শওকত বলল, একটা ডেইলি পেপারে ইলাস্ট্রেশন করি। আর দু‘টা ম্যাগাজিনে পার্ট টাইম ইলাস্ট্রেশন করি। বইমেলার সময় বইয়ের কাভার করি। সেট ডিজাইন করি।
তােমার চলে যায় ?
হু। দেশে টাকা পাঠাতে হয় না। মা মারা গেছেন। আমার নিজের তাে আর টাকা বেশি লাগে না।
তােমার মা‘র মৃত্যু তাহলে তােমার জন্যে একটা রিলিফের মতাে হয়েছে। প্রতি মাসে টাকা পাঠাতে হবে এই টেনশন নেই ।
শওকত ক্ষীণ স্বরে বলল, ঠিকই বলেছ।
রেবেকা বলল, যে কয়দিন ইমনকে রাখবে তার খাওয়া–দাওয়ার দিকে লক্ষ রাখবে। হােটেলের কোনাে খাবার বা ফাস্ট ফুড খাওয়াবে না। খাওয়া নিয়ে সে মােটেও যন্ত্রণা করে না। এক গ্লাস দুধ, এক পিস পাউরুটি, একটা হাফ বয়েলড় ডিম হলেই তার হয়।
তুমি চিন্তা করাে না, আমি বাইরের খাবার খাওয়াব না। ছবি আঁকাআঁকি কি বন্ধ ? বন্ধই বলা চলে। ছবি আঁকছ না কেন ? ইচ্ছা করে না।
ছেলেকে যখন কাছে নিয়ে রাখবে, তখন একটা দু’টা ছবি আঁকার চেষ্টা করবে । ইমন তার বাবার ছবি আঁকা নিয়ে খুব একসাইটেড।
ও আচ্ছা।
ফাদারস ডে–তে তাদের স্কুলে বাবাকে নিয়ে রচনা লিখতে বলা হয়েছিল । ইমন একটা দীর্ঘ রচনা লিখেছে। রচনার শিরােনাম হচ্ছে My Painter Father.
বলাে কী ?
আমি তার রচনাটার ফটোকপি নিয়ে এসেছি। তােমাকে দিয়ে দেব। এটা পড়া থাকলে ছেলে তার বাবা সম্পর্কে কী ভাবছে তা তােমার জানতে সুবিধা হবে। আমি চাই এই অল্প কয়েকটা দিন ইমন যেন আনন্দে থাকে ।
আমি চেষ্টা করব। ইমনকে নিতে কবে আসব ? আগেই তাে বলেছি, পাঁচ তারিখে চলে এসাে। এখন তাহলে উঠি ?
যদিও সন্ধ্যা -পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ
এক মিনিট দাড়াও, ইমনের লেখা এসেটা তােমাকে দিচ্ছি। ইমন যেন জানতে না পারে, সে লজ্জা পাবে।
ওকে কিছু বলব না।
একটা কথা তােমাকে বলতে ভুলে গেছি— রাতে কিন্তু সে অন্ধকার ঘরে ঘুমুতে পারে না। অবশ্যই ঘরে বাতি জ্বালিয়ে রাখবে।
হ রাখব। তােমার বাসায় কি এসি আছে ?
এখন অবশ্য গরম সেরকম না। ঠিক আছে, তুমি যে অবস্থায় থাক ছেলে সেই অবস্থাটাই দেখুক। তার জন্যে আলাদা কিছু করতে হবে না।
ইমনের লেখা ইংরেজি রচনার বাংলাটা এরকম
আমার পেইন্টার বাবা আমার বাবা থাকেন বাংলাদেশে। সেখানের সবচে বড় শহরটার নাম ঢাকা। তিনি ঢাকায় থাকেন এবং দিনরাত ছবি আঁকেন । গাছপালার ছবি, নদীর ছবি এইসব । তিনি গাছপালার ছবি বেশি আঁকেন কারণ বাংলাদেশে অনেক গাছ। পুরাে দেশটা সবুজ। এই জন্যেই বাংলাদেশের পতাকার রঙও সবুজ। সবুজের মাঝখানে লাল সূর্য আঁকা।
আমার বাবাকে আমি খুবই পছন্দ করি । তিনি আমাকে পছন্দ করেন কি–না আমি জানি না। মনে হয় করেন না। কারণ তিনি কখনােই আমার বার্থডেতে কোনাে কার্ড পাঠান।
এই {য়ে আমি মােটেও মন খারাপ করি না। কারণ তিনি খুব ব্যস্ত মানুষ। তাঁকে দিন–রাত ছবি আঁকতে হয়।
আমি আমার বাবাকে তিনটা কার্ড পাঠিয়েছি। তিনটা কার্ডের ছবি আমি নিজে এঁকেছি। একটাতে ছিল ক্রিসমাস ট্রি। আরেকটা ছবিতে আমি মাছ মারতে লেক ইওনিতে গিয়েছি। অন্য কার্ডটা শুধু ডিজাইন। কার্ডগুলাে পাঠাতে আমার খুবই লজ্জা লাগছিল। কারণ, আমার বাবা কত ভালাে ছবি আঁকেন। আর আমি তাে ছবি আঁকতেই পারি।
যদিও সন্ধ্যা -পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ
আমি যখন রঙ দেই, তখন একটা রঙের সঙ্গে আরেকটা রঙ মিশে কেমন যেন হয়ে যায়। যদি কখনাে বাবার সঙ্গে আমার দেখা হয়, তাহলে আমি তার কাছ থেকে ছবি আঁকা শিখব।
আমার আঁকা তিনটা কার্ডের কোনােটাই শেষপর্যন্ত বাবাকে পাঠানাে হয় নি, কারণ আমার মা বাবার ঠিকানা
জানতেন না। মা‘র কোনাে দোষ নেই, কারণ বাবার স্বভাব হচ্ছে দুদিন পর পর বাড়ি বদলানাে । বড় বড় শিল্পীরা এরকমই হয়। ভ্যানগ নামের শিল্পীর কোনাে বাড়ি–ঘরই ছিল না। আমাদের আর্ট টিচার মিস সুরেনসন বলেছেন— ভ্যানগগ তার প্রেমিকাকে নিজের কান কেটে উপহার দিয়েছিলেন। আমি মনে মনে খুব হেসেছি। কাটা কান কি কাউকে উপহার হিসেবে দেয়া যায় ? আমি শব্দ করে হাসি নি কারণ শব্দ করে হাসলে মিস সুরেনসন রাগ করেন।
রাগ করলেও আমাদের সবার উচিত শব্দ করে হাসা এবং শব্দ করে কাঁদা। কারণ তাতে আমাদের লাংস পরিষ্কার থাকে। এই কথাটা আমাদেরকে বলেছেন আমাদের গেম টিচার। আমি যদিও কোনাে গেম পারি না, তারপরেও আমি গেম টিচারকে খুব পছন্দ করি। তাকে সবাই ডাকে কনি। কিন্তু তাঁর নাম রিচার্ড বে হাফ । আমি গেম টিচারকে আমার বাবার কথা বলেছি। তিনি বলেছেন— তােমার বাবা তাে। একজন অতি ভালােমানুষ। তার সঙ্গে আমি দেখা করতে চাই ।
যদিও সন্ধ্যা -পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ
দেখা করা সম্ভব না। কারণ বাবা তাে আর আমেরিকায় থাকেন না। বাবা যদি আমেরিকায় থাকতেন তাহলে আমি অবশ্যই বাবার সঙ্গে তাঁর দেখা করিয়ে দিতাম। বাবাকে বলতাম, তুমি মিস্টার কনির একটা পােট্রেট এঁকে দাও। পােট্রেট করার সময় তার গালের কাটা দাগটা মুছে দিও। এই কাটা দাগটা উনি পছন্দ করেন না।
মিস্টার কনি আমাকে বলেছেন বাবা–মা’র ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। এটা নিয়ে কখনাে মন খারাপ করতে নেই। তুমি দূর থেকে তােমার বাবাকে ভালােবাসবে। তােমার বাবাও দূর থেকে তােমাকে ভালােবাসবেন। যখন তােমাদের দেখা হবে তখন দেখবে তােমার এবং তােমার বাবার ভালােবাসার মধ্যে রেসলিং শুরু হবে। সব রেসলিং–এ একজন হারে একজন জিতে। এই রেসলিং–এ দু‘জনই জিতবে।
মিস্টার কনি এত মজার মজার কথা বলেন! মজা করে কথা বললেও তিনি আসলে খুবই জ্ঞানী। শওকত তার ছেলের লেখা রচনা অতি দ্রুত একবার শেষ করে দ্বিতীয়বার পড়তে শুরু করল। প্রথমবার পড়তে কোনাে সমস্যা হয় নি, দ্বিতীয়বার পড়তে খুব কষ্ট হলাে। এক একটা লাইন পড়ে, চিঠি ঝাপসা হয়ে আসে। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে থাকে।
Read more
