হাবীব বললেন, না। মাথায় পানি ঢালার ব্যবস্থা করতে বলো। আর জামে মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছ থেকে স্বপ্নের তফসির নিয়ে আসে। স্বপ্নে আমি হাতির উপর উঠেছি। হাতি নদী পার হচ্ছে। নদীতে প্রবল স্রোত।রাত প্রায় বারোটা। ইলেকট্রিসিটি চলে গেছে। শহর অন্ধকার। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বাতাস দিচ্ছে। এখনো বর্ষণ শুরু হয়নি।
ফরিদের নবপরিণীতা স্ত্রী চৌকিতে বসে কাঁদছে। তার মুখ জানালার দিকে ফেরানো বলে ফরিদ মুখ দেখতে পাচ্ছে না। চৌকির ওপর মশারি খাটানো। বাতাসে নৌকার পালের মতো মশারি উড়ছে। ফরিদ মশারি ঠিক করতে ব্যস্ত। ঘরে হারিকেন জ্বলছে। তবে হারিকেন দপদপ করছে। যে-কোনো সময় হারিকেন নিভবে। ফরিদ কলল, রাত অনেক হয়েছে। শুয়ে পড়ো।
সফুরা বলল, আপনে আমার সাথে কথা কবেন না। আমার গায়ে হাত দিবেন না। শইলে যদি হাত দেন দাও দিয়া কোপ দিব। হাত ফালায়া দিব।ফরিদ বলল, আমি কী দোষ করলাম।দোষ করেন নাই? ফরিদ বলল, না। তুমি জানো, আল্লাহপাক জানেন, তোমার সঙ্গে আমার কিছু হয় নাই। কারোর সঙ্গেই কিছু হয় নাই। আমি সেরকম মানুষ না। তুমি মহাবিপদে পড়েছিলা বলে সাহায্য করেছি। একবার আমিও মহাবিপদে পড়েছিলাম।
স্যার সাহায্য করেছেন। একজনের বিপদে অন্যজন সাহায্য করবে এইটাই নিয়ম।সফুরা বলল, যে দোষ করেন নাই সেই দোষ নিজের ঘাড়ে কী জন্যে নিয়েছেন?একটা কারণ আছে। কোনো একদিন তোমারে বলব। কান্দন বন্ধ করো।সফুরা বলল, আমি সারা রাত কানব। অপনের অসুবিধা আছে।আমি ঘুমাইতে পারব না। এইটাই অসুবিধা।আইজ রাইতে আপনি ঘুমাইতে পারবেন? কেন পারব না।
আপনে মানুষ না। আপনে গাছ। গাছের সাথে যে কথা বলে, সে গাছই হয়।আমি গাছের সাথে কথা বলি তুমি জানো? সবেই জানে।ফরিদ বলল, এই তো তোমার কান্দা বন্ধ হইছে। তুমি অত্যধিক সুন্দর মেয়ে, এইটা আগে নজর করি নাই।সফুরা বলল, আগে নজর করলে কী করতেন? ইশারা দিতেন? বিছানার ইশারা?
ছিঃ, এমন চিন্তা করবা না। সব মানুষ একরকম না। কিছু মানুষ আছে। ফেরেশতারও উপরে।সফুরা বলল, মানুষ তে ফেরেশতার উপরেই। ফেরেশতার যে সর্দার সে মানুষরে সালাম করছিল।বাহ্, সুন্দর বলেছ। সব মানুষই ফেরেশতার উপরে। তোমার কথা শুনে মনে বল পেয়েছি।সফুরা বলল, আমি একটা নটি মাগি। আমার কথা শুনে মনে বল পেয়েছেন?নিজের বিষয়ে এইভাবে বলবা না।
দমকা বাতাসে হারিকেন নিভে গেল। তুমুল বর্ষণ শুরু হলো। স্বামী-স্ত্রী অন্ধকারে পাশাপাশি বসে আছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। এক পর্যায়ে সফুরা বলল, আপনে শুইয়া পড়েন। আপনে বইসা আছেন কোন দুঃখে? ঠান্ডা বাতাস ছাড়ছে, আরামে ঘুম দেন! মাথা টিপ্যা দিতে বললে মাথা টিপা দিব।ফরিদ বলল, গল্প শুনব। একটা গল্প বলব?
বলতে চাইলে বলেন। আমারে গাছ ভাবছেন? ভাবছেন গাছের মতো আমিও আপনের গফ শুইন্যা মজা পাব? আমি গাছ না।ফরিদ বলল, এক কাঠুরের গল্প। সে কাঠ কাটতে বনে গিয়েছে। হঠাৎ তার কুড়ালটা পড়ে গেল পানিতে। মনের দুঃখে সে কাঁদছে। তখন পানি থেকে জলপরী উঠে এসে বলল, কুড়ালের জন্যে কাঁদছ? এই সোনার কুড়ালটা কি তোমার?
সফুরা বলল, এই গল্প আমি জানি। কাঠুরে বলল, না। তখন জলপরী একটা রুপার কুড়লি তুলে বলল, এইটা তোমার? কাঠুরে বলল, না। আমার কুড়াল লোহার। তখন তার ভালোমানুষি দেখে জলপরী খুশি হয়ে তিনটা কুড়ালই দিয়ে দিল।ফরিদ বলল, আমি যে গল্পটা বলব সেটা এখানেই শেষ না। আরেকটু আছে। বলি? বলেন।সেই কাঠুরে অনেকদিন পর তার স্ত্রীকে নিয়ে বনে বেড়াতে গেছে। হঠাৎ স্ত্রী পানিতে পড়ে ডুবে গেল। কাঠুরে কান্না শুরু করেছে। জলপরী অতি রূপবতী রাজকন্যার মতো এক মেয়েকে পানি থেকে তুলে বলল, এই কি তোমার স্ত্রী?
কাঠুরে বলল, জি এই আমার স্ত্রী।জলপরী বলল, কালো করে দেখে তারপর বলো।কাঠুরে বলল, সরি দেখতে হবে না। এই আমার স্ত্রী।জলপরী বলল, আগের বার তোমার সততা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। এখন তুমি এটা কী করলে? রূপবতী মেয়ে দেখে স্ত্রীকে ভুলে গেলে?
তখন কাঠুরে বলল, আমি বাধ্য হয়ে বলেছি এইটাই আমার স্ত্রী। যদি না বলতাম, আপনি এরচেয়ে একটু কম সুন্দর আরেকটা মেয়ে তুলতেন। আমি যদি বলতাম এই মেয়ে না। আপনি সবশেষে আমার স্ত্রীকে তুলতেন এবং আগের বারের মতো তিনজনকেই আমাকে দিয়ে দিতেন। আমি নিতান্তই গরিব মানুষ। তিন বউকে পালব কীভাবে? এই কারণে প্রথমবারই বলেছি এটা আমার স্ত্রী।সফুরা বলল, ও আল্লা। সুন্দর তো।ফরিদ বলল, গল্পটা তোমার পছন্দ হয়েছে?
সফুরা বলল, হয়েছে।ফরিদ বলল, এই গল্পটা তোমাকে কেন বললাম জানো? গল্পটা বললাম যেন তুমি বুঝতে পারো আমি কত গরিব। ওই কাঠুরের তিনজন স্ত্রী পালার ক্ষমতা নাই। আমার অবস্থা তারচেয়ে অনেক খারাপ। আমার একজন স্ত্রী পালার ক্ষমতাও নাই।
ফরিদের কথা শেষ হতেই দোতলা থেকে হাজেরা বিবির তীক্ষ্ণ গলা শোনা গেল, হাবু, হাবু! ও হাবু! হাবুরে ! ফরিদের বিয়ের তারিখ ১৭ জানুয়ারি, ১৯৬৮ সন। এই তারিখটা গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ থেকে এই দিন শেখ মুজিবুর রহমান বেকসুর খালাস পান। হাসিমুখে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি বের হলেন। ফুলের মালা নিয়ে অনেকেই তার জন্যে অপেক্ষা করছে। তাদের সময় দিতে হবে। মিছিল করে ফেরার পথে বক্তৃতা দিতে হতে পারে।
দীর্ঘ কারাবাসে তার শরীর এবং মন—দুইই ক্লান্ত। দ্রুত ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করছে। ঘরে ফিরে গরম পানি দিয়ে গোসল। গোসল শেষে অনেক দিন পর স্ত্রীর হাতের রান্না খাবার। কয়েকদিন থেকেই কেন জানি পুঁটি মাছের কড়কড়া ভাজি আর ছোট টেংরা মাছের টক খেতে ইচ্ছা করছে। আজ কি সম্ভব হবে? মনে হয় না।জেলগেটের বাইরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে আবার গ্রেফতার করা হলো। এবার দেশরক্ষা আইনে না। এবার গ্রেফতার হলেন, আর্মি নেভি এবং এয়ারফোর্স অ্যাক্টে। তাঁকে সরাসরি নিয়ে যাওয়া হলো কুর্মিটোলা সেনানিবাসে।
হাবীব সারা দিনে একবারই খবর শোনেন। রাতের শেষ ইংরেজি খবর। তিনি রাতের খবরে জানলেন দু’জন সিএসপি অফিসারসহ ২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে পূর্ববাংলা বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। তারা ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ডেপুটি হাই কমিশনারের সঙ্গে গোপন মিটিং চালাচ্ছিল। দেশ ধ্বংস ষড়যন্ত্রের মূল নায়ক শেখ মুজিবুর রহমান।
হাবীব বিড়বিড় করে বললেন, এইবার আর রক্ষা নাই। ঝুলে পড়তে হবে। তিনি শোবার আয়োজন করলেন। স্ত্রীর জন্যে অপেক্ষা। স্ত্রী প্রথম বিছানায় যাবে, তারপর স্বামী—এটাই নিয়ম। এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয় না। ব্যতিক্রম হলে স্বামীর আয়ু কমে।লাইলী পানের বাটা নিয়ে ঢুকলেন। হাবীব পানের বাটা থেকে এক টুকরা লং নিয়ে মুখে দিলেন। লাইলী বললেন, একজন নির্দোষ মানুষরে আপনারা দোষী করলেন?
কে নির্দোষ? কার কথা বলো? ফরিদের কথা বলি।সে নির্দোষ কীভাবে জানো? লাইলী হাই তুলতে তুলতে বললেন, জানি।হাবীব বললেন, বেশি জানবা না এবং বেশি বুঝবা না। যারা বেশি জানে এবং বেশি বোঝে তারাই বিপদে পড়ে। যেমন শেখ মুজিবুর রহমান। সে বেশি বুঝে ফেলেছিল। এখন তাকিয়ে আছে ফাঁসির দড়ির দিকে। আমাকে অজুর পানি দাও।
লাইলী বললেন, এশার নামাজ তো পড়েছেন। আবার অজুর পানি কেন? তাহাজ্জুত পড়ব। মন অস্থির হয়েছে।মন অস্থির কেন? এত কথা তোমারে বলতে পারব না। অজুর পানি দিতে বলেছি—পানি দাও। আরেকটা কথা, এই বৎসর এখনো খেজুরের রস খাওয়া হয় নাই। কাল সকালে খেজুরের রস খাব।
হাবীব চেম্বারে বসেছেন। তার সামনে মক্কেলরা বসা। সামনের সারিতে বসেছে। তিনজন, তাদের পেছনে বোরকাপরা এক মহিলা। এমন কঠিন বোরকা যে মুখও দেখা যাচ্ছে না। এই গরমেও বোরকাপরা মহিলার গায়ে কাজ করা হলুদ রঙের চাদর। হাবীবের সঙ্গে প্রণব বসে আছেন। প্রণবের মুখভর্তি পান। রশিদ পাংখা টেনে যাচ্ছে। হাবীব তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে মক্কেলদের চোখের দিকে তাকালেন। কথাবার্তা শুরুর আগে তাদের ভাবভঙ্গি দেখা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বয়স্কজনের গায়ের রঙ পাকা ডালিমের মতো। চুল-দাড়ি সবই ধবধবে সাদা। তাঁর দৃষ্টি ভরসাহারা। চোখের নিচে কালি। তিনি লম্বা আচকান পরেছেন। তাঁর হাতে তসবি। তিনি তসবির গুটি টেনে যাচ্ছেন। তার দু’পাশে যে দু’জন বসা তারা টাউটশ্রেণীর তা বোঝা যাচ্ছে। মামলা-মোকদ্দমা জাতীয় বিপদে টাউট জুটে যায়। একজনের থুতনিতে অল্প দাড়ি। মাথায় বেতের টুপি। চোখে সুরমা। পরনে পায়জামা-পাঞ্জাবি। অনাজন যুবা বয়সের। শার্ট-প্যান্ট পরা। তার গা থেকে সেন্টের গন্ধ আসছে। হাবীব বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি আসামির কে হন? বৃদ্ধ বললেন, পিতা।নাম?
রহমত রাজা চৌধুরী।হজ্জ করেছেন? জি জনাব। দুইবার হজ্জ করেছি।আপনার সঙ্গে এই দুইজন কে? একজন আমার গ্রামসম্পর্কের ভাতিজা, নাম সুলায়মান। হজ্জ করেছে। মামলা-মোকদ্দমা ভালো বোঝে। আরেকজন আমার দূরসম্পর্কের ভাই। নাম ইয়াকুব।আপনার ভাই ইয়াকুব, তিনিও কি মামলা-মোকদ্দমা ভালো বোঝেন?
জি জনাব। জলমহাল নিয়ে একটা হাঙ্গামায় পড়েছিলাম, সে নানান সাহায্য করেছে। তার ‘উনসুনি’ বুদ্ধি ভালো।হাবীব বললেন, এই দু’জনকে আমার সামনে থেকে চলে যেতে বলেন। যারা মামলা-মোকদ্দমা ভালো বোঝে তাদের সামনে আমার কথাবার্তা বলতে অসুবিধা হয়। কারণ আমি নিজে মামলা-মোকদ্দমা কম বুঝি।
বদ্ধ তার দুই সঙ্গীকে নিচুগলায় কিছু বললেন। দুজনেই কঠিন মুখ করে নাসূচক মাথা নাড়ল। একজন (ইয়াকুব) হাবীবের দিকে তাকিয়ে বলল, জনাব, আমাদের থাকার প্রয়োজন আছে। মামলার অনেক খুঁটিনাটি আমরা জানি। হাজি সাহেব সুফি মানুষ, তিনি বলতে গেলে কিছুই জানেন না।হাবীব বললেন, আপনি অনেক কিছু জানেন? জি, অবশ্যই।খুনটা কে করেছে। আপনি?
আমি কেন খুন করব? এইসব কী বলেন? হাবীব বললেন, আপনি খুন না করলে সব খুঁটিনাটি জানবেন কীভাবে? হাজি সাহেব বললেন, এই তোমরা যাও। বাইরে অপেক্ষা করো।নিতান্ত অনিচ্ছায় দু’জন উঠে গেল। হাবীব বললেন, হাজি সাহেব, আপনার পেছনের মহিলা কে? আমার ভাগ্নি। জনাব, সে থাকুক। সে শুধু শুনে যাবে, কোনো কিছুই বলবে না।
হাবীব বললেন, উনি থাকলে আমার সমস্যা নাই। আমি টাউট অপছন্দ করি। যাই হোক, আমি প্রশ্ন করলে তা উত্তর দিবেন। উকিল এবং ডাক্তার এদের কাছে মিথ্যা বললে পরে বিরাট সমস্যা হয়।হাজি সাহেব বললেন, জনাব, আমি এম্নিতেই সত্য কথা বলি। অভাবি মানুষ মিথ্যা বেশি বলে। আমি অভাবি না।খুব ভালো। খুন আপনার ছেলে করেছে? জি।কে খুন হয়েছে? ছেলের আপন মামা। আমার বড় শ্যালক। তার নাম আশরাফ। আশরাফ আলি খান। খী বংশ।খুনটা কী কারণে হয়েছে?
এই বিষয়ে আমি জানি না। ছেলে কিছু বলে নাই। সে বলবে না।ঘটনা কীভাবে ঘটেছে বলুন।আমার বড় শ্যালক আশরাফ আলি খান ব্যবসা করে। মোহনগঞ্জে এবং ধর্মপাশায় তার বিরাট পাটের ব্যবসা। একটা লঞ্চও আছে। বর্ষাকালে ভাটি অঞ্চলে লঞ্চ চলাচল করে। আমার ছেলে ছোটবেলা থেকেই মোহনগঞ্জে মামার সঙ্গে থাকে।কেন?
