাতদুপুরে গোসল করার তার কি দরকার পড়ল? বোধ হয় গরম লাগছে।একটি সহজ এবং সাধারণ রসিকতা। পরিস্থিতি হালকা করার জন্যে এরকম রসিকতা করা যেতে পারে। কিন্তু বড় মেয়েটি এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন খুব আহত হয়েছে। এই সাধারণ রসিকতাটিতে আহত হবার কী আছে? আহসান বলল, অন্য ভাড়াটেরা কেউ নেই?
জ্বি না।অন্য ভাড়াটেরা কেউ যে নেই এই তথ্যটি আহসানের জানা। দোতলার বাঁদিকের ভাড়াটে আসিক সাহেব তাঁর স্ত্রীকে দেশের বাড়িতে রেখে আসতে গিয়েছেন। ডানদিকের ভাড়াটে বজলু সাহেব গত সপ্তাহে বাড়ি ছেড়ে দিয়েছেন। বজলু সাহেবকে আহসানের সবসময় ভালোমানুষ বলে মনে হত। কিন্তু লোকটি চলে যাবার পর জানা গেল সে বাথরুমের কমোড ভেঙে দু টুকরা করেছে।
একটি আয়না এবং রান্নাঘরের বেসিন ভেঙেছে। শোবার ঘরের জানালার সব কটি কাচ ভেঙেছে। এই কাজগুলো তাকে বেশ পরিশ্রম করে করতে হয়েছে বলাই বাহুল্য।করিম সাহেব আহসানকে ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে সব দেখালেন। তার মনে হল রাগের বদলে ভদ্রলোকের বিস্ময়টাই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। বার-বার বলছেন, এরকম কেন করল বলেন তো?
বলা মুশকিল। আপনার ওপর হয়ত রাগ আছে।রাগ থাকবে কেন? আমাকে সবসময় চাচা-চাচা বলত। যাবার সময় পা ছুঁয়ে সালাম করল। আমি পনের দিনের ভাড়া নিই নাই।দুনিয়ায় অনেক রকমের মানুষ আছে।আমাকে ক্ষতি করিয়ে তার লাভ কি হল? ক্ষতি করেছে এইটাই লাভ।
যদি কোনোদিন দেখা হয় আপনার সঙ্গে, তাহলে কথাটা জিজ্ঞেস করবেন? বলবেন-আমি মনে কষ্ট পেয়েছি। খুব কষ্ট।দেখা হলে বলব। দেখা হবে না। এই জাতীয় লোকদের সঙ্গে দেখা হয় না।তাও ঠিক। কি সমস্যায় পড়েছি বলেন তো দেখি। বাড়ি ঠিকঠাক না-করে ভাড়াও দিতে পারব না। ইংলিশ কমোড আর বেসিন ছিল। শখ করে কিনেছিলাম। আগে জানলে বাংলাদেশিটা কিনতাম।
Read more
