মিসির আলি UNSOLVED শেষ – পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

মিসির আলি UNSOLVED শেষ – পর্ব

আমি বললাম, এখন খেয়ে নেব। সঙ্গে খাবার আছে। শুকনা খাবার।প্রশান্ত বাবু বললেন, আমি রান্না বসাচ্ছি। আপনি আমার এখানে থাবেন। খিচুড়ি করব। ঘি দিয়ে খাবেন। আমি রাতে খাই না। আপনার জন্যেই রান্না করব। আপনি দয়া করে না বলবেন না। আমি ব্রাহ্মণ। ব্ৰাহ্মণরা ভালো রাধুনি হয়।প্রশান্ত বাবু উঠানে রান্না বসালেন। আমি তাঁর পাশে মোড়া পেতে বসলাম। ভদ্রলোক বেশ গোছানো। নিমিষেই চুলা ধরিয়ে ফেললেন। চাল-ডাল হাঁড়িতে চড়িয়ে দিলেন। আমি বললাম, আপনি একা থাকেন?

প্রশান্ত বাবু হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লেন।চিরকুমার? না। বিবাহ করেছিলাম। স্ত্রী-পুত্ৰ স্বৰ্গবাসী হয়েছে। আচ্ছা জনাব, আপনি তো অনেক কিছু জানেন- মৃত মানুষ কি ফিরে আসতে পারে? আমি বললাম, প্রশ্নটা পরিষ্কার বুঝতে পারছি না।তিনি বললেন, ধরুন কেউ একজন মারা গেল, তার কবর হলো বা দাহ হলো। বৎসর খানিক পরে সে আবার উপস্থিত। এ রকম কি হতে পারে?

আমি বললাম, গল্প-উপন্যাসে হতে পারে। বাস্তবে হয় না। কবর থেকে উঠে আসা মানুষদের বলে জম্বি। তারা মানুষ না। বোধশক্তিহীন মানুষ। তবে সবই গল্পগাথা। বাস্তবে কেউ কখনো জন্বি দেখেনি। সিনেমায় দেখেছে। জন্বিদের নিয়ে অনেক সিনেমা হয়েছে। আমি একটা ছবি দেখেছিলাম। সেখানে জম্বিরা পুরো একটা গ্রাম দখল করে নেয়। Return of the Dead. প্ৰশান্ত বাবু বললেন, পরকাল থেকে মানুষ ফিরে আসার কোনো ঘটনা নাই?

আমি বললাম, ইংল্যান্ডের চার্চগুলি অঞ্চলের মানুষদের জন্ম-মৃত্যুর হিসাব রাখে। তাদের এক ক্যাথলিক চার্চে চারশ’ বছর আগে মৃত মানুষের এক বছর পরে সংসারে ফিরে আসার ঘটনা উল্লেখ আছে। বিষয়টা নিয়ে তখন বেশ হৈচৈ হয়। তাকে পরিবারের সঙ্গে থাকতে দেয়া হবে না বলে চার্চ ঘোষণা দেয়। ইংরে রাজ পরিবারকে শেষ পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করতে হয়।তাকে কি পরিবারের সঙ্গে থাকতে দেয়া হয়েছিল?

না। সে তার স্ত্রী এবং দুই কন্যা নিয়ে অঞ্চল ছেড়ে চলে যায়। কোথায় যায় এই বিষয়ে কোনো তথ্য নাই। আপনার কাছে কি এই ধরনের কোনো গল্প আছে? পরকাল থেকে কেউ ফিরে এসেছে? প্রশান্ত বাবু বেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ চোখ নামিয়ে নিয়ে বললেন, না।

আমি বললাম, প্রশান্ত বাবু! মানুষ যখন সত্যি কথা বলে তখন চোখের দিকে তাকিয়ে বলে। মিথ্যা যখন বলে, চোখ নামিয়ে নেয়। পরকাল থেকে মানুষ ফিরে আসার ব্যাপারটা নিয়ে আপনার আগ্ৰহ দেখে মনে হচ্ছে আপনি এ ধরনের কোনো গল্প জানেন। আমাকে গল্পটা বলুন আমি চেষ্টা করব লৌকিক ব্যাখ্যা দিতে। অতীন্দ্ৰিয় ব্যাপার ব্যাখ্যা করতে আমার ভালো লাগে।

আপনি খাওয়া-দাওয়া করুন। তারপর বলি। তবে আপনার কাছে আমি ব্যাখ্যা চাই না। ব্যাখ্যা ভগবানের কাছে চাই। আর কারো কাছে না।।আমি খেতে বসলাম। অতি উপাদেয় খিচুড়ি। হালকা পাঁচফুড়ুনের বাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঘিয়ের গন্ধ। খিচুড়ি রান্নায় অস্কার পুরস্কার থাকলে প্ৰশান্ত বাবু দুটা অস্কার পেতেন।

আমি বললাম, গল্প শুরু করুন। প্ৰশান্ত বাবু অস্বস্তি এবং দ্বিধার সঙ্গে থেমে থেমে কথা বলা শুরু করলেন। ভাবটা এ রকম যে তিনি একটা খুন করেছেন। এখন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিচ্ছেন।

আমার বড় ভাইয়ের নাম বিকাশ ভট্টাচার্য। তাঁর স্ত্রী এক মাসের শিশুপুত্ৰ রেখে একদিনের জ্বরে স্বৰ্গবাসী হন। আমার বড় ভাই পরম আদরে এবং যত্নে শিশুপুত্র লালন করতে থাকেন। আমরা কথায় বলি নয়নের মণি। আমার ভাইয়ের কাছে সত্যিকার অর্থেই তার পুত্র ছিল নয়নের মণি। সন্তান চোখের আড়াল হলেই তিনি অস্থির হয়ে যেতেন। তার হাঁপানির টান উঠে যেত।

ছেলের যখন নয়। বৎসর বয়স তখন সে পানিতে ড়ুবে মারা যায়। ছেলেটার শখ ছিল বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে পুকুর ঘাটে চলে যাওয়া। পানিতে চিল মেরে খেলা করা। দুপুরবেলা ভাই যখন ঘুমাচ্ছিলেন তখন সে পুকুরঘাটে খেলতে গিয়ে পা পিছলে মারা যায়।

সোমবার সন্ধ্যায়। তাকে সাজনাতলা শ্মশানঘাটে দাহ করা হয়। আমার বড় ভাই উন্মাদের মতো হয়ে যান। চিৎকার করতে থাকেন— মানি না, মানি না। আমি ভগবান মানি না। ভগবানের মুখে আমি থুথু দেই! মানি না। আমি ভগবান মানি না।তখন বৈশাখ মাস। ঝড়-বৃষ্টির সময়! তুমুল ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলো। দাহ হয়ে গেছে। লোকজন চলে গেছে। আমার বড় ভাইকে ঘরে আনার অনেক চেষ্টা করা হলো। তিনি এলেন না। ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে বসে রইলেন এবং কিছুক্ষণ পরপর চিৎকার করতে লাগলেন, মানি না, মানি না—আমি ভগবান মানি না।

রাত তিনটায় তিনি শূন্য বাড়িতে ফিরলেন। শোবার ঘরে ঢুকে দেখেন— ঘরে হারিকেন জুলছে। খাটের উপর তার ছেলে বসে আছে। পা দুলাচ্ছে। আমার ভাই জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে পড়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পায় তাঁর জ্ঞান ফিরল। তখনো ছেলে খাটে বসা। ভাই বললেন, বাবা তুমি কে?

সে বলল, আমি কমল! আমি এসেছি।

কোথেকে এসেছ বাবা?

পানির ভিতর থেকে।

তুমি কি চলে যাবে?

বন।

আমার ভাই বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন না। কিন্তু তিনি একটি ক্ষেত্রে বিচক্ষণতার পরিচয় দিলেন। চারদিকে প্রচার করলেন- পুত্ৰ শোক ভুলার জন্যে তিনি একটি কন্যা দত্তক নিয়েছেন। তিনি কমলকে মেয়েদের পোশাক পর্যালেন। তার নাম দিলেন কমলা।গ্রামের লোক সহজেই বিশ্বাস করল। দু’একজন শুধু বলল, পালক মেয়েটার সঙ্গে মৃত ছেলেটার চেহারার মিল আছে।আমি বললাম, ছেলেটা কি এখনো আছে?

হুঁ আছে।কোথায়? ভাইজান তাকে নিয়ে ইন্ডিয়ায় চলে গেছেন। গৌহাটিতে থাকেন।ছেলেটার কি মানুষের মতো বুদ্ধি আছে? প্রশান্ত বাবু বললেন, না। দশ বছর আগে সে যেমন ছিল এখনো তেমনি আছে। সে কোনো খাদ্য খায় না। দিনে-রাতে কখনো ঘুমায় না। রাতে পুকুরঘাটে বসে থাকতে খুব পছন্দ করে। হামা-ভূতের ভয়ে অনেকদিন পুকুরঘাটে যাওয়া হয় না।

আমি বললাম, আপনার বড় ভাইয়ের ছেলে তার বাবার সঙ্গে গৌহাটিতে থাকে। সেখানে হামা-ভূত গেল কিভারে? প্রশান্ত বাবু চুপ করে রইলেন। আমি বললাম, বারান্দায় দুটা মেয়েদের জামা শুকোতে দেয়া আছে। আপনি একা থাকেন। মেয়েদের জামা কেন? ছেলেটা কি আপনার?

প্রশান্ত বাবু বিড়বিড় করে বললেন, জে আর্জেন্তু, আমারই সস্তান।কত বছর আগের ঘটনা। অর্থাৎ কত বছর আগে ছেলে ফিরে এসেছে? একুশ বছর।ছেলে আগের মতোই আছে। বয়স বাড়েনি? প্রশান্ত বাবু জবাব দিলেন না। আমি বললাম, ছেলেটাকে ডাকুন। কথা বলি।না। আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে দেখলে সে ভয় পায়।আমি বললাম, তার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলা অত্যন্ত জরুরি। তার জন্যেও জরুরি। আপনার জন্যেও জরুরি।

প্রশান্ত বাবু বললেন, না। আপনার সঙ্গে গল্পটা করে আমি বিরাট ভুল করেছি। ভুল আর বাড়াব না।আমি প্রশান্ত বাবুকে অগ্রাহ্য করে উঁচু গলায় ডাকলাম, কমল! কমল।নয়-দশ বছর বয়েসি মেয়েদের পোশাক পরা এক বালক দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়াল। আমাকে এক পলক দেখে বাবার দিকে আসতে শুরু করল। প্রশান্ত বাবু কঠিন গলায় বললেন, ঘরে যাও। ঘরে যাও বললাম।ছেলেটি ঘরের দিকে যাচ্ছে। এক পা টেনে টেনে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে যাচ্ছে।আমি বললাম, তার পায়ে কি সমস্যা?

প্রশান্ত বাবু কঠিন গলায় বললেন, তার পায়ে কি সমস্যা সেটা আপনার জানার প্রয়োজন নাই।হামা-ভূত রহস্য ভেদ করার জন্যে আমি গ্রামে এভারেস্ট বিজয়ী তেনজিং-এর মর্যাদা পেলাম। আমাকে রেল স্টেশন পর্যন্ত এগিয়ে দেবার জন্যে দুজন রওনা হলো। একজন মাথায় ছাতা ধরে রইল।

তাদের কাছে শুনলাম ছেলেটে পানিতে ডুবে মারা যাবার পর প্রশান্ত বাবুর খানিকটা মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়েছে। তিনি তার ছেলের চেহারার সঙ্গে মিল আছে এরকম একটা মেয়ে কোত্থেকে ধরে নিয়ে এসে পালক নিয়েছেন। দিন-রাত মেয়েটার সঙ্গে থাকেন, কারো সঙ্গে মিশেন না। মেয়েটার বিয়ের বয়স হয়েছে কিন্তু মেয়েটা গিট্টু লেগে আছে, বড় হচ্ছে না। তাছাড়া ঠ্যাং খোড়া, সম্বন্ধও আসে না।প্ৰশান্ত বাবু লোক কেমন?

নিষ্ঠাবান ব্ৰাহ্মণ। ভালো লোক। সমস্যা একটাই। মেয়ে ছাড়া কাউকে চিনে না।

যুগান্তর ১৩ মে, ২০০৯-এ প্রকাশিত একটি রিপোর্ট

জলপরীদের দেশ থেকে দশ বছর পর ফিরে এলো মাসুদ

এমরান ফারুক মাসুম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে

পানিতে ড়ুবে যাওয়ার ১০ বছর পর অলৌকিকভাবে জলজ্যান্ত মায়ের কোলে ফিরে এসেছে মাসুদ (১৪) নামের এক শিশু। অবিশ্বাস্য মনে হলেও ঘটনাটি ঘটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা ইউনিয়নের রামজীবনপুর গ্রামের কাচারীবাড়িতে। এলাকাজুড়ে জোর গুজব, মাসুদ এতদিন ছিল জলপরীদের দেশে। সেখানে সে জীবনযাপন করেছে অলৌকিকভাবে। জলপরীরাই তাকে লালনপালন করেছে এতদিন।

ছেলেটিকে নিয়ে নানাজনের মুখে নানা কথা ছড়িয়ে পড়ছে সমগ্র এলাকায়। জানা গেছে, সদর উপজেলার রামজীবনপুর গ্রামের কাচারীবাড়ির মৃত মাহতাবউদ্দিনের ছেলে মাসুদ (৫) ১৯৯৯ সালে তার ভাই-বোনদের সঙ্গে মহানন্দার রামজীবনপুর ঘাটে গোসল করতে গিয়ে ড়ুবে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর মাসুদের কোন সন্ধান না পেয়ে মা শেফালী বেগম বুকে পাথর বেঁধে দিন কাটান। অবশেষে ১০ বছর পর গত ৮ মে শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে অলৌকিকভাবে মহানন্দা নদীর কল্যাণপুর ঘাটের কাছে মাঝনদাঁতে সে ভেসে ওঠে।

কল্যাণপুর মহল্লার ইলিয়াস আহমেদের স্ত্রী রানী বেগম জানান, তিনি গত ৮ মে। শুক্রবার দুপুরে নদীর ঘাটে গোসল করতে যান। গোসল করার সময় মাঝনদাঁতে ছেলেটিকে পানিতে হাবুড়ুবু খাচ্ছে দেখতে পেয়ে সেখানে কয়েকজনের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে আসেন। নদী থেকে তোলার সময় একটি ৫ বছরের শিশুর মতোই সে আচরণ করছিল।

শিশুটিকে বাড়ি নিয়ে আসার পর রানী বেগম স্থানীয় লোকজনকে ঘটনাটি জানান। শিশুটি কোন কথা বলতে না পারার বিষয়টি বিভিন্নভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে শিশুটিকে দেখতে আসেন রামজীবনপুর গ্রামের কাচারীবাড়ির শেফালী বেগম। শেফালী বেগম সেখানে উপস্থিত হওয়া মাত্রই উদ্ধারকৃত শিশুটি শেফালীকে জড়িয়ে ধরে। এ সময় শেফালী বেগম তাকে তার ছেলে বলে শনাক্ত করেন। ছেলেটির কোমরে একটি পোড়া দাগ দেখেই তাকে শেফালী বেগমের ছেলে বলে স্থানীয় লোকজন শনাক্ত করেন।

উদ্ধারের পর থেকেই মাসুদ মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত রানী বেগমের হেফাজতেই ছিল। অবশেষে মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানায় তাকে নিয়ে আসা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার মেয়র অধ্যাপক আতাউর রহমানের উদ্যোগে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আহসানুল হক ছেলেটিকে বালিয়াডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল হাইয়ের উপস্থিতিতে তার মা শেফালী বেগমের কাছে হস্তান্তর করেন। এ সময় অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া মাসুদকে একনজর দেখার জন্য হাজার হাজার লোক ভিড় জমায়।

১৯৯৯ সালে শিশু মাসুদ মহানন্দা নদাঁতে ড়ুবে যাওয়ার সময় তার বয়স ছিল ৫ বছর। শুক্রবার মাসুদকে উদ্ধার করার পর থেকে তার শারীরিক গঠনও অলৌকিকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এই ৫ দিনেই সে এখন বেড়ে ১৪ বছরের এক বালক। বালক মাসুদের আচার-আচরণ অস্বাভাবিক। সে কোন কথা বলতে পারছে না। কোন খাবারও খেতে পারছে না। মাঝে মাঝে তার গলা থেকে পানির জীবজন্তুর মতো অস্ফুট শব্দ বের হচ্ছে।

 

Read more

একা একা পর্ব – ১ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *