মিসির আলিকে আয়োজন করে মাছ দেখানো হলো। গজফিতা আনা হয়েছিল। গজফিতা দিয়ে মিসির আলিকেই সেই মাছ মাপতে হলো। তিন ফুট সাড়ে সাত ইঞ্চি। মিসির আলি মাছ মাপামাপি করছেন সেই দৃশ্যের ছবি তোলা হলো মোবাইল টেলিফোনে। একটা ছবি না, একাধিক ছবি।
মিসির আলি হতাশ বোধ করলেও যন্ত্রণা সহ্য করে গেলেন। মোবাইল ফোনের সঙ্গে ক্যামেরা যুক্ত হয়ে বিরাট সমস্যা হয়েছে। সবাই ফটোগ্রাফার। বাংলাদেশে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা এক কোটি। এর অর্থ এক কোটি ফটোগ্রাফার ক্যামেরা হতে ঘুরছে।তরিকুল ইসলাম বললেন, ভাই সাহেব! আমার ধারণা পাঁচ দশ বছরের মধ্যে এমন ক্যামেরা বার হবে যা দিয়ে ভূত প্রেতের ছবি তোলা যাবে।
যারা এইসব বিশ্বাস করে না, তাদের গালে পড়বে থাপ্লড়। ঠিক বলেছি কি-না বলুন।মিসির আলি বললেন, সে রকম ক্যামেরা আবিষ্কার হলে অবিশ্বাসীরা বড় ধরনের ধাক্কা অবশ্যই খাবে।আপনি কি অবিশ্বাসী? জি।তরিকুল ইসলাম বললেন, আচ্ছা যান আমি আপনাকে ভূত দেখাব। কথা দিলাম।ভূত দেখাবেন?
অবশ্যই দেখাব। আমার লাগবে বড় সাইজের গজার মাছ। সেই মাছ আগুনে পুড়ে জঙ্গলে ভোগ দিতে হবে। সব ধরনের ভূত প্রেতের প্রিয় খাদ্য হচ্ছে গজার মাছ। খড়ের আগুনে আধাপুড়া গজার মাছ। আর পেতন্ত্রীগুলির প্রিয় খাদ্য ইলিশ মাছ ভাজি। আপনি আগামী শনিবার পর্যন্ত থাকুন আমি প্ৰেত দেখায়ে দিব। শনি-মঙ্গলবার ছাড়া এদের দেখা পাওয়া কঠিন।
মিসির আলি ভোজন রসিক মানুষ না, কিন্তু চিতল মাছের পেটি আগ্রহ করে খেলেন। পোলাওয়ের চালের সুগন্ধি ভাত। প্রচুর ধনে পাতা দেয়া মাছের পেটি। বাটি ভর্তি চিতল মাছের গাদা দিয়ে বানানো কোপ্তা। পেটি খাবার সঙ্গে সঙ্গে একটা করে কোপ্তা মুখে দিয়ে চিবুতে হয়। খাবার তদারকি করছেন হেডমাস্টার সাহেবের স্ত্রী। আয়নাকে আশেপাশে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। মিসির আলি বললেন, আয়না কোথায়?
হেডমাস্টার বললেন, মাছ রান্না হচ্ছে তো-ও দোতলা থেকে নামবে না। মাছের গন্ধ সহ্য করতে পারে না মিসির আলি বললেন, আমাদের নবীজিও (স.) মাছের গন্ধ সহ্য করতে পারতেন না। তিনি কখনো মাছ খান নি। একবার ইয়েমেনে তাকে মাছ খেতে দেয়া হয়েছিল। দুৰ্গন্ধ বলে তিনি সরিয়ে রেখেছিলেন।
হেডমাস্টার বললেন, জানতাম নাতো।এই জ্ঞান হেডমাস্টার সাহেবকে তেমন অভিভূত করতে পারল না। তিনি শুরু করলেন ভূতের গল্প।বুঝলেন ভাই সাহেব! আমি নিজের চোখে ভূত দেখেছি। দুই বছর আগে। চৈত্র মাসে।। ঘটনাটা বলব? বলুন শুনি।আপনি যে ঘরে ঘুমান, সেই ঘরে আমি এবং আমার স্ত্রী শুয়েছি। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। ঘর অন্ধকার, কিন্তু ক্যারাম খেলার আওয়াজ আসছে।ক্যারাম?
জ্বি ক্যারাম। বড় একটা ক্যারামবোর্ড কিনেছিলাম। আমার স্ত্রী ক্যারাম খেলতে পছন্দ করেন, তার জন্যেই কেনা। সেই ক্যারামে কেউ ক্যারাম খেলছে। ঘটাস ঘটাস শব্দে স্ট্রাইকার মারছে। গুটি গর্তে পড়ছে। আমি টর্চ ফেলে দেখি ক্যারামবোর্ড মেঝেতে বিছানো। গুটি বোর্ডে ছড়ানো। ঘরে কেউ নেই। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।একদিনই শুনেছেন। আর শুনেন নি?
জ্বি না। ঐ ঘরে থাকাই ছেড়ে দিলাম।মিসির আলি বললেন, ক্যারাম বোর্ডটা কি আছে? না সেটাও ফেলে দিয়েছেন।ক্যারামবোর্ড আছে। ক্যারামবোর্ড ফেলব। কেন? আপনার ঘরেই আছে। রাতে ঘুম ভাঙলে একটু খেয়াল রাখবেন। ক্যারাম খেলার শব্দ শুনলেও শুনতে পারেন। তবে ভয় পাবেন না। যে সব ভূত প্ৰেত মানুষের বাড়িতে থাকতে আসে তারা সাধারণত নিরীহ হয়। এদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। অবশ্য প্ৰটেকশান নেয়া আছে আপনার তোষকের নিচে মোজা ভর্তি সরিষা আর দুটা রসুন রাখা আছে। সরিষা এবং রসুন যেখানে থাকে। সেখানে ভূত।কারণ কি?
রসুন আর সরিষার ঝাঁঝ তারা সহ্য করতে পারে না। ভূত প্রেতের স্মেল সেন্স খুবই ডেভেলপড। রাতে কি খাবেন বলেন।রাতে কিছু খাব না-রে ভাই।অসম্ভব কথা বললেন। রাতে থাবেন না মানে? রাজহাঁস কখনো খেয়েছেন? রাজহাঁস খাওয়াই।এত সুন্দর একটা প্ৰাণী। তাকে কেটে কুটে খেয়ে ফেলব? আমি এর মধ্যে নাই। হেডমাস্টার বিরক্ত গলায় বললেন, আপনিতো ছাতু খাওয়া হিন্দু সাধুর মত কথা বলছেন। আপনি হিন্দু সাধু না। আপনি গরু খাওয়া মুসলমান। রাজহাঁস খেতেই হবে।মিসির আলি হতাশ গলায় বললেন, ঠিক আছে রাজহাঁস খাব।
মিসির আলিকে রক্ষা করল তাঁর দুর্বল পাকস্থলী। চিতল মাছের পেটি দুর্বল স্টমাক সহ্য করল না। সন্ধ্যার দিকে কয়েকবার বমি করে তিনি নেতিয়ে পড়লেন। রাজহাঁস না খেয়েই রাতে ঘুমুতে গেলেন। তাকে কিছু খেতে হবে। না। এই আনন্দেই তিনি অভিভূত। আধশোয়া হয়ে লেপ গায়ে বিছানায় শুয়ে থাকতে ভাল লাগছে। কদম ফুলের হালকা সুবাস নাকে আসছে। তিনি ঠিক করলেন, শীতকালে ফুল ফুটে এমন কদমের চারার খোজ করবেন। ঢাকায় যে বাড়িতে থাকেন তার সামনে ফাঁকা জায়গা আছে। কদমের চারা সেখানে পুতে দেবেন।
মাজেদ নামের নয় দশ বছরের একটা ছেলেকে দেয়া হয়েছে গা, হাতপা টিপে তাকে আরাম দেবার জন্যে। মিসির আলি তাকে সে সুযোগ দেন। নি। একটা মানুষ তার গা ছানাছানি করবে। এই চিন্তাই তাঁর কাছে অরুচিকর।মনে হচ্ছে মাজেদিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তার ঘরে কম্বল পেতে ঘুমানোর জন্যে। সে খাটের দক্ষিণ দিকে মহানন্দে বিছানা করছে।মিসির আলি বললেন, মাজেদ! তুমি স্কুলে যাও?
জ্বে না স্যার।যাও না কেন? মাস্টার ভাল না। পিটন দেয়।লেখাপড়া শিখতে ইচ্ছা করে না? জ্বে না।বড় হয়ে কি করবে? ক্ষেতের কাজ? খলিফার কাজ শিখবা। সদরে দোকান দিব।তোমার বংশে খলিফা আছে? আমার বড় মামা খলিফা। নাম সবুর মিয়া। সবেই ড়াকে সবুর খলিফা।আমার ঘরে তোমাকে না ঘুমালেও চলবে। আমার শরীর সেরে গেছে।আমারে আপনের লগে ঘুমাতে বলছে। না ঘুমাইলে পিটন দিবে।কে পিটন দিবে?
হেড স্যার।তাহলে ঘুমাও। খাওয়া দাওয়া হয়েছে? জ্বে। রাজহাঁসের সালুন দিয়া খাইছি।রাজহাঁসের সালুন শুনে পেটে আয়েক দফা মোচড় দিচ্ছিল। মিসির আলি সেটা সামলালেন। মাজেদের নাক ডাকার অ্যাওয়াজ পাওয়া যাচেছ। বালিশে মাথা ছোয়ানো মাত্র ঘুমিয়ে পড়ার সৌভাগ্য তারা নেই। তাকে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকতে হবে। বইপত্র তেমন নিয়ে আসেননি। নিশি যাপন কঠিন হবে।
মিসির আলি ছাত্রের লেখা ডায়েরি হাতে নিলেন। আয়না মেয়েটির বিষয়ে আরো কিছু জানা যাক। আজ সারা দিনে একবারও তার সঙ্গে দেখা হয়নি। মাছের আশিটে গন্ধে কাতর এই মেয়ে কি শুয়ে পড়েছে? না কি সেও নিশি যাপন করছে? মিসির আলি ডায়েরি খুললেন।
আয়নাকে তার বাবা-মা’র কাছে রেখে আমি চলে এলাম। টিচার্সদের মেসে থাকি। ক্লাস নেই। প্রাইভেট টিউশনি করি। কোন কিছুতেই মন বসে না। আমি আয়নাকে একটা মোবাইল টেলিফোন কিনে দিয়েছিলাম। টেলিফোন সে ব্যবহার করে না। আমি যতবার টেলিফোন করি, তার সেন্ট বন্ধ পাই। আয়নাকে প্রতি সপ্তায় একটা করে চিঠি দেই, সে চিঠিরও জবাব দেয় না।
এক মাসের মাথায় আমি কোয়াটার পেয়ে গেলাম। তিনি কামরার ঘর। বারান্দা আছে। দক্ষিণমুখী জানালা। প্রচুর বাতাস। আয়নাকে এখন নিজের কাছে এনে রাখার আর বাধা নেই।ঘর সাজানোর কিছু আসবাবপত্র কিনলাম। খাট, ড্রেসিং টেবিল, আলনা। হাঁড়ি-পাতিল কিনিলাম না, আয়নাকে সঙ্গে নিয়ে কিনিব। ঘর সাজানোর জিনিসপত্র কিনতে মেয়েরা সব সময় আনন্দ পায়। তবে আয়না আর দশটা মেয়ের মত না। সে আলাদা এবং প্ৰবল ভাবেই আলাদা। সে কি আগ্রহ নিয়ে হাঁড়িকুড়ি কিনতে যাবে?
এক রাতের ঘটনা। আমি রেস্টুরেন্ট থেকে খেয়ে এসে ঘুমানোর আয়োজন করছি। মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। কারেন্ট চলে গেছে। ঘর অন্ধকার। মোমবাতি জ্বলিয়েছি। বাতাসে মোমবাতি নিভু নিভু করছে। আমি দরজা জানালা বন্ধ করে বাতাস আটকালাম, আর তখন মোবাইল টেলিফোন বেজে উঠল।
হ্যালো কে? আমি আয়না।কেমন আছ আয়না? ভাল না।ভাল না কেন? জানি না।আমি তোমাকে অনেকগুলি চিঠি পাঠিয়েছি। তুমি পেয়েছ? হ্যাঁ।পড়েছ? না।পড়নি কেন? ভাল লাগে না।ভাল না লাগলে পড়ার দরকার নেই। এই শোন, আমি কোয়ার্টার পেয়েছি। ছিমছাম সুন্দর বাসা। বড় বারান্দা। দক্ষিণ দিকে বারান্দাতো প্রচুর বাতাস।তোমার ঘরে কি আয়না আছে? অবশ্যই আছে। আয়না থাকবে না কেন? কয়টা আয়না? তোমার জন্যে একটা ড্রেসিং টেবিল কিনেছি। সেখানে আয়না আছে। বাথরুমে আয়না আছে। আরেকটা যেন কোথায় আছে। ও আচ্ছা, বেসিনের সঙ্গে।তুমি একটা আয়নার সামনে দাঁড়াওতো।কেন?
আছে একটা ব্যাপার। আয়নার সামনে দাঁড়াও।এই বলেই আয়না টেলিফোনের লাইন কেটে দিল।আমি চেষ্টা করেও তাকে ধরতে পারলাম না। সে মোবাইল সেট বন্ধ করে দিয়েছে। আমি ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। চমকে দেখি আয়নায় আমার স্ত্রীকে দেখা যাচ্ছে। তার পরনে শাড়ি। ঘোমটা দেয়া। মুখ হাসি হাসি। সে এখন আছে অতি রূপবতী রূপে। তার আশেপাশে কিছুই নেই।
প্রথমে ভাবলাম বিকট চিৎকার দেই। সেই ভাবনা স্থায়ী হল না। বিকট চিৎকার কেন দেব? অয়নায় যাকে দেখা যাচ্ছে সে আমার স্ত্রী। কেন এ রকম দেখছি তার কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। আমার কাছে না থাকলেও ব্যাখ্যা থাকতে হবে।
আমার শিক্ষক মিসির আলি সব সময় বলতেন- সব মানুষই জীবনের কোনও না কোন সময় অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। তখন সে যুক্তির সিঁড়ি থেকে সরে দাঁড়ায়। নিজেকে সমৰ্পণ করে। রহস্যময়তার কাছে। এই কাজটি কখনো করা যাবে না। আমাদের এগুতে হবে যুক্তির কঠিন পথে। মনে রাখতে হবে প্রকৃতি দাঁড়িয়ে আছে যুক্তির উপর। যুক্তি নেই তো প্রকৃতিও নেই।মিসির আলি স্যার আমার কাছে অতিমানব। তার কথা অবশ্যই অভ্রান্ত। কিন্তু আমি আয়নায় কি দেখছি?
আমি আয়নার ভেতরে আয়না মেয়েটিকে বললাম, তুমি এখানে কি করছ? আয়না হাসল। মাথা সামান্য কাত করল। আমি বললাম, আমি তোমার ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে পারছি না। আমাকে একটু বুঝাও।আয়না না সূচক মাথা নাড়ল।তুমি আমাকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছি। এটা তুমি করতে পার। You must speak out.
আয়না কথা বলা শুরু করল। সমস্যা একটাই। আমি তার কোনো কথা শুনতে পাচ্ছি না। তার ঠোঁট নড়ছে। কিন্তু আমি কিছু শুনছি না। ভয়াবহ অবস্থা। আমি মোমবাতি হাতে বাথরুমে আয়নার কাছে গেলাম। সেই আয়নার ভেতরেও আমার স্ত্রী বসে আছে। কথা বলছে কিন্তু আমি কিছুই শুনছি না।
মিসির আলিকে ডায়েরি পড়া বন্ধ রাখতে হল। কারণ ঘরের ভেতর খটাস খটাস শব্দ হচ্ছে। কে যেন ক্যারাম খেলছে। মাজেদের নাক ডাকার আওয়াজ আসছে। সে খেলছে না এটা বুঝা যায়। তাহলে কে? মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কদম ফুলের গন্ধ না। কড়া গন্ধ।
মিসির আলি ইচ্ছা করলেই উঁচু হয়ে খাটের ওপাশে কি হচ্ছে তা দেখতে পারেন। তিনি তা করলেন না। ডায়েরি বন্ধ করে শুয়ে পড়লেন। খটাস খটাস শব্দ হতেই থাকল। মিসির আলি চোখ বন্ধ করলেন। খটাস খটাস শব্দ থেমে গেল। কড়া মিষ্টি গন্ধটাও আর পাওয়া যাচ্ছে না। মিসির আলি ঘুমিয়ে পড়লেন। তাঁর তৃপ্তির ঘুম হল।
সকাল আটটা।মিসির আলি বারান্দায় বসে আছেন। তাঁর পায়ের কাছে মাজেদ। ঘুম ভাঙার পর থেকেই সে মিসির আলির সেবা করার নানান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো লাভ হচ্ছে না। মিসির আলি সেবা গ্ৰহণ করতে রাজি হচ্ছেন। না! মাজেদ হাল ছাড়ার পাত্র না। সে চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে।পায়ে তেল দিয়া দিমু স্যার?
না।শীতকালে পায়ে তেল দিতে হয়। তেল না দিলে চামড়া ফাটে।ফাটুক।মাথা মালিশ করব? আরাম পাইবেন।আমার আরামের দরকার নেই।সবের আরাম দরকার। নেড়ি কুত্তারও আরাম দরকার।তাই নাকি? জে। দেহেন না রইদ উঠলে কুত্তা কেমন রইদ তাপায়।তা ঠিক।গরুরাও আরাম দরকার। গরুর গলাতে যদি আপনে হাতাহাতি করেন আরামে তার চউখ বন্ধ হয়। মাথা টিপ্যা। আমি আপনেরে এমন আরাম দিব যে আপনের চউখ বন্ধ হয়ে যাবে।
মিসির আলি বললেন, আমি চোখ খোলা রাখতে চাই। বই পড়ছিতো। চোখ বন্ধ রাখলেতো বই পড়তে পারব না। তাছাড়া আমি গরু না, মানুষ।মাজেদ বলল, কি বই পড়েন? কবিতার বই পড়ি। দিনের শুরুটা কবিতায় করা ভাল।কবিতার মধ্যে কি লেখা স্যার? শুনতে ইচ্ছা করে? জ্বে।
মিসির আলি আবৃত্তি করলেন—
Two Toads diverged in a yellow wood,
And sorry I could not travel both
And be one traveler, long I stood
And looked down one as far as I could
To where it bent in the undergrowth,
মাজেদ হা করে কবিতা শুনছে। তার চোখ ভর্তি বিস্ময়। মিসির আলি বললেন, কবিতা কেমন শুনলি? ভাল লেগেছে? জ্বে স্যার। ভাল। আরো শুনবি? জ্বে শুনব। মাজেদকে কবিতা শুনানো হল না। চা নিয়ে আয়না আসছে। আয়নাকে দেখেই মাজেদ উঠে দাঁড়াল, ভীত গলায় বলল, আমি যাই স্যার পরে আসব। মিসির আলির মনে হল যে কোনো কারণেই হোক মাজেদ আয়না মেয়েটাকে ভয় পায়।
আয়না বলল, চা নিয়ে এসেছি।মিসির আলি বললেন, থ্যাংক য়ু।আয়না বলল, আপনার নাশতা রেডি হচ্ছে। খাটি ঘিয়ে ভাজা চপচপে পরোটা এবং রাজহাঁসের ভুনা মাংস। এত চেষ্টা করেও রাজহাঁসের হাত থেকে রক্ষা পেলেন না।মিসির আলি বললেন, তাইতে দেখছি।আয়না বলল, স্যার আপনার সামনে বসি।মিসির আলি বললেন, আরাম করে বাস। এবং কি বলতে চাও বলে ফেল।আয়না বসতে বসতে বলল, আপনার মানসিক ক্ষমতা দেখে অবাক হয়েছি।মিসির আলি বললেন, কোন ক্ষমতাটা দেখলে?
আয়না বলল, রাতে ক্যারাম খেলার খটাস খটাস ভৌতিক শব্দ হচ্ছে। আপনি নির্বিকার, মাথা উঁচিয়ে দেখার চেষ্টাও করলেন না। ঘুমিয়ে পড়লেন। আপনি ছাড়া অন্য যে কোনো মানুষ ভয়ে অস্থির হত। ডাকাডাকি শুরু করত। আপনি একটুও ভয় পাননি, এর কারণ কি স্যার? মিসির আলি বললেন, বেশির ভাগ মানুষ সংশয়বাদী। তাদের ধারণা ভূত-প্ৰেত থাকলে থাকতেও পারে। আমার মধ্যে এই ধরনের কোনো সংশয় নেই।ক্যারাম খেলার শব্দ কি ভাবে হল?
মিসির আলি বললেন, শব্দটা পাশের ঘরে হয়েছে। কেউ একজন খটাস খটাস শব্দে ক্যারাম খেলেছে।সেই কেউ টা কে? আমি? না তুমি না। তোমার বাবা।কিভাবে বুঝলেন? মিসির আলি সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, তোমার বাবা আমাকে আস্তিক বানানোর চেষ্টা করছেন। পাশের ঘরে খটাস খটাস শব্দ করে আমাকে ভূতের ভয় দেখাতে চাচ্ছেন।বাবা এই কাজটা করেছেন। আপনি এত নিশ্চিত হচ্ছেন কি ভাবে?
মিসির আলি বললেন, সকালে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। তিনি জানতে চাইলেন, রাতে ঘুম ভাল হয়েছে কি না। তার গলায় ছিল কৌতূহল এবং অগ্রহ।আয়না বলল, এই থেকে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায় না। আপনি অসুস্থ ছিলেন। অতিথি মানুষ। আপনার ভাল ঘুম হয়েছে কি না সেটা কৌতূহল এবং আগ্রহ নিয়ে জানতে চাওয়াটাতো স্বাভাবিক।
মিসির আলি বললেন, যখন ক্যারাম খেলার শব্দ হচ্ছে তখন আমি মিষ্টি গন্ধ পেলাম। আমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ার পর খটাস খটাস শব্দ থেমে গেল। মিষ্টি গন্ধও পাওয়া গেল না। মিষ্টি গন্ধটা জর্দার। তোমার বাবা প্রচুর জর্দা দিয়ে পান খান। এখন কি তুমি আমার Deduction গ্রহণ করবে?
জ্বি স্যার করব।মিসির আলি বললেন, বিডি ল্যাংগুয়েজের একটা ব্যাপার আছে সেটা কি জান? না।আমরা মুখে অনেক কথা বলি না, কিন্তু আমাদের শরীর বলে। মনের ভেতরের কথা শরীর প্রকাশ করে দেয়। সকালবেলা তোমার বাবার বডি ল্যাংগুয়েজ তাকে প্রকাশ করে দিয়েছে। উদাহরণ দিয়ে বুঝাব? বুঝান।তুমি আমার সামনের চেয়ারে বসেছি। পায়ের উপর পা তুলে বসেছি। পা কিন্তু আমার দিকে না। যেদিক থেকে এসেছি সেদিকে রাখা এর অর্থ তুমি আমার সামনে বসে থাকতে চাচ্ছ না, চলে যেতে চাচ্ছ।আয়না অবাক হল। ভালই অবাক হল।
মিসির আলি বললেন, তুমি এখন তোমার বসার অবস্থা একটু বদলেছ। মাথা সামান্য নিচু করে উপরের দিকে তাকাচ্ছ। মাথা নিচু করে যখন কোনো মেয়ে উপরের দিকে তাকায়, তখন তার চোখ বড় দেখা যায় এবং তার মধ্যে সামান্য হলেও খুকি ভাব আসে। তুমি এই ভাবটা নিয়ে এসে আমাকে বলার চেষ্টা করছি যে আমি যা বলছি তা সত্যি। আরো উদাহরণ দিন।
