আরও একবছর কেটে গেল। এখন সাইমনের বাড়িতে দুবছর পূর্ণ হল মিখাইলের। সে ঠিক আগের মতোই আছে। কখনও কোথাও যায় না, একটা বাজে কথা বলে না। এতদিনের মধ্যে মাত্র দুবার হেসেছে : একবার, যখন স্ত্রীলোকটি তার জন্য রাতের খাবার তৈরি করেছিল, দ্বিতীয়বার সেই ভদ্রলোককে দেখে। লোকটিকে নিয়ে সাইমনেরও খুশির সীমা নেই। কোথা থেকে সে এসেছে, সে আর জিজ্ঞেস করে না। তার একমাত্র ভয়, পাছে মিখাইল চলে যায়।
একদিন, দুজনই বাড়িতে। মুচির বউ উনুনে পাত্র চাপাচ্ছে। ছেলেমেয়েরা বেঞ্চির পাশে। দৌড়োদৌড়ি করছে আর জানালা দিয়ে দেখছে মাঝেমাঝে। একটা জানালার পাশে বসে সাইমন সেলাই করছে। আরেকটা জানালার পাশে বসে মিখাইল জুতোর গোড়ালিতে কাঁটা মারছে।সাইমনের ছোটছেলে দৌড়ে এসে মিখাইলের ঘাড়ের উপর ঝুঁকে পড়ে জানালা দিয়ে তাকাল। “মিখাইলকাকা, দেখ, ছোট-ছোট মেয়েদের নিয়ে একজন বণিকের স্ত্রী এই দিকেই আসছে। একটি ছোটমেয়ে আবার খোড়া।”সঙ্গে সঙ্গে মিখাইল হাতের কাজ রেখে জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে সেদিকে তাকাল।
সাইমন অবাক হয়ে গেল। এর আগে মিখাইল তো কখনও রাস্তার দিকে তাকায়নি! অথচ এখন সে কী যেন দেখবার জন্য জানালার একেবারে ধার ঘেঁষে বসেছে। সাইমনও জানালা দিয়ে তাকাল। দেখল, পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা একটি স্ত্রীলোক তার বাড়ির দিকেই আসছে। দুটি মেয়েকে সে হাত ধরে নিয়ে আসছে। দুটি মেয়ে দেখতে একেবারে একরকম। দুজনেরই ফারকোট আর গরম স্কার্ফ গায়ে। দুজনকে আলাদা করাই মুশকিল, শুধু একজনের পা একটু বাকা, সে খুঁড়িয়ে হাঁটে।
স্ত্রীলোকটি সিড়ি বেয়ে উঠে হাতল ঘুরিয়ে দরজা খুলল এবং মেয়েদুটিকে সামনে রেখে ঘরের ভিতরে পা দিল।“নমস্কার।” “আসুন। কী চাই আপনার?” স্ত্রীলোকটি বসল টেবিলের পাশে। মেয়েদুটি তার হাঁটু ঘেঁষে দাড়াল।স্ত্রীলোকটি বলল, “এই মেয়েদের বসন্তকালে পরার মতো চামড়ার জুতো চাই।” “ভালো কথা, করে দেব। এত ছোট জুতো এর আগে আমরা করিনি, কিন্তু সবরকমই আমরা করতে পারি। আগাগোড়া চামড়ার জুতোও করাতে পারেন, আবার কাপড়ের লাইনিং দেওয়াও করাতে পারেন। এই আমার বড় কারিকর মিখাইল।”
সাইমন মিখাইলের দিকে তাকাল। সে তখন হাতের কাজ রেখে মেয়েটির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে চুপ করে বসে আছে।সাইমন খুবই বিস্মিত হল। এ কথা ঠিক যে মেয়েদুটি দেখতে খুব সুন্দর। কালো চোখ, গোলগাল লাল টুকটুকে শরীর। গায়ের কোট আর স্কার্ফও সুন্দর। কিন্তু মিখাইল কেন যে একান্ত পরিচিতের মতো তাদের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে কিছুতেই বুঝতে পারল না।
যাহোক সাইমন স্ত্রীলোকটির সঙ্গে দরদাম করতে লাগল। খোঁড়া মেয়েটাকে কোলের উপর তুলে স্ত্রীলোকটি বলল: “এর দুপায়ের মাপ নাও; একপাটি জুতো করো খোঁড়া পায়ের মাপে, আর তিন-পাটি করো ভালো পায়ের মাপে। তাহলেই হবে। এদের দুজনের পা ঠিক এক মাপের। এরা যমজ।” মাপ নেবার পর সাইমন বলল, “আহা, এমন সুন্দর মেয়েটি, এরকম কেমন করে হল? জন্মের থেকেই কি এই রকম?” “না, ওর মা-ই পা-টা ভেঙে ফেলেছিল।” এই সময় মাত্রোনা ঘরে ঢুকে বলল, “আপনি তাহলে ওদের মা নন?”
“না গো ভালোমানুষের মেয়ে, আমি ওদের মা নই, কোনোরকম আত্মীয়ও নই। এদের সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্কই নেই। আমি ওদের লালন-পালন করেছি মাত্র।” “আপনার মেয়ে নয়, অথচ আপনি ওদের এত ভালোবাসেন!” “ভালো না বেসে কী করি? এদের দুজনকেই যে আমার বুকের দুধ খাইয়ে বড় করেছি। আমার নিজের একটি সন্তান ছিল, ঈশ্বর তাকে নিয়ে নিলেন। এদের যত ভালোবাসি তত ভালো বুঝি সেটাকেও বাসতাম না।” “এরা তাহলে কার মেয়ে?” স্ত্রীলোকটি বলতে আরম্ভ করল।
“ছ-বছর আগেকার কথা। একসপ্তাহের মধ্যে এরা বাবা-মাকে হারাল; বাপকে কবর দেওয়া হল মঙ্গলবার, মা মারা গেল শুক্রবার। জন্মের তিনদিন আগে বাপকে হারাল, মা মারা গেল জন্মের দিন। তখন আমার স্বামী আর আমি চাষবাসের কাজ করি। আমরা ছিলাম তাদের প্রতিবেশী ; পাশের বাড়িই ছিল আমাদের ! ওদের বাবাও একজন চাষী, জঙ্গলে কাজ করত।
কেমন করে যেন একটা গাছ তার উপরে পড়ে; শরীরের একেবারে আড়াআড়ি। ফলে ভিতরটা একেবারে গুঁড়ো হয়ে যায়। তাকে যখন বাড়ি নিয়ে এল, তখন সব শেষ। সেই সপ্তাহেই তার স্ত্রীর দুটি যমজ মেয়ে হল, এই দুটি মেয়ে। দুঃখে-দুর্দশায় সে ছিল একেবারে একা-যুবতী বা বৃদ্ধা কোনো আত্মীয়াই ছিল না। একাই সে শিশুদের জন্ম দিল, একাই মারা গেল।
“পরদিন সকালে আমি তাকে দেখতে গেলাম। ওর বাড়ি পৌঁছে দেখি বেচারি তখন মরে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। মরবার ঠিক আগে সে পাশ ফিরে একটা মেয়ের উপর গড়িয়ে পড়ে। তাতেই ওর বাঁ-পা গুঁড়িয়ে বেঁকে যায়। লোকজন জড়ো হয়ে তাকে ধোঁয়াপোঁছা করে, পোশাক পরিয়ে কফিন তৈরি করে কবর দেবার ব্যবস্থা করল। মেয়েদুটি একা পড়ে গেল। কোথায় তাদের রাখা হবে? তখন একমাত্র আমার কোলেই সন্তান ছিল আমার সেই ছেলের বয়স তখন আট সপ্তাহ।
কাজেই তখনকার মতো আমিই তাদের ভার নিলাম। সুস্থ মেয়েটাকে বুকের দুধ খাওয়াতে লাগলাম। প্রথমটা পা-ভাঙা মেয়েটাকে দুধ দিইনি, ও যে বাচবে তা ভাবিনি। পরে ভাবলাম: এমন পরীর মতো মেয়েটা কেন মারা যাবে? আমার মনে দয়া হল। তাকেও দুধ দিতে লাগলাম। আমার তখন বয়স অল্প, স্বাস্থ্য ভালো, ভালো খাওয়াদাওয়া করতাম। ঈশ্বরও বুকে এত দুধ দিতেন যে অনেক সময় উপচে পড়ত। একসঙ্গে দুজনকে খাওয়াতাম, তৃতীয়জন অপেক্ষা করত।
একজন থামলে তখন তৃতীয়টিকে খাওয়াতাম। ঈশ্বরের বুঝি ইচ্ছা যে আমি এই দুটোকেই মানুষ করি, তাই দ্বিতীয় বছরেই আমরা নিজেরটিকে কবরে শুইয়ে দিলাম। ঈশ্বর আমাকে আর সস্তান দিলেন না, কিন্তু আমাদের অবস্থা ফিরতে লাগল। এখন আমরা মিলের মালিক হয়েছি। আমাদের আয় যথেষ্ট, থাকিও ভালোভাবে। নিজেদের ছেলেপিলে নেই, এই দুটিকে না পেলে কী নিয়ে আমি বাঁচতাম ! ওদের ভালো না বেসে কি আমি পারি ! ওরাই তো আমার প্রদীপের সলতে।”
মাত্রোনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল :“এইজন্যই বুঝি লোকে বলে :বাপ-মা ছাড়া তুমি বাঁচতে পারো, কিন্তু ঈশ্বরকে ছেড়ে বাঁচতে পারো না।” কথাবার্তা শেষ করে স্ত্রীলোকটি যাবার জন্য উঠে দাঁড়াল। মুচি আর তার বউ দরজা পর্যন্ত গেল তাদের সঙ্গে। তারপর মিখাইলের দিকে তাকাল। হাঁটুর উপরে দুই হাত ভাজ করে সে বসে আছে। চেয়ে আছে উপরের দিকে। হাসছে।
সাইমন তার কাছে গিয়ে বলল :“এইবার সব কথা খুলে বলো তো মিখাইল।” হাতের কাজ সরিয়ে রেখে মিখাইল বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল। অ্যাপ্রনটা খুলে মুচি আর তার বউকে নমস্কার করে বলল : “তোমরা দুজনে আমাকে ক্ষমা করো। ঈশ্বর আমাকে ক্ষমা করেছেন। তোমরাও ক্ষমা করো।”
উভয়ে দেখতে পেল, মিখাইলকে ঘিরে একটা আলো ঝলমল করছে। সাইমন দাড়িয়ে মিখাইলকে নমস্কার জানিয়ে বলল : “বুঝলাম মিখাইল, তুমি সাধারণ মানুষ নও, তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করাও চলে না। শুধু একটা কথা বলো : প্রথম সাক্ষাতের পরে তোমাকে যখন বাড়ি নিয়ে আসি তখনই বা তুমি বিষন্ন ছিলে কেন, আবার আমার স্ত্রী যখন তোমাকে রাতের।
খাবার পরিবেশন করল তখনই বা তুমি হাসলে কেন? তারপর, সেই ভদ্রলোক যখন বুটের অর্ডার দিলেন, তখনই ভূমি দ্বিতীয়বার হাসলে কেন? এবং এইমাত্র স্ত্রীলোকটি যখন মেয়েদুটিকে নিয়ে এল তখনই বা তুমি তৃতীয়বার হাসলে কেন? বলো মিখাইল, তোমার চারদিকে এমন আলো কেন, আর কেনই বা তুমি তিনবার হেসেছ?”
মিখাইল বলল :“আমার শাস্তি হয়েছিল, কিন্তু এখন ঈশ্বর আমাকে ক্ষমা করেছেন, তাই এই আলো। আমি তিনবার হেসেছি, কারণ তিনটি ঐশ্বরিক সত্য আমার জানবার ছিল। ঈশ্বরের সেই সত্য আমি জেনেছি। প্রথম সত্য জানলাম যখন তোমার স্ত্রী আমার প্রতি করুণা করল; তাই আমি প্রথমবার হাসলাম। আরেকটি সত্য জানলাম যখন ধনীলোকটি বুটের অর্ডার দিল, তাই দ্বিতীয়বার হাসলাম। এখন এই মেয়েটিকে দেখে আমি তৃতীয় এবং শেষ সত্যটি জানলাম। তাই তৃতীয়বার হাসলাম।”
সাইমন বলল :“বলো মিখাইল, কেন ঈশ্বর তোমাকে শাস্তি দিয়েছিলেন, আর ঈশ্বরের সত্য তিনটিই বা কী? সব আমি জানতে চাই।” মিখাইল বলল : “ঈশ্বরের আদেশ আমি অমান্য করেছিলাম, তাই তিনি আমাকে শাস্তি দিয়েছিলেন। আমি ছিলাম স্বর্গের দেবদূত। ঈশ্বরকে আমি অমান্য করেছিলাম।”
“আমি স্বর্গের দেবদূত ছিলাম। ঈশ্বর আমাকে পাঠিয়েছিলেন একটি স্ত্রীলোকের আত্মা নিয়ে যেতে। পৃথিবীতে উড়ে গিয়ে দেখলাম একটি স্ত্রীলোক অসুস্থ হয়ে একাকী শুয়ে আছে। সবেমাত্র তার দুটি যমজ সন্তান জন্মেছে—দুটি মেয়ে! মেয়েদুটি মায়ের পাশে পড়ে আছে, ওদের যে দুধ খাওয়াবে সেই শক্তিও প্রসূতির নেই। শ্রীলোকটি আমাকে দেখতে পেল, বুঝতে পারল তার আত্মা নিতেই আমি এসেছি। চোখের জল ফেলে সে বলল: ঈশ্বরের দূত! আমার স্বামী গাছচাপা পড়ে মারা গেছে সবাই মিলে সবে তাকে কবর দিয়েছে।
আমার বোন নেই, খালা-চাচি নেই, দাদি-নানি নেই বাপ-মা-মরা মেয়েদুটোকে দেখার কেউ নেই। আমার আত্মা নিয়ো না। মেয়েদুটোকে খাইয়ে পরিয়ে তাদের পায়ে দাড়াবার মতো করে তুলতে দাও। বাপ মা ছাড়া তো সন্তান বাচতে পারে না ” প্রসূতির কথা শুনে আমি একটি মেয়েকে তার বুকে তুলে দিলাম, আরেকটিকে তুলে দিলাম তার কোলে, তারপর স্বর্গে ঈশ্বরের কাছে চললাম। ঈশ্বরের কাছে উড়ে গিয়ে বললাম : সদ্যপ্রসূতির আত্মা আনতে আমি পারিনি।
গাছ চাপা পড়ে বাপ মরেছে মায়ের দুটি যমজ সন্তান জন্মেছে সে আমাকে অনুরোধ করল তার আত্মা না নিতে। সে বলল : ‘আমার মেয়েদের লালন পালন করতে দাও, তাদের পায়ে দাঁড়াবার মতো সময় দাও। বাপ-মা ছাড়া শিশুসন্তান বাচতে পারে না। …সে মায়ের আত্মা আমি আনি নি।” তখন ঈশ্বর বললেন : “যাও মায়ের আত্মা নিয়ে এসো, আর তিনটি সত্য জেনে এসো; জেনে এসো; মানুষের কী আছে, মানুষের কী নেই, আর মানুষ কী নিয়ে বাঁচে। এই তিন সত্য জেনে তবে স্বর্গে ফিরে আসবে। আমি আবার পৃথিবীতে উড়ে গেলাম, মায়ের আত্মা নিয়ে এলাম।”
“শিশুদুটি মায়ের বুক থেকে গড়িয়ে পড়ল। তার মৃতদেহ শয্যার উপরে ঘুরে পড়তেই একটি মেয়েকে চাপা দিল; তার পা গেল বেঁকে। আত্মা নিয়ে ঈশ্বরের কাছে উড়ে চলেছি এমন সময় আমি ঝড়ে পড়লাম, আমার পাখদুটো খসে পড়ল। আত্মা একাই ঈশ্বরের দিকে চলে গেল। আমি পৃথিবীতে একটি পথের ধারে পড়ে গেলাম।” সাইমন ও মাত্রোনা বুঝতে পারল কাকে তারা খাইয়েছে, পরিয়েছে ; কে তাদের সঙ্গে এতদিন ছিল। তখন ভয়ে ও আনন্দে তারা কাঁদতে লাগল।
দেবদূত বলল :“মাঠের মধ্যে উলঙ্গ অবস্থায় আমি একা পড়ে রইলাম। মানুষের কী দরকার আমি জানতাম না। শীত বা ক্ষুধা কাকে বলে তাও জানতাম না। কিন্তু তখন আমি মানুষ হয়ে গিয়েছি। আমি তখন ক্ষুধায় কাতর, ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছি; কিন্তু কী যে করব কিছুই জানি না। তখন মাঠের মধ্যে তৈরি একটি ঈশ্বরের প্রার্থনাঘর দেখতে পেয়ে আশ্রয়ের আশায় সেখানেই গেলাম।
প্রার্থনাগৃহ তালাবন্ধ। ভিতরে ঢুকতে পারলাম না। ঠাণ্ডা বাতাস থেকে আত্মরক্ষার জন্য প্রার্থনাগৃহের পিছনে বসে রইলাম। সন্ধ্যা নেমে এল। আমি অভুক্ত, ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছি, সারা শরীর কাঁপছে। হঠাৎ একটা শব্দ শুনলাম : একটা লোক রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে, হাতে একজোড়া বুট; নিজের মনেই কী যেন বলছে। মানুষের মরণশীল মুখ আমি দেখলাম।
সেমুখ দেখে আমার ভয় হল। চোখ ফিরিয়ে নিলাম। আমি শুনতে পেলাম লোকটি বলছে, এই বরফের মতো ঠাণ্ডায় কী করে সে নিজের শরীরকে বাচাবে, কেমন করে তার স্ত্রী-পুত্রকে খাওয়াবে। আমি ভাবলাম : ‘ঠাণ্ডায় ও ক্ষুধায় আমি মরে যাচ্ছি, আর এই লোকটা শুধু নিজের কথাই ভাবছে ; কেমন করে নিজেকে আর বউকে ফারকোট দিয়ে ঢাকবে, কেমন করে স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকে খাওয়াবে। এ কখনও আমাকে সাহায্য করবে না।’ লোকটি আমাকে দেখল, ভুরু কোচকাল, যেন আরও ভয় পেয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
আমি হতাশায় ভেঙে পড়লাম। হঠাৎ শব্দ শুনে বুঝলাম লোকটা ফিরে আসছে। আমি চোখ তুললাম, কিন্তু দেখলাম এ যেন সে-লোক নয়। তখন তার মুখে ছিল মৃত্যুর ছায়া, এখন সহসা সে যেন বেঁচে উঠেছে, তার মুখে আমি ঈশ্বরকে দেখতে পেলাম। সে আমার কাছে এল, আমাকে জামা-জুতো পরাল, সঙ্গে করে তার বাড়িতে নিয়ে গেল। লোকটির বাড়িতে ঢুকতেই তার বউ এগিয়ে এসে বকবক করতে লাগল।
বউটি যেন লোকটির চাইতেও ভয়ংকরী— তার মুখ দিয়ে যেন একটি মৃত আত্মা কথা বলছে, মৃত্যুর দুর্গন্ধে আমার যেন দম আটকে আসছিল। সেই ঠাণ্ডায় সে আমাকে বাইরে তাড়িয়ে দিতে চাইল। আমি জানতাম, আমাকে তাড়িয়ে দিলেই সে মারা যাবে। তখন তার স্বামী তাকে ঈশ্বরের কথা স্মরণ করিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীলোকটির মনে পরিবর্তন এল। তারপর সে যখন খাবার দিয়ে আমার দিকে তাকাল, আমি দেখলাম তার মুখে মৃত্যুর ছায়া আর নেই সে যেন বেঁচে উঠেছে; তার মুখেও আমি ঈশ্বরকে দেখতে পেলাম।
“তখনই আমার মনে পড়ে গেল ঈশ্বরের প্রথম কথা : ‘জেনে এসো, মানুষের কী আছে।’ আমি জানলাম, মানুষের প্রেম আছে। আমি খুশি হলাম, কারণ ঈশ্বর আমাকে যা বলেছিলেন সেই সত্য আমার কাছে প্রকাশ করতে আরম্ভ করেছেন। সেই আমি প্রথমবার হাসলাম। কিন্তু সবকিছু তখনও শেখা হয়নি। তখনও জানিনি, মানুষের কী নেই, বা মানুষ কী নিয়ে বেঁচে থাকে।
“তোমাদের সঙ্গে একটি বছর কাটালাম। তারপর একদিন একজন লোক এসে এমন বুটের অর্ডার দিল যা একবছরের মধ্যে ছিড়বে না বা ফাটবে না। তার দিকে তাকাতেই তার পিছনে আমার সঙ্গী মৃত্যুদূতকে দেখতে পেলাম। বুঝলাম, সূর্যাস্তের আগেই সে এই ধনীলোকটির আত্ম নিয়ে যাবে। তখন ভাবলাম :‘মানুষ একবছরের কথা ভাবে, অথচ সে জানে না যে সন্ধ্যা পর্যন্তও তার আয়ু নেই।” তখনই মনে পড়ল ঈশ্বরের দ্বিতীয় কথা: ‘জেনে এসো, মানুষের কী নেই।’
“মানুষের কী আছে আমি আগেই জেনেছি। এখন জানলাম, মানুষের কী নেই। তখনই আমি দ্বিতীয়বার হাসলাম। আমার সঙ্গী দেবদূতকে দেখে এবং ঈশ্বর আর একটি সত্য আমার কাছে প্রকাশ করেছেন জেনে আমার ভারি আনন্দ হল।
“কিন্তু তখনও আমার সব জানা হয়নি। আমি তখনও জানি নি, মানুষ কী নিয়ে বাঁচে। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম, কবে ঈশ্বর বাকি সত্যটা আমার কাছে প্রকাশ করবেন। ষষ্ঠ বছরে দুটি যমজ মেয়ে নিয়ে স্ত্রীলোকটি এল। আমি তাদের চিনতে পারলাম ; তারা কী করে বেঁচে আছে তাও শুনলাম। সব শুনে ভাবলাম : ‘মেয়েদের জন্য মা আমার কাছে জীবন ভিক্ষা চেয়েছিল, মায়ের কথা আমি বিশ্বাস করেছিলাম—ভেবেছিলাম বাব-মা ছাড়া শিশুসন্তান।
বাচতে পারে না, অথচ একজন অপরিচিতা তাদের বড় করে তুলেছে!’ অন্যের মেয়ের প্রতি স্নেহে স্ত্রীলোকটি যখন কাদল, তখন তার মধ্যে আমি জীবন্ত সৃষ্টিকর্তাকে দেখতে পেলাম, আমি জানলাম মানুষ কী নিয়ে বাচে। তখন আমি বুঝলাম, ঈশ্বর আমার কাছে তৃতীয় সত্য প্রকাশ করেছেন, আমাকে ক্ষমা করেছেন। তাই আমি তৃতীয়বার হাসলাম।”
দেখতে দেখতে দেবদূতের দেহ নেমে এল। এমন তীব্র আলো দিয়ে সে দেহ গড়া যে সেদিকে তাকানো যায় না। অতি উচ্চকণ্ঠে সে কথা বলতে লাগল। মনে হল, কথাগুলো তার ভিতর থেকে আসছে না, স্বর্গ থেকে আসছে। দেবদূত বলল: “আমি জানলাম, মানুষ নিজের কৌশলে বাচে না, বাচে প্রেমে।”
“মানুষ হিসাবে আমি বেঁচে রইলাম—আমার চেষ্টায় নয়, বেঁচে রইলাম যেহেতু একজন পথের লোক ও তার স্ত্রীর হৃদয়ে প্রেম ছিল, তারা আমাকে দয়া করেছিল, ভালোবেসেছিল। বাপ-মা-হারা মেয়েদুটি বেঁচে রইল কোনো স্বার্থচিন্তার দ্বারা নয়, বেঁচে রইল, যেহেতু অপরিচিতার হৃদয়ে প্রেম ছিল, সে তাদের দয়া করেছিল, ভালোবেসেছিল। সব মানুষই বেঁচে থাকে—নিজেদের পরিকল্পনা অনুসারে নয়, মানুষের হৃদয়ের প্রেমের শক্তিতে।
‘আগে জানতাম ঈশ্বর মানুষকে জীবন দান করেন, তিনি চান তারা বেঁচে থাকুক; এখন আমি আরও কিছু জানলাম।” “আমি বুঝতে পারলাম, যদিও মানুষ মনে করে যে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবার প্রচেষ্টাতেই সে বাঁচে, সে কিন্তু বাঁচে একমাত্র প্রেমে। যে মানুষ প্রেমময়, ঈশ্বর তার সঙ্গী, তার মধ্যে তিনি আছেন; কারণ তিনিই প্রেম।”
দেবদূত ঈশ্বরের জয়গান করতে লাগল, তার কণ্ঠস্বরে কেঁপে কেঁপে উঠল ঘরখানি। ঘরের ছাদ দুইভাগ হয়ে পৃথিবী থেকে স্বর্গ পর্যন্ত একটা অগ্নিস্তম্ভ উঠে গেল। সাইমন, তার স্ত্রী আর ছেলেমেয়েরা পড়ে গেল মেঝেয়। দেবদূতের পিঠে পাখা গজাল, সে উড়ে গেল আকাশে।সাইমনের যখন জ্ঞান ফিরে এল, তখন তার কুঁড়েঘর যেমন ছিল তেমনি আছে, আর তার নিজের পরিবার ছাড়া আর কেউ সেখানে নেই।
Read more
