বেলতলাতে দু-দুবার (৩য় পর্ব) – সৈয়দ মুজতবা আলী

বেলতলাতে দু-দুবার (৩য় পর্ব)

আমাদের দেশে যেমন বাচ্চা মেয়ের নাম ‘পেঁচির মা, ‘ঘেঁচির মা’ হয়, আপন বাচ্চা জন্মাবার বহু পূর্বে, মনিক অঞ্চলে তেমনি ডক্টরেট প্রসব করার পূর্বেই পোয়াতী অবস্থাতেই আত্মীয়স্বজন ডাকতে আরম্ভ করে, ‘হের ডক্টর। আমার তখনো ডক্টরেট পাওয়ার ঢের বাকি, কিন্তু আত্মজনের নেকনজরে আমি য়ুনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হার্ড-বয়লড ‘হের ডক্টর’ হয়ে গিয়েছিলুম।

মারিয়ার অবিশ্যি এই বোেকায় ‘হের ডক্টর’ বলার উদ্দেশ্য ছিল মেয়েটিকে ভালো করে বুঝিয়ে দেওয়া যে অজ পাড়াগাঁয়ের মেলাতে বসে থাকলেই মানুষ কিছু কামার-চামার হতে বাধ্য নয়—আমি রীতিমত খানদানী মনিষ্যি, ‘হের ডক্টর’—বাঙলা কথা।মেয়েটি তখন কাতর হয়ে পড়েছে।

ধীরে ধীরে বলল, হে-র-ড-ক্‌–ট্‌–র!’চাচা বললেন, আমি মনে মনে বললুম দুত্তোর ‘হের ডক্টর’, আর দুত্তোর এই মারিয়াটা! মুখে বললুম, মারিয়া, আমি এখখুনি আসছি। বলে, দিলুম চম্পট।চাচা বললেন, ‘তোরা তো মুনিকে যাসনি, কাজেই জানিসনে মানুষ সেখানে কী পরিমাণ বিয়ার খায়। তাই সবাইকে যেতে হয় ঘনঘন বিশেষ স্থলে।

আমি এসব জিনিস খাইনে, কিন্তু তাই নিয়ে তো মারিয়া আর তর্কাতর্কি জুড়তে পারে না।চাচা বললেন, ঠিক ধরেছিস। ঐ বিদেশী চেহারার যে চটক থাকে তাই নিয়ে বাঁধল ফ্যাসাদ।নাচের মজলিসে, বিশেষ করে একই টেবিলে তো আর ব্যাকরণসম্মত পদ্ধতিতে ইনট্রডাকশন করে দেবার রেওয়াজ নেই। কপোতীটি বিনা আড়ম্বরে শুধালো, আপনি কোন দেশের লোক? উত্তর দিলুম।

তারপর এটা ওটা সেটা এমনকি ফষ্টিটা-নষ্টিটা, অবশ্যি সন্তর্পণে, যেন ফুলদানির ফুলের ভিতর দিয়ে থু দ্য ফ্লাওয়ার্স।ওদিকে দেখি কপোতটি এ জিনিসটা আদপেই পছন্দ করছে না।আমি ভাবলুম, কাজ কী হাঙ্গামা বাড়িয়ে। দু-একটা প্রশ্নের উত্তর দিলুম না, যেন শুনতে পাইনি। কিন্তু মারিয়াটা ঘড়েল মেয়ে।

ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছে চট করে, আর নষ্টামির ভূত চেপেছে তার ঘাড়ে, হয়তো শ্যাম্পেনও তার জন্য খানিকটা দায়ী। সে আরম্ভ করল মেয়েটাকে ওসকাতে। বলল, জানেন, ইনি আমার দাদা হন।মেয়েটি বলল, তা কী করে হয়! ওঁর রঙ বাদামী, চুল কালো, উনি তো ইন্ডার।মারিয়া গম্ভীর মুখে বলল, ঐ তো! উনি যখন জন্মান, মা-বাবা তখন কলকাতার জর্মন কনসুলেটে কর্ম করতেন।

কলকাতার তোক বাঙলা ভাষায় কথা কয়। দাদাকে জিজ্ঞেস করুন উনি বাঙলা জানেন কি না।মেয়েটি হেসে কুটিকুটি। বলল, হ্যাঁ, ওর জর্মন বলাতে কেমন যেন একটু বিদেশী গোলাপের খুশবাই রয়েছে। মেরেছে। বিদেশী ওঁচা এ্যাকসেন্ট হয়ে দাঁড়ালো গোলাপী খুশবাই’! চাচা বললেন, আমি মারিয়াকে দিলুম ধমক দিয়ে করলুম ভুল।

বোঝা উচিত ছিল মারিয়ার স্কন্ধে তখন শ্যাম্পেনের ভূত ড্যাংড্যাং করে নাচছে। শ্যাম্পেনকে ঝাঁকুনি দিলে তার বজবজ বাড়ে বই কমে না। মারিয়া মরমিয়া সুরে কপোতর কাছে মাথা নিয়ে গিয়ে বলল, ‘আর উনি এ্যাসা খাসা নাচতে পারেন। আমাদেরই ওয়ালটু নাচ—আর তার উপর থাকে ভারতীয় জরির কাজ।

আইন, ৎসুয়াই, দ্রাই—আইন, ৎসুয়াই, ড্রাই—তার সঙ্গে ধা, ধিন, না; ধা, তিন না; ডাডরা-না?’ চাচা বললেন, ‘পাঁচপীরের কসম, আমার বাপ-ঠাকুর্দা চতুর্দশ পুরুষের কেউ কখনো নাচেনি। মুখে গরম আলু পড়াতে হয়তো নেচেছে, কিন্তু সে তো ওয়ালট নয়। মেয়েটাও বেহায়ার একশেষ।

মারিয়াকে বলল, তা উনি যে নাচতে পারবেন তাতে আর বিচিত্র কী? কী রকম যেন সাপের মতো শরীর। বলে চোখ দিয়ে যেন আমার গায়ে এক দফা হাত বুলিয়ে নিল।চাচা বললেন, ওঃ! এখনো ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়। ওদিকে ছেলেটাও চটে উঠেছে। আর চটবে নাই বা কেন? বান্ধবীকে নিয়ে এসেছে নাচের মজলিসে ফুর্তি করতে।

সে যদি আরেকটা মদ্দার সঙ্গে জমে যায় তবে কার না রাগ হয়? কপোত দেখি বাজপাখির মূর্তি ধরতে আরম্ভ করছে। তখন তাকিয়ে দেখি তার কোটে লাগানো রয়েছে নাৎসি পার্টির মেম্বারশিপের নিশান। ভারি অস্বস্তি অনুভব করতে লাগলুম।মারিয়া তখন তার-সপ্তকের পঞ্চমে। শেষ বাণ হানলো, ‘একটু নাচুন না, হের ডক্টর।’

আমাদের দেশে যেমন বাচ্চা মেয়ের নাম ‘পেঁচির মা, ‘ঘেঁচির মা’ হয়, আপন বাচ্চা জন্মাবার বহু পূর্বে, মনিক অঞ্চলে তেমনি ডক্টরেট প্রসব করার পূর্বেই পোয়াতী অবস্থাতেই আত্মীয়স্বজন ডাকতে আরম্ভ করে, ‘হের ডক্টর। আমার তখনো ডক্টরেট পাওয়ার ঢের বাকি, কিন্তু আত্মজনের নেকনজরে আমি য়ুনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হার্ড-বয়লড ‘হের ডক্টর’ হয়ে গিয়েছিলুম।

মারিয়ার অবিশ্যি এই বোেকায় ‘হের ডক্টর’ বলার উদ্দেশ্য ছিল মেয়েটিকে ভালো করে বুঝিয়ে দেওয়া যে অজ পাড়াগাঁয়ের মেলাতে বসে থাকলেই মানুষ কিছু কামার-চামার হতে বাধ্য নয়—আমি রীতিমত খানদানী মনিষ্যি, ‘হের ডক্টর’—বাঙলা কথা।মেয়েটি তখন কাতর হয়ে পড়েছে।

ধীরে ধীরে বলল, হে-র-ড-ক্‌–ট্‌–র!’চাচা বললেন, আমি মনে মনে বললুম দুত্তোর ‘হের ডক্টর’, আর দুত্তোর এই মারিয়াটা! মুখে বললুম, মারিয়া, আমি এখখুনি আসছি। বলে, দিলুম চম্পট।চাচা বললেন, ‘তোরা তো মুনিকে যাসনি, কাজেই জানিসনে মানুষ সেখানে কী পরিমাণ বিয়ার খায়। তাই সবাইকে যেতে হয় ঘনঘন বিশেষ স্থলে।

আমি এসব জিনিস খাইনে, কিন্তু তাই নিয়ে তো মারিয়া আর তর্কাতর্কি জুড়তে পারে না।চাচা বললেন, বাইরে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলুম। কষে ঠাণ্ডা বাতাস বুকের ভিতর নিয়ে সিগার-সিগারেটের ধুয়ো যতটা পারি ঝেটিয়ে বের করলুম। মারিয়াটা যে এত মিটমিটে শয়তান কী করে জানব বল। কিন্তু মারিয়ার কথায় মনে পড়ল, ওকে ফেলে তো বাড়ি যাওয়া যাবে না।

বুড়োবুড়ি তাহলে সত্যিই দুঃখিত হবেন। ভাববেন, এই সামান্য দায়টুকু আমি এড়িয়ে গেলুম। কিন্তু ততক্ষণে একটা দাওয়াই বের করে ফেলেছি। শরাবখানার ঠিক মুখোমুখি ছিল আরেকটি ছোটা সে ছোটা বিয়ার ঘর। সেখানে কফিও পাওয়া যায়। অধিকাংশ খদ্দের ওখানে ঢুকে বারে দাঁড়িয়েই ঝপ করে একটা বিয়ার খেয়ে চলে যায়, আর যারা নিতান্ত নিরামিষ তারা বসে বসে কফিতে চুমুক দেয়।

স্থির করলুম, সেখানে বসে কফি খাব, আর জানলা দিয়ে বাইরের দিকে নজর রাখব। যদি মারিয়া বেরোয় তবে তক্ষুণি তাকে কাক করে ধরে বাড়ি নিয়ে যাব। যদি না বেরোয় তবে ঘন্টাখানেক বাদে মারিয়ার তত্ত্বতালাশ করব। শ্যেনও ততক্ষণে ফের কবুতর হয়ে যাবে আশা করাটা অন্যায় নয়।

চাচা শিউরে উঠে বললেন, বাপস! কী মারাত্মক ভুলই না করেছিলুম সেই বিয়ারখানায় ঢুকে। পাঁচ মিনিট যেতে না যেতে দেখি সেই কপোতী শরাবখানা থেকে বেরিয়ে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। তারপর ঢুকল সেই বিয়ারখানাতে। আমার তখন আর লুকোবার বা পালাবার পথ নেই। আমাকে দেখে মেয়েটির মুখে বিদ্যুৎ-চমকানো-গোছ হাসি ঝিলিক মেরে উঠল।

ঝুপ করে পাশের চেয়ারে বসে বলল, একটু দেরি হলো। কিছু মনে করোনি তো? বলে, দিল আমার হাতে হাত, পায়রার বাচ্চা যে রকম মায়ের বুকে মুখ গোঁজে।বলে কী! ছন্ন না মাথা খারাপ? আপন মাথা ঠাণ্ডা করে বুঝলুম, এরকম ধরা চলে এসে অন্য জায়গায় বসাটা হচ্ছে এদেশের প্রচলিত সঙ্কেত। অর্থটা সপত্ন (অর্থাৎ পুংসতীন) ব্যাটাকে এড়িয়ে চলে এস বাইরে। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। তাই সে এসেছে।

মেয়েটা আমার হাতে হাত বুলোত বুলোতে বলল, কিন্তু, ভাই, তুমি কায়দাটা জানো ভালো। টেবিলে তো ভাবখানা দেখালে আমাকে যেন কেয়ারই করো না। বলে আমার গালে দিল একটি মিষ্টি ঠোনা।।চাচা বললেন, আমি তখন মরমর। ক্ষীণ কণ্ঠে বললুম, আপনি ভুল করেছেন। আমায় মাপ করুন।

মেয়েটা তখন একটু যেন বিরক্ত হয়ে বলল, তোমার এই প্রাচ্যদেশীয় টানা-ঠ্যালা, টানা-ঠ্যালা কায়দা থামাও। আমার সময় নেই। হয়তো এতক্ষণে আমার বন্ধুর সন্দেহ হয়েছে আর হঠাৎ এখানে এসে পড়বে। তাহলে আর রক্ষে নেই। তোমার চাচা বললেন, আমি তখন মরমর। ক্ষীণ কণ্ঠে বললুম, আপনি ভুল করেছেন। আমায় মাপ করুন।

মেয়েটা তখন একটু যেন বিরক্ত হয়ে বলল, তোমার এই প্রাচ্যদেশীয় টানা-ঠ্যালা, টানা-ঠ্যালা কায়দা থামাও। আমার সময় নেই। হয়তো এতক্ষণে আমার বন্ধুর সন্দেহ হয়েছে আর হঠাৎ এখানে এসে পড়বে। তাহলে আর রক্ষে নেই। তোমার ফোন নম্বর কত বলল। আমি পরে কন্টাক্ট করবে। তখন তোমার সবরকম খেলার জন্য আমি তৈরি হয়ে থাকবা।

বাঁচালে! নম্বরটা দিলেই যদি মেয়েটা চলে যায় তাহলে আমিও নিষ্কৃতি পাই। পরের কথা পরে হবে। নম্বর বলতেই মেয়েটা দেশলাইয়ের পোড়াকাঠি দিয়ে চট করে সিগারেটের প্যাকেটে নম্বরটা টুকে নিল।সঙ্গে সঙ্গে সেই দুশমন এসে ঘরে ঢুকল।তার চেহারা তখন কপোতের মতো তো নয়ই, বাজপাখির মতোও নয়, মুখ দিয়ে আগুনের হা বেরহে, যেন চীনা ড্রাগন।

আর সে কী চিৎকার আর গালাগালি। আমি তার বান্ধবীকে বদমায়েশি করে, ধড়িবাজের ফেরেব্বাজি দিয়ে ভুলিয়ে নিয়ে এসেছি। একই টেবিলে ওয়াইন খেয়ে, বন্ধুত্ব জমিয়ে এরকম ব্ল্যাকমেলিং, ব্যাকস্ট্যাবিং—আল্লা জানেন, আরো কতরকম কথা সে বলে যাচ্ছিল। সমস্ত বিয়ারখানার লোক তার চতুর্দিকে জড়ো হয়ে গিয়েছে। আমি হতভম্বের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে।

মেয়েটা তার আস্তিন ধরে টানাটানি করে বার বার বলছে, ‘হানস, হানস, চুপ করো। এখানে সীন করো না। ওঁর কোনো দোষ নেইআমিই কনুই দিয়ে মেয়েটার পেটে দিল এক গুত্তা। চেঁচিয়ে বলল, ‘হটে যা মাগী’— অথবা তার চেয়েও অভদ্র কী একটা শব্দ ব্যবহার করেছিল আমার ঠিক মনে নেই।

চটলে নাৎসিরা মেয়েদের সঙ্গে কী রকম ব্যবহার করে সেটা না দেখলে বোঝবার উপায় নেই। হারেমে বুখারার আমীর তাদের তুলনায় কলসী কানার বোষ্টম। তঁতো খেয়ে মেয়েটা কোঁক করে, অদ্ভুত ধরনের শব্দ করে একটা চেয়ারে নেতিয়ে পড়ল।‘এই বকাবকি আর চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে ড্রাগন আস্তিন গুটোয় আর বলে, ‘আয়, এর একটা রফারফি হওয়ার দরকার। বেরিয়ে আয় রাস্তায় বাইরে।’

চাচা বললেন, আমি তো মহা বিপদে পড়লুম। অসুরের মতো এই দুশমনের হাতে দুটো ঘুষি খেলেই তো আমি উসপার। ক্ষীণকণ্ঠে যতই প্রতিবাদ করে বোঝাবার চেষ্টা করি যে ফ্রলাইনের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র অনুরাগ নেই, আমার মনে কোননারকম মতলব নেই, ছিল না, হওয়ার কথাও নয়, সে ততই চেঁচায় আর কাপুরুষ’ বলে গালাগাল দেয়।

আড্ডার চ্যাংড়া সদস্য গোলাম মৌলা শুধাল, আর কেউ মূখটাকে বোঝাবার চেষ্টা করল না যে আপনি নির্দোষ? চাচা বললেন, তুই এদেশে নতুন এসেছিস তাই এসব ব্যাপারের মরাল অথবা ইমরাল কোডের খবর জানিসনে। এদেশে এসব বর্বরতাকে বলা হয়, অন্যলোকের ঘরোয়া মামলা’, personal matter। এরা আসলে থাকে বিনটিকিটে মজা দেখবে বলে।

চাচা বললেন, ততক্ষণে অসুরটা আবার নাৎসি বক্তৃতা জুড়ে দিয়েছে যত সব ইহুদি আর বাদ বাকি কালা-আদমি নেটিভরা এসে এদেশের মানইজ্জৎ নষ্ট করে ফেললো। এই করেই বর্ণসঙ্কর (অবশ্য একটা অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করেছিল) হয়, এই করেই দেশটা অধঃপাতে যাচ্ছে, অথচ জর্মনির আজ এমন দুরবস্থা যে এরকম অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে পারছে না।

বিশ্বাস করবে না, দু-একজন ততক্ষণে তার কথায় সায় দিতে আরম্ভ করেছে আর আমার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন আমি দুনিয়ার সব চেয়ে মিটমিটে শয়তান, আর কাপুরুষস্য কাপুরুষ।মাপ চেয়ে নিলে কী হতো বলতে পারিনে, কিন্তু মাপ চাইতে যাব কেন? আমি দোষ করিনি এক ফোঁটা, আর আমি চাইতে যাব মাপ? ভয় পাই আর নাই পাই, আমিও তো বাঙাল।

আমার গায়ের রক্ত গরম হয় না? দুনিয়ার তাবৎ বাঙালদের মানইজ্জৎ বাঁচাবার ভার আমার উপর নয় জানি, কিন্তু এই বাঙালটাই বা এমন কী দোষ করল যে লোকে তাকে কাপুরুষ ভাববে?’ চাচা বললেন, আমি বললুম, এসো তবে, যখন নিতান্তই মারামারি করবে বলে মনস্থির করেছ, তবে তাই হোক! মনে মনে বললুম, দুটো ঘুষি সইতে পারলেই চলবে, তারপর তো নির্ঘাৎ অজ্ঞান হয়ে যাব।

এমন সময় হুঙ্কার শুনতে পেলুম, এই যে! সব ব্যাটা মাতাল এসে একত্তর হয়েছে হেথায়। এসো, এসো, আরেক পাত্তর হয়ে যাক, মেলার পরবে’।চাচা বললেন, ‘তাকিয়ে দেখি অস্কার। একদম টং। এক বগলে খালি বোতল, আরেক বগলে ডানাকাটা পরী। পরীটিও যেন শ্যাম্পেনের বুদ্বুদে ভর করে উড়ে চলেছেন।

সেই উৎকট সঙ্কটের মাঝখানেও না ভেবে থাকতে পারলুম না, মানিয়েছে ভালো।অস্কারকে দুনিয়ার কুল্লে মাতাল চেনে। আমার কথা ভুলে গিয়ে সবাই তাকে উদ্বাহু হয়ে আসতে আজ্ঞা হোক, বার’-এ দাঁড়াতে আজ্ঞা হোক’ বলে অকৃপণ অভ্যর্থনা জানালো।ওদিকে আমার মোযটা বাধা পড়ায় চটে গিয়ে আরো হুঙ্কার দিয়ে বলল, তবে আয় বেরিয়ে।

তখন অস্কারের নজর পড়ল আমার দিকে। আমাকে যে কী করে সে-অবস্থায় চিনতে পারল তার সন্ধান সুস্থ লোক দিতে পারবে না। পারবেন দিতে অস্কারের মতো সেই গুণী, যিনি মৌজের গৌরীশঙ্করে চড়ে জাগরণসুষুপ্তিস্বল্পতুরীয় ছেড়ে পঞ্চমে পৌঁছতে পারেন।

কাইজারের জন্মদিনের কামানদাগার মতো আওয়াজ ছেড়ে বললে, ঐ রেঃ! ঐ ব্যাটা কালা ইভার, মিশ শয়তানও এসে জুটেছে। যেখানেই যাও, শয়তানের মতো সব জায়গায় উপস্থিত। বিয়ার ধরেছিস নাকি? এক পাত্তর হয়ে যাক। আজ তোকে খেতেই হবে। মেলার পরব।ষাঁড় আবার হুঙ্কার ছেড়েছে।

অস্কার তার দিকে তাকিয়ে, আর তার আস্তিন-টানা মারমুখো তসবির দেখে আমাকে শুধালো, ইনি কিনি বটেন? আমি হামেহাল জেন্টিলম্যান। শাস্ত্রসম্মত কায়দায় পরিচয় করিয়ে দিতে যাচ্ছিলুম, কিন্তু দুশমন অস্কারকে চেঁচিয়ে বললে, তুমি বাইরে থাকো ছোকরা। এর সঙ্গে আমার বোঝাপড়া আছে।

অস্কার প্রথমটায় এরকম মোগলাই মেজাজ দেখে একটুখানি থতমত খেয়ে গেল। খালি বোতলটায় একটা টান দিয়ে অতি ধীরে ধীরে মিনিটে একটা শব্দ উচ্চারণ করে বলল, এরসঙ্গে—আমার—বোঝাপড়া—আছে? কেন বাবা, এত রাগ কিসের? এই পরবের বাজারে? তা ইন্ডারটা ঝগড়াটে বটে। হলেই বা। এস, বেবাক ভুলে যাও।

খেয়ে নাও এক পাত্তর। মনে রঙ লাগবে, সব ঝগড়া কঞ্জুর হয়ে যাবে।বলে জুড়ে দিল গান। অনেকটা রবিঠাকুরের ‘রঙ যেন মোর মর্মে লাগে’ গোছের।দুশমন ততক্ষণে আমার দিকে ঘুষি বাগিয়ে তেড়ে এসেছে।হাঁ হাঁ করো কী, করো কী?’ বলে অস্কার তাকে ঠেকালো। অস্কার আমার সপত্নের চেয়ে দুমাথা উঁচু।

আমাকে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? নাৎসিদের ফের গালাগাল দিয়েছিস বুঝি? আমি যতটা পারি বোঝালুম। শেষ করলুম, কী মুশকিল! বলে।অস্কার বলল, তা আমি কি তোর মুশকিল আসান নাকি, না তোর ফুরার? আর দেখছিস না ও অস্কার বলল, তা আমি কি তোর মুশকিল আসান নাকি, না তোর ফুরার? আর দেখছিস না ও আমার পার্টির লোক।

আমি হাল ছেড়ে দিলুম।কিন্তু অস্কারকে বোঝা ভার।হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে সেই ষাঁড়কে জিজ্ঞেস করল, ইন্ডারটা তোমার বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরেছিল? আমি বললুম, ছিঃ অস্কার।সপত্ন বলল, ‘চোপ! অস্কার শুধাল, চুমো খেয়েছিল? আমি বললুম, অস্কার! সপত্ন বলল, শাট আপ! তখন অস্কার সেই সম্পূর্ণ অপরিচিত মেয়েটিকে দুহাত দিয়ে চেয়ার থেকে দাঁড় করাল।

বললে, ‘খাসা মেয়ে। তারপর বলা নেই কওয়া নেই তাকে জড়িয়ে ধরে কমশেলের মতো শব্দ করে খেল চুমো।সবাই অবাক। আমিও। কারণ অস্কারকে ওরকম বেহেড মাতাল হতে আমিও কখনো দেখিনি।কিন্তু আমারই ভুল।আমাকে ধাক্কা দিয়ে একপাশে সরিয়ে ফেলে সে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াল সেই ছোকরার।

একদম সাদা গলায় বলল, ‘দেখো বাপু, আমার বন্ধু ইন্ডারটি তোমার বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরেনি, চুমোও খায়নি। তবু তুমি অপমানিত বোধ করে তাকে ঠ্যাঙাতে যাচ্ছিলে। ও রোগা টিঙটিঙে কিনা। ওঃ, কী সাহস! কিন্তু আমি তোমার বান্ধবীকে চুমো খেয়েছি। এতে তোমার জরুর অপমান বোধ হওয়া উচিত। আমিও সেই মতলবেই চুমোটা খেলুম।

তাই এসো, পয়লা আমাকে ঠ্যাঙাও, তারপর না হয় ইন্ডারটাকে দেখে নেবে।হুলুস্থুল পড়ে গেল। সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে কথা কয়, কিছু বোঝবার উপায় নেই।ছোকরা পড়ে গেল মহা বিপদে। অস্কারের সঙ্গে বক্সিং লড়া তো আর চাট্টিখানি কথা নয়। গেল বছরই এ অঞ্চলের চেম্পিয়ন হয়েছে এ সামনের শরাবখানাতেই।

হোকরা পালাতে পারলে বাঁচে, কিন্তু অস্কার নাছোড়বান্দা। আর পাঁচজনও কথা কয় না—এ রকম রগড় তো পয়সা দিয়েও কেনা যায় না। সব পার্সনাল ম্যাটার কি না! কিন্তু আমি বাপু ইন্ডার, কালা আদমী। আমি ছুটে গিয়ে ডাকলুম পুলিশ। ফিরে দেখি ছোকরা মুখ বাঁচাবার জন্য মুখ চুন করে কোট খুলছে আর শার্টের আস্তিন গুটোচ্ছে।

অস্কার যেন খাসা ভোজের প্রত্যাশায় জিভ দিয়ে চ্যাটাম দ্যাটাস শব্দ করছে।পুলিশ নিত অনিয় বাধা দিল। ট্যাক্সি ডেকে কপোত কপোতীকে বিদেয় করে দিল।অস্কার বললে, ওরে কালা শয়তান, কোথায় গেলি? আমার বান্ধবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।বান্ধবী সোহাগ ঢেলে শুধালেন, আপনি কোন দেশের লোক? পয়লা কপোতও ঠিক এই প্রশ্ন দিয়ে আরম্ভ করেছিল।আমি দিলুম চম্পট। অস্কার চেঁচিয়ে শুধালো, যাচ্ছিস কোথায়? আমি বললুম, আর না বাবা! এক রাত্তিরে দু-দুবার না।

( সমাপ্ত )

 

Read more

কানাইয়ের কথা – সত্যজিৎ রায়

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *