বেলতলাতে দু-দুবার – সৈয়দ মুজতবা আলী

বেলতলাতে দু-দুবার

বার্লিন শহরে ‘হিন্দুস্থান হৌসে’র আড্ডা সেদিন জমিজমি করেও জমছিল না। নাৎসিদের প্রতাপ দিনের পর দিন বেড়েই যাচ্ছে। আড্ডার তাতে কোনো আপত্তি নেই, বরঞ্চ খুশি হবারই কথা। নাৎসিরা যদি একদিন ইংরেজের পিঠে দু-চার ঘা লাগাতে পারে তাতে অদ্ভুত এ-আর কেউ বেজার হবে না। বেদনাটা সেখানে নয়, বেদনাটা হচ্ছে দু-একটা মুখ নাৎসিকে নিয়ে।

ফর্সা ভারতীয়কে তারা মাঝে মাঝে ইহুদি ভেবে কড়া কথা বলে, আর এক নাক-বাঁকা নীল-চোখে কাশ্মীরীকে তারা নাকি দু-একটা ঘুষিঘাষাও মেরেছে।আড্ডার চ্যাংড়া সদস্য গোলাম মৌলা এসব বাবদে নাৎসিদের চেয়েও অসহিষ্ণু। বলল, আমরা যে পরাধীন সে-কথা সবাই জানে।

তবে কেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দেওয়া? এক ব্যাটা নাৎসি সেদিন আমার সঙ্গে তর্কে হেরে গিয়ে চটেমটে বলল, ‘তোমরা তো পরাধীন, তোমরা এসব নিয়ে ফপরদালালি কর কেন?’ নাৎসিদের তর্ক করার কায়দা অদ্ভুত।।পুলিন সরকার বলল, তা তুই বললি না কেন, পরাধীন বলেই তো বাওয়া ভারতবর্ষে কলকজা বেচে আর ইনশিওরেন্স কোম্পানি খুলে দু’পয়সা কামিয়ে নিচ্ছে।

ভারতবর্ষের লোক তো আর হটেনটট নয় যে স্বরাজ পেলেও কলকজা বানাতে পারবে না! জানিস, সুইজারল্যান্ডে এখনও জাপানী ঘড়ি বিককিরি হয়।বিয়ারের ভিতর থেকে সুয্যি রায় বললেন, ‘নাই তাই খাচ্ছো,…….. থাকলে কোথা পেতে?……….. কহেন কবি কালিদাস……….. পথে যেতে যেতে।’

কাটা ন্যাজের ঘা’তে যে মাছিগুলো পেট ভরে খেয়ে নিচ্ছিল তারাও তাই নিয়ে গরুটাকে কটুকাটব্য করেনি। নাৎসিদের বুদ্ধি ঐ রকমেরই। যে হাত খাবার দিচ্ছে সেইটেকেই কামড়ায়। নাৎসিদের তুলনায় ইংরেজ সম্বন্ধীরা ঘুঘু—ভারতবর্ষের পরাধীনতাটার সঙ্গে ব্যবহার করে যেন বাড়ির ছোট বউ।

মাঝে মাঝে গলা খাঁকারি দেয় বটে, কিন্তু তিনি যে আছেন সেকথাটা কথাবার্তায় চালচলনে আকছারই অস্বীকার করে যায়।চাচা গলাবন্ধ কোটের ভিতর হাত ঢুকিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসেছিলেন। তার ন্যাওটা ভক্ত গোঁসাই জিজ্ঞেস করল, চাচা যে রা কাড়ছেন না?’চাচা চোখ না খুলেই বললেন, আমি ওসবেতে নেই। আমার শিক্ষা হয়ে গিয়েছে।

সবাই অবাক। গোঁসাই জিজ্ঞেস করল, সে কী কথা? নাৎসিরা তো দাবড়াতে আরম্ভ করেছে মাত্র সেদিন। এর মাঝে কিছু একটা হলে তো আমরা খবর পেতুম।কথাটা সত্য। চাচার গলাবন্ধ কোট, শ্যামবর্ণ চেহারা, আর রবিঠাকুরী বাবরী বার্লিন শহরের হাইকোর্ট। যে দেখেনি তার বাড়ি পদ্মার হে-পারে।

চাচার উপর চোটপাট হলে একটা আন্তর্জাতিক না হোক ‘আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি’ হয়ে যাবার সম্ভাবনা।চাচা বললেন, ‘তোরা তো দেখছিস নাৎসিদের দ্বিজত্ব। তাদের পয়লা জনম হয়েছিল মিউনিকে। আমি তখন জব্বলপুরের শ্রীধর মুখুয্যে অভিমানভরে বলল, চাচা, আপনি কি আমাদের এতই বাঙাল ঠাওরালেন যে আমরা পুশের (Putsch) খবরটা পর্যন্ত জানিনে? চাচা বললেন, এহ বাহ্য, আমি তারও আগেকার কথা বলছি।

এই ভুলুণ্ডি সূয্যি রায় আর আমি তখন মিউনিকে পাশাপাশি বাড়িতে থাকতুম। মিউনিক বললে ঠিক কথা বলা হল না। আমরা থাকতুম মিউনিক থেকে মাইল পনরো দূরে, ছোট্ট একটা গ্রামে—ডেলিপ্যাসেঞ্জরি করলে সব দেশেই পয়সা বাঁচে। আমি থাকতুম এক মুদির বাড়িতে। নিচের তলায় দোকান, উপরে তিন ছেলে, এক মেয়ে, আর আমাকে নিয়ে মুদির সংসার।

মুদির সংসারটির দুটি মহৎ গুণ ছিলকাচ্চা-বাচ্চা-বাপ-মা সকলেরই ঠাট্টা-মস্করার রসবোধ ছিল প্রচুর আর ওস্তাদী সঙ্গীতের নামে তারা অজ্ঞান। বড় ছেলে অস্কার বাজাতে বেয়ালা, মেয়ে করতাল-ঢোল, বাপ পিয়ানো আর মেজো ছেলে হুবের্ট চেলল্লা। কাজকর্ম সেরে দু’দণ্ড ফুরসৎ পেলেই কনসার্টকাজের ফাঁকে ফাঁকে ঠাট্টা-মস্করা।

কিন্তু এদের মধ্যে আসল গুণী ছিল অস্কার। তবে তার গুণের সন্ধান পেতে আমার বেশ কিছুদিন লেগে গিয়েছিল—কারণ অস্কারকে পাওয়া যেত দুই অবস্থায়। হয় টং মাতাল, নয় মাথায় ভিজে পট্টি বাঁধা। তখন সে প্রধানত আমাকে লক্ষ্য করেই বলত, ‘ডু ইন্ডার, ওরে ভারতবাসী কালা শয়তান, তোরা যে মদ খাসনে সেইটেই তোদের একমাত্র গুণ।

তোর সঙ্গে থেকে থেকে আর কাল রাত্রির বাইশ গেলাশের পর মেয়ে মারিয়া আমাকে বলল, বাইশ না বিয়াল্লিশ জানল কী করে? পনরোর পর তো ও আর হিসেব রাখতে পারে না।মা বলল, তাই হবে। কাল রাত্রে চারটের সময় অস্কার বাড়ি ফিরে তো হড়হড় করে সব বিয়ার গলাতে আঙুল দিয়ে বের করে দিচ্ছিল।

বোধহয় সন্দেহ হয়েছিল মদওয়ালা যে বাইশ গ্লাসের দাম নিল তাতে কোনো ফাঁকি নেই তো! বমি করছিল বোধহয় মেপে দেখবার জন্য।অস্কার বলল, ওসব কথায় কান দিয়ো না হে ইভার (ভারতীয়)। দরকারও আর নেই। আমি এই সর্বজনসমক্ষে মা-মেরির দিব্যি কেটে বললুম, আর কখনো মদ স্পর্শ করব না।

মদ মানুষকে পরের দিন কী রকম বেকাবু করে ফেলে এই ভিজে পড়িই তার লেবেল। বাপ রে বাপ, মাথাটা যেন ফেটে যাচ্ছে।ভিজে পট্টিতেও আর কুলোল না। অস্কার কল খুলে মাথাটি নিচে ধরল।সেখান থেকেই জলের শব্দ ডুবিয়ে অস্কার হুঙ্কার দিয়ে বলল, কিন্তু আমাকে বিয়ারে ফাঁকি দিয়ে পয়সা মারবে কে শুনি? ইঃ! বক্সিং-এর পয়লা প্রাইজের কথা কি মদওয়ালা ভুলে গিয়েছে? তার হোটেলের বাগানেই তো বাবা ফাইনালটা হলো।

ব্যাটার নাকটা এমনিতেই থ্যাবড়া, আমার বাঁ হাতের একখানা সরেস আন্ডারকাট খেলে সেনাক মিউনিক-বার্লিন সদর রাস্তার মতো ফেলেট হয়ে যাবে না? কথাটা ঠিক। বিয়ারওয়ালা বরঞ্চ ইনকাম-টেক্স অফিসারকে ফাঁকি দেবার চেষ্টা করতে পাবে—আভে মারিয়া মন্ত্র কমিয়েসমিয়ে ভগবানকে ফাঁকি প্রতি রবিবারে গির্জেঘরে সে দেয়ই, না হলে সময়মতো দোকান খুলবে কী করে—কিন্তু বিয়ার নিয়ে অস্কারের সঙ্গে মস্করা ফস করে কেউ করতে যাবে না।

ঢকঢক করে এক গেলাশ নেবুর সরবৎ খেয়ে অস্কার বলল, মাথার ভিতর যেন এ্যারোপ্লেনের প্রপেলার চলছে, চোখের সামনে দেখছি গোলাপি হাতি সারে সারে চলেছে, জিবখানা যেন তালুর সঙ্গে ইস্কু মারা হয়ে গিয়েছে, কানে শুনছি মা যেন বাবাকে ঠ্যাঙাচ্ছে।মুদি বলল, ভাললা হোক মন্দ হোক, আমার তো একটা আছে, তুই তো তাও জোটাতে পারলিনে।

অস্কার কান না দিয়ে বলল, ‘কিন্তু আর বিয়ার না। মা-মেরি সাক্ষী, পীর রেমিগিয়ুস সাক্ষী, কালা শয়তান ইভার সাক্ষী, আর বিয়ার না।’ অস্কারকে সকালবেলা যে কোনো মদ্য-নিবারণী সভার বড়কর্তা বানিয়ে দেওয়া যায়। সন্ধ্যের সময় বিয়ারের জন্য সে আল কাঁপোনের ডাকাতদলের সর্দারী করতে প্রস্তুত।

আমি পকেট-ডায়েরি খুলে পড়ে বললুম, অস্কার, এই নিয়ে তুমি সাতাশীবার মদ ছাড়ার প্রতিজ্ঞা করেছ।অস্কার বলল, ‘যাঃ! তুই সাতাশী পর্যন্ত গুনতেই পারিসনে। ভারতবর্ষে অশিক্ষিতের সংখ্যা শতকরা সাতাশী। তুই তো তাদের একজন। ওখানে পাঠশালা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে বলেই তো এদেশে এসেছিস। দুই সাতাশীতে ঘুলিয়ে ফেলেছিস।

মুদির মা বলল, অস্কার চাকরি পেয়েছে আঠারো বছর বয়সে। সেই থেকে প্রতি রাত্রেই বিয়ার, ফি সকাল মদ ছাড়ার শপথ। এখন তার বয়স বাইশ। সাতাশীবার ভুল বলা হল।অস্কার বলল, ঐ যাঃ! বেবাক ভুলে গিয়েছিলুম, আজ আমাদের কারখানার সালতামামী পরব—বিয়ার পার্টি। চাকরির কথায় মনে পড়ল। কিন্তু না, না, না, আর বিয়ার না।

দেখো, ইন্ডার, আজ যদি পার্টির কোনো ব্যাটা আসে তবে তুমি ভারতীয় কায়দায় তাকে নরবলি দেবে।’চাচা বললেন, আমি আজও বুঝতে পারিনে অস্কার এই পট্টিবাঁধা মাথা নিয়ে কী করে প্রেসিশন মেশিনারির কাজ করত। মদ খেলে তো লোকের হাত কাঁপে, চোখের সামনে গোলাপি হাতি দেখে।

অস্কার এক ইঞ্চির হাজার ভাগের এক ভাগ তা হলে দেখতই বা কী করে আর বানাতেই বা কী কৌশলে? এত সূক্ষ্ম কাজ করতে পারত বলে তাকে মাত্র দু’ঘন্টা কারখানায় খাটতে হত। মাইনেও পেত কয়েক তাড়া নোট। তাই দিয়ে খেত বিয়ার আর করত দান-খয়রাত। দ্বিতীয়টা হরবকত।

মৌজে থাকলে তো কথাই নেই, পট্টিবাঁধা অবস্থায় ও মোটরসাইকেল থেকে নেবে বুড়ি দেশলাইওয়ালীর কাছ থেকে একটা দেশলাই কিনে এক ডজনের পয়সা দিত।অস্কার ছিল পাঁড় নাৎসি। আমাকে বলত, এ সব ভিখিরি আতুরকে কেন যে সরকার গুলি করে মারে না একথাটা এখনো আমি বুঝে উঠতে পারিনে। সমস্ত দেশের কপালে আছে তো কুল্লে তিন মুঠো গম।

তারই অর্ধেক খেয়ে ফেললে এ বুড়ি, ও কানী, সে খোড়া। সোমখ জোয়ানরা খাবে কী, দেশ গড়বে কী দিয়ে? জেকে যখন নেকড়ে তাড়া করে তখন দুটো দুবলা বাচ্চা ফেলে দিয়ে বাঁচাতে হয় তিনটে তাগড়াকে। সব কটাকে বাঁচাতে গেলে একটাকেও বাঁচানো যায় না। কথাটা এত সোজা যে কেউ স্বীকার করবে না, পাছে লোকে ভাবে লোকটা যখন এত সোজা কথা কয় তখন সে নিশ্চয়ই হাবা।

আমি বললুম, তিনটেকে বাঁচাতে গিয়ে দুটোকে নেকড়ের মুখে দিয়ে যদি অমানুষ হতে হয় তবে নাই বাঁচল একটাও।অস্কার যেন ভয়ঙ্কর বেদনা পেয়েছে সে রকম মুখ করে বললে, বললি? তুইও বললি? তুই না এসেছিস এদেশে পড়াশোনা করতে! এদেশের পণ্ডিতদের জুড়ি পৃথিবীতে আর কোথাও নেই বলেই তুই এখানে এসেছিস।

এ পণ্ডিতের জাতটা মরে যাক এই বুঝি তোর ইচ্ছে? বল দিকিনি বুকে হাত দিয়ে, এই জর্মন জাতটা মরে গেলে পৃথিবীটা চালাবে কে? পণ্ডিত, কবি, বীর এ জাতে যেমন জন্মেছে–’ আমি বললুম, ‘থাক থাক। তোমার ওসব লেকচার আমি ঢের ঢের শুনেছি।অস্কার মটরসাইকেল থামিয়ে বলল, যা বলেছিস। তোকে এসব শুনিয়ে কোনো লাভ নেই।

তুই মুসলমান, তারা কখনো ধর্ম বদলাসনে, যা আছে তাই নিয়ে আঁকড়ে পড়ে থাকিস। চ, একটা বিয়ার খাবি?’ আমি পিনিয়ন থেকে নেমে বললুম, গুড বাই। আর দেখো, তুমি সোজা বাড়ি যেয়ো। আমি লোকাল ধরব।অস্কার বলল, ‘নিশ্চয়, নিশ্চয়। তোমাকে তো আর নিত্যি নিত্যি আমি লিফট দিতে পারিনে।

কারখানায় পরীরা সব ভয়ঙ্কর চটে গিয়েছে আমার উপর, কাউকে লিফট দিইনে বলে। প্রেমট্রেম সব বন্ধ।আমি রাগ করে বললুম, এ কথাটা এত দিন বললানি কেন? আমি তোমাকে পইপই করে বারণ করিনি আমার কখন ক্লাস শেষ হয় না হয় তার ঠিক নেই, তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করবে না।

অস্কার বলল, তোমার জন্য আমি আর অপেক্ষা করলুম কবে? সামনের শরাবখানায় ঢুকি এক গেলাস বিয়ারের তরে। জানলা দিয়ে যদি দেখা যায় তুমি বেরিয়ে আসছ তাহলে কি তোমার দিকে তাকানোটাও বারণ? বেড়ালটাও তো কাইজারের দিকে তাকায়, তাই বলে কি কাইজার তার গর্দান নেন নাকি?’ চাচা বললেন, অস্কারের সঙ্গে তর্ক করা বৃথা।আর ঐ ছিল তার অদ্ভুত পরোপকার করার পদ্ধতি।

ভিখিরিটাকে তিনটে মার্ক দিলে কেন? অস্কার বলবে, ব্যাটা বেহেড মাতাল, তিন মার্কেটিং নেশা করে গাড়ি চাপা হয়ে মরবে এই আশায়। আমাকে নিত্যি নিত্যি লিফট দেবার জন্য তুমি অপেক্ষা করো কেন?’ ‘সে কি কথা? আমি তো বিয়ার খেতে শরাবখানায় ঢুকেছিলুম!’ ‘নাৎসি পার্টিতে টাকা ঢালছো কেন?’ ‘তাই দিয়ে বন্দুকপিস্তল কিনে বিদ্রোহ করবে, তারপর ফাঁসিতে ঝুলবে বলে।

’ আমি একদিন বলেছিলুম, ‘মিশনরিরা যে আফ্রিকায় খ্রীষ্টধর্ম প্রচার করতে যায় সেটা বন্ধ করে দেওয়া উচিত।’ অস্কার বলল, ‘তাহলে দুর্ভিক্ষের সময় বেচারী নিগ্রোরা খাবে কী? মিশনরির মাংস উপাদেয় খাদ্য।’চাচা বললেন, কিন্তু এসব হাইজাম্প-লঙজাম্প শুধু মুখে মুখে।

অস্কার নাৎসি আন্দোলনের বেশ বড় ধরনের কর্তা আর নাৎসিদের নিয়ে নিজে যতই রসিকতা করুক না কেন, আর কেউ কিছু বললে তাকে মারমার করে তাড়া লাগাত। আমার সঙ্গে এক বৎসর ধরে যে এত বন্ধুত্ব জমে উঠেছিল সেইটি পর্যন্ত সে একদিন অকাতরে বিসর্জন দিল ঐ নালিদের সম্বন্ধে আমি আমার রায় জাহির করেছিলুম বলে।

রান্নাঘরে সকালবেলা সবাই জমায়েত। সেদিন ছিল রবিবার–সপ্তাহে ঐ একটিমাত্র দিন আমরা সবাই রান্নাঘরে বসে একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট খেতুম, আর হদিন যে যার সুবিধে মতো।মেয়ে মারিয়া পাঁচজনের উপকারার্থে চেঁচিয়ে খবরের কাগজ পড়ছিল। অস্কার মাথায় ভিজে পট্টি বাঁধছিল আর আপনমনে মাথা নেড়ে নেড়ে নিজেকে বোঝাচ্ছিল, বিয়ার খাওয়া বড় খারাপ।

মারিয়া হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, এ খবরটা মন দিয়ে শুনুন, হের ডক্টর।—পাটেনকির্ষেনে হৈ হৈ রৈ রৈ, নাৎসি গুণ্ডা কর্তৃক ইহুদিনী আক্রান্ত। প্রকাশ, ইহুদিনী রাস্তায় নাৎসি পতাকা দেখে ঘাড় ফিরিয়ে নিয়ে আপন বিরক্তি প্রকাশ করেছিল। নাৎসিরা তখন তাকে ধরে নিয়ে এসে পতাকার সামনে মাথা নিচু করতে আদেশ করে।

সে তখনো নারাজি প্রকাশ করাতে নাৎসিরা তাকে মার লাগায়। পুলিশ এসে পড়ায় নাৎসিরা পালিয়ে যায়। তদন্ত চলছে।’ চাচা বললেন, আমি বিরক্তি প্রকাশ করে বললাম, নাৎসি গুণ্ডারা কী করে না-করে আমার তাতে কী? অস্কার আমার দিকে না তাকিয়ে বলল, জাতির পতাকার সম্মান যারা বাঁচাতে চায় তারা গুণ্ডা? আমি কিছু বলার আগেই বুড়ো বাপ বলল, ওটা জাতির পতাকা হল কী করে? ওটা তো নাৎসি পার্টির পতাকা।

আমি বললুম, ঠিক, এবং জাতীয় পতাকাকে কেউ অবহেলা করলে তাকে সাজা দেবার জন্য পুলিশ রয়েছে, আইন-আদালত রয়েছে। বিশেষ করে একটা মেয়েকে ধরে যখন পাঁচটা ষাঁড়ে মিলে ঠ্যাঙায় তখন সেটা গুণ্ডামি না হলে গুণ্ডামি আর কাকে বলে? অস্কার আমার দিকে ঘুরে হঠাৎ ‘আপনি’ বলে সম্বােধন করে বলল, আপনি তা হলে ইহুদিদের পক্ষে? আমি বললুম, অস্কার অত সিরিয়স হচ্ছ কেন? আমি ইহুদিদের পক্ষে না বিপক্ষে সে প্রশ্ন তো অবান্তর।

অস্কার বলল, ‘প্রশ্নটা মোটেই অবান্তর নয়। ইহুদিরা যতদিন এদেশে থাকবে ততদিনই বর্ণসঙ্করের সম্ভাবনা থাকবে। জর্মনির নর্ডিক জাতের পবিত্রতা অক্ষুন্ন রাখতে হবে।’চাচা বললেন, এর পর আমার আর কোনো কথা না বললেও চলত। কিন্তু মানুষ তো আর সবসময় শাস্ত্রসম্মত পদ্ধতিতে ওঠা-বসা করে না, আর হয়তো অস্কার আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়েছিল যে আমার মনে হয়েছিল, কোনো একটা যুৎসই উত্তর দেওয়া প্রয়োজন।

আমি বললুম, ভারতবর্ষেও তো আর্য জাতি রয়েছে এবং তারা জনদের চেয়ে ঢের বেশি খানদানী এবং কুলীন। আর্যদের প্রাচীনতম সৃষ্টি চতুর্বেদ ভারতবর্ষেই বেঁচে আছে। গ্রীস রোমে যা আছে তার বয়স বেদের হাঁটুর বয়সেরও কম।জর্মনির-ফ্রান্সের তো কথাই ওঠে না—পরশু দিনের সব চ্যাংড়ার পাল।

কিন্তু তার চেয়েও বড় তত্ত্বকথা হচ্ছে এই, ভারতবর্ষের যা কিছু প্রাচীন সভ্যতা-সংস্কৃতি নিয়ে তোমরা-আমরা সবাই গর্ব করি সেটা গড়ে উঠেছে আর্য-অনার্য সভ্যতার সংমিশ্রণ অর্থাৎ বর্ণসঙ্করের ফলে। আমাদের দেশে বর্ণসঙ্কর সবচেয়ে কম হয়েছে কাশ্মীরে—আর ভারতীয় সভ্যতায় কাশ্মীরীদের দান ট্যাকে গুঁজে রাখা যায়।

এবং আমার বিশ্বাস যে সব গুণী জর্মনিকে বড় করে তুলেছেন তাদের অনেকেই খাঁটি আর্য নন।আমাকে কথা শেষ না করতে দিয়ে অস্কার হুঙ্কার তুলে বলল, আপনি বলতে চান, আমাদের সুপারম্যানরা সব বাস্টার্ড?’ চাচা বললেন, আমি তো অবাক। কিন্তু ততক্ষণে আমার সবুদ্ধির উদয় হয়েছে। কিছু না বলে চুপ করে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলুম।

চাচা কফিতে চুমুক দিলেন। সেই অবসরে গোলাম মৌলা বলল, আমার সঙ্গেও ঠিক এইরকম ধারাই তর্ক হয়েছিল। কিন্তু আমি তো ভারতীয় সভ্যতার অতশত জানিনে, তাই ওরকম টায়টায় তুলনা দিয়ে তর্ক করতে পারিনি। কিন্তু নাৎসিরা রাগ দেখায় একই ধরনের।চাচা বললেন, কিন্তু মনটা খারাপ হয়ে গেল।

কী প্রয়োজন ছিল তর্ক করার? বিশেষ করে যখন জানি, যত বড় সত্য কথাই হোক মানুষ আপন কৌলীন্য বজায় রাখার জন্য সেটাকেও বিসর্জন দেয়। তার উপর অস্কার জানেই বা কী, বোঝেই বা কী? মানুষটা ভাললা, তর্ক করে আনাড়ির মতো, আর আগেও তো বলেছি তার হাইজাম্পলঙজাম্প তো শুধু মুখেই।আমি আর অস্কার বাড়ির সক্কলের পয়লা ব্রেকফাস্ট খেয়ে বেরতুম।

পরদিন খেতে বসে দেখি অস্কার নেই। যাঁকে তার বরসাতি আর হ্যাটও নেই। বুঝলুম আগেই বেরিয়ে গিয়েছে। মনে কী রকম খটকা লাগল। দুদিনের ভিতরই কিন্তু ব্যাপারটা খোলস হয়ে গেল—অস্কার আমাকে এড়িয়ে বেড়াচ্ছে। শুনলুম মুদি আর তার মা আমার পক্ষ নিয়ে অস্কারকে ধমক দিয়েছেন। অস্কার কোনো উত্তর দেয়নি, কিন্তু আমি রান্নাঘরে থাকলে সেখানে আসে না।

 

Read more

বেলতলাতে দু-দুবার (২য় পর্ব) – সৈয়দ মুজতবা আলী

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *