মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ

মধ্যাহ্ন

শশাংক পাল মাথা দোলাতে দোলাতে বললেন, নিজের কন্যা ছাড়া আর কেউ কন্যাসম নাএইটা খেয়াল রাখবা।……….আচ্ছা রাখবতােমার বাড়িতে তাে কোনাে লােকজন দেখলাম নাসবাই কি তােমাকে ত্যাগ করেছে

করেছেকরাই স্বাভাবিকআমার জাত নাই। সমাজ নাই। ……শশাংক পাল বললেন, এইসব নিয়ে চিন্তা করবে নাযার টাকা আছে সে সমাজ কিনবে আর আমি তাে আছিবামুন পণ্ডিতকে ডেকে ধমক দিয়ে দিব, নিমিষে সে অন্য বিধান দিবেহা হা হা। 

প্রচণ্ড শব্দে শশাংক পাল হাসছেনঅথচ এই হাসি প্রাণহীনমনে হচ্ছে কোনাে একটা যন্ত্রের ভেতর থেকে শব্দ আসছে। ……..হরি! …………..জে আজ্ঞে তােমার এখানে যদি মদ্যপান করি তােমার কি অসুবিধা আছে? কোনাে অসুবিধা নাইকলিকাতা থেকে ভালাে রাম আনিয়েছিলামখাবে একটু ? আমি মদ্যপান করি না। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ

ভালােখুব ভালােমদ্য সর্বগুণনাশিনী আমার দিকে তাকায়ে দেখআমার হয়েছে হাতকাপা রােগএই সঙ্গে স্মৃতিভ্রংশ রােগকিছু মনে থাকে। …………………মদ্যপান ছেড়ে দেন। 

কেন ছাড়ব ? পৃথিবীতে আমরা এসেছি ভােগের জন্যে। ভােগ নিবৃত্তি না হলে বারবার জন্মাতে হবেআবার জন্মানাের ইচ্ছা নাইএই জন্যেই ঠিক করেছি, এই জীবনেই সমস্ত ভােগের নিষ্পত্তি করব। 

শশাংক পালের জন্যে মদ্যপানের আয়ােজন তার লােকজন অতি দ্রুত করে ফেললমেঝেতে কার্পেট বিছানাে হলােতাকিয়া এবং কোলবালিশ নামানাে হলােগ্লাস নামল, বােতল নামলধুপদানে অগরুপােড়ানাে হলােকোয় মেশকাত আধুরী তামাক ভরা হলাে। 

শশাংক পাল তাকিয়ায় হেলান দিয়ে গ্লাস হাতে নিতে নিতে বললেন, বরফ ছাড়া এইসব জিনিস খেয়ে কোনাে মজা নাই। বরফকলের সন্ধানে আছি। 

কলিকাতায় সাহেবপাড়ায় বরফকল পাওয়া যায় কেরােসিনে চলেঅত্যধিক দামতারপরেও সিদ্ধান্ত নিয়েছি কিনব ভালাে করেছি না

কথায় কথায় ভালাে করেছি নাবলা শশাংক পালের মুদ্রাদোষপ্রশ্নটা তিনি করেন, তবে জবাবের জন্যে অপেক্ষা করেন নাতিনি নিশ্চিত যা করেছেন, ভালােই করেছেন। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ

হরি! যে আজ্ঞে । ……….মহাভারতের যযাতির কথা মনে আছে ? তার জীবনটাই ছিল ভােগেরবৃদ্ধ হয়ে গেলে ভােগের তৃষ্ণা মেটে নাতখন সে তিনপুত্রকে ডেকে বলল, তােমাদের মধ্যে কেউ কি তােমাদের যৌবন আমাকে দিয়ে আমার জরা গ্রহণ করবেআমি আরাে ভােগ করতে চাইকেউ রাজি হয় নাএকজন রাজি হলােসেই একজনের নামটা কি তােমার মনে আছে, হরি

সর্বকনিষ্ঠ পুত্র রাজি হলােতার নাম পুরুঐটা ছিল গর্ধবগর্ধবটা রাজি হয়েছেহা হা হামহা গর্ধবহা হা হা। 

হাসতে হাসতে শশাংক পালের হেঁচকি উঠে গেল। হেঁচকি থামানাের জন্যে পানি খেতে হলােমাথায় পানি দিতে হলােতবু হেঁচকি থামে নাহেঁচকি দিতে দিতেই তিনি হাতিতে উঠে চলে গেলেনমাদি হাতি লােহার শিকলে বাধা থাকল জামগাছের সঙ্গেহাতির সঙ্গে আছে হাতির সহিসসহিস মুসলমান, নাম কালু মিয়াছােটখাটো মানুষঅতি বিনয়ীচোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে না| হরিচরণ বললেন, এত বড় হাতি আর তুমি ছােটখাটো মানুষতােমার কথা কি মানে

কালু মিয়া বলল, জে কর্তা, মানে। আমি তার চোখের সামনে থাকলেই সে ঠাণ্ডা থাকেচোখের আড়াল হলেই অস্থির হয় । ………এত বড় জন্তু বশ করলে কীভাবে ? আদর দিয়েসব পশু আদর বুঝে মানুষের চেয়ে বেশি বুঝে। মানুষ কম বুঝে

জে কর্তামানুষ কম বুঝে কেন ? ………….মানুষরে আদর করলে মানুষ ভাবে আদরের পেছনে স্বার্থ আছেপশু স্বার্থ বুঝে না । ………….কালু মিয়া! আমি যদি হাতিটাকে আদর করি সে বুঝবে ? অবশ্যই বুঝবেহাতির অনেক বুদ্ধিআর হাতি আদরের কাঙ্গাল । 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ

হরিচরণ হাতির গায়ে হাত রাখলেন হাতি মাথা ঘুরিয়ে তাকে দেখলহরিচরণ বললেন, কেমন আছিস গাে বেটি ? ……হাতি গঁড় কঁকালােহরিচরণ বললেন, তুই আমার বাড়ির অতিথিতুই কী খেতে চাস বল । 

কালু মিয়া বলল, কর্তা, আপনের প্রত্যেকটা কথাই হে বুঝছেজবান নাই বইলা উত্তর দিতেছে না। …….হরিচরণ বললেন, তােমার হাতি কী খেতে সবচেপছন্দ করে বলােআমি তাই খাওয়াব। 

এক ধামা আলুচাল দেনএক ছড়ি কলা দেন, আর নারকেল দেনআপনি নিজের হাতে তারে খাওয়াটা দিবেন, বাকি জীবন সে আপনারে ভুলবে না। ….হরিচরণ নিজের হাতে হাতিকে খাবার খাওয়ালেনকালু মিয়া বলল, কর্তা, আপনার আদর হে বেবাকটাই বুঝছে। 

তুমি জানলে কীভাবে? …….দেহেন না একটু পর পর শুড় দিয়া আপনেরে ধাক্কা দিতাছেএইটা তার খেলাপছন্দের মানুষের সাথে এই খেলা সে খেলে। 

অল্প কয়েক ঘণ্টায় হাতিটার উপর তার অস্বাভাবিক মায়া পড়ে গেলতৃতীয় দিনে সেই মায়া যখন অনেক গুণ বেড়েছে, তখনি হাতি ফেরত নেবার জন্যে শশাংক পালের দুই ম্যানেজার উপস্থিততারা টাকা নিয়ে আসে নি, এসেছে খালি হাতে। 

তাদের কাছেই হরিচরণ জানলেন যে, হাতি বন্ধক রেখে টাকা নেবার কোনাে ঘটনা ঘটে নিবন্ধকনামায় যে টিপসই আছে সেটা শশাংক পালের না তিনি যদি ইচ্ছা করেন বন্ধকনামা নিয়ে কোর্টে যেতে পারেন। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ

হরিচরণ বললেন, হাতি নিয়ে যাওকালু মিয়ার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগলসে হরিচণের পা ছুঁয়ে বিদায় নিল। ……….হরিচরণ তাকে রুপার একটা টাকা দিয়ে বললেন, তােমার স্বভাব আচার আচরণ আমার পছন্দ হয়েছেহাতির সঙ্গে থাক বলেই হাতির স্বভাব তােমার মধ্যে এসেছেহাতি উত্তম প্রাণীতুমিও উত্তম। 

শশাংক পাল হাতি ফিরিয়ে নিয়েই ক্ষান্ত হলেন নাতিনি হরিচরণের উপর নানাবিধ নির্যাতনের চেষ্টা করলেনসমাজচ্যুতির বিষয়টা পাকাপাকি করলেনতার ধােপানাপিত বন্ধ হয়ে গেলসােহাগগঞ্জে পাটের গদিতে আগুন যোগে সব পুড়ে গেলকিছু বিশ্বাসী কর্মচারী তাকে ছেড়ে চলে গেলহরিচরণ দমলেন

 

 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *