তখন মনে হল রাস্তায় একটা পাগলা কুকুর বের হয়েছে, ভয়টা বােধহয় ঐ কুকুরের কারণে। আমি একটা লাঠি হাতে নিলাম।
‘শুক্লপক্ষের রাত। ফকফকা জ্যোৎস্না, তবু পরিষ্কার সবকিছু দেখা যাচ্ছে না। কারণ কুয়াশা। কার্তিক মাসের শেষে এদিকে বেশ কুয়াশা হয়। ‘
‘নদীর কাছাকাছি আসতেই কুকুরটাকে দেখলাম। গাছের নিচে শুয়ে ছিল। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়াল এবং পিছনে–পিছনে আসতে লাগল। মাঝে–মাঝে চাপা শব্দ করছে। পাগলা কুকুর পিছনে–পিছনে আসছে, আমি এগুচ্ছি—ব্যাপারটা খুব ভয়াবহ। যে–কোনাে মুহুর্তে এই কুকুর ছুটে এসে কামড়ে ধরতে পারে। আমি কুকুরটাকে তাড়াবার চেষ্টা করলাম। ঢিল ছুঁড়লাম, লাঠি দিয়ে ভয় দেখালাম।
কুকুর নড়ে না, দাঁড়িয়ে থাকে। চাপা শব্দ করতে থাকে। আমি হাঁটতে শুরু কললেই সেও হাঁটতে শুরু করে। যাই হােক, আমি কোনােক্রমে নদীর পাড়ে এসে পৌছলাম। তখন আমার খানিকটা সাহস ফিরে এল। কারণ, পাগলা কুকুর পানিতে নামে না। পানি দেখলেই এরা ছুটে পালায়। ‘অদ্ভুত কাণ্ড, কুকুর পানি দেখে ছুটে পালাল না! আমার পিছনে–পিছনে পানিতে নেমে পড়ল। আমার বিস্ময়ের সীমা রইল না। ‘আমি নদীর ওপারে উঠলাম। কুকুরটাও উঠল—আর ঠিক তখন একটা ব্যাপার ঘটল।
বৃহন্নলা-পর্ব-৫
সুধাকান্তবাবু থামলেন।
আমি বিরক্ত গলায় বললাম, আপনি জটিল জায়গাগুলিতে দয়া করে থামবেন না। গল্পের মজা নষ্ট হয়ে যায়।
সুধাকান্তবাবু বললেন, এটা কোনাে গল্প না। ঘটনাটা কীভাবে বলব ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না বলে থেমেছি।‘
‘আপনি মােটামুটিভাবে বলুন, আমি বুঝে নেব।‘
‘কুকুরটা আমার খুব কাছাকাছি চলে এল। পাগলা কুকুর আপনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন কিনা জানি না। ভয়ংকর দৃশ্য ! সারাক্ষণ হাঁ করে থাকে। মুখ দিয়ে লালা পড়ে, চোখের দৃষ্টিটাও অন্য রকম। আমি ভয়ে কাঠ হয়ে গেছি। ছুটে পালাব বলে ঠিক করেছি, ঠিক তখন কুকুরটা কেন জানি ভয় পেয়ে গেল।
অস্বাভাবিক ভয়। একবার এ দিকে যাচ্ছে, একবার ও–দিকে যাচ্ছে। চাপা আওয়াজটা তার গলায় আর নেই। সে ঘেউঘেউ করছে। আমার কাছে মনে হল, সে কুকুরের ভাষায় আমাকে কী যেন বলার চেষ্টা করছে। এরকম চলল মিনিট পাঁচেক। তার পরই সে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সাঁতরে ওপারে চলে গেল। পুরােপুরি কিন্তু গেল না, ও–পারে দাঁড়িয়ে রইল এবং ক্রমাগত ডাকতে লাগল।
বৃহন্নলা-পর্ব-৫
‘আমি একটা সিগারেট ধরালাম। তখন আমি ধূমপান করতাম। মাস তিনেক হল ছেড়ে দিয়েছি। যাই হােক, সিগারেট ধরাবার পর ভয়টা পুরােপুরি কেটে গেল। হাত থেকে লাঠি ফেলে দিলাম। বাড়ির দিকে রওনা হব বলে ভাবছি, হঠাৎ মনে হল নদীর ধার ঘেঁষে বড়াে–হওয়া ঘাসগুলাের মাঝখান থেকে কী–একটা যেন নড়ে উঠল।
আপনি আবার ভয় পেলেন? “না, ভয় পেলাম না। একবার ভয় কেটে গেলে মানুষ চট করে আর ভয় পায় না। আমি এগিয়ে গেলাম।
‘কুকুরটা তখনাে আছে? ‘হ্যা, আছে। ‘তারপর বলুন।
কাছাকাছি এগিয়ে গিয়ে দেখলাম একটা মেয়ের ডেডবডি। এগার–বার বছর বয়স। পরনে ডােরাকাটা শাড়ি।
বলেন কী আপনি। ‘যা দেখলাম তাই বলছি। ‘মেয়েটা যে মরে আছে তা বুঝলেন কী করে?
যে–কেউ বুঝবে। মেয়েটা মরে শক্ত হয়ে আছে। হাত মুঠিবদ্ধ করা। মুখের কষে রক্ত জমে আছে।”
‘কী সর্বনাশ। ‘আমি দীর্ঘ সময় মেয়েটার সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম। ‘ভয় পেলেন না?
‘না, ভয় পেলাম না। আপনাকে তাে আগেই বলেছি, একবার ভয় পেলে মানুষ দ্বিতীয় বার চট করে ভয় পায় না।‘
বৃহন্নলা-পর্ব-৫
‘তারপর কী হল বলুন।
‘মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল। বাচ্চা একটা মেয়ে এইভাবে মরে পড়ে আছে, কেউ জানছে না। কীভাবে না জানি বেচারি মরল। ডেডবডি এখানে ফেলে রেখে যেতে ইচ্ছা করল না। ফেলে রেখে গেলে শিয়াল–কুকুরে ছিড়েখুঁড়ে খাবে। আমার মনে হল এই মেয়েটাকে নিয়ে যাওয়া উচিত।
‘আশ্চর্য তো!‘ ‘আশ্চর্যের কিছু নেই। আমার অবস্থায় পড়লে আপনিও ঠিক তাই করতেন। ‘না, আমি তা করতাম না। চিৎকার করে লােক ডাকাডাকি করতাম।‘ ‘আশেপাশে কোনাে বাড়িঘর নেই। কাকে আপনি ডাকতেন? ‘তারপর কী হল বলুন।
সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘আপনি আমাকে একটা সিগারেট দিন। সিগারেট খেতে ইচ্ছা করছে।‘
আমি সিগারেট দিলাম। বৃদ্ধ সিগারেট ধরিয়ে খকখক করে কাশতে লাগলেন।
অমি বললাম, তারপর কী হল বলুন। সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘ঘটনাটা এখানে শেষ করে দিলে কেমন হয়? আমার কেন জানি আর বলতে ইচ্ছা করছে না।‘
‘ইচ্ছে না করলেও বলুন। এখানে গল্প শেষ করার প্রশ্নই ওঠে না। ‘এটা গল্প না।
গল্প না যে তা বুঝতে পারছি। তারপর বলুন আপনি কী করলেন। মেয়েটাকে তুললেন?
‘হা তুললাম। কেন তুললাম সেটাও আপনাকে বলি। একটা অপরিচিত মেয়ের শবদেহ কেউ চট করে কোলে তুলে নিতে পারে না। আমি এই কাজটা করলাম, কারণ এই বালিকার মুখ দেখতে অবিকল
সুধাকান্তবাবু থেমে গেলেন। আমি বললাম, ‘মেয়েটি দেখতে ঐ মেয়েটির মতাে, যার সঙ্গে আপনার বিয়ের কথা হয়েছিল। আরতি?
আরতি। আপনার স্মৃতিশক্তি তাে খুব ভালাে! ‘আপনি আপনার গল্পটা বলে শেষ করুন।
বৃহন্নলা-পর্ব-৫
‘মেয়েটি দেখতে অবিকল আরতির মতাে। আমি মাটি থেকে তাকে তুললাম। মরা মানুষের শরীর ভারি হয়ে যায়, লােকে বলে। আমি দেখলাম মেয়েটার শরীর খুব হালকা। একটা কথা বলতে ভুলে গেছি, মেয়েটাকে তােলার সঙ্গে–সঙ্গে কুকুরটা চিৎকার বন্ধ করে দিল। আমার কাছে মনে হল চারদিক হঠাৎ যেন অস্বাভাবিক নীরব হয়ে গেছে। আমি মেয়েটাকে নিয়ে রওনা করলাম।
‘আপনার ভয় করল না?
‘না, ভয় করে নি। মেয়েটার জন্যে মমতা লাগছিল। আমার চোখে প্রায় পানি এসে গিয়েছিল। কার–না–কার মেয়ে, কোথায় এসে মরে পড়ে আছে। বাড়িতে এসে পৌছলাম।
Read more