বাসর পর্ব – ৭ হুমায়ূন আহমেদ

বাসর পর্ব – ৭

প্রথম বাড়ি ভাড়া নিতে যখন আসলেন আমি বেগমের মার বললামখাটি লোক একটা। বেগমের মা বলল, বড় বড় মেয়ে ঘরে আমি বললাম, এ ফেরেশতা লোক, তোমার মেয়েগুলোর দিকে কোনদিন চোখ পড়বে না। কি কথা ঠিক হইল।করিম সাহেব বিজয়ীর মত তাকালেন স্ত্রীর দিকে। বেঁটেখাটো মলিন মুখের মহিলাকে ঘিরে তাঁর মেয়েরা দাঁড়িয়ে আছে। ভদ্রমহিলা বসে আছেন। সবচেয়ে ছোটো মেয়েটি ঘুমিয়ে পড়েছে। মেঝেতে জায়নামাজ বিছিয়ে বেগমের দূর সম্পর্কের ফুপু খুব নিচু গলায় কোরান শরীফ পড়ছেন।

প্রফেসর সাব।জ্বি বলুন।বোধ হয় বাঁচব না। আমার মাকে গত রাতে বিছানার পাশে বসে থাকতে দেখলাম। পরিষ্কার দেখলাম কোন ভুল নাই। মরবার আগে আত্মীয়স্বজনের রুহ। দেখা যায়।আপনি ভালো হয়ে উঠবেন শুধু-শুধু ভয় পাচ্ছেন। ভয় আমি পাচ্ছি না প্রফেসর সাব। মরণের খামাকা ভয় পাব কেন বলেন? মরণ তো আছেই। ভয় পাইতেছি অন্য জিনিসে। সেইটা আপনারে বলতে চাই।

আপনি সুস্থ হয়ে উঠুন তারপর বলবেন।জ্বি না, এখনই বলতে হবে। আমার আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। বড় বড় লোকসান দিয়ে শেষ হয়ে গেছি। বাজারে বিরাট দেনা। দশ-বার লাখ টাকা দেন। মরে গেলে মেয়েগুলোর আমার সর্বনাশ হয়ে যাবে। একটু দেখবেন। খোঁজ রাখবেন। দেখাশোনা করবে সেই রকম আত্মীয় স্বজন আমার কেউ নাই।

করিম সাহেব, ঐসব নিয়ে চিন্তার সময় এখনো হয় নি।হয়েছে, সময় হয়ে গেছে। কাউরে না বললে শান্তি হবে না। আমার মেয়েগুলো বোকা তার ওপর মূখ। মাথার ওপর কেউ না থাকলে ভেসে যাবে।আপনি শান্ত হয়ে বিশ্রাম নিন। আমার যতদূর দেখার আমি দেখব।করিম সাহেব চুপ করে গেলেন। চোখ বন্ধ করে বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলেন। মনে হল তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। আরো খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে আহসান উঠে দাঁড়াল। লোকটির ঘুম না ভাঙিয়ে চলে যেতে হবে।

প্রফেসর সাব।জ্বি! চলে যাচ্ছেন? ভাবলাম ঘুমিয়ে পড়েছেন।না ঘুমাই নাই। ঘুম হয় না। তার মতো হয়।করিম সাহেব আবার কাশতে লাগলেন। দম নেবার মতো শক্তি সঞ্চয়ের পর তাঁর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমরা সব একটু বাইরে যাও আমি একটা কথা প্রফেসর সাবকে বলব। দাঁড়িয়ে আছ কেন? যাও না।খুব অনিচ্ছার সঙ্গে সবাই বেরুল। করিম সাহেব বললেন, প্রফেসর সাব একটু কাছে আসেন একটা কথা বলব। আহসান এগিয়ে গেল।

আমার তিন নম্বর মেয়েটা যে আছে মহল—শুনছি তারে আপনি খুব স্নেহ করেন। দেখা হলে কথাটথা বলেন। মেয়েগুলো বোকা। পেটে কথা রাখতে পারে না। যা হয় সব তাদের মাকে বলে। তার মা বলে আমারে।আহসান অস্বস্তি নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। করিম সাহেবের চোখ বন্ধ তবে তিনি কথা বলছেন বেশ পরিষ্কার গলায়।

