মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ

মধ্যাহ্ন

নাপিত বন্ধ হওয়ার কারণে তিনি চুলদাড়ি কাটা বন্ধ করলেন। তার মাথাভর্তি চুলদাড়ি গজালচেহারা ঋষি ঋষি হয়ে গেলমানুষ এমন প্রাণী যে দ্রুত নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারেহরিচরণ একা জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেনসকালে গদিতে বসেনব্যবসার কাজকর্ম দেখেনগদির হিন্দু কর্মচারীদের জাতের সমস্যা হয় নিতারা আগের মতােই আছে

তাদের দুপুরের খাবার সময় হলেই কিছু সমস্যা হয়তখন হরিচরণকে গদিঘর থেকে চলে আসতে হয়তিনি নিজের বাড়িতে রান্না করতে বসেন ভাত, আলু সেদ্ধ, ঘিকোনাে কোনাে দিন ডিমখাওয়াদাওয়ার পর বাড়ির আশেপাশে হাঁটতে বের হনদেখাশােনার কেউ না থাকায় বাড়ির চারদিকে ঘন জঙ্গল হয়েছেঘাস এবং কচুবনে বাড়ি প্রায় ঢাকা পড়ার মতাে অবস্থা

কোনাে একদিন মনে হয় বাড়ি পুরােপুরি ঢাকা পড়ে যাবেসেটাও মন্দ কী! বনের ভেতর হাঁটতে গিয়ে মাঝে মাঝে চমকে যাবার মতাে ঘটনাও ঘটেঘটনাগুলাে নিয়ে তার ভাবতে ভালাে লাগেএকবার হিজল গাছের গােড়ায় কয়েকটা সাপের ডিম দেখলেনআকাশী নীল রঙের ডিমমাঝে মাঝে হলুদ ছােপদেখে মনে হয়, রঙতুলি দিয়ে কেউ ডিমগুলাে একেছেসাপের মতাে ভয়ঙ্কর একটা প্রাণীর ডিম এত সুন্দর কেন এই বিষয় নিয়ে ভেবে ভেবে অনেক সময় পার করলেনকোলকাতায় চিঠি পাঠালেন সাপের উপর বই বুকপােস্টে পাঠানাের জন্যে। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ

বই পড়ার অভ্যাস তার ছিল নাএই অভ্যাস ভালােমতােই হলােবেশির ভাগই ধর্মের বই, সাধুদের জীবনকাহিনীপাশাপাশি ইতিহাসের বইসন্ধ্যার পর তার প্রধান কাজ হারিকেন জ্বালিয়ে বই পড়াসুর করে কাশীদাসীর মহাভারত পড়তেও তার ভালাে লাগেতার মনে হয় রামায়ণ পাঠের সময় দেহধারী না এমন অনেকেই চারপাশে জড়াে হয়তারা নিঃশব্দে মন দিয়ে পাঠ শােনে— 

হেতায় ভাবিত রাজা আশ্রমে বসিয়াধীরে ধীরে কহিলেন অৰ্জ্জুনে চাহিয়া শুন ভাই ধনঞ্জয়, না বুঝি কারণভীমের বিলম্ব কেন হয় এতক্ষণ শীঘ্রগতি বৃকোদরে কর অন্বেষণবুঝি ভীম কারাে সনে করিতেছে রণ । 

জহির ছেলেটা প্রায়ই আসেতার প্রধান ঝোঁক পুকুরের পানিহরিচরণ তাকে সাঁতার শেখালেনএই কাজটা করেও খুব আনন্দ পেলেন। নিঃসঙ্গ জীবনে বনেজঙ্গলে হাঁটতে হাঁটতে জহিরের সঙ্গে গল্প করা তাঁর জন্যে আনন্দময় অভিজ্ঞতাছেলেটা অতিরিক্ত বুদ্ধিমানবড় হলে তার এই বুদ্ধি থাকবে কিনা এটা নিয়েও হরিচরণ চিন্তা করেনছেলেটার সঙ্গে জ্ঞানের কথা বলতেও হরিচরণের ভালাে লাগেকারণ এই ছেলে কথাগুলাে বুঝতে পারে। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ

জহিরমানুষের যেমন জীবন আছে গাছেরও আছেএটা জানাে জানিকীভাবে জানাে ? আপনি বলেছেন। মানুষের সঙ্গে গাছের অনেক প্রভেদ আছেপ্রভেদ হলাে অমিলঅমিলগুলাে কি জানাে নাভেবে ভেবে বলােচিন্তা করে বলাে গাছ কথা বলতে পারে নাহয়েছেআর কী ? গাছ হাঁটতে পারে নাহয়েছেআর কী

জানি নাচিন্তা করে বলােকখনাে হুট করে জানি নাবলবে নাচিন্তা করাে ছেলেটা গম্ভীর ভঙ্গিতে গালে হাত দিয়ে চিন্তা করেদেখতে এত ভালাে লাগে! আচ্ছা জন্মান্তর কি আছে ? এমন কি হতে পারে তার মৃত কন্যা মুসলমান ঘরে পুরুষ হয়ে জন্ম নিয়েছে ? তার মেয়ের মাথায় চুল ছিল কোঁকড়ানােএই ছেলেরও তাইআগের জন্মে মেয়েটা পানিতে ডুবে মরেছিলএই জন্যেও একটা ঘটনা ঘটেছে, তবে এই জন্মে সে রক্ষা পেয়েছে। 

মাঝে মাঝে হাটের দিন যখন সুলেমান হাটে যায়, জুলেখা ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আসেতার হাতে থাকে শলার ঝাড়। ছেলের হাতেও থাকে ঝাড়দুজনে বিপুল উৎসাহে বাড়িঘর ঝাঁট দিতে থাকেঘর পরিষ্কার পর্ব শেষ হলে খুলেখিচুড়ি রাঁধতে বসেহরিচরণ তখন পাশেই থাকেনরান্না দেখেনরান্নার সময় জুলেখা নানান গল্প করে। জগতের সবচেসহজ রান্ধন খিচুড়িহাতের কাছে যা আছে সব হাঁড়িতে দিয়া জ্বালএকটু নুন, দুই একটা কঁচামরিচব্যস। 

ছেলে প্রশ্ন করে, জগতের সবচেকঠিন রান্ধন কী ভাতঝরঝরা নরম ভাত রান্ধা বড়ই কঠিনএকটু জ্বাল বেশি হইলে ভাত গলগলাজ্বাল কম ভাত শক্ত চাউল । 

কোনাে কোনাে দিন জুলেখা তার বাবার গল্প শুরু করেকবে কোনদিন তার বাপজান কবিগানের প্রশ্নোত্তরে বিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করেছিলেনতার গল্পএই সময় জুলেখার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেহরিচরণের মনে হয়, মেয়েটার মুখ থেকে আলাে বের হচ্ছে। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ

বুঝলেন বাবা! জাঙ্গির আলী, সেও বিরাট নামি মালজোড়ার গায়েন, আমার বাপজানরে কঠিন একখান সােয়াল করলমাটি ক্যামনে সৃষ্টি হইল বাপজান সঙ্গে সঙ্গে বলল, (জুলেখা এই অংশে গান শুরু করল) ………..ওরে গুনধন! প্রশ্নের কী বিবরণ! সভার মাঝে করিব বর্ণনধৈর্য ধরে শুনাে ওরে শ্রোতাবন্ধুগণ দুই দিনে হয় মাটির জনম 

চারদিনে আল্লাহ সব করিলেন সৃজনবিস্ময়কর হলেও সত্যি, হঠাৎ হঠাৎ অম্বিকাচরণ উপস্থিত হনতিনি প্রতিবারই সমাজ থেকে পতিত হবার পর উদ্ধারের একেকটা উপায় নিয়ে আসেনপুকুরঘাটে বসে গলা উঁচিয়ে ডাকেনহরি! আছাে ? খোঁজ নিতে আসলামআছাে কেমন ? ………..ভালাে আছি । 

 

 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *