শশাংক পাল মাথা দোলাতে দোলাতে বললেন, নিজের কন্যা ছাড়া আর কেউ কন্যাসম না। এইটা খেয়াল রাখবা।……….আচ্ছা রাখব। তােমার বাড়িতে তাে কোনাে লােকজন দেখলাম না। সবাই কি তােমাকে ত্যাগ করেছে ?
করেছে। করাই স্বাভাবিক। আমার জাত নাই। সমাজ নাই। ……শশাংক পাল বললেন, এইসব নিয়ে চিন্তা করবে না। যার টাকা আছে সে সমাজ কিনবে । আর আমি তাে আছি। বামুন পণ্ডিতকে ডেকে ধমক দিয়ে দিব, নিমিষে সে অন্য বিধান দিবে। হা হা হা।
প্রচণ্ড শব্দে শশাংক পাল হাসছেন। অথচ এই হাসি প্রাণহীন। মনে হচ্ছে কোনাে একটা যন্ত্রের ভেতর থেকে শব্দ আসছে। ……..হরি! …………..জে আজ্ঞে । তােমার এখানে যদি মদ্যপান করি তােমার কি অসুবিধা আছে? কোনাে অসুবিধা নাই। কলিকাতা থেকে ভালাে রাম আনিয়েছিলাম। খাবে একটু ? আমি মদ্যপান করি না।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ
ভালাে। খুব ভালাে। মদ্য সর্বগুণনাশিনী । আমার দিকে তাকায়ে দেখ— আমার হয়েছে হাতকাপা রােগ। এই সঙ্গে স্মৃতিভ্রংশ রােগ। কিছু মনে থাকে। …………………মদ্যপান ছেড়ে দেন।
কেন ছাড়ব ? পৃথিবীতে আমরা এসেছি ভােগের জন্যে। ভােগ নিবৃত্তি না হলে বারবার জন্মাতে হবে। আবার জন্মানাের ইচ্ছা নাই। এই জন্যেই ঠিক করেছি, এই জীবনেই সমস্ত ভােগের নিষ্পত্তি করব।
শশাংক পালের জন্যে মদ্যপানের আয়ােজন তার লােকজন অতি দ্রুত করে ফেলল। মেঝেতে কার্পেট বিছানাে হলাে। তাকিয়া এবং কোলবালিশ নামানাে হলাে। গ্লাস নামল, বােতল নামল। ধুপদানে অগরু’ পােড়ানাে হলাে। কোয় মেশকাত আধুরী তামাক ভরা হলাে।
শশাংক পাল তাকিয়ায় হেলান দিয়ে গ্লাস হাতে নিতে নিতে বললেন, বরফ ছাড়া এইসব জিনিস খেয়ে কোনাে মজা নাই। বরফকলের সন্ধানে আছি।
কলিকাতায় সাহেবপাড়ায় বরফকল পাওয়া যায় । কেরােসিনে চলে। অত্যধিক দাম। তারপরেও সিদ্ধান্ত নিয়েছি কিনব । ভালাে করেছি না?
কথায় কথায় ভালাে করেছি না’ বলা শশাংক পালের মুদ্রাদোষ। প্রশ্নটা তিনি করেন, তবে জবাবের জন্যে অপেক্ষা করেন না। তিনি নিশ্চিত যা করেছেন, ভালােই করেছেন।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ
হরি! যে আজ্ঞে । ……….মহাভারতের যযাতির কথা মনে আছে ? তার জীবনটাই ছিল ভােগের। বৃদ্ধ হয়ে গেলে ভােগের তৃষ্ণা মেটে না। তখন সে তিনপুত্রকে ডেকে বলল, তােমাদের মধ্যে কেউ কি তােমাদের যৌবন আমাকে দিয়ে আমার জরা গ্রহণ করবে। আমি আরাে ভােগ করতে চাই। কেউ রাজি হয় না। একজন রাজি হলাে। সেই একজনের নামটা কি তােমার মনে আছে, হরি ?
সর্বকনিষ্ঠ পুত্র রাজি হলাে। তার নাম পুরু। ঐটা ছিল গর্ধব। গর্ধবটা রাজি হয়েছে। হা হা হা। মহা গর্ধব। হা হা হা।
হাসতে হাসতে শশাংক পালের হেঁচকি উঠে গেল। হেঁচকি থামানাের জন্যে পানি খেতে হলাে। মাথায় পানি দিতে হলাে। তবু হেঁচকি থামে না। হেঁচকি দিতে দিতেই তিনি হাতিতে উঠে চলে গেলেন। মাদি হাতি লােহার শিকলে বাধা থাকল জামগাছের সঙ্গে। হাতির সঙ্গে আছে হাতির সহিস। সহিস মুসলমান, নাম কালু মিয়া। ছােটখাটো মানুষ। অতি বিনয়ী। চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে না। | হরিচরণ বললেন, এত বড় হাতি আর তুমি ছােটখাটো মানুষ। তােমার কথা কি মানে ?
কালু মিয়া বলল, জে কর্তা, মানে। আমি তার চোখের সামনে থাকলেই সে ঠাণ্ডা থাকে। চোখের আড়াল হলেই অস্থির হয় । ………এত বড় জন্তু বশ করলে কীভাবে ? আদর দিয়ে। সব পশু আদর বুঝে । মানুষের চেয়ে বেশি বুঝে। মানুষ কম বুঝে ?
জে কর্তা। মানুষ কম বুঝে কেন ? ………….মানুষরে আদর করলে মানুষ ভাবে আদরের পেছনে স্বার্থ আছে। পশু স্বার্থ বুঝে না । ………….কালু মিয়া! আমি যদি হাতিটাকে আদর করি সে বুঝবে ? অবশ্যই বুঝবে। হাতির অনেক বুদ্ধি। আর হাতি আদরের কাঙ্গাল ।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ
হরিচরণ হাতির গায়ে হাত রাখলেন । হাতি মাথা ঘুরিয়ে তাকে দেখল। হরিচরণ বললেন, কেমন আছিস গাে বেটি ? ……হাতি গঁড় কঁকালাে। হরিচরণ বললেন, তুই আমার বাড়ির অতিথি। তুই কী খেতে চাস বল ।
কালু মিয়া বলল, কর্তা, আপনের প্রত্যেকটা কথাই হে বুঝছে। জবান নাই বইলা উত্তর দিতেছে না। …….হরিচরণ বললেন, তােমার হাতি কী খেতে সবচে‘ পছন্দ করে বলাে। আমি তাই খাওয়াব।
এক ধামা আলুচাল দেন। এক ছড়ি কলা দেন, আর নারকেল দেন। আপনি নিজের হাতে তারে খাওয়াটা দিবেন, বাকি জীবন সে আপনারে ভুলবে না। ….হরিচরণ নিজের হাতে হাতিকে খাবার খাওয়ালেন। কালু মিয়া বলল, কর্তা, আপনার আদর হে বেবাকটাই বুঝছে।
তুমি জানলে কীভাবে? …….দেহেন না একটু পর পর শুড় দিয়া আপনেরে ধাক্কা দিতাছে। এইটা তার খেলা। পছন্দের মানুষের সাথে এই খেলা সে খেলে।
অল্প কয়েক ঘণ্টায় হাতিটার উপর তার অস্বাভাবিক মায়া পড়ে গেল। তৃতীয় দিনে সেই মায়া যখন অনেক গুণ বেড়েছে, তখনি হাতি ফেরত নেবার জন্যে শশাংক পালের দুই ম্যানেজার উপস্থিত। তারা টাকা নিয়ে আসে নি, এসেছে খালি হাতে।
তাদের কাছেই হরিচরণ জানলেন যে, হাতি বন্ধক রেখে টাকা নেবার কোনাে ঘটনা ঘটে নি। বন্ধকনামায় যে টিপসই আছে সেটা শশাংক পালের না । তিনি যদি ইচ্ছা করেন বন্ধকনামা নিয়ে কোর্টে যেতে পারেন।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ
হরিচরণ বললেন, হাতি নিয়ে যাও। কালু মিয়ার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল। সে হরিচণের পা ছুঁয়ে বিদায় নিল। ……….হরিচরণ তাকে রুপার একটা টাকা দিয়ে বললেন, তােমার স্বভাব আচার আচরণ আমার পছন্দ হয়েছে। হাতির সঙ্গে থাক বলেই হাতির স্বভাব তােমার মধ্যে এসেছে। হাতি উত্তম প্রাণী। তুমিও উত্তম।
শশাংক পাল হাতি ফিরিয়ে নিয়েই ক্ষান্ত হলেন না। তিনি হরিচরণের উপর নানাবিধ নির্যাতনের চেষ্টা করলেন। সমাজচ্যুতির বিষয়টা পাকাপাকি করলেন। তার ধােপা–নাপিত বন্ধ হয়ে গেল। সােহাগগঞ্জে পাটের গদিতে আগুন যোগে সব পুড়ে গেল। কিছু বিশ্বাসী কর্মচারী তাকে ছেড়ে চলে গেল। হরিচরণ দমলেন।