ভাটি অঞ্চলে কোনো স্কুল নাই। মামার সঙ্গে থেকে ছেলে মোহনগঞ্জ পাইলট স্কুলে পড়েছে। আমার ছেলে লেখাপড়ায় অত্যন্ত ভালো। মাশাল্লাহ। সে চারটা লেটার নিয়ে মেট্রিক পাশ করেছে। সিলেট এম সি কলেজ থেকে স্টার মার্ক পেয়ে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছে।
খুনটা কীভাবে হয়েছে সেটা বলুন। ছেলের বিদ্যাবুদ্ধি বিষয়ে পরে জানব।আমার বড় শ্যালক ফজরের নামাজের অজু করে নামাজে বসেছে, তখন আমার ছেলে দু’নলা বন্দুক দিয়ে দু’টা গুলি করে। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু।ঘটনা কেউ দেখেছে? বারান্দায় নামাজ পড়ছিল, ইমাম সাহেব ছিলেন। উনি দেখেছেন। তারপর সবাই ছুটে এসেছে। সবাই ছুটে এসেছে।পুলিশ চার্জশিট দিয়েছে? এখনো দেয় নাই। তদন্ত চলছে।আপনার ছেলে কি পুলিশ কাস্টডিতে?
হাজি সাহেব বললেন, জি-না। পুলিশ তাকে খুঁজছে। কিন্তু সে পলাতক। তাকে শিলচর পাঠিয়ে দিয়েছি সেখানে আমার এক আত্মীয় আছে।হাবীব বললেন, একটু আগে বললেন, আপনি মিথ্যা বলেন না। এখন তো মিথ্যা বললেন। ছেলে আপনার সঙ্গেই আছে। বোরকাপরাটা আপনার ছেলে।ছেলের নাম কী? হাসান রাজা চৌধুরী।হাবীব কঠিন গলায় বললেন, হাসান রাজা চৌধুরী, বোরকা খেলো।হাজি সাহেব বললেন, একগ্লাস পানি খাব।প্রণব পানি আনার জন্যে উঠে গেলেন। হাবীব বিরক্তমুখে সিগারেট ধরালেন। হাসান রাজা চৌধুরী বোরকা খুলল।
হাবীব অনেকক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি তার দীর্ঘ জীবনে এমন রূপবান পুরুষ দেখেননি। কোরান শরিফে অতি রূপবান হিসেবে ইউসুফ নবীর কথা বলা আছে। সেই নবী কি সামনে বসে থাকা ছেলেটির চেয়েও সুন্দর ছিলেন? হাবীব বললেন, মক্কেলের সঙ্গে আমি মামলা ছাড়া অন্য বিষয়ে আলাপ করি না। আজ অন্য একটা প্রসঙ্গে কথা বলব। হাজি সাহেব, আমি আপনার ছেলের মতো রূপবান পুরুষ দেখি নাই। প্রণব, তুমি কি দেখেছ?
প্রণব আগ্রহের সঙ্গে বললেন, একবার দেখেছিলাম। শম্ভুগঞ্জ বাজারে কাপড়ের আড়তে সে বসা ছিল। জিজ্ঞেস করে জানলাম তার নাম মনীন্দ্র। তাকে দেখার জন্যে ভিড় জমে গিয়েছিল। ছয় ফুটের মতো লম্বা। ইংরেজ সাহেবদের মতো গাত্রবর্ণ। আমি যখন বললাম, আপনার নাম এবং পরিচয় কি জানতে পারি? তখন… হাবীব বললেন, প্রণব, বাকিটা পরে শুনব। এখন একটু বাইরে যাও। রশিদ, তুমিও যাও। আমি এই দু’জনের সঙ্গে প্রাইভেট কিছু কথা বলব।
প্রণব অপ্রসন্ন মুখে উঠে গেলেন। মামলা-মোকদ্দমার প্রাইভেট কথায় তিনি থাকবেন না কেন তা বুঝতে পারছেন না।হাবীব বললেন, হাজি সাহেব, আপনার মামলা আমি নিব। ছেলের পলাতক থাকাটা ঠিক না। পলাতক থাকার অর্থ অপরাধ স্বীকার করে নেওয়া। খুনের মামলায় পলাতক আসামির বেশির ভাগ সময় মৃত্যুদণ্ড হয়।হাজি সাহেব বললেন, ছেলেকে কি পুলিশের হাতে তুলে দিব?
এখনো না। যখন বলব তখন। আরও মাসখানিক সে পলাতক থাকতে পারে। আমি মামলা গুছিয়ে আনার পর সে পুলিশের কাছে ধরা দিবে। তবে আপনি যে ছেলেকে বোরকা পরিয়ে সঙ্গে সঙ্গে রাখছেন তা ঠিক না। আপনার দুই সঙ্গীও বিষয়টা জানে। এটাও ঠিক না। ছেলে এমন জায়গায় থাকবে যে আপনি ‘াড়া আর কেউ জানবে না।
হাজি সাহেব বললেন, আমার এমন কোনো জায়গা নাই। শিলচরে আমার খালাত ভাই থাকে। ছেলে সেখানে যেতে রাজি না।আপনি কোথায় থাকেন? আমি হোটেলে উঠেছি। হোটেলের নাম ‘আল হেলাল।আপনার ছেলেও আপনার সঙ্গে থাকে? জি।আপনার দুই সঙ্গীকে না জানিয়ে ছেলেকে আমার এখানে দিয়ে যাবেন। সে মামার এখানে লুকিয়ে থাকবে। আপনি একা পারবেন না। আমার পাংখাপুলার রশিদকে পাঠাব। সে অতি বিচক্ষণ। আমার এখানে ছেলেকে রাখতে আপনার আপত্তি আছে?
হাজি সাহেব বললেন, জি-না জনাব। ছেলের মত আছে কি না একটু জেনে নেই।হাবীব কঠিন গলায় বললেন, আপনার ছেলের মতামত বলে এখন কিছু নাই। যেদিন মামলার রায় হয়ে যাবে, হাইকোর্ট থেকে আপিলের ফলাফল হাতে আসবে, তখন তার মতামত শুরু হবে।হাজি সাহেব বললেন, আমি খবর নিয়েছি অনেক খুনের আসামিকে আপনি ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছেন। আমার ছেলেকে কি ছাড়িয়ে আনতে পারবেন? হাবীব বললেন, ছেলে যদি বলে আমি খুন করেছি তাহলে ছাড়িয়ে আনতে পারব না। তাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে।এই প্রথম হাসান রাজা চৌধুরী মুখ খুলল। সে শান্ত গলায় বলল, আমি মিথ্যা কথা বলব না।
হাবীব বললেন, তাহলে তো বাবা আমার কাছে খামাখা এসেছ। সত্যি কথা বলে ফাঁসিতে ঝুলে পড়ো। তোমাকে আমি একটা কথা বলি, তুমি কঁসিতে ঝুলিলে আমার কিছু যায় আসে না। আবার তুমি খালাস পেয়ে নৌকাবাইচ খেললেও কিছু যায় আসে না। বুঝেছ? হাসান বলল, জি।হাবীব বললেন, আমার অনুমানশক্তি ভালো। তুমি খুনটা কেন করেছ সেটা আমি অনুমান করতে পারি। বলব আমার অনুমান? হাসান বলল, না।হাবীব উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, চিন্তাভাবনা করে ঠিক করুন কী করবেন?
হাজি সাহেব বললেন, আপনি কি চলে যাচ্ছেন।হাবীব বললেন, জি। গভর্নর মোনায়েম খানকে আজ বার কাউন্সিল থেকে একটা সংবর্ধনা দেওয়া হবে। আমি বার কাউন্সিলের প্রধান।সময় ১৯৬৮, এশিয়ার লৌহমানব বলে স্বীকৃত আয়ুব খান হাসি হাসি মুখে পাকিস্তানের সব ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করছেন। পূর্ব এবং পশ্চিম, দুই পাকিস্তানেই তার উন্নয়নের দশ বছর পালিত হচ্ছে। বিপুল উৎসাহ এবং উদ্দীপনা।
পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সংহতি আরও প্রবল করার বাসনায় তিনি এক সভায় ঘোষণা করলেন, বাংলা-উর্দু মিলিয়ে এক নতুন ভাষা পাকিস্তানে তৈরি করা হবে। ভবিষ্যতের পাকিস্তানিরা এই ভাষাতেই কথা বলবে।সঙ্গে সঙ্গেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল ঘোষণা করল বাংলা বর্ণমালা লিখন রীতির সংস্কার করা প্রয়োজন।(১) পূর্বপাকিস্তানে মোনায়েম খান নামের একজনের রাজত্বকাল। তার উত্থানের গল্পটি এরকম—তিনি ছিলেন ময়মনসিংহ বারের অতি সাধারণ একজন ক্রিমিন্যাল ল’ইয়ার।
আয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসি নামের অদ্ভুত পদ্ধতিতে এমএলএ হন। নির্বাচিত এমএলএ-রা যাবেন পশ্চিম পাকিস্তানে। সেখানে সংসদ বসবে। এয়ারপোর্টে ছাত্ররা তাদের ঘিরে ধরল। তাদের দাবিদাওয়া যেন সংসদে পেশ করা হয়। সবাই চুপ করে থাকলেন, শুধু মোনায়েম খান বললেন, এইসব দাবিদাওয়া কোনো কাজের কথা না। ছাত্রদের সঙ্গে তাঁর উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হাতে। লাগল। এক পর্যায়ে কিছু ছাত্র তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ধাক্কা খেয়ে মোনায়েম খানের টুপি উড়ে গেল। এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করা হলো। পরদিন দৈনিক ইত্তেফাকে ছবিটি ছাপা হলো।
আয়ুব খান বুঝে গেলেন মোনায়েম খানকে তার প্রয়োজন। তিনি শুরুতে তাঁকে করলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কিছুদিন পরেই গভর্নর।মোনায়েম খানকে নিয়ে মজার মজার সব গল্প। যেমন, তিনি রাতে ঘুমানোর সময় বুকের ওপর একটা বই নিয়ে ঘুমান। বইটির নাম Friends Not Masters, বইটির লেখক আয়ুব খান।তিনি না-কি টিভি এবং বেতারের দুই প্রধানকে গভর্নর হাউসে চা খেতে ডেকে নিয়ে বলেছেন, আমার সম্পর্কে কিছু অপপ্রচার আছে।
আমি নাকি রবীন্দ্রসঙ্গীত বিরোধী। অবশ্যই না। রবীন্দ্রসঙ্গীত আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তবে আমি চাই এখন থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত আপনারা মুসলমান গীতিকারদের দিয়ে লেখাবেন। বেতার এবং টিভিতে মুসলমানদের লেখা রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া অন্য কোনো রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ। বলেন, আলহামদুলিল্লাহ।আনন্দমোহন কলেজের প্রিন্সিপাল নিযুক্তি নিয়েও গল্প আছে। মোনায়েম খান ঠিক করলেন তিনিই প্রিন্সিপাল নির্বাচন করবেন। ঠিক মানুষকে নিতে হবে। নয়তো সমস্যা। দু’জন ক্যান্ডিডেটের একজনকে বললেন, সকালে কী দিয়ে নাশতা করেছেন।
তিনি বললেন, পরোটা ডিমভাজি।এই ক্যান্ডিডেট সঙ্গে সঙ্গে বাতিল হয়ে গেলেন। কারণ ডিম হিন্দুয়ানি শব্দ। যে ডিম বলবে সে ইসলামি তমুদ্দনের একজন হবে না।অন্য ক্যান্ডিডেট বললেন, রুটি আর আন্ডাভাজি দিয়ে নাশতা করেছি।সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রিন্সিপাল নিযুক্ত হলেন। কারণ ‘আভা’ মুসলমানি শব্দ। তবে তাকেও মোনায়েম খান বললেন, আল্ডা না বলে আপনি যদি বইদা বলতেন তাহলে আমি আরও খুশি হতাম। বইদা হলো ডিমের খাস আরবি। অনেকেই বইদা বলে। আপনার বলতে অসুবিধা কী? এখন থেকে বইদা বলবেন।
মোনায়েম খান তার রাজত্বকালে অতি গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি করলেন তা হলো, এনএসএফ নামের ছাত্র সংগঠনকে পুরোপুরি গুণ্ডাবাহিনীতে রূপান্তর করা। তিনি এর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছিলেন। এনএসএফকে গুণ্ডামির অলিখিত লাইসেন্স দেওয়া হলো। বিষয়টা পুলিশ বাহিনীকেও জানানো হলো।
এই সরকারি দলের একজনের নাম পাচপাত্তুর। সে টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলে থাকে। হাতে সাইকেলের চেইন নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। মাতাল হাওয়া’ গ্রন্থে পাচপাত্তুরের ভূমিকা আছে বলেই তার বিষয়ে বিস্তারিত বলা হচ্ছে। শুরুতে পাচপাণ্ডুর নামকরণের ইতিহাসটা বলা যাক। তার আসল নাম সাইদুর। তার বাবা বিএম কলেজের শিক্ষক। সে ছিল M.Sc. Part -র ছাত্র। তার ঘরের দরজায় নিজের নাম লেখা। নামের শেষে লেখা Pass Part Two.
‘পাস পার্ট টু’ থেকে হয়েছে পাচপাস্তুর। বিশ্ববিদ্যালয়ে সে তার পূর্ণ ক্ষমতা যে ঘটনাটি দিয়ে দেখাল তা হলো, এক রাতে রেলওয়ে কলোনি থেকে অল্পবয়েসী দু’জন প্রসটিটিউট নিয়ে এল। শহীদুল্লাহ হলের মাঠে তাদেরকে দিয়ে নগ্ননৃত্যের ব্যবস্থা করল। সে নিজেও চেইন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কিছুক্ষণ নাচল। শহীদুল্লাহ হলের ছাত্র-শিক্ষকরা হতভম্ব হয়ে এই দৃশ্য দেখল।(২)
এনএসএফ নামক সংগঠনটির প্রেসিডেন্টের নাম জমির আলি। সেক্রেটারি মাহবুবুল হক দোলন। এই দু’জন খুব সম্ভব এসএম হলে থাকত। তবে এনএসএফ-এর মূল ঘাঁটি ছিল সদ্যনির্মিত মহসিন হল। এরা সহকারী হাউস টিউটরের জন্যে বানানো চমৎকার একটি উইং দখল করে ছিল। সাধারণ ছাত্রদের টাকায় কেনা খাবারদাবারের একটি অংশ চলে যেত তাদের কাছে। তাদের জন্যে আলাদা রান্না হতো।
মহসিন হলের পাশেই রেললাইন। রেললাইনের দু’পাশে বস্তি। বস্তির কিছু মেয়ে ছিল যৌনকর্মী। তাদেরকে প্রায়ই মহসিন হলে এনএসএফ-এর নেতাদের কাছে আসতে দেখা যেত। হলের প্রভোস্ট এবং হাউস টিউটররা পুরো বিষয় জানতেন। কেউ কিছুই বলতেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জ্ঞানের অভাব হয়তো ছিল না, সাহসের অভাব ছিল।
মহসিন হলের ৫৬৪ নম্বর রুমে রসায়ন বিভাগের অতি নিরীহ একজন ছাত্র বাস করত। SSC এবং HSC-তে তার রেজাল্ট ভালো ছিল বলে তাকে একটি সিঙ্গেল সিটের রুম দেওয়া হয়েছিল। এই বেচারা এনএসএফের নেতাদের ভয়ে সারাক্ষণ অস্থির হয়ে থাকত। একদিন কোনো কারণ ছাড়াই এনএসএফের নেতারা তার ঘরে ঢুকে রুম তছনছ করে দিল।
তোষক জ্বালিয়ে দিল এবং বেচারার নিজের টাকায় কেনা Organic Chemistry’র Morrison and Boyed-এর লেখা বিশাল বইটাও ছিড়ে কুটিকুটি করে ফেলল। বই কুটিকুটি করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণে বইটা সে অনেক দাম দিয়ে স্কলারশিপের টাকায় কিনেছে। তার একটাই বই। কেমিস্ট্রির অন্য বইগুলি সে লাইব্রেরি থেকে এনে পড়ত। নতুন করে আরেকটা তোষক কেনার টাকা তার ছিল না। খাটে পত্রিকার কাগজ বিছিয়ে ঘুমানো ছাড়া তার কোনো পথ রইল না।