নাপিত বন্ধ হওয়ার কারণে তিনি চুল–দাড়ি কাটা বন্ধ করলেন। তার মাথাভর্তি চুল–দাড়ি গজাল। চেহারা ঋষি ঋষি হয়ে গেল।মানুষ এমন প্রাণী যে দ্রুত নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। হরিচরণ একা জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সকালে গদিতে বসেন। ব্যবসার কাজকর্ম দেখেন। গদির হিন্দু কর্মচারীদের জাতের সমস্যা হয় নি। তারা আগের মতােই আছে।
তাদের দুপুরের খাবার সময় হলেই কিছু সমস্যা হয়। তখন হরিচরণকে গদিঘর থেকে চলে আসতে হয়। তিনি নিজের বাড়িতে রান্না করতে বসেন । ভাত, আলু সেদ্ধ, ঘি। কোনাে কোনাে দিন ডিম। খাওয়া–দাওয়ার পর বাড়ির আশেপাশে হাঁটতে বের হন। দেখাশােনার কেউ না থাকায় বাড়ির চারদিকে ঘন জঙ্গল হয়েছে। ঘাস এবং কচুবনে বাড়ি প্রায় ঢাকা পড়ার মতাে অবস্থা।
কোনাে একদিন মনে হয় বাড়ি পুরােপুরি ঢাকা পড়ে যাবে। সেটাও মন্দ কী! বনের ভেতর হাঁটতে গিয়ে মাঝে মাঝে চমকে যাবার মতাে ঘটনাও ঘটে। ঘটনাগুলাে নিয়ে তার ভাবতে ভালাে লাগে। একবার হিজল গাছের গােড়ায় কয়েকটা সাপের ডিম দেখলেন। আকাশী নীল রঙের ডিম। মাঝে মাঝে হলুদ ছােপ। দেখে মনে হয়, রঙ–তুলি দিয়ে কেউ ডিমগুলাে একেছে। সাপের মতাে ভয়ঙ্কর একটা প্রাণীর ডিম এত সুন্দর কেন এই বিষয় নিয়ে ভেবে ভেবে অনেক সময় পার করলেন। কোলকাতায় চিঠি পাঠালেন সাপের উপর বই বুকপােস্টে পাঠানাের জন্যে।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ
বই পড়ার অভ্যাস তার ছিল না। এই অভ্যাস ভালােমতােই হলাে। বেশির ভাগই ধর্মের বই, সাধুদের জীবনকাহিনী। পাশাপাশি ইতিহাসের বই। সন্ধ্যার পর তার প্রধান কাজ হারিকেন জ্বালিয়ে বই পড়া। সুর করে কাশীদাসীর মহাভারত পড়তেও তার ভালাে লাগে। তার মনে হয় রামায়ণ পাঠের সময় দেহধারী না এমন অনেকেই চারপাশে জড়াে হয়। তারা নিঃশব্দে মন দিয়ে পাঠ শােনে—
হেতায় ভাবিত রাজা আশ্রমে বসিয়া। ধীরে ধীরে কহিলেন অৰ্জ্জুনে চাহিয়া ।। শুন ভাই ধনঞ্জয়, না বুঝি কারণ। ভীমের বিলম্ব কেন হয় এতক্ষণ ।। শীঘ্রগতি বৃকোদরে কর অন্বেষণ। বুঝি ভীম কারাে সনে করিতেছে রণ ।।
জহির ছেলেটা প্রায়ই আসে। তার প্রধান ঝোঁক পুকুরের পানি। হরিচরণ তাকে সাঁতার শেখালেন। এই কাজটা করেও খুব আনন্দ পেলেন। নিঃসঙ্গ জীবনে বনে–জঙ্গলে হাঁটতে হাঁটতে জহিরের সঙ্গে গল্প করা তাঁর জন্যে আনন্দময় অভিজ্ঞতা। ছেলেটা অতিরিক্ত বুদ্ধিমান। বড় হলে তার এই বুদ্ধি থাকবে কি–না এটা নিয়েও হরিচরণ চিন্তা করেন। ছেলেটার সঙ্গে জ্ঞানের কথা বলতেও হরিচরণের ভালাে লাগে। কারণ এই ছেলে কথাগুলাে বুঝতে পারে।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ
জহির! মানুষের যেমন জীবন আছে গাছেরও আছে— এটা জানাে ? জানি। কীভাবে জানাে ? আপনি বলেছেন। মানুষের সঙ্গে গাছের অনেক প্রভেদ আছে। প্রভেদ হলাে অমিল। অমিলগুলাে কি জানাে ? না। ভেবে ভেবে বলাে। চিন্তা করে বলাে । গাছ কথা বলতে পারে না। হয়েছে। আর কী ? গাছ হাঁটতে পারে না। হয়েছে। আর কী ?
জানি না। চিন্তা করে বলাে। কখনাে হুট করে জানি না’ বলবে না। চিন্তা করাে । ছেলেটা গম্ভীর ভঙ্গিতে গালে হাত দিয়ে চিন্তা করে। দেখতে এত ভালাে লাগে! আচ্ছা জন্মান্তর কি আছে ? এমন কি হতে পারে তার মৃত কন্যা মুসলমান ঘরে পুরুষ হয়ে জন্ম নিয়েছে ? তার মেয়ের মাথায় চুল ছিল কোঁকড়ানাে। এই ছেলেরও তাই। আগের জন্মে মেয়েটা পানিতে ডুবে মরেছিল। এই জন্যেও একটা ঘটনা ঘটেছে, তবে এই জন্মে সে রক্ষা পেয়েছে।
মাঝে মাঝে হাটের দিন যখন সুলেমান হাটে যায়, জুলেখা ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আসে। তার হাতে থাকে শলার ঝাড়। ছেলের হাতেও থাকে ঝাড়। দু‘জনে বিপুল উৎসাহে বাড়িঘর ঝাঁট দিতে থাকে। ঘর পরিষ্কার পর্ব শেষ হলে খুলে। খিচুড়ি রাঁধতে বসে। হরিচরণ তখন পাশেই থাকেন। রান্না দেখেন। রান্নার সময় জুলেখা নানান গল্প করে। জগতের সবচে‘ সহজ রান্ধন খিচুড়ি। হাতের কাছে যা আছে সব হাঁড়িতে দিয়া জ্বাল। একটু নুন, দুই একটা কঁচামরিচ। ব্যস।
ছেলে প্রশ্ন করে, জগতের সবচে’ কঠিন রান্ধন কী ? ভাত। ঝরঝরা নরম ভাত রান্ধা বড়ই কঠিন। একটু জ্বাল বেশি হইলে ভাত গলগলা। জ্বাল কম ভাত শক্ত চাউল ।
কোনাে কোনাে দিন জুলেখা তার বাবার গল্প শুরু করে। কবে কোনদিন তার বাপজান কবিগানের প্রশ্নোত্তরে বিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করেছিলেন—তার গল্প। এই সময় জুলেখার চোখ–মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে। হরিচরণের মনে হয়, মেয়েটার মুখ থেকে আলাে বের হচ্ছে।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ
বুঝলেন বাবা! জাঙ্গির আলী, সেও বিরাট নামি মালজোড়ার গায়েন, আমার বাপজানরে কঠিন একখান সােয়াল করল— মাটি ক্যামনে সৃষ্টি হইল ? বাপজান সঙ্গে সঙ্গে বলল, (জুলেখা এই অংশে গান শুরু করল) ………..ওরে গুনধন! প্রশ্নের কী বিবরণ! সভার মাঝে করিব বর্ণন। ধৈর্য ধরে শুনাে ওরে শ্রোতাবন্ধুগণ । দুই দিনে হয় মাটির জনম
চারদিনে আল্লাহ সব করিলেন সৃজন। বিস্ময়কর হলেও সত্যি, হঠাৎ হঠাৎ অম্বিকাচরণ উপস্থিত হন। তিনি প্রতিবারই সমাজ থেকে পতিত হবার পর উদ্ধারের একেকটা উপায় নিয়ে আসেন। পুকুরঘাটে বসে গলা উঁচিয়ে ডাকেন— হরি! আছাে ? খোঁজ নিতে আসলাম। আছাে কেমন ? ………..ভালাে আছি ।