বুঝলেন প্রফেসর সাব, তাঁর মার কাছ থেকে শুনলাম। একদিন নাকি মহলের কাছে আচার চেয়ে খেয়েছেন। মেয়েটা সব তার মাকে বলেছে। মেয়েটাকে যদি আপনার পছন্দ হয় — আমার মেয়েগুলো বোকা কিন্তু ভালো। মন্দ কিছু আর এদের মধ্যে নাই। আপনারে দিল থেকে কথাগুলো বললাম। দোষ হইলে মাফ কইরা দিবেন। আচ্ছা তাহলে এখন যান।

কথা শেষ হবার আগেই নার্স এবং হাসপাতালের এ্যাটেনডেন্ট ঢুকল। করিম সাহেবকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাবে। অল্প বয়স্ক একজন ডাক্তার নার্ভাস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। আহসান তাঁকে একপাশে নিয়ে নিচু গলায় বলল, অবস্থা কি খুব বেশি খারাপ?

তাই তো মনে হচ্ছে। মাথার আঘাতটা তেমন গুরুতর না, তবে লাংসে জখম আছে। অপারেশনের আগে বলা যাবে না।সারভাইভালের সম্ভাবনা কেমন? বাঁচামরার ব্যাপারে তো স্ট্যাটিসটিকস চলে না।আহসান নিদারুণ অস্বস্তি নিয়ে বের হল। অপারেশনের সময় এখানে থাকা উচিত। কিন্তু থাকতে ইচ্ছে করছে না। মেয়েগুলি এমন করে কাঁদছে যে সহ্য করা মুশকিল।

হাসপাতালের গেটে দেখা হল ড্রাইভার জলিল মিয়ার সঙ্গে। তার বগুড়া না কোথায় যেন যাবার কথা ছিল ট্রাক নিয়ে। বোধ হয় যায় নি। বিরস মুখে পান চিবুচ্ছে। আহসানকে দেখে এগিয়ে এল।প্ৰবেসার সাব, সালাস্লামালিকুম।ওয়ালাইকুম সালাম।দেখে আসছেন? হ্যাঁ।ভালো করছেন। আপনার কথা খুব বলতেছিল। মরবার সময় মাথায় কিছু ঢুকলে ঐটা নিয়ে শুধু প্যাচাল পাড়ে। আপনার সাথে কথা বলনের শখ ছিল। শখ মিটল। আপনি কি এখন বাড়ি যান?

হুঁ।আসেন রিকশা করে দিই।রিকশা করে দিতে হবে না।চলেন যাই। আপনার সাথে একটা ছোট কথাও আছে প্ৰবেসার সাব।কি কথা? মনে রাগ কিন্তুক নিবেন না।না রাগ নেব না।কাইল রাইতে কি আপনার ঘরে একটা মেয়েছেলে ছিল? সকালে দেখি গেইট দিয়া বাইর হয়। আমি আটকাইলাম। চোর না কি কে জানে? শেষে বুঝলাম অন্য ব্যাপার।আহসান সিগারেট ধরাল।

জলিল মিয়া বেশ শব্দ করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে আবার তার বক্তব্য শুরু করল, করিম সাবের মেয়ে তিনটা খুব মন খারাপ করছে। মেয়ে তিনটার মন খুব নরম। আপনারে খুব মানে। হেই কারণে মনে খুব কষ্ট পাইছে। মহল মেয়েটা তো কানতেছিল।আহসান কিছুই বলল না। জলিল মিয়া পানের পিক ফেলে বলল, এই সব ছোট কাজ করব আমার মতো মানুষ, আপনে হইলেন–। জলিল মিয়া কথা শেষ করল না। মাঝপথে থেমে গেল। আহসান বলল, মহল খুব কাঁদছিল?

জ্বি। বয়স কম মেয়ে। দুনিয়ার হালচাল তো জানে না। এরা ভাবে এক রকম দুনিয়া চলে অন্য রকম। প্ৰবেসার সাব রিকশা নিয়া তাড়াতাড়ি যান গিয়া। আকাশের অবস্থা খারাপ।আহসান রিকশা নিল না। হাঁটতে শুরু করল। আকাশে মেঘের ঘনঘটা। ঘন-ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। জোর বৃষ্টি হবে। হোক। পৃথিবী ভাসিয়ে নিয়ে যাক। ভিজতে ইচ্ছে। করছে। কি যেন সেই গানটা—এসো কর স্নান নবধারা জলে, এসো নীপবনে।

জেরিন দরজা খুলল। খুশি-খুশি গলায় বলল, সত্যি তাহলে এলেন? আমার মনে হচ্ছিল—শেষ পর্যন্ত বোধ হয় আসবেন না।বলে গিয়েছিলাম তো আসব।তা বলে গিয়েছিলেন। পুরোপুরি বিশ্বাস করি নি। মনে হচ্ছিল পালাতে চাচ্ছেন বলে একটা অজুহাত তৈরি করেছেন।পালাতে চাইলেও সবসময় পালানো যায় না।ভালোই বলেছেন। যারা পালাতে চায় না তারাই শুধু পালাতে পারে। যেমন তারিন আপা। আপনার রুগী কেমন?

ভালো না। বাঁচবে বলে মনে হচ্ছে না।আপনাকে তার জন্যে খুব একটা দুঃখিত মনে হচ্ছে না।দুঃখিত মনে হওয়ার কারণও নেই। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ মরছে।খাবার দিতে বলি। হাত-মুখ ধোবেন তো? হ্যাঁ ধোব।জেরিন এবং আহসান খেতে বসল। অপরিচিত একটা কাজের মেয়ে শুধু খাবারদাবার এগিয়ে দিচ্ছে। এই বাড়িতে কোনো কাজের লোকই বেশি দিন টেকে না।

জেরিন লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, বাবা শুয়ে পড়েছেন। বাবার তো সব ঘড়ি ধরা, সাড়েদ দশটা বাজতেই বাতি নিভিয়ে নিদ্রা। মার মাথা ধরেছে। কাজেই খাবার সাজিয়ে একমাত্র আমিই আপনার জন্য জেগে আছি।থ্যাংকস।আপনি যা-যা পছন্দ করেন সবই জোগাড় করার চেষ্টা করেছি। নিধুর মা তুমি চলে যাও। তোমাকে আর লাগবে না। খাওয়া শেষ হলে বলব, তখন টেবিল গোছাবে।

নিধুর মা চলে গেল। আহসানের খেতে ভালো লাগছে না। টেবিলে প্রচুর আয়োজন। প্রতিটি পদই চেখে দেখতে হবে ভেবেও বিরক্তি লাগছে।খেতে কেমন হয়েছে? ভালো।আপনি যে তরকারিতে খুব ঝাল খান তা মনে ছিল না। সব তরকারিই বোধ হয় আপনার কাছে মিষ্টি-মিষ্টি লাগছে।তুমি বেঁধেছ? কেন আমি কি রাঁধতে জানি না?

রাতদিন পড়াশোনা নিয়ে থাক, তাই বলছি।দুলাভাই, আপনি কিন্তু কিছু খাচ্ছেন না।শরীরটা ভালো নেই জেরিন। কিছু মুখে দিতে ইচ্ছে করছে না। তুমি খাও আমি বসে-বসে দেখি।জেরিন একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। মৃদু স্বরে বলল, বাবাকে আপনি চমৎকার একটা মিথ্যা কথা বললেন। শ্বশুরকে খুশি করে দিলেন।মিথ্যা নাও তো হতে পারে। কোনো দিন দ্বিতীয় একটি মেয়েকে বিয়ে করব না এমন প্রতিজ্ঞা ছিল না।

আমার মনে হয় আপনি বাবাকে মিথ্যা বলেছেন। আজকের রাতটা আপনার জন্য খুব একটা বিশেষ রাত। এই রাতে অন্য একটি মেয়েকে বিয়ের প্রসঙ্গ আপনি তুলতেই পারেন না। তুলেছেন কারণ আপনি বাবাকে নিশ্চিত করতে চেয়েছেন।ঠিকই ধরেছ।দুলাভাই, আপনার সঙ্গে আমি রূঢ় আচরণ করেছি। আপনি কিছু মনে করবেন না। আমি ভালো করেই জানি ঐ চিঠি আপনার বাবা নিজে থেকেই লিখেছেন। সেখানে আপনার কোনো ভূমিকা নেই।জানতে যখন তখন এ কথাগুলো বললে কেন?

খুব রাগ হচ্ছিল বলে বলেছিলাম। রাগের সময় আমরা অনেক অন্যায় কথা বলি। বলি না? তা অবশ্যি বলি।দুলাভাই আপনি কি আমাকে খুব অপছন্দ করেন? অপছন্দ করব কেন? আমার মনে হয় করেন। আপার সঙ্গে আমার কোনো মিল নেই এই কারণেই করেন।আহসান হেসে ফেলল। জেরিন গম্ভীর গলায় বলল, কেউ আমাকে অপছন্দ করলে আমার খুব খারাপ লাগে। আমার সব সময় ইচ্ছা করে আমাকে সবাই ভালবাসুক।

তোমার একার না। এরকম ইচ্ছে আমাদের সবারই করে।আমার একটু বেশি করে। আশ্চর্য কাণ্ড কি জানেন, আমার তেইশ বছর বয়স হল এখন কেউ আমাকে ভালবাসার কথা বলে নি।এখনো তো সময় সামনে আছে-ভবিষ্যতে বলবে।যদি বলে তাহলে হয়ত তার মুখের ওপর হেসে ফেলব।হ্যাঁ সেই সম্ভাবনাও আছে।আহসান উঠে পড়ল। হাত ধুতে-ধুতে বলল, এখন বাসার দিকে রওনা হব। তুমি আমার জন্যে যে মমতা দেখিয়েছ তা আমি অনেক দিন মনে রাখব। সো নাইস অব ইউ।জেরিন বিস্মিত হয়ে বলল, যাবেন মানে? কোথায় যাবেন?

বাসায় যাব। কাল ক্লাস আছে। পড়া তৈরি করব। মাস্টারদের ছাত্রদের মতো পড়া তৈরি করতে হয়।আপনাদের পুরনো বাসরঘর এত কষ্ট করে সাজিয়ে রাখলাম আর আপনি চলে যাবেন? ঐসব ছেলেমানুষির বয়স কি এখন আছে? গল্প-উপন্যাসে এ-সব মানায়। শূন্য বাসরঘরে নায়ক ঢুকবে পুরানো স্মৃতি মনে পড়বে। সবই আছে শুধু সে নেই। বালিশের পাশে বাসি ফুলের মালা। বিছানায় স্মৃতিময় চুলের কাঁটা।

দুলাভাই আপনি কিন্তু যেতে পারবেন না। আপনি চলে গেলে আমার খারাপ লাগবে। খুবই খারাপ লাগবে।খারাপ লাগবে কেন? দুপুরে আপনার সঙ্গে জঘন্য ব্যবহার করেছি। এই জন্যেই খারাপ লাগবে।এ-সব নিয়ে আমি মাথা ঘামাচ্ছি না জেরিন।আমি জানি আপনি মাথা ঘামাচ্ছেন না। কারণ আমাকে আপনি খুবই তুচ্ছ জ্ঞান। করেন। আমি একটা মন্দ কথা বললেও আপনার কিছু যায়-আসে না।

এক জিনিস নিয়ে তর্ক করতে ভালো লাগছে না। ঠিক আছে তুমি খুবই তুচ্ছ। দয়া করে এক কাপ চা দাও। খেয়ে চলে যাব। ঝড়-বৃষ্টি হবে।জেরিন গম্ভীর মুখে চা বানিয়ে আনল। এবং খুবই হালকা গলায় বলল, আপনি আপনার বাড়িওয়ালার যে মেয়েটিকে বিয়ে করবেন বলে ঠিক করেছিলেন তার নাম কি মহল? আহসান চমকে উঠে বলল, ওদের নাম জান তুমি?

হ্যাঁ জানি।কী করে জান? আপনার খোঁজে একবার গিয়েছিলাম। তখন আলাপ হয়েছে।কই আমি তো কিছু জানি না। ওরা তো আমাকে কিছু বলে নি। অবশ্যি এমনিতেও ওদের সঙ্গে আমার কথাবার্তা হয় না। মেয়েগুলো খুব লাজুক।লাজুক কিনা জানি না তবে মাথায় ছিট আছে।

একদিন নিউ মার্কেটে ওদের সঙ্গে দেখা। তিন বোন একসঙ্গে ওজনের যন্ত্রে দাঁড়িয়ে ওজন নিচ্ছে। তিন জন একসঙ্গে ওজন নেবার পেছনে যুক্তিটা কি বলুন তো? আহসান শব্দ করে হেসে উঠল। জেরিন বলল, আপনি কি জানেন এই মেয়ে তিনটি আপনাকে খুব পছন্দ করে। বিশেষ করে মহল মেয়েটি।কি করে বুঝলে?

 

Read more

বাসর পর্ব – ৮ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *