মিসির আলি আপনি কোথায় পর্ব:০৪ হুমায়ূন আহমেদ

মিসির আলি আপনি কোথায়

তোমার বাবা যখন সিগারেট খান তখন উপরের দিকে ধোঁয়া ছাড়েন। তুমি যখন সামনে থােক তখন মেঝের দিকে ধোঁয়া ছাড়েন। এর অর্থ তুমি সামনে থাকলে তাঁর Confidence level নেমে যায়। আমাদের মন অনেক কিছু বলতে চায় না। কিন্তু শরীর বলে দেয়।

আয়না বলল, আপনি বুদ্ধিমান।মিসির আলি বললেন, আমার বুদ্ধি আর দশজন মানুষের মতই। আমার সুবিধা হচ্ছে। আমি বুদ্ধি ব্যবহার করি। অন্যরা করে না, বা করতে চায় না।আয়না বলল, আপনি কি আপনার ছাত্রের লেখা ডায়েরিটা পড়ে শেষ করেছেন?

দশ পৃষ্ঠার মত পড়েছি। Slow reader, কারণ কি জান? কারণ হচ্ছে লেখা থেকে আমি ধরার চেষ্টা করি লেখার বাইরের কি লেখা আছে তা। লেখার মধ্যেও বডি ল্যাংগুয়েজ আছে।আয়না বলল, যে দশ পৃষ্ঠা পড়েছেন সেখানে লেখার বাইরে কি লেখা আছে? মিসির আলি বললেন, লেখার বাইরে লেখা আছে যে স্বামী স্ত্রী হিসেবে বাস করেছ কিন্তু তোমাদের ভেতর শারীরিক কোনো সম্পর্ক হয়নি! কি ভাবে ধরলাম বলব?

না। চলুন নাশতা খেতে যাই।নাশতার টেবিলে হেডমাস্টার সাহেব একটি আনন্দ সংবাদ দিলেন। রাজ্য জয় করে ফেলেছেন এমন ভঙ্গিতে বললেন, ভাই সাহেব গুড নিউজ। গজার মাছ পাওয়া গেছে। ইনশাল্লাহ আজ রাতে আপনাকে ভূত দেখাতে পারব।মিসির আলি হাসলেন। হেডমাস্টার বললেন, আপনার অবিশ্বাস আজ পুরোপুরি দূর হবে।মিসির আলি বললেন, অবিশ্বাসী মানুষের সবচে বড় সমস্যা হল একটা অবিশ্বাস দূর হলে অন্য অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়।আজ সব ভেঙেচুড়ে দেব। খড়ের আগুনে সামান্য লবণ দিয়ে গজার মাছ পুড়া হবে।মিসির আলি বললেন, সেই মাছ কি আমরা জঙ্গলে রেখে আসব?

হেডমাস্টার সাহেব বললেন, না। মাছ ঘরে রেখে দেব। তারপর দেখবেন কি হয়।কি হবার সম্ভাবনা? পোড়া মাছের লোভে ভূত প্রেতি বাড়ির চারপাশে ঘোরাঘুরি শুরু করবে।আয়না বলল, বাবা ভূতের আলাপ থাকুক। দিনের বেলা ভূতের ইতিহাস শুনতে ভাল লাগে না। সন্ধ্যা হোক তারপর শুরু করা। নাশতা খাবার পর আমি স্যারকে নিয়ে বেড়াতে বের হব। তুমি কি যাবে আমাদের সঙ্গে?

আরো পাগল হয়েছিস? গজার মাছ পুড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে না? মাছ পুড়ানোর টেকনিক আছে। আগুনে ফেলে দিলেই হয় না।আয়না মিসির আলিকে নিয়ে বটগাছের কাছে এল। সে কাঁধে বুলিয়ে পাটের ব্যাগ এনেছে। সেখান থেকে ক্যামেরা বের করে বলল, বটগাছের ছবি তুলতে চেয়েছিলেন। ছবি তুলুন।মিসির আলি হাতে ক্যামেরা নিলেন।

একবারও জানতে চাইলেন না তিনি যে ছবি তুলতে চেয়েছেন সেটা আয়না জানল কি ভাবে।মাছরাঙার ছবি তুলুন।মিসির আলি মাছরাঙার ছবি তুলে বললেন, তোমার একটা ছবি কি তুলে দেব? আয়না না সূচক মাথা নাড়ল। মিসির আলি বললেন, তুমি এখন মুখের ভাষায় না বলনি। শরীরের ভাষায় মাথা নেড়ে না বলেছ। শরীরের এই ভাষাটা আমরা সবাই জানি। এই ভাষার উৎপত্তি কি ভাবে জান? জানি না।জানতে চাও? চাই।

মিসির আলি বললেন, না বলার এই শারীরিক ভাষা তৈরি হয়েছে আমাদের শৈশবে। একটা শিশুকে মা খাওয়াচ্ছে। সে কথা বলা শিখেনি। তার পেট ভর্তি হয়ে গেছে সে এবার খাবে না। তখন তার মুখের কাছে খাবার নিলে সে মুখ সরিয়ে নেবে।। যেখানে মুখ সরিয়েছে সেখানে খাবার নিলে মুখ আরেক দিকে সরাবে। না সূচক মাথা নাড়ানাড়ি চলতেই থাকবে। বুঝতে পারছ? আমি যে তোমাকে ইচ্ছা করে অবাক করতে চাচ্ছি সেটা বুঝতে পারছ? পারছি।কেন তোমাকে অবাক করতে চাচ্ছি সেটা বুঝতে পারিছ?

বুঝতে পারছি না। এবং বুঝতে চাচ্ছিও না। স্যার আপনি আর কতদিন থাকবেন? পরশু চলে যাব।যে মিশন নিয়ে এসেছিলেন সেটা কমপ্লিট হয়েছে? মোটামুটি হয়েছে।আয়না মেয়েটির রহস্য ধরে ফেলেছেন? অনেকখানি ধরেছি। তুমি নিজে তোমার সম্পর্কে যা লিখেছি তা যদি পড়তে দাও। তাহলে পুরোটাই বুঝতে পারব। দিবে?

আয়না স্পষ্ট গলায় বলল, না।মিসির আলি বললেন, চল বসি।আয়না। ক্লান্ত গলায় বলল, চলুন।দু’জন চুপচাপ বসা। মিসির আলি নদীর দিকে তাকিয়ে আছেন।আয়না দুঃখী দুঃখী ভঙ্গিতে মিসির আলির দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। মিসির আলি বললেন, চুপচাপ বসে না থেকে গল্প কর।আয়না বলল, আপনি গল্প করুন। আমি শুনি।কি গল্প শুনতে চাও?

আয়না বলল, আপনার ছাত্রের কাছে শুনেছি আপনার একটা ফাইল আছে, সেখানে যে সব রহস্যের আপনি কোনো মীমাংসা করতে পারেন নি। সেই সব অমীমাংসিত রহস্যের কথা লেখা।ঠিকই শুনেছ।সে সব গল্পের একটা শুনান। আপনার ব্যর্থতার গল্প শুনি। না কি আপনার আপত্তি আছে?

কোনো আপত্তি নেই। বরং আগ্ৰহ আছে। আমি রহস্যভেদ করতে পারি নি, অন্য একজন পারবে। সেই অন্য একজন তুমিও হতে পার।গল্প শুরু করুন। মিসির আলি শুরু করলেন— বছর পনেরো আগের কথা। আমার কাছে একটা কিশোরী মেয়ে এসেছে। চৌদ্দ পনেরো বছর বয়স। সে এক আসেনি, তার মা তাকে নিয়ে এসেছে। মেয়েটার নাম নোশিন। তার নাকি ভয়ংকর এক সমস্যা। আমি তার সমস্যার সমাধান দেব এই মা মেয়ে দু’জনের আশা।

আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করি। আমার নিজের একটা ছোট্ট কামরা আছে। ক্লাসের শেষে সেখানে বসে পড়াশোনা করি। মেয়ে এবং মেয়ের মা সেখানেই বসেছে। আমি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললাম, কি সমস্যা গো মা? মেয়ে ভীত চোখে মা’র দিকে তাকাল। সে তার সমস্যা নিজের মুখে বলতে চায় না। মাকে দিয়ে বলতে চায়। তার মা বললেন, নোশিন কি যেন দেখে।আমি বললাম, কি দেখ?

নোশিন আবার তার মা’র দিকে তাকালো।আমি বললাম, তোমার সমস্যা তোমাকেই বলতে হবে। খোলাখুলি বলতে হবে এবং আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে হবে। কোন ক্লাসে পড়? ক্লাস টেন।তুমি পড়াশোনায় কেমন? ভাল।সায়েন্স গ্রুপ? জ্বি।এইত কথা বলতে পারছি। এখন সমস্যা বলা শুরু কর। কোক বা পেপসি খাবে আনিয়ে দেব? না।

শোন নোশিন! তুমি পেপসি বা কোক খেতে চাচ্ছ। তোমার বডি ল্যাংগুয়েজ তাই বলছে। কিন্তু মুখে বলছ না। আমি আনিয়ে দিচ্ছি। কি আনতে বলব কোক? সেভেন আপ।আমি সেভেন আপ আনতে বেয়ারাকে পাঠালাম। নোশিন অনেকখানি সহজ হল। সে হাত মুঠি করে বসেছিল। হাতের মুঠি সামান্য আলগা করল। কেউ যখন কিছু বলতে চায় না, তখন হাত মুঠিবদ্ধ করে রাখে।

সেভেন আপের গ্লাসে চুমুক দিয়ে নোশিন তার সমস্যাটা বলল, সে না কি খুব ছোটবেলা থেকেই জন্তুর মত একটা কিছু দেখে। জন্তুটা থাকে মানুষের পেছনে। সব মানুষের পেছনে না। যারা অল্পদিনের মধ্যে মারা যাবে। তাদের পেছনে। জন্তুটা দেখতে কিছুটা মানুষের মত। তবে মুখ গরুর মুখের মত লম্বা। তাদের চোখও গরুর চোখের মত। সেই চোখের মণি কখনো স্থির না। সব সময় ঘুরছে। জন্তুর গা থেকে কাঠপোড়ার গন্ধ আসে। তার হাত পা মানুষের মত। শুধু হাতের আঙুল অস্বাভাবিক লম্বা।

নোশিনের মা বললেন, মেয়ে যা বলছে সবই সত্যি। আমাদের যে সব আত্মীয় স্বজন মারা গেছেন, তাদের প্রত্যেকের পেছনে সে এই জন্তু দেখে ভয়ে অস্থির হয়ে কান্নাকাটি করেছে। যাদের পেছনে সে এই জন্তু দেখেছে তারা প্ৰত্যেকেই সাত থেকে দশদিনের ভেতর মারা গেছে।আমি বললাম, নোশিন জন্তুটার সাইজ কি? কত লম্বা?

নোশিন বলল, যার পেছনে সে দাঁড়ায় তারচেয়ে সে এক ফুটের মত লম্বা হয়। তার মাথার উপর দিয়ে জঞ্জটার মাথা দেখা যায়। জন্তুটা গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে থাকে।জন্তুটার গায়ে কাপড় দেখেছ? সে দেখতে মানুষের মত? মানুষ জামা কাপড় পরে। জন্তুটা কি পরেছে?

নোশিন এই প্রশ্নের জবাব দিল না। চোখ নামিয়ে টেবিলের দিকে তাকিয়ে রইল।আমি তাকে নিয়ে সেদিনই ঢাকা মেডিকেল কলেজে গোলাম। তাকে বললাম, তুমি আমাকে সাতজন রোগী দেখাও যাদের পেছনে ঐ জন্তু দাঁড়িয়ে আছে।নোশিন দেখাল। আমি রোগীদের নাম ধাম লিখে চলে এলাম। নোশিনকে বললাম, পরে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করব।

আশ্চর্য হলেও সত্যি সাতজন রোগীই দশ দিনের মাথায় মারা গেল। নোশিনকে নিয়ে এই পরীক্ষা আরো দুইটা হাসপাতালে করলাম। তার একটি হচ্ছে আজমপুর সরকারি মেটার্নিটি ক্লিনিক। যেখানে অনেক সময় মা এবং নবজাতক দু’জনই মারা যায়। নোশিন তাও ঠিকঠাক মত বলতে পারল।সে বলল যে সব রোগী বিছানায় শুয়ে থাকে জন্তুটা তার পাশে শুয়ে থাকে। বেশির ভাগ সময় গলা জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে।

নবজাতক শিশুর সঙ্গে যে জন্তুটা শুয়ে থাকে, সেই জন্তুটার সাইজ শিশুর চেয়ে সামান্য বড়।আমি একটি হাইপোথিসিস দাঁড়া করালাম। জটিল কিছু না। সহজ ব্যাখ্যা। মেয়েটি কোনো বিশেষ উপায়ে মানুষের মৃত্যু sense করতে পারে। হয়ত কোনো গন্ধ পায় বা এরকম কিছু। মৃত্যু সেন্স করার পর পরই তার ব্রেইন একটা কাল্পনিক ভয়ংকর জন্তুর মূৰ্তি তৈরি করে। তার ভেতর illusion তৈরি হয় যে সে জন্তু দেখছে।

পাশাপাশি আরেকটা হাইপোথিসিস দাঁড়া করলাম। এই হাইপোথিসিসে মেয়েটির ভবিষ্যত দেখার ক্ষমতা আছে। পুরো ভবিষ্যত না দশ বারোদিনের ভবিষ্যত। এর মধ্যে যারা মারা যাবে সে জানে, তাদের পেছনেই জন্তু কল্পনা করে নেয়।আমি প্রায় এক বছর এই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবলাম। প্যারানরম্যাল ভুবনে নোশিনের মত আর কোনো উদাহরণ আছে কিনা জানার চেষ্টা করলাম।

অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়ে যারা গবেষণা করেন তাদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তখন ইন্টারনেট শুরু হয়নি। অনেক চিঠিপত্র চালাচালি করতে হল। বলিভিয়ার এক বৃদ্ধের খোঁজ পাওয়া গেল যে মানুষের মৃত্যুর দিন ক্ষণ বলতে পারে তবে সে কোনো জন্তু দেখে না। তার নাম সিমন ডি শান। যখন ভাবছি সরাসরি তার সঙ্গে যোগাযোগ করব হঠাৎ খবর পেলাম নোশিন তার নিজের পেছনে একটা জন্তু দেখছে।

মিসির আলি বললেন, আজ এই পর্যন্ত। বাকিটা অন্য সময় বলব।আয়না বলল, অন্য সময় বলবেন মানে? এখনই গল্প শেষ করবেন। গল্প শেষ না করে উঠতে পারবেন না।মিসির আলি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, কেন পারব না বল? তুমি সবার উপর প্রভাব খাটাচ্ছ। আমার উপরও প্রভাব ফেলতে চাচ্ছি। আমাকে এই চক্র থেকে বের হতে হবে। তুমি ফুটবল খেলতে এসে বল রাখছি নিজের পায়ে। তা আর হবে না। বল নিয়ে আসতে হবে। আমার নিজের কোর্টে।আয়না বলল, গল্পের শেষটা খুব জানতে ইচ্ছা করছে।কোনও এক সময় অবশ্যই জানবো।সেটা কখন? আজ?

মিসির আলি বললেন, জানি না। তিনি বাড়ির দিকে রওনা হয়েছেন। আয়না আসছে না। সে তার জায়গাতেই বসে আছে। তাকিয়ে আছে মিসির আলির দিকে। তার চেহারা বিষণ্ণ। কেঁদে ফেলার আগে কোনো তরুণীকে যে রকম দেখায়, তাকে সে রকম দেখালো। মিসির আলির মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। তিনি বললেন, আয়না এসো। গল্পের শেষটা শুনে যাও। বাড়ির দিকে যেতে যেতে গল্পটা করি। আয়না প্ৰায় দৌড়ে এল। মিসির আলি ছোট ছোট স্টেপ নিয়ে এগুচ্ছেন, গল্প করছেন। আয়না। কান পেতে আছে।

বুঝতেই পারছি নোশিন মেয়েটির বাড়িতে কান্নার সীমা রইল না। তখনি তাকে ডাক্তারের কাছে নেয়া হল। যদি কোনো রোগ ধরা পড়ে তার চিকিৎসা যেন শুরু হয়।পুরো মেডিকেল চেক আপ। নোশিনের বাধা নিজেও একজন ডাক্তার, পিজিতে কাজ করেন।মেডিকেল চেকাপে খারাপ ধরনের জন্ডিস ধরা পড়ল। হেপাটাইটিস সি বা ডি এই ধরনের কিছু। সুস্থ সবল মেয়ে দেখতে দেখতে মরার মত হয়ে গেল। তাকে ভর্তি করা হল পিজি হাসপাতালে।

মেডিকেল বোর্ড বসল। নোশিনের অবস্থা দ্রুত খারাপ হওয়া শুরু করল। বেশির ভাগ সময় সে চোখ বন্ধ করে থাকে। ঘরের আলো সহ্য করতে পারে না।এক রাতে নোশিন তার মাকে বলল জন্তুটা তার সামনে চলে এসেছে। বসে আছে হাসপাতালের বিছানার পাশে। নোশিনকে অদ্ভুত ভাষায় কি সব বলে নোশিন বুঝতে পারে না।

আমি প্রতিদিনই নোশিনকে দেখতে যাই। তাকে সান্ত্বনা দেয়া বা প্ৰবোধ দেবার কিছু নেই। আমি যাই ব্যাপারটা বুঝতে। নোশিনকে নানান প্রশ্ন করি। সে প্রতিটা প্রশ্নেরই জবাব দেয়। জবাব দিয়ে কাঁদে।নোশিনী! জন্তুটা এখন কোথায়? আমার সামনে।কি করছে? আঙুল নেড়ে নেড়ে কি যেন বলছে।তুমি হাত ইশারায় তাকে চলে যেতে বল।নোশিন হাত ইশারায় চলে যেতে বলল। মুখেও বলল, তুমি চলে যাও। তুমি চলে যাও।আমি বললাম, নোশিন এখন জন্তুটা কি করছে? হাসছে।জন্তুটা হাসতে পারে? পারে।

অষ্টম দিনে নোশিনের মা আমাকে টেলিফোন করে আসতে বললেন। বিশেষ একটা ঘটনা না কি ঘটছে। আমি তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে উপস্থিত হলাম। নোশিন আধশোয়া হয়ে আছে। তার হাতে কি যেন আছে। সে দুই হাতে সেটা আড়াল করতে চাইছে। আঙুলের ফাঁক দিয়ে সবুজ রঙের কি যেন দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কোনো গাছের কষ। আমি বললাম, কি ব্যাপার? নোশিন জানালি জন্তুটা তাকে ঘন্টাখানিক আগে এটা দিয়েছে এবং খেতে বলেছে। বার বার ইশারা করছে মুখে দিতে। সে কি করবে বুঝতে পারছে না।আমি বললাম, কখন দিয়ে গেল?

নোশিন বলল, কখন দিয়েছে আমি জানি না। ঘুমাচ্ছিলাম হঠাৎ জেগে দেখি জোলির মত এই জিনিসটা আমার হাতে। জন্তুটা বিছানার পাশে দাড়িয়ে। হাত দিয়ে ইশারা করে আমাকে খেতে বলছে। চাচা আমি কি খাব? আমি কি বলব বুঝতে পারছি না। জন্তুর ব্যাপারটাই নিতে পারছি না। সে খাবার এনে দিচ্ছে এটা কি ভাবে নেব?

বার বার মনে হচ্ছে হাসপাতালের কোনো নার্স বা অ্যাসিস্টেন্ট মেয়েটার হাতে এটা দিয়েছে। টুথপেস্ট হবার সম্ভাবনা। দেখতে সে রকমই।নোশিন বলল, কেউ খেতে দিচ্ছে না। সবাই বলছে খেলেই আমি মরে যাব। জন্তুটা আমাকে তাড়াতাড়ি মরার জন্যে এটা এনে দিয়েছে! আমি বললাম, তোমার মন যা চায়। তাই কর। কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হয়। তবে আমি তোমার জায়গায় হলে হয়তো খেয়ে ফেলতম।

নোশিন হঠাৎ জিনিসটা মুখে দিয়ে মুখ বিকৃত করে গিলে ফেলল। এবং চোখ বড় বড় করে বলল, জন্তুটা দরজা দিয়ে চলে যাচ্ছে।নোশিনের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। সে অতি দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। তার বিয়ে হয়। একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে। তার নিজের জৰ্ত্তটাকে চলে যেতে দেখার পর জন্তু দেখার রোগটা তার পুরোপুরি সেরে যায়। এই হচ্ছে অমীমাংসিত রহস্যের গল্প।

আয়না বলল, সব রহস্যের মীমাংসা না হওয়াই ভাল। তাই বুঝি? জ্বি তাই। সব রহস্যের মীমাংসা হয়ে গেলে পৃথিবী সাধারণ হয়ে যাবে। আমি চাই না। আপনি আমার রহস্যের মীমাংসা করেন।তুমি নিজে কি তোমার রহস্যের মীমাংসা করেছ? যদি করে ফেল তাহলেই হবে।পোড়া গজার মাছ ভূত প্রেতকে দিয়ে খাওয়ানো প্ৰকল্প বাতিল হয়ে গেল। ঘটনা এরকম- খড়ের গাদায় আগুন দিয়ে লবণ মাখানো গজার মাছ ঢুকানো হবে। প্রস্তুতি সম্পন্ন।

আগুন দেয়া হয়েছে। খড় ভেজা বলে আগুন ঠিকমত জ্বলছে না। একজন গেছে কেরোসিন আনতে। হেড মাস্টার সাহেব বললেন, কেরোসিন দিয়ে আগুন ধারালে চলবে না। মাছে কেরোসিনের গন্ধ থাকলে ভূত সেই মাছ খাবে না। অল্প আগুনেই মাছ পুড়ানো শুরু হোক। দু’জন মিলে মাছটাকে আগুনে রাখতে যাচ্ছে তখন বনের ভেতর থেকে ভয়াল দৰ্শন এক কুকুর বের হয়ে এল। লাঠি নিয়ে একজন কুকুরটাকে তাড়া করতে গেল। কুকুরটা তার পা কামড়ে ধরল। আর তখন কনের ভেতর থেকে আরো দুটা কুকুর বের হল। তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল মাছের উপর।

কুকুরের তাড়া খেয়ে হেড মাস্টার সাহেব উল্টে পড়লেন। পা মাচকালেন। মাছ ধরার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারজনের ভেতর তিনজনই কুকুরের কামড় খেল। হেডমাস্টার সাহেব কোনক্রমে রক্ষা পেলেন।রাত বাড়ার পর শুরু হল আরেক উপদ্রব্য। কুকুর তিনটা হেড মাস্টার সাহেবের বাড়ির চারদিকে চক্রাকারে ঘুরতে শুরু করল। মাঝে মাঝে তারা থামে। তখন তিনজনই এক সঙ্গে ঘেউ ঘেউ করতে থাকে।

হেডমাস্টার সাহেব মিসির আলিকে বললেন, অবস্থা কিছু বুঝলেন? মিসির আলি বললেন, না।তিন কুকুর হচ্ছে ঐ জিনিস।কি জিনিস? খারাপ জিনিস। কুকুরের বেশ ধরে এসেছে।ভূত-প্ৰেত? অবশ্যই। এদের আচার আচরণ দেখে বুঝতে পারছেন না? মিসির আলি বললেন, ভূত-প্ৰেত কুকুরের বেশ ধরে আসবে কেন? হেডমাস্টার সাহেব বললেন, ভয় দেখানোর জন্যে এসেছে।ধরে আসা উচিত। যেমন ধরুন চিতাবাঘ।এরা যে কুকুর না। অন্য কিছু তা আপনি বিশ্বাস করছেন না?

মিসির আলি বললেন, না। আপনার কাছে বন্দুক থাকলে আমি বলতাম। একটা কুকুর গুলি করে মারতে। তাহলে আপনি ভূত মারার দুর্লভ সম্মান পেতেন। ভাই আপনার কাছে কি বন্দুক আছে? না বন্দুক নাই। বন্দুক থাকলেও আমি গুলি করতাম না। ভূত-প্রেতের সাথে বিবাদে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। এদের ক্ষেপিয়ে দিলে সমস্যা আছে। সমানে সমানে বিবাদ চলে। অসমানে বিবাদ চলে না।ভূতদের ক্ষমতা কি আমাদের চেয়ে বেশি?

অবশ্যই বেশি। যারা অদৃশ্য তাদের ক্ষমতা বেশি তো হবেই। মানুষ চাঁদে যাওয়া নিয়ে কত হৈ চৈ করল। খোজ নিয়ে জানা যাবে ভূত-প্রেত মানুষের অনেক আগেই চাঁদ, মঙ্গল গ্ৰহ এই সব জায়গায় বসতি করেছে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে তাদের রকেট লাগে না।কুকুর তিনটার কারণে মিসির আলি রাতের খাবারের হাত থেকে বেঁচে গেলেন। দোতলা থেকে কেউ নামতে সাহস পেল না। পরিবারের সবাই অভুক্ত থেকে গেল!

রাত অনেক হয়েছে। বারান্দায় বসে মিসির আলি কুকুরের কর্মকাণ্ড দেখছেন। আয়না এসে তার পাশে বসতে বসতে বলল, কুকুর তিনটা কি কাণ্ড করেছে দেখেছেন স্যার? মিসির আলি বললেন, দেখছি।আয়না বলল, এই বাড়ির চারপাশে তাদের ঘুরঘুর করার কি আছে? গজার মাছ পুড়ানোর আয়োজন। এ বাড়ি থেকে করা হয়েছে এই তথ্য কুকুরদের জানার কথা না। স্যার আপনি তো অনেক বিষয় জানেন- কুকুর বিষয়ে কি জানেন?

মিসির আলি বললেন, তেমন কিছু জানি না। আমার বিষয় মানুষের সাইকোলজি। কুকুরের সাইকোলজি না। তবে একটা বিষয় জানি-কুকুর মিষ্টির স্বাদ জানে না। জিহ্বায় যে টেস্টবাড মিষ্টির স্বাদ টের পায় সেই টেস্টবাড কুকুরের নেই। তাকে রসগোল্লা দিয়ে দেখ, সে খাবে না।আয়না বলল, স্যার আপনিতো সব বিষয়ে একটা হাইপোথিসিস দাঁড়া করিয়ে ফেলেন। কুকুর তিনটা সম্পর্কে আপনার হাইপোথিসিস কি?

মিসির আলি বললেন, সহজ হাইপোথিসিস আছে। কুকুর মানুষের ভয় টের পায়। যে কুকুরকে ভয় পায় কুকুর তাকেই তাড়া করে। তোমার বাবা প্ৰচণ্ড ভয় পেয়েছেন। কুকুর তিনটা ভয় ধরে ধরেই এখানে এসেছে। তোমার বাবা যখন ঘুমিয়ে পড়বে ওরা চলে যাবে।আয়না বলল, আপনার কি একবারও মনে হয়নি কুকুর তিনটার এখানে আসার পেছনে আমার ভূমিকা আছে? মানুষকে যে প্রভাবিত করতে পারে, সে তো কুকুরকেও করতে পারবে।

মিসির আলি বললেন, তোমার সঙ্গে এ বাড়িতে কুকুর আসার কোনো সম্পর্ক নেই। কুকুর তিনটার কারণে তোমাদের বাড়ির সব মানুষ না খেয়ে আছে। ঐই কাজটাতো তুমি হতে দেবে না। তুমি কুকুর এনে থাকলে তাদের বিদেয় করে দিতে। সেটা তুমি করেনি। তুমি নিজেও অভুক্ত।আয়না বলল, স্যার রেলিং ধরে একটু দাঁড়ান। আমি এদের বিদায় করে দিচ্ছি। এরা একজন একজন করে উঠে চলে যাবে। আর ফেরত আসবে না।

মিসির আলি রেলিং ধরে দাঁড়ালেন। কুকুর তিনটা এক লাইনে হিজ মাস্টার্স ভয়েসের মত থাবা গেড়ে বসে আছে। একটা কুকুর হঠাৎ একটু নড়ে চড়ে উঠল। তারপরেই ছুটে চলে গেল। বাকি দুটা আগের মতই বাসা। এখন আরেকটা চলে গেল। আরো কিছুক্ষণ পরে গেল তৃতীয়টা।মিসির আলি আয়নার দিকে তাকিয়ে বললেন, ভালো দেখিয়েছ। I am Impressed.

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *