হুমায়ন আহমেদ এর যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১৫

 হয়তাে সঙ্গে সঙ্গেই ঘুম ভাঙল অথবা দীর্ঘ সময় ঘুমালেন। ঘুম ভাঙলে প্রথমেই ঘড়ি দেখলেন। ঘড়ি উল্টাদিকে যাচ্ছে না। স্থির হয়ে আছে। ঘড়ির হিসাবে সময় এখন বারােটা। দিন বা রাত বােঝা যাচ্ছে না।

যখন নামিবে আঁধারবাথরুম থেকে শব্দ আসছে। মনে হচ্ছে কেউ থালাবাসন ধুচ্ছে । মিসির আলি বললেন, কে ? কিশােরীদের মিষ্টি গলায় কেউ একজন বলল, চাচাজি! আমি চম্পা। মিসির আলি হতাশ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, আবার হেলুসিনেশন শুরু হয়েছে । মিসির আলি বললেন, বাথরুমে কেন ? সামনে আসাে। 

চাচাজি! আমি বাথরুম পরিষ্কার করছি। আমার হাতে হাতমােজা নেই বলে আপনার সামনে আসতে পারব না। আপনার সামনে এলে আপনি আমার হাত দেখে ফেলবেন। আমার বিরাট পাপ হবে । শেষ বিচারের দিন জবাব দিতে পারব 

না । 

মিসির আলি বললেন, ও আচ্ছা।। 

চম্পা বলল, শরীরের উপর আমার ঘেন্না ধরে গেছে তাে চাচাজি। কাউকেই এখন শরীর দেখাই না । হাত পায়ের আঙুল, চোখ, সব লুকিয়ে রাখি। চাচাজি! এই ঘরটা কি চিনতে পারছেন ? 

না । 

আপনার এত বুদ্ধি, আর সাধারণ ব্যাপারটা ধরতে পারলেন না। ঘরে একটা মাত্র জানালা। সেই জানালা কঠিনভাবে বন্ধ । 

মিসির আলি বললেন, এই ঘরেই কি তুমি তােমার শ্বশুর সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে আসাে ? 

চম্পা বলল, আপনি খুব সুন্দর করে বললেন, দেখা করতে আসি। আমি দেখা করতে আসি না। বাধ্য হয়ে ভয়ংকর কিছু কর্মকাণ্ডের জন্যে আসি । 

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১৫

মিসির আলি বললেন, তুমি আমাকে আটকে রেখেছ কেন ? চম্পা বলল, আমি আপনাকে আটকে রাখি নি। বড়পা রেখেছে। কেন ? 

বড়পা এই ঘরে অনেক দিন আটক ছিল। এই দুঃখে সে সবাইকেই এভাবে আটকে রাখতে চায়। 

কত দিন আটকে রাখবে ? 

জানি না। মনে হয় ছাড়বে না। ছাড়বে না ? 

 চাবি কুয়ায় ফেলে দিয়েছে তাে। দরজা খুলবে কীভাবে? সেটাও একটা কথা। 

চাচাজি! আমি এখন যাই। পরে আসব। হাতমােজা পরে আসব, তখন আপনার সামনে আসা যাবে। গল্প করা যাবে। 

আচ্ছা। 

আপনার জন্যে এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে আসব। আপনি আরাম করে সিগারেট খাবেন। 

মিসির আলি বললেন, সঙ্গে দিয়াশলাই আনবে। আমার দিয়াশলাইয়ের কাঠি শেষ হয়ে গেছে। 

চম্পা বলল, অবশ্যই দিয়াশলাই আনব। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন তাে চাচাজি । আপনার ঘুম দরকার । ঘুমপাড়ানি গান গাইয়ে ঘুম পাড়াব ? 

মিসির আলি ক্লান্ত গলায় বললেন, গান লাগবে না। এমনিতেই ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। 

মিসির আলি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন। 

একসময় ঘুম ভাঙল। তিনি অবাক হয়ে দেখেন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি পড়ছে ঘরের ভেতর। কাক-দম্পতির বাসাও ঘরের ভেতর। বৃষ্টিতে ভিজে দু’টা কাক শীতে থরথর করে কাঁপছে। পুরুষ কাকটা মিসির আলিকে বলল, স্যার, একটা। ছাতা দিতে পারবেন ? প্লিজ! 

মিসির আলি বললেন, ছাতা পাব কোথায় ? তাকিয়ে দেখাে, আমিও ভিজছি। | কাক বলল, একটা কিছু ব্যবস্থা কি করা যায় স্যার ? বৃষ্টির পানি ভয়ংকর ঠান্ডা । ডিমগুলাে পুরােপুরি ভিজে গেলে আর বাচ্চা ফুটবে না। 

যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১৫

মিসির আলি বললেন, তােমার বাসাটা কি আমার খাটের নিচে আনতে পারাে ? তাহলে বৃষ্টির পানির হাত থেকে বাঁচতে পারাে। 

থ্যাংক য়ু স্যার। ভালাে সাজেশন । 

কাক-দম্পতি অনেক কষ্টে বাসাটা খাটের দিকে আনছে। বাসা মিসির আলির। হাতের নাগালে চলে এসেছে। তিনি ইচ্ছা করলেই হাত বাড়িয়ে বাসাটা ধরে খাটের নিচে চালান করে দিতে পারেন, কিন্তু তা সম্ভব হচ্ছে না। তার সমস্ত শরীর অবশ । ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে । মিসির আলির কেন জানি মনে হচ্ছে এবার ঘুমিয়ে পড়লে আর ঘুম ভাঙবে না। তিনি প্রাণপণে জেগে থাকার চেষ্টা করছেন। 

স্যার স্নামালিকুম। ওয়ালাইকুম সালাম। 

আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন? আমি আপনার ছাত্রী। আমার নাম রেবেকা । 

ও আচ্ছা আচ্ছা। চিনতে পারেন নি ? 

শরীরটা ভালাে না তাে। এইজন্যে সমস্যা হচ্ছে । স্যার, আমি আপনাকে চামড়ায় বাঁধানাে একটা খাতা দিয়েছিলাম। এখন মনে পড়েছে । তুমি কেমন আছ? আমি ভালাে আছি। কিন্তু আপনার একী অবস্থা? একটু বেকায়দা অবস্থাতেই আছি। এরা আমাকে আটকে ফেলেছে। কেন ? কেন তা তাে জানি না । 

স্যার, আপনি জানবেন না তাে কে জানবে ? আপনি হচ্ছেন মিসির আলি । ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে বের করুন কেন তারা আপনাকে আটকেছে। এরা কি আপনার শত্রুপক্ষ ? 

 তাদের ক্ষতি হয় এমন কিছু কি আপনি করেছেন? 

 আপনাকে আটকে রাখলে তাদের কি কোনাে স্বার্থসিদ্ধি হয় ? 

আপনার চিন্তা করার ক্ষমতা ঠিক আছে কি না, সেই পরীক্ষা কি করবেন ? কী পরীক্ষা ? ক্লিৎস টেস্ট। স্যার, মনে পড়েছে ? হ্যা, পড়েছে। ১০০ থেকে নিচের দিকে নামতে হবে। 

প্রথমবার একটি সংখ্যা বাদ দিয়ে নিচে নামা। ১০০ থেকে হবে ৯৮, তারপর দুটা সংখ্যা বাদ ৯৫, তারপর তিন সংখ্যা বাদ ৯১। 

স্যার, পরীক্ষা দিতে থাকুন। এই ফাঁকে আমি পানি এনে দিচ্ছি। পানি খান। পানি কোথায় পাবে ? পানি তাে বন্ধ। 

 

Read More

হুমায়ন আহমেদ এর যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১৬

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *