মিসির আলি UNSOLVED পর্ব – ২ হুমায়ূন আহমেদ

মিসির আলি UNSOLVED পর্ব – ২

ছবিগুলি কোথেকে আমার কাছে আসছে তার কোনো হদিস বের করতে পারলাম না। একধরনের ভয় এবং দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে গেলাম। সবচেয়ে ভয় পেলেন আমার মা। তিনি পীর সাহেবের কাছ থেকে তাবিজ এনে গলায় এবং কোমরে প্রালেন।জামাল সাহেব দিম নেবার জন্যে থামলেন।আমি বললাম, ছবিগুলি যে একই মেয়ের সেই বিষয়ে আপনি নিশ্চিত?

জি। জেসমিনের ঠোঁটের নিচে বা দিকে একটা লাল তিল ছিল। একই রকম তিল আমার মেয়ে ইথেনের ঠোঁটের নিচেও আছে। জেনেটিক ব্যাপার। যাই হোক, সব মিলিয়ে আমি পাঁচবার মেয়েটিয়া ছবি পাই। আমি যে পাঁচজনকে চা এবং রুটি খাওয়াই তার পেছনে হয়তো অবচেতনভাবে পাঁচ সংখ্যাটি কাজ করেছে।তিনবার ছবি পাওয়ার ঘটনা শুনলাম। বাকি দু’বার কীভাবে পেলেন বলুন।

জামাল সাহেব বললেন, শেষবারেরটা শুধু বলি- শেষবার যখন ছবি পাই, তখন আমি আমেরিকায়। মোরহেড স্টেট ইউনিভার্সিটিতে এলাকালয়েডের ওপর পিএইচডি ডিগ্রির জন্যে কাজ করছি। জায়গাটা নৰ্থ ডাকোটায়, কানাডার কাছাকাছি। শীতের সময় প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়ে। টেম্পরেচার শূন্যের অনেক নিচ পর্যন্ত নামে। আমি গরম একটা ওভারকোট কিনেছি। তাতেও শীত আটকায় না। একদিন লাইব্রেরিতে গিয়েছি।

লাইব্রেরিয়ানের হাতে ওভারকেটের পকেটে রাখা লাইব্রেরি কার্ড দিলাম। লাইব্রেরিয়ান কার্ড হাতে নিয়ে বলল, Your wife? very pretty, আমি অবাক হয়ে দেখলাম লাইব্রেরি কার্ডের পকেটে জেসমিনের ছবি। এই ছবি কোনো একটা পুরনো বাড়ির ছাদে তোলা। ছাদের রেলিং দেখা যাচ্ছে। রেলিং-এ কিছু কাপড় শুকাতে দেয়া হয়েছে। জেসমিন বসা আছে একটা বেতের মোড়ায়। তার হাতে একটা পিরিচ। মনে হয় পিরিচে আচার। কারণ জেসমিনের চারদিকে অনেকগুলি আচারের শিশি। রোদে শুকাতে দেয়া হয়েছে।

ছবির মেয়েটির সঙ্গে কোনোদিন দেখা হবে ভাবি নি। দেখা হয়ে গেল। দেশে ফিরেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাসিসটেন্ট প্রফেসর হিসেবে জয়েন করেছি। একদিন নিউমার্কেটে গিয়েছি ষ্টেশনারি কিছু জিনিসপত্র কিনতে। হঠাৎ একটা বইয়ের দোকানের সামনে মেয়েটিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। মনে হলো এক্ষুনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাব। কীভাবে নিজেকে সামলালাম জানি না। আমি লাজুক প্রকৃতির মানুষ। সব লাজলজ্জা বিসর্জন দিয়ে ছুটে গেলাম! মেয়েটির পাশে দাঁড়ালাম। সে চমকে তাকাল। আমি বললাম, আপনার নাম কি জেসমিন?

মেয়েটি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।আপনি কি কোনো কারণে আমাকে চেনেন? সে না-সূচক মাথা নাড়ল। আমি বললাম, আপনার কিছু ছবি আমার কাছে আছে।আমার ছবি? হ্যাঁ বিভিন্ন বয়সের আপনার পাঁচটা ছবি।বলেই দেরি করলাম না। পকেট থেকে মানিব্যাপ বের করলাম। তখন আমি পাঁচটা ছবিই সবসময় সঙ্গে রাখতাম। আমি বললাম, এইগুলি কি আপনার ছবি?

জেসমিন হ্যা-সূচক মাথা নাড়ল। আমার কাছে মনে হলো, তাঁর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা। আমি বললাম, এই ছবিগুলি আমার কাছে কীভাবে এসেছে আমি জানি না। আপনার কি কোনো ধারণা আছে? জেসমিন জবাব দিল না।আমি কি আপনার সঙ্গে কোথাও বসে এক কাপ চা খেতে পারি?

আমি চা খাই না।তাহলে আসুন আইসক্রিম খাই। এখানে ইগলু আইসক্রিমের একটা দোকান আছে।আইসক্রিম খেতে ইচ্ছা করছে না।আমি বললাম, আপনাকে আইসক্রিম খেতে হবে না। আপনি আইসক্রিম সামনে নিয়ে চুপচাপ বসে থাককেন। প্লিজ, প্লিজ প্লিজ।জেসমিন বলল, চলুন।

সাতদিনের মাথায় জেসমিনকে বিয়ে করলাম। বাসররাতে সে বলল, ছবিগুলি কীভাবে তোমার কাছে গিয়েছে আমি জানি। কিন্তু তোমাকে বলব না। তুমি জানতে চেও না।আমি জানতে চাই নি। এই গ্রহের সর্বশ্রেষ্ঠ মেয়েটিকে স্ত্রী হিসেবে পেয়েছি, আর কিছুর আমার প্রয়োজন নেই। তাছাড়া কম জানার ব্যাপারটায় সুখ আছে। Ignorence is bliss. আপনি কি জেসমিনের পাঁচটা ছবি দেখতে চান?

চাই।ছবি দেখে আপনি চমকবেন।আমি ছবি দেখলাম এবং চমকালাম। অবিকল ইথেন। দু’জনকে আলাদা করা অসম্ভব বলেই মনে হলো। জামাল সাহেব বললেন, আমি পড়াই বিজ্ঞান। যে বিজ্ঞান রহস্য পছন্দ করে না। কিন্তু আমার জীবন কাটছে রহস্যের মধ্যে। অদ্ভুত না?

অদ্ভুত তো বটেই। আচ্ছা ছাদে জেসমিনের যে ছবিটা তোলা হয়েছে। চারদিকে আচারের বোতল। সেই বাড়িটা কি দেখেছেন।জামাল সাহেব বললেন, সে রকম কোনো বাড়িতে জেসমিনরা কখনো ছিল না। ছবি বিষয়ে এইটুকুই শুধু জেসমিন বলেছে।আমি বিদায় নিয়ে ফিরছি। জামাল সাহেব আমাকে গোট পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। শেষ মুহুর্তে বললেন, আমার মেয়ে ইথেন কিছুদিন আগে হঠাৎ করে বলল, তার মা’র ছবি কীভাবে আমার কাছে এসেছে তা সে জানে। তবে আমাকে কখনো বলবে না। আমি বলেছি, ঠিক আছে মা, বলতে হবে না।

মিসির আলি সাহেবের পেটমোটা ফাইল আছে। ফাইলের ওপর ইংরেজিতে লেখা— Unsolved. যেসব রহস্যের তিনি মীমাংসা করতে পারেন নি তার প্রতিটির বিবরণ। আমি কয়েকবার তার ফাইল উল্টেপাল্টে দেখেছি। কোনো কিছুই পরিষ্কার করে লেখা নেই। নোটের মতো করে লেখা। উদাহরণ দেই- একটি অমীমাংসিত রহস্যের (নম্বর ১৮) শিরোনাম ‘BRD’, ‘BRD’ কী জিজ্ঞেস করে জানলাম BRD হলো বেলারানী দাস। মিসির আলি লিখেছেন

BRD

বয়স ১৩

বুদ্ধি ৭

বটগাছ ১০০

বজ্ৰপাত ২

BRD বটগাছ Union

কপার অক্সাইড

আমি বললাম, যা লিখেছেন এর অর্থ কী? বয়স ১৩ বুঝতে পারছি। বেলারানী দাসের বয়স তের। বুদ্ধি ৭-এর অর্থ কী? মিসির আলি বললেন, বুদ্ধি মাপার কিছু পরীক্ষা আছে। IQ টেস্ট। এই টেস্ট আমার কাছে গ্রহণযোগ্য না। আইনষ্টাইনের মতো মানুষ IQ টেষ্টে হাস্যকর নাম্বার পেয়েছিলেন। আমি নিজে এক ধরনের পরীক্ষা করে বুদ্ধির নাম্বার দেই। সেই নাম্বারে সর্বনিম্ন হলো এক সর্বোচ্চ দশ। আমার হিসেবে বেলারানীর বুদ্ধি ছিল সাত।আমি বললাম, আপনার হিসেবে আমার বুদ্ধি কত?

মিসির আলি হাসতে হাসতে বললেন, ছায়ের কাছাকাছি। তবে এতে আপসেট হবেন না। মানুষের গড় বুদ্ধি পাঁচ। তা ছাড়া আপনি লেখক মানুষ। ক্রিয়েটিভ মানুষদের সাধারণ বুদ্ধি কম থাকে।আমি বললাম, আমার বুদ্ধি কম এটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। বটগাছ ১০০এর অর্থ কী?

একটা বটগাছের কথা বলেছি। যার আনুমানিক বয়স ধরেছি ১০০ বছর।বজ্ৰপাত ২ মানে? বটগাছে দু’বার বজ্ৰপাত হয়েছিল। শেষ বজ্রপাতে বটগাছটা মারা যায়।BRD বটগাছ Union-টা ব্যাখ্যা করুন।বেলারানীর বাবা-মা তাদের মেয়েটাকে একটা বটগাছের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন। হিন্দুদের কিছুবিচিত্র আচার আছে! গাছের সঙ্গে বিয়ে তার একটা। এখন যদিও এই প্রথা নেই। তারপরেও বেলারানীর বাবা-মা কাজটা করেছিলেন।

কপার অক্সাইড কী?

কপার ধাতুর সঙ্গে অক্সিজেনের যৌগ- CuO.

গল্পটা বলুন।

না।

না কেন?

কিছু কিছু গল্প আছে বলতে ইচ্ছা করে না। এটা সেরকম একটা গল্প। সব গল্প জানানোর জন্যে না।আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি। এই গল্প আমি কোথাও লিখব না। কাউকে বলবও না।মিসির আলি সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, না।তার না বলার বিশেষ একটা ভঙ্গি আছে। এই ভঙ্গিতে যখন না বলে ফেলেন। তখন তাকে আর হ্যা বানানো যায় না। আমি হাল ছেড়ে দিলাম।মিসির আলি বললেন, অমীমাংসিত রহস্য নিয়ে গল্প করা ঠিক না। এতে মানুষ Confused হয়ে যায়।

ঘটনার উপর নানান আধ্যাত্মিকতা আরোপ করে। চলে আসে ভূত-প্রেত। সাধু-সন্ন্যাসী।আমি বললাম, ভূত-প্ৰেত বাদ দিলাম, সাধু-সন্ন্যাসীরা তো আছেন। না-কি তাদের অস্তিত্বেও আপনার অবিশ্বাস? মিসির আলি বললেন, অবিশ্বাস। ধর্ম হলো পরিপূর্ণ বিশ্বাস। আর বিজ্ঞান হলো পরিপূর্ণ অবিশ্বাস। ধর্মের বিশ্বাস শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই থাকে। বিজ্ঞানের অবিশ্বাস কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বদলায়।

কিছু কিছু অবিশ্বাস বিশ্বাসে রূপ নেয়।আপনি তো একজন সাইকোলজিষ্ট, বিজ্ঞানী না।মিসির আলি বললেন, মানুষ মাত্রই বিজ্ঞানী। অবিশ্বাস করা তার Natureএর অংশ। সে জঙ্গলে হাঁটছে। একটা সাপ দেখল। সে শুরু করল অবিশ্বাস দিয়ে—দড়ি না তো? না-কি সাপ? আবার সে পথে হাঁটতে হাঁটতে একটা দড়ি দেখল। সে শুরু করল অবিশ্বাস দিয়ে—সাপ না তো? না-কি দড়ি। চা খাবেন? খাব ৷ঘরে শুধু চা-পাতা আছে। আর কিছুই নেই। লিকার চা চলবে? চলবে।

মিসির আলি রান্নাঘরে ঢুকলেন এবং বের হয়ে এসে জানালেন, চা পাতাও নেই। চলুন কোনো রেস্টুরেন্টে গিয়ে চা খেয়ে আসি।আমি বললাম, রেস্টুরেন্টে যেতে ইচ্ছা করছে না। আপনার সঙ্গে নিরিবিলি গল্প করছি এই ভালো।সময় রাত আটটা। আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি। বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। মিসির আলির ঘরের চাল টিনের। চালে বৃষ্টির শব্দ শুনতে ভালো লাগছে। ঢাকা শহরে সেই অর্থে কখনো বৃষ্টির শব্দ কানে আসে না। শহরের কোলাহল বৃষ্টির শব্দ গিলে ফেলে।মিসির আলি বললেন, হাবলু মিয়ার গল্প শুনবেন?

আমি বললাম, গল্পটা যদি আপনার Unsolved খাতায় থাকে তাহলে শুনব। আপনার মতো মানুষ রহস্যের কাছে ধরা খেয়ে গেছেন ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং।মিসির আলি বললেন, হাবলু মিয়ার গল্প আমার Unsolved ফাইলে আছে। ৩৮ নম্বর।সব গল্পের নাম্বার আপনার মনে থাকে?

তা থাকে। ফাইলটা নিয়ে আমি প্রায়ই বসি। রহস্যের কিনারা করা যায় কি না তা নিয়ে ভাবি। এখনো হাল ছাড়ি নি। হাল ধরে বসে আছি। অকূল সমুদ্র। নৌকা কোন দিকে নিয়ে যাব বুঝতে পারছি না।হাবলু মিয়ার গল্পটা শুরু করুন।

মিসির আলি গল্প শুরু করলেন। সাধারণত দেখা যায় শিক্ষকরা ভালো গল্প বলতে পারেন না। তাদের গল্প ক্লাসের বক্তৃতার মতো শোনায়। যিনি গল্প শোনেন কিছুক্ষণের মধ্যেই তার হাই ওঠে। এক পর্যায়ে শ্রোতা বলেন, ভাই, বাকিটা আরেকদিন শুনব। আজ একটা জরুরি কাজ পড়ে গেছে। এখন না গেলেই না।মিসির আলি শিক্ষক গল্পকথকের দলে পড়েন না। তাঁর বর্ণনা সুন্দর। গল্পের কোন জায়গায় কিছুক্ষণ থামতে হবে তা জানেন।

পরিবেশ এবং চরিত্র বর্ণনা নিখুঁত। আমার প্রায়ই মনে হয় মিসির আলির মুখের গল্প CD আকারে বাজারে ছেড়ে দিলে ভালো বাজার পাওয়া যাবে। যাই হোক, তার জবানীতে গল্পটা বলার চেষ্টা করি।হাবলু মিয়ার বয়স কত বলতে পারছি না। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে পান খাওয়া লাল দাঁত বের করে হাসিমুখে বলল, জানি না। স্যার। বাপ-মা কিছু বইলা যায় নাই। মুরুকু পিতামাতা। এইসব জানেও না। আপনে একটা অনুমান কইরা নেন।

আমি অনুমান করতে পারলাম না। কিছু মানুষ আছে যাদের বয়স বোঝা যায়। না। হাবলু মিয়া সেই দলের। তার বয়স পঁচিশ হতে পারে, আবার চল্লিশও হতে পারে। অতি রুগ্ন মানুষ। খিকখিক কাশি লেগেই আছে। গায়ের রঙ এক সময় ফর্সা ছিল। রোদে ঘুরে রঙ জুলে গেছে। মাথা সম্পূর্ণ কামানো। গায়ে কড়া নীল রঙের পাঞ্জাবি। পরনের লুঙ্গির রঙ এক সময় খুব সম্ভবত সাদা ছিল! ময়লার আস্তর পড়ে এখন ছাইবৰ্ণ। পায়ে চামড়ার জুতা। জুতাজোড়া নতুন। চকচক করছে। লোকটার গা থেকে বিকট গন্ধ আসছে। আমি বললাম, গাঁজা খাবার অভ্যাস আছে?

হাবলু মিয়া আবার দাঁত বের করে হাসিমুখে বলল, জি স্যার।আজ খেয়েছেন? জে না। দিনে খাই না। সবকিছুর নিয়ম আছে। গাঁজা খাইতে হয়। সূৰ্য ডোবার পরে। চরস খাইতে হয় দুপুরে।লেখাপড়া কিছু করেছেন? ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছি। ক্লাস ফাইভ পাস করার ইচ্ছা ছিল। একদিন হেড স্যার বললেন, তোর আর লেখাপড়া লাগবে না। তুই চলে যা।চলে যেতে বললেন কেন?

সেটা উনারে জিগাই নাই। শিক্ষক মানুষরে তো আর জিজ্ঞাস করা যায় না। উনাদের কথা মান্য করতে হয়। উনাদের আলাদা মৰ্যাদা।আপনার পায়ের জুতাজোড়া তো নতুন মনে হচ্ছে।হাবলু মিয়া আনন্দিত গলায় বলল, চুরির জুতা স্যার। আমি নিজেই চুরি করেছি। কীভাবে চুরি করেছি। শুনলে মজা পাবেন। স্যার বলব?

বলুন।আমারে স্যার তুমি কইরা বলবেন। আমি অতি নাদান লোক। আপনের নাকের সর্দির যোগ্যও না। তার চেয়েও অধম। জুতাচুরির গল্পটা কি শুরু করব? শুরু করে।জুম্মার নামাজ শুরু হইছে। আমি সোবাহান মসজিদের কাছে। রাস্তা বন্ধ কইরা নামাজ। শেষ সারিতে দেখি এক লোক তার সামনে নয়া জুতা রাইখা নামাজ পড়তাছে। আমি তার সামনে থাইকা জুতাজোড়া নিলাম। সে নামাজের মধ্যে ছিল বইলা আমারে কিছু বলতে পারল না। একবার তাকাইলো।

আমি ঝাইড়া দৌড় দিলাম। আমার ভাগ্য ভালো জুতাজোড়া ভালো ফিটিং হইছে। চুরির জুতা ফিটিং-এ সমস্যা।জুতা কি প্রায়ই চুরি করে? জে। একেকলার একেক মসজিদে যাই। বনানী মসজিদ থেকে একজোড়া স্যান্ডেল চুরি করেছিলাম। বিলাতি জিনিস, দুইশ’ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন আফসোস হয় আফসোস হয় কেন? নিজের ব্যবহারের জন্যে রেখে দিতে পারতাম। স্যান্ডেলে আরাম বেশি। একটু পানের ব্যবস্থা কি করা যায় স্যার?

জর্দা লাগবে না। জর্দা আমার সঙ্গে আছে। গোপাল জর্দা। গোপাল জর্দা ছাড়া অন্য জর্দা আমার মুখে রুচে না।দিনে কয়টা করে পান খাও? তার কি স্যার হিসাব আছে। ভাতের হিসাব থাকে। দৈনিক দুই বার কি তিন বার। পান এবং চা। এই দুইয়ের হিসাব নাই।পানের ব্যবস্থা করছি, এখন বলো তুমি যে জুতা চুরি করো খারাপ লাগে না।খারাপ লাগে না। স্যার, মজা পাই। ইন্টাৱেষ্ট পাই। বাইচ থাকতে হইলে ইন্টারেস্ট লাগে। ঠিক বলেছি। স্যার?

হুঁ।পানের ব্যবস্থা তো স্যার এখনো করেন নাই? অস্থির লাগতেছে।সে পান ছাড়াই বেশ খানিকটা জর্দা মুখে দিয়ে চিবুতে লাগল।হাবলু মিয়ার সঙ্গে আমার যোগাযোগের বিষয়টা এখন পরিষ্কার করি। তাকে পাঠিয়েছে আমার এক ছাত্র। হাবলু মিয়ার না-কি অদ্ভুত এক আধ্যাত্মিক ক্ষমতা। যে কোনো ফলের নাম বললেই সে দুই হাত মুঠি বন্ধ করে। মুঠি খুললেই সেই ফল হাতে দেখা যায়। যে মুঠিবদ্ধ করে ফল আনতে পারে সে পানিও আনতে পারে। পানটা সে কেন আনছে না, বুঝলাম না।

আমি আমার ছাত্রের কথায় কোনোই গুরুত্ব দেই নি। সহজ হাতসাফাই বোঝাই যাচ্ছে। যেসব ফলের নাম চট করে মানুষের মাথায় মনে আসে। সেই সব বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে রাখা হয়। যথাসময়ে বের করা হয়।ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার করে বলি। একজন বুজরুক আমাকে বলল, স্যার যে কোনো একটা ফুলের নাম বলুন।

যে ফুলের নামই বলবেন সেই ফুল আমি পাঞ্জাবির পকেট থেকে বের করে দেব।আমি বললাম, দুপুরমণি ফুল। তুমি বের করো।সে বলল, স্যার পারলাম না। দুপুরমণি ফুলের নামই শুনি নাই। আজ প্রথম শুনলাম।আমি বললাম, তোমার পাঞ্জাবির পকেটে আছে গোলাপ ফুল। তুমি এই খেলাটা গোলাপ ফুল নিয়েই দেখাও। কারণ দশজন মানুষের মধ্যে সাতজনই বলবে গোলাপ ফুলের কথা।

বুজরুকি মাথা চুলকে বলল, স্যার কথা সত্য বলেছেন। মাটি খাই। তয় স্যার শুধু গোলাপ রাখি না। রজনীগন্ধাও রাখি। আজকাল অনেকেই রজনীগন্ধার কথা বলে।যাই হোক, আমাদের হাবলু মিয়াকে আমি সেই দলেই ফেলেছি। লোকটার চোখই বলে দিচ্ছে সে মহা্ধূর্ত। অনেককে ধোঁকা দিয়ে এখন সে এসেছে আমার

ঘরে পান ছিল না। দোকান থেকে পান আনিয়ে তাকে দিয়েছি। দুই খিলি পান একসঙ্গে মুখে পুরে সে জড়ানো পলায় বলল, স্যার কি খেতে চান বলেন, এনে দেই। সে হাত মুঠি করল।আমি বললাম, একটা আখরোট এনে দাও।হাবলু মিয়া বিক্ষিত গলায় বলল, আখরোট কী জিনিস? এক ধরনের বাদাম।জীবনে স্যার নাম শুনি নাই।আমি বললাম, আমাকে তাহলে খাওয়াতে পারস্থ না?

হাবলু মিয়া বলল, কেন পারব না। স্যার! আপনি খাবেন। আমিও একটু খায়া দেখব। তবে স্বাদ পাব বলে মনে হয় না। পান-জর্দাঁ খায়া জিবরা নষ্ট। যাই খাই ঘাসের মতো লাগে। একবার নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি খাওয়ার শখ হলো। খায়া দেখি সেইটাও ঘাসের মতো। মিষ্টির বংশ নাই। আমার কাছে এখন চিনিও যা, লবণও তা।

কথা শেষ করে হাবলু মিয়া হাতের মুঠি খুলল। তার হাতে দুটা আখরোট। সে বিস্মিত হয়ে আখরোট দেখছে। আমি মোটামুটি হতভম্ব। হাবলু মিয়া বলল, জিনিসটা ভাঙে ক্যামনে? দাঁত দিয়া? হাবলু মিয়া কামড়াকামড়ি শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আখরোটের শক্ত খোসা ভাঙিল। হাবলু মিয়া বাদাম ভেঙে মুখে দিয়ে চিবুতে চিবুতে বলল, কোনো স্বাদ নাই। শুকনা খড়ের মতো।আমি বললাম, এখন কি অন্য কোনো ফল আনা যাবে?

হাবলু বলল, অবশ্যই। ফলের নাম বলেন। তবে স্যার হাতের মুঠার চেয়ে বড় ফল হইলে পারব না। তরমুজ আনতে পারব না। কলা পারব না।আমি বললাম, আমি আনতে পারবে? ছোট সাইজের আমি তো আছে।আম পারব। আমি অনেকবার অনছি।

হাবলুমিয়া দুই হাত (ডান হাতের উপর বাম হাত রেখে) মুঠির মতো করল। চোখ বন্ধ করল। সামান্য ঝাকি দিয়ে মুঠি খুলল— আমি সেখানে আছে। সে আমার হাতে আম দিতে দিতে বলল, খেয়ে দেখেন স্যার মিষ্টি আছে কি-না। মধুর মতো মিষ্টি হওয়ার কথা। মাঝে মাঝে টকও হয়। একবার একটা আমি আসছে- ‘কাক দেশান্তরী আমি। এমন টক যে কাক খাইলে দেশান্তরী হবে। স্যার, আমার খেলা দেখে খুশি হয়েছেন? খুশি হয়েছি। এটা কি কোনো খেলা?

স্যার দুনিয়াটাই তো খেলা। বিরাট খেলা ৷ ক্রিকেট খেলা। কেউ সেঞ্চুরি করতেছে, কেউ আমার মতো শূন্য পায়া আউট। আবার কেউ কেউ আছে বেটিং করার সুযোগ পায় না। না খেইলাই আউট।ফালগুলি আসে কীভাবে? স্যার বললাম না খেলা! খেলার মাধ্যমে আসে।খেলছে। কে? সেটা তো স্যার বলতে পারব না। জ্ঞান-বুদ্ধি নাই। ক্লাস ফাইভ পাস করার শখ ছিল। পারলাম না। স্যার, ঘরে কি ছুরি আছে?

ছুরি দিয়ে কি করবেঃ আমট কাঁইট্যা একটা ছোট্ট পিস খায়া দেখতাম। মিষ্টি কি-না। যদিও মন বলতেছে মিষ্টি। তয় মনের কথা বনে ষায়।আমি ছুরি আনলাম। এক পিস হাবলু মিয়া খেল। এক পিস। আমি খেলাম।আম মিষ্টি। কড়া মিষ্টি।হাবলু আনন্দিত গলায় বলল, ইজ্জত রক্ষা হইছে। আমি মিষ্টি। টক হইলে আপনের কাছে বেইজ্জত হইতাম। স্যার, ইজাজত দেন, উঠি? আরেকবার আসতে পারবেন?

কেন পারব না। যেদিন বলবেন সেদিন আসব। শুক্রবারটা বাদ দিয়া। ঐ দিন জুতা চুরি করি। স্যার কিছু খরচ দিবেন। খেলা দেখাইলাম। এই জন্যে খরচ।তোমার এই খেলা দেখিয়ে তুমি টাকা নাও? জে নেই। আমার কোনো দাবি নাই। যে যা দেয় নেই।সবচেয়ে বেশি কত পেয়েছে?

পাঁচশ’ একবার পাইছিলাম। স্যারের নাম ভুইল্যা গেছি। মুসুল্ল মানুষ। নুরানী চেহারা। সেই মুরুবি ভাবছে আমি জ্বিনের মাধ্যমে আনি। আমি স্বীকার পাইছি। তার ভাবনা সে ভাববে। আমার কী? মুরুব্বি বলল, হাবলু মিয়া তোমার কি জ্বিন আছে?

আমি বললাম, জ্বে স্যার আপনের দোয়ায় আছে।মুরুব্বি বলল, জ্বিন কয়টা।আমি বললাম, দুইটা। একটা মাদি আরেকটা মর্দা। মর্দটার নাম জাহেল। ফল-ফুরুট সেই আনে।মুরুবি আমার কথা সবই বিশ্বাস পাইছে। আমারে বখশিশ দিছে পাঁচশ’ টেকা।আমি বললাম, তুমি জ্বিনের মাধ্যমে আনো না? জে না।কীভাবে আনো? স্যার আপনারে তো আগে বলেছি। এইটা একটা খেলা।খেলাটা তোমাকে কে শিখিয়েছে?

 

Read more

মিসির আলি UNSOLVED পর্ব – ৩ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *