যোহান উলফগ্যঙ ভন গ্যেটে [১৭৪৯–১৮৩১]
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে জার্মানিতে প্রকাশিত হল একখানি উপন্যাস, নাম “The sorrows of Werther“ (তরুণ ভের্টরের শোক) । উপন্যাস প্রকাশিত হবার সাথে সাথে সমস্ত জার্মানিতে আলোড়ন পড়ে গেল । ক্রমশই তার ঢেউ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আছড়ে পড়ল সমস্ত ইউরোপে, এমনকি সদূর চীনেও । কাহিনীর নায়ক ভের্টর এক ছন্নছাড়া যুবক ।
তাঁর কবি মন স্বপ্নের জগতে বাস করে । মাঝে মাঝেই আঘাত পায়, বেদনায় ভেঙ্গে পড়ে । আবার সব ভুলে নতুন করে স্বপ্ন দেখে । কিন্তু সে স্বপ্ন ভেঙে যায় । নতুন জীবনের আশায় শহরের কাছে এক গ্রামে এর । গ্রামের মুক্ত প্রকৃতি গছ ফুল পাখি মানুষ মুগ্ধ করে ভের্টরকে, প্রিয়তম বন্ধু হেলমকে চিঠি লেখে ভের্টর । এই চিঠির মালা সাজিয়েই সৃষ্টি হয়েছে উপন্যাস । জীবনে আঘাত ব্যর্থতা হতাশায় শেষ পর্যন্ত সব আশা হারিয়ে আত্মহত্যা করে ভের্টর ।
যোহান উলফগ্যঙ ভন গ্যেটে এর জীবনী
ভের্টরের আশা নিরাশা তাঁর কল্পনা রোমান্স সমস্ত মানুষের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করল । যুবক যুবতীদের কাছে ভের্টর হয়ে উঠল আদর্শ । উপন্যাসের পাতা ছাড়িয়ে ভের্টর হয়ে উঠল এক জীবন্ত মানব । তার অনুকরণে ছেলেরা পরতে আরম্ভ করল নীল কোট, হলদে ওয়েস্ট কোট । মেয়েরা নায়িকার মত সাদা পোশাক আর পিঙ্ক বো-তে নিজেদের সাজাতে থাকে । সকলেই যেন ভের্টরের জীবনের সাথে জীবন মেলাতে দলে দলে যুবক-যুবতীরা আত্মহত্যা করতে আরম্ভ করল ।
শুধু একটি মানুষ নির্বিকার । ভের্টরের জীবনের সেই বিষাদ, বিষণ্ণতা, অন্ধকার তাঁর জীবনকে স্পর্শ করতে পারেনি কারণ তিনি যে চির আলোর পথিক, ভের্টরের স্রষ্টা, জার্মানী সাহিত্যের অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ পুরুষ যোহান উলফগ্যঙ ভন গ্যেটে । গ্যেটের জন্ম জার্মানি ফ্রাঙ্কফুট শহরে । তারিখটি ছিল ১৭৪৯ সালে ২৮শে আগস্ট । গ্যোটের প্রপিতামহ ছিলেন কামার, পিতামহ দর্জি । পিতামহ চেয়েছিলেন সম্ভ্রান্ত নাগরিক হিসাবে ছেলেকে গড়ে তুলতে ।
গ্যেটের পিতা যোহান ক্যাসপার পড়াশুনা শেষ করে উচ্চপদস্থ কর্মচারী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন । যোহান ছিলেন যেমন শৃঙ্খলাপরায়ন তেমনি সুপণ্ডিত । অন্যদিকে গ্যেটের মা ছিলেন সহজ সরল উদার হৃদয়ের মানুষ । গ্যেটের জীবনে পিতা এবং মাতা দু’জনেরই ছিল ব্যাপক প্রভব। গ্যেট লিখেছেন, আমার জীবন সম্বন্ধে দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছিল পিতার কাছ থেকে, মায়ের কাছে পেয়েছিলাম সৃষ্টির প্রেরণা ।
Johann Wolfgang Von Goethe
ছেলেবেলা থেকেই গ্যেটে ছিলেন এক ভিন্ন চরিত্রের মানুষ । পিতা যোহান ক্যাসপার চেয়েছিলেন ছেলে তাঁর মতই একজন উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী হবে । চার বছর বয়সে গ্যেটেকে স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হল । কিন্তু স্কুলের ছোট গণ্ডির মধ্যে অল্পদিনেই গ্যেটের প্রাণ হাঁপিয়ে উঠল । মাস্টারদের শাসন, অন্য ছেলেদের দুষ্টমি, কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলার বেড়াজালে কিছুতেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারলেন না । অসুন্থ হয়ে পড়লেন । বাধ্য হয়ে পিতা তাঁকে বাড়িতে এনে গৃহশিক্ষক রেখে পড়াবার ব্যবস্থা করলেন । একদিকে চলতে লাগল ল্যাটিন, গ্রীক, ইটালিয়ান, ইংরাজি ভাষা শিক্ষা, অন্যদিকে ছবি আঁকা, গান শেখা ।
এরই মধ্যে শৈশব কালেই গ্যেটের মনে গড়ে উঠেছিল এক ভিন্ন জগৎ । যা প্রচলিত জীবন পথ থেকে স্বতন্ত্র, মাত্র ছয় বছর বয়সে ঈশ্বরের অস্তিত্বে সন্দেহ প্রকাশ করেন । পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে পথে পথে ঘুড়ে বেড়াতেন গ্যেটে । দু’চোখ ভরে দেখতেন প্রকৃতির অপরূপ শোভা । মানুষজন বাড়ি-ঘর জীবনের নানা রূপ । যা কিছু একবার দেখতেন জীবনের স্মৃতিপটে তা অক্ষয় হয়ে থাকত । কৈশোরের এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে তাঁর নানান রচনায় মূর্ত হয়ে উঠেছে ।
Johann Wolfgang Von Goethe
কৈশোরের শুরু হয়েছিল তাঁর সাহিত্য জীবনের হাতেখড়ি । তিনি নিজের সম্বন্ধে লিখেছেন, “যখন আমার দশ বছর বয়স তখন কবিতা লিখতে শুরু করি যদিও জানতাম না সেই লেখা ভাল কিংবা মন্দ । কিন্তু উপলব্ধি করতে পারতাম অসাধারণ কিছু সৃষ্টি করবার ক্ষমতা আমার মধ্যে রয়েছে ।” প্রকৃতপক্ষে জন্ম থেকেই তিনি কবি । কবিতা ছিল তাঁর সত্তায় আর সেই সাথে মিশে ছিল তাঁর প্রেম । যে প্রেমের শুরু মাত্র পনেরো বছর বয়সে । শেষ প্রেম চুয়াত্তর বছর বয়সে ।
একদিন গ্যেটে তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে সরাইখানায় গিয়েছেন, সেখানে দেখলেন সরাইখানার মালিকের কিশোরী কন্যা মাগুরিতকে । তাঁর চেয়ে কয়েক বছরের বড় । কিন্তু প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ হলেন গ্যেটে । অল্প দিনেই দু’জনে পরস্পরের প্রতি গভীর প্রেমে আকৃষ্ট হলেন । গ্যেটে লিখেছেন তার প্রতি আমার দুর্নিবার আকর্ষণ আমার মনের মধ্যে সৃষ্টি করল এক নতুন সৌন্দরযের জগৎ আর আমাকে উত্তোরিত করল পবিত্রতম মহত্ত্বে । গ্যেটের কৈশোর জীবনে প্রথম প্রেম দীর্ঘস্থায়ী হয়নি । মাগুরিত ফ্রাঙ্কফুট ছেড়ে পিতার সঙ্গে গ্রামে চলে গেলেন ।
Johann Wolfgang Von Goethe
বিচ্ছেদ বেদনায় সাময়িক ভেঙে পড়লেও ধীরে ধীরে আবার নিজেকে আনন্দ জগতে ভাসিয়ে দিলেন গ্যেটে । সমস্ত দিন বন্ধু-বান্দবদের সঙ্গে আমোদ আহ্লাদেই কেটে যায় । ছেলেন ভবিষৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন পিতা । স্থির করলেন আইন পড়বার জন্য গ্যেটেকে লিপজিগে পাঠাবেন ।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও শুধুমাত্র পিতাকে সন্তুষ্ট করবার জন্য গ্যেটে লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন । আইনের প্রতি সমান্যতম আকর্ষণ ছিল তাঁর । ক্লাস কামাই করে অধিকাংশ সময় তিনি ঘুরে বেড়াতেন পথে প্রান্তরে, বাজারে মানুষের ভিড় । “আমি মনে করি এই পৃথিবী আর ঈশ্বর সম্বন্ধে আমার জ্ঞান কলেজের শিক্ষকদের চেয়ে বেশি ।
Johann Wolfgang Von Goethe
আর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের চার দেওয়ালের ক্লাস ঘরের মধ্যে থেকে আমি যা জানতে পারব, বাইরের উন্মক্ত পৃথিবীর মানুষদের কাছ থেকে তার থেকে অনেক বেশি জানতে পারবে ।” তাঁর এই জীবনবোধের অনুপ্রেরণায় মাত্র সতেরো বছর বয়সে রচনা করলেন নাটক Lover’s Quarrels এবং The fellow Sinners । শেষ নাটকটির বিষয়বস্তু হচ্ছে বিবাহিত জীবনের ব্যভিচার । এক বৃদ্ধ যিনি যৌবনের পাপের জন্য নিয়ত অনুশোচনায় যন্ত্রণা ভোগ করেছেন, এক নৈতিক প্রশ্ন তাঁর জীবনে বড় হয়ে উঠেছে । তরুণ গ্যেটের মনে হয়েছে । আমরা সকলেই অপরাধী । অপরাধবোধের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার শ্রেষ্ঠ পথ অন্যকে ক্ষমা করা, অতীতকে বিস্মৃত হওয়া ।
Johann Wolfgang Von Goethe
গ্যেটের জীবনে ঘটল এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা । গ্যেটের পাশের থাকতেন ওয়েল্যান্ড নামে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক ছাত্র । একদিন গ্যেটেকে নিয়ে গেলেন স্ট্যাটসবুর্গের অদূরে এক গ্রাম্য যাজকের বাড়িতে । সেখানে দেখা হল যাজকের ১৮ বছরের তরুণী কন্যা ফ্রেডরিখ ব্রিয়নের সাথে । তাঁর হাঁটু পর্যন্ত স্কার্টে ঢাকা রয়েছে । মুখে এক গ্রাম্য সরলতা ।
চোখে উজ্জ্বল স্বচ্ছ দৃষ্টি । প্রথম দর্শনেই ভালবাসার গভীর বাঁধনে বাঁধা পড়ে গেলেন দু’জন । গ্রাম্য প্রকৃতির মাঝে ব্রিয়নের সহজ সরলতা, অনুপম সৌন্দর্য গ্যেটের জীবনের এক নতুন দিগন্তের দ্বারকে উন্মোচিত করল । কিন্তু গ্যেটে বুঝতে পারলেন সামাজিক কারণে তাঁদের মধ্যে বিবাহ হওয়া সম্ভব নয় ।
তখন আইন পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে । ভাগ্যক্রমে গ্যেটে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন । বাড়ি থেকে পিতার ডাক এল । গ্যেটে বুঝতে পারছিলেন ফ্রেডরিখের সাথে তাঁর মিলন সম্ভব নয় । বিষণ্ণ হৃদয়ে গ্যেটে ফিরে গেলেন ফ্রাঙ্কফুটে । গ্যেটের জীবনে বহু নারীর আগমন ঘটেছিল, তাদের মধ্যে একমাত্র ফ্রিডরিখ সারা জীবন অবিবাহিত থেকে যান । নিজের সম্বন্ধে ফ্রেডরিখ বলেছিলেন, যে মন আমি গ্যেটেকে উৎসর্গ করেছি তা আর কাউকে দিতে পারব না ।
Johann Wolfgang Von Goethe
ফ্রাঙ্কফুটে ফিরে আসতেই গ্যেটের পিতা তাঁকে পাঠালেন সুপ্রীম কোর্টে । মনের ইচ্ছা পুত্র আইনের জগতে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করুক । সুপ্রীম কোর্টে প্র্যাকটিস শুরু করলেন গ্যেটে । কিন্তু আদালতের কাজকর্মের অবস্থা অল্পদিনেই আইন ব্যবসায়ের উপর সব শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেললেন গ্যেটে । স্থির করলেন আর আইন নয়, সাহিত্যই হবে তাঁর জীবনের একমাত্র পেশা । গ্যেটের প্রিয় লেখক ছিলেন শেক্সপীয়র । তাঁর অনুকরণে তিনি লিখলেন একটি পঞ্চম অঙ্কের নাটক । সাহিত্য হিসাবে এর সামান্যই মূল্য আছে ।
সুপ্রীম কোর্টে কাজ করবার সময় গ্যেটে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে আশ্রয় নিয়েছিলেন । সেই পরিবারের কুড়ি বছরের তরুণী কন্যা লটিকে দেখেই তার সৌন্দরযে মুগ্ধ হয়ে গেলেন গ্যেটে । কিন্তু অল্পদিনেই গ্যেটে জানতে পারলেন লটি অন্য পুরুষের বাগদত্তা । শুধু তাঁর সাথে প্রেমের অভিনয় করেছে । আকস্মিক এই আঘাতে মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেন গ্যেটে । মনে হল আত্মহত্যা করবেন । কিন্তু ধীরে ধীরে মানসিক শক্তি সঞ্চয় করে আবার উঠে দাঁড়ালেন গ্যেটে ।
Johann Wolfgang Von Goethe
লটির প্রতি ব্যর্থ প্রেমের স্মৃতি, তার প্রেমিকের প্রতি ঈর্ষা গ্যেটের মনোজগৎকে এত গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল, চার সপ্তাহের মধ্যে রচনা করলেন তাঁর অবিস্মরণীয় উপন্যাস The sorrows of Werther তরুণ ভের্টরের শোক । সমস্ত জার্মানি তথা ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল সেই উপন্যাসের প্রতিক্রিয়া । চব্বিশ বছরের অখ্যাত যুবক গ্যেটে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলেন ।
সেদিনকার কিছু সমালোচক এঁকে সেন্টিমেন্টাল রোমান্স বলে উড়িয়ে দিতে চাইলেও তরুণ সমাজের কাছে এই বই চিরদিনের । এই বইয়ের নায়ক এক তরুণ, নাম ভের্টর । স্বপ্নের জগতে বাস করে ভের্টর । তার মন পাখা মেলে উড়ে বেড়ায় । কিন্তু জীবনের বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে সব স্বপ্ন তার ভেঙে গেল । একদিন পথে বেরিয়ে পড়ল । ঘুরতে ঘুরতে ভের্টর এসে পড়ল একটা ছোট গ্রাম ভালহাইমে । বসন্তকাল, সমস্ত প্রকৃতি নতুন সাজে সেজে উঠেছে । মুগ্ধ হয়ে গেল ভের্টর । সেখানেই রয়ে গেল । মনে হল এখানেই জীবনের সব দুঃখকে ভুলতে পারবে ।
Johann Wolfgang Von Goethe
ধীরে ধীরে তার মন শান্ত প্রকৃতিস্থ হয়ে আসছিল । এমন সময় দেখা হল শারলোটের সাথে । সে অ্যালবার্টের বাগদত্তা । তবুও তাকে দেখে মুগ্ধ হল ভের্টর । ভালবাসার বাঁধনে বাঁধা পড়ল সে । পরিচিত হল অ্যালবার্টের সাথে । অ্যালবার্টের শান্ত ভদ্র আচরণে বিভ্রান্ত ভের্টর । কেমন করে শারলোটকে তার কাছে থেকে ছিনিয়ে আনবে, আবার শারলোটকে না পেলেও যে তার জীবন অন্ধকার ।
মানসিক যন্ত্রণায় ভেঙে পড়ে ভের্টর । শেষে ঠিক করল সে চলে যাবে অন্য কোথাও । বন্ধু তার জন্যে একটা চাকরি ঠিক করল । কিন্তু চাকরি নিয়েও সুখী হতে পারল না । একদিন সব ছেড়ে আবার ফিরে এল ভালহাইমে । শারলোট তখন অ্যালবার্টের স্ত্রী । সমস্ত অন্তর ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে ভের্টরের । হতাশার বেদনায় আত্মহত্যা করল ভের্টর । লাইম গাছের নিচে তার দেহ সমাধি দেওয়া হল । সমস্ত উপন্যাসটি পত্রগুচ্ছের সংকলন । অনেক বিদগ্ধ সমালোচকের অভিমত উনিশ শতকে ইংরেজি সাহিত্যে যে রোমান্টিক মুভমেন্টের বিকাশ ঘটেছিল তার মূল অনুপ্রেরণা তরুণ ভের্টরের শোক ।
Johann Wolfgang Von Goethe
তরুণ ভের্টরের শোক যখন প্রকাশিত হল, গ্যেটে তখন আইন ব্যবসায়ের সাথে যুক্ত ছিলেন । এই উপন্যাসের খ্যাতিতে উদ্ধুদ্ধ হয়ে স্থির করলেন সাহিত্যকেই জীবনের একমাত্র অবলম্বন হিসাবে গ্রহণ করবেন । সম্ভবত এই সময় থেকেই গ্যেটের মনের মধ্যে ফাউস্টের ভাবনা জন্ম নেয় । ১৭৭৪ সালে তিনি লিখলেন তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় নাটক Clavigo ।
এই নাটরেক বিষয়বস্তু তিনি পেয়েছিলেন কোর’আন থেকে । গ্যেটের খ্যাতি জনপ্রিয়তা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছিল । বিভিন্ন স্থান থেকে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছিল । যদিও অভিজাত সম্প্রদায়কে তিনি তাঁর বহু রচনায় বিদ্রুপ করেছেন তবুও তাদের প্রতি ছিল এক সহজাত আনুগত্যবোধ আর শ্রদ্ধা ।
তাঁর এক বন্ধু রাজদরবারে চাকরি নেওয়ার পর তিনি লিখেছিলেন, “ক্ষমতাবান প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, তাদের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার মধ্যে আমি কোন দোষ দেখি না । যদি শ্রেষ্ঠ মানুষদের সম্পর্ককে যথার্থভাবে কাজে লাগানো যায় তবে তা সব সময়েই কল্যাণকর ।” যখন যুবরাজ কার্ল লুডউইগ তাঁকে ওয়েমারে আমন্ত্রণ করলেন, গ্যেটে এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে যুবরাজের আতিথ্য গ্রহণ করলেন ।
তখন তাঁর বয়স ছাব্বিশ । অবশিষ্ট জীবন তিনি এখানেই অতিবাহিত করেন । প্রসাদের কাছেই একটি উদ্যান বাড়িতে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হল । এখানে পরিচয় হল দুই কিশোর রাজকুমারের সঙ্গে । এই পরিচয় ভবিষৎ জীবনে এক বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করেছিল ।
যোহান উলফগ্যঙ ভন গ্যেটে এর জীবনী
কার্ল ছিলেন শিক্ষা জ্ঞান শিল্প সংস্কৃতির গভীর পৃষ্ঠপোষক । গ্যেটের জ্ঞান সৃজনীশক্তি ব্যক্তিত্ব দেখে মুগ্ধ হলেন কার্ল । তাঁকে অন্যতম প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে নির্বাচিত করলেন । গ্যেটে উপলব্ধি করেছিলেন তাঁর দ্বায়িত্বের কথা । তাই সমস্ত কাজকে দু’ভাগে ভাগ করে নিয়েছিলেন । একদিকে রাজনীতি অন্যদিকে সাহিত্য সৃষ্টি ।
কনফুসিয়াসের মত তিনিও তরুণ যুবরাজকে নানান বিষয়ে শিক্ষা দিতেন, পরামর্শ দিতেন । এর জন্যে নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠিত হতেন না । সাহিত্যে যিনি ছিলেন চির বিদ্রোহী, ব্যক্তিজীবনে তিনি তার সম্পূর্ণ বিপরীত, রাজশক্তির প্রতি চরম অনুগত ।
একদিকে যখন ফাউস্ট রচনার কাজ চলেছে, তারই পাশাপাশি আমেরিকান বিপ্লবের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে রচনা করলেন তাঁর নাটক, এগমঁত । এই নাটকের বিষয়বস্তু হল স্পেনের অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে নেদারল্যান্ডবাসীদের বিদ্রোহ । এই নাটকের নায়ক কাউন্ট এগঁমত ছিলেন দেশপ্রেমিক কিন্তু জ্ঞানহীন । নিজের সামর্থ্য শক্তিতে বিচার না করেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সংগ্রামে । এই হটকারিতার জন্যেই শেষ হল তাঁর জীবন ।
যোহান উলফগ্যঙ ভন গ্যেটে এর জীবনী
১৭৮৯ সাল নাগাদ অসুস্থ হয়ে পড়লেন ডিউক কার্ল । স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য ডিউক এবং গ্যেটে গেলেন সুইজারল্যান্ডে । এখানকার শান্ত পরিবেশ, মনোরম প্রাকৃতিক নিসর্গ দৃশ্য । গ্যেটের মনে এক গভীর প্রশান্তি নিয়ে আসে । ওয়েমারে প্রত্যাবর্তন করে গ্যেটে গভীর অধ্যয়ন শুরু করলেন । মূলত বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা ছাড়াও তিনি পড়তেন ইতিহাস, দর্শন, চিত্রকলা । গ্যেটের উদ্দেশ্য ছিল ওয়েমারের কৃষি, খনিজ উত্তোলন, সামরিক উন্নয়নের জন্য এই জ্ঞানকে কাজে লাগানো । তাছাড়া নিজেরই অন্তহীন জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজে পাওয়া ফাউস্টের মত গ্যেটেও ছিলেন চির জ্ঞান-অন্বেষী ।
একদিকে চলছিল তাঁর জ্ঞান সাধনা অন্য দিকে সাহিত্য সাধনা । এগমঁতের পর রচনা করলেন ভিন্নধর্মী উপন্যাস ইউলেম সেস্তার । এই উপন্যাসে গ্যেটের নিজের জীবনই অনেকাংশে প্রতিভাত হয়ে উঠেছে । গ্যেটে যাদের ভালবেসেছিলেন তাদের কাউকেই জীবনে সঙ্গি হিসাবে পাননি । ব্যর্থ প্রেমের যন্ত্রনা তাঁকে আহত করলেও চলার পথকে রুদ্ধ করত পারেন । উপন্যাসের নায়ক মেস্তারের জীবনেও বারে বারে প্রেম এসেছিল কিন্তু প্রতিবারই সে ব্যর্থ হয়েছে । তবুও তার চলার ছন্দ বিনষ্ট হয়নি । কিন্তু ঘটনার আধিক্য উপন্যাসের ছন্দ অনেকাংশে বিঘ্নিত হয়েছে ।
যোহান উলফগ্যঙ ভন গ্যেটে এর জীবনী
তবে গ্যেটের সার্থক উপন্যাস ‘কাইন্ডার্ড বাই চয়েস’ বা ’সিলেকটিভ এ্যাফিনিটি’ । একই পরিবেশের মধ্যে গড়ে উঠেছে কয়েকটি নরনারী- এডওয়ার্ড ও ওতিলে, শার্লোতে ও ক্যাপ্টেন । একদিকে নায়ক-নায়িকাদের ইচ্ছাশক্তি অন্যদিকে নিয়তি, এই দুই এর দ্বন্দ্ব, তার বিস্তারই এই উপন্যাসরে বিষয়বস্তু ।
উপন্যাস লিখলেও গ্যেটে অনুভব করেছিলেন উপন্যাসে নয়, নাটকেই তাঁর প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটা সম্ভব । একক প্রচেষ্টায় গড়ে তুললেন নাটকের দল লিটলট থিয়েটার । এই দলের প্রয়োজনে কয়েকটি অসাধারণ নাটক রচনা করেছিলেন । প্রথম পর্বের নাটকে দেখা যায় তারুণ্য আর যৌবনের উদ্দামতা । তার Stella নাটকে দেখা যায় নায়ক তার স্ত্রীর সাথে বাস করে, অন্যদিকে তার প্রেমিকাকেও ভালবাসে । তিনজরেন মধ্যে গড়ে উঠেছে এক পারস্পারিক সম্পর্ক ।
এ পরোক্ষভাবে দুই পত্নী গ্রহণের মতবাদ । এর বিরুদ্ধে তীব্র জনমত গড়ে ওঠে । নিরুপায় হয়ে গ্যেটে নাটকের শেষ অঙ্কের পরিবর্তন ঘটালেন । নায়ক স্থির করতে পারে না কাকে বেছে নেবে স্ত্রী না প্রেমিকাকে? মানসিক দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে ।
যোহান উলফগ্যঙ ভন গ্যেটে এর জীবনী
কিন্তু ক্রমশেই গ্যেটের মধ্যেকার এই বিদ্রোহ মনোভাব প্রশমিত হয়ে আসে । যৌবনের উদ্দমতায় যিনি বিদ্রোহী হয়ে সব কিছুকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন, এখন হয়ে ওঠেন প্রজ্ঞাবান দার্শনিক, যিনি সব কিছুর মধ্যে অন্বেষণ করেন সৌন্দরযের প্রজ্ঞার, তিনি জানতেন অভিজাদের বাইরের সৌন্দরযের মধ্যে প্রকৃত সৌন্দর্যকে খুঁজে পাওয়া যাবে না । একদল কয়লা খনির শ্রমিক, রুটি তৈরির কারিগরকে দেখে বলেছিলেন তথাকথিত এই নিচু সমাজের মানুষেরাই ঈশ্বরে চোখে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে সুন্দর ।
মানুষের প্রতি এই ভালবাসাই ছিল তাঁর সৃষ্টির মূল উৎস । একবার ডিউক কার্ল ফরাসীদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন । ডিউক যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করবার জন্যে ডেকে পাঠালেন গ্যেটেকে । গ্যেটে এলেন কিন্তু মানুষের এই বীভৎসতা তাঁর ভাল লাগল না । তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে এক নির্জন অঞ্চলে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করতেন ফুল, প্রকৃতি । দেশকে তিনি ভালবাসতেন । যখন তাঁকে বলা হয়েছিল যুদ্ধের জন্য গান লিখতে, তিনি বলেছিলেন, যে বিষয়ে আমার কোন অভিজ্ঞতা নেই, সেই বিষয়ে আমি শব্দও উচ্চারণ করি না । আমি যা ভালবাসি শুধু তারই গান গাইতে পারি ।
যোহান উলফগ্যঙ ভন গ্যেটে এর জীবনী
১৭৭৮ সাল, তখন গ্যেটের বয়স ৩৯ । তরুণ্যের প্রান্তে পৌঁছে পরিচয় হল ক্রিস্টেন ভারপাইনের সাথে । কিস্টেন তার ভাইয়ের জন্য একটি সুপারিশপত্র নিয়ে এসেছিলেন গ্যেটের কাছে । ক্রিস্টেনের স্নিগ্ধ সৌন্দর্য শান্ত স্বভাব, সম্ব্রমপূর্ণ ব্যবহার দেখে মুগ্ধ হলেন গ্যেটে । ক্রিস্টেনকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এলেন । দীর্ঘ আঠারো বছর তারা একত্রে রয়ে গেলেন । ১৮০৬ সালে শুধুমাত্র সন্তানের পরিচয়ের স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য দু’জনে বিবাহ করেন ।
গ্যেটের জীবনের আরেকটি ঘটনা, কবি শীলারের সাথে পরিচয় । এই পরিচয় অল্পদিনের মধ্যেই গভীর বন্ধুত্বে পরিণত হল । যদিও দু’জনে ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের মানুষ । গ্যেটের বয়স তখন ৪৫, শীলারের ৩৫ । গ্যেটে প্রাণবন্ত সজীব, শীলার অসুস্থ । ধর্মের প্রতি গ্যেটের কোন আগ্রহ ছিল না তিনি বিশ্বাস করতেন অন্তরের প্রকৃতির সৌন্দরযে । অন্যদিকে শীলার ছিলেন ধর্মভীরু, তিনি বিশ্বাস করতেন ন্যায়বিচার ।
গ্যেটে পেয়েছেন ভাগ্যের অকৃপণ সহায়তা, নারীর প্রেম কিন্তু শীলার পেয়েছেন শুধু দারিদ্র্য আর বঞ্চনা । এত বৈষম্য সত্ত্বেও দু’জনের বন্ধুত্ব ছিল অকৃত্রিম । এই বন্ধুত্ব দু’জনের সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহদণ করেছিল । শীলার Horen নামে একটি পত্রিকা সম্পাদন করতেন । গ্যেটে এই পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন । এই সময় তাঁদের লেখার একাধিক বিরূপ সমালোচনা হতে থাকে । দু’জনে সরস বুদ্ধিদীপ্ত কবিতায় তার জবাব দিতে থাকেন । ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে যৌথ উদ্যেগে প্রকাশিত হয় কাব্যগ্রন্থ Musen Almanach ।
Johann Wolfgang Von Goethe
১৮০৫ সালে যখন শীলারের মৃত্যু হয়, গ্যেটে শিশুর মত কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন । এক বন্ধুকে লিখেছিলেন আমার অর্ধেক অস্তিত্ব চলে গেল ।
মাত্র ৪৫ বছর বয়সে বন্ধু দেহরক্ষা করলেও ঈশ্বরের আশীর্বাদে দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন গ্যেটে । ১৭৪৯-১৮৩২ প্রায় তিরাশি বছর এই সুদীর্ঘ জীবনে অনেক কিছু হারাতে হয়েছে তাঁকে প্রিয় বন্ধু, আদরের বোন, প্রিয়তমা স্ত্রী, একমাত্র সন্তান । এত বেদনার মধ্যেও তাঁর জীবনের অপ্রতিহত গতি কখনো রুদ্ধ হয়নি । তিনি তাঁর সমস্ত যন্ত্রণা বেদনাকে ব্যর্থতাকে রূপান্তর ঘটিয়েছেন তাঁর সৃষ্টির মধ্যে । এমন বিস্ময়কর বহুমুখী প্রতিভা মানব ইতিহাসে দুর্লভ ।
Johann Wolfgang Von Goethe
কি ছিলেন না তিনি? কবি, নাট্যকার, চিত্রকর, সঙ্গীতজ্ঞ, বিজ্ঞানী, দার্শনিক । তিনি প্রায় ৬০টি বই লিখেছেন – এর মধ্যে আছে গাথা, গীতকবিতার ব্যঙ্গনাটক, কাব্য, নাটক, প্রবন্ধ, উপন্যাস, মজাদার কাহিনী, ভূত-দৈত্যাদানবের গল্প । তাঁর এই বহুব্যাপ্ত প্রতিভার নির্যাস দিয়ে সমস্ত জীবন ধরে সৃষ্টি করেছেন ফাউস্ট, যার প্রথম খণ্ড লিখতে লেগেছিল ত্রিশ বছর, দ্বিতীয় খণ্ড শেষ করতে লেগেছিল পঁচিশ বছর ।
বৃদ্ধ হয়েও যৌবনের মত তারুণ্যের দীপ্তিতে ভরপুর হয়ে থাকতেন গ্যেটে । শোনা যায় ভাইমারের যুদ্ধের পর যখন নেপোলিয়নের সৈন্যবাহিনী জার্মানি দখল করে, নেপোলিয়ন আদেশ দিয়েছিলেন গ্যেটের প্রতি সামান্যতম অমর্যাদা যেন না করা হয় । তিনি গ্যেটেকে আমন্ত্রণ করেছিলেন তাঁর প্রাসাদে ।
Johann Wolfgang Von
গ্যেটে যখন এলেন, নেপোলিয়ন বিস্ময়ভরা চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে বলে উঠেছিলেন, একটা মানুষ আপনি! বৃদ্ধ গ্যেটের ব্যক্তিত্ব, তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়েছিলেন নেপোলিয়ন । তাঁর সাথে নানান বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন । বহু বিষয়ে গ্যেটে নেপোলিয়নের মতের সাথে একমত হতে পারেননি । গ্যেটে স্পষ্টভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করেছিলেন ।
গ্যেটে যখন চলে যান, নেপোলিয়ন গভীর শ্রদ্ধায় আবার বলেছিলেন একটা মানুষ বটে । গ্যেটে সম্বন্ধে নেপোলিয়নের এই মন্তব্য যথার্থই সত্য । একজন পরিপূর্ণ মানুষ । জীবনের অন্তিম লগ্নে এসেও এই মানুষটি বিস্মৃত হননি তিনি মানুষ, ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ জীব, যে প্রতিমুহূর্তে নিজেকে উত্তরণ করে চলেছে অন্ধকার থেকে আলোকে ।
১৮৩২ সালের ২২শে মার্চ । কয়েকদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন গ্যেটে । অনুরাগীরা তাঁকে এনে বসিয়ে দিল তাঁর পাঠকক্ষের চেয়ারে । সকলেই অনুভব করেছিল কবির জীবনদীপ নির্বাপিত হয়ে আসছে । এক বিষন্ন বেদনায় আচ্ছন্ন হয়েছিল তাদরে মন । দিন শেষ হয়ে এসেছিল । বাইরে অন্ধকারের ছায়া নেমে এসেছিল । গ্যেটে চোখ মেলে তাকালেন । অস্ফুটে বলে উঠলেন, “আরো আলো।” তারপরই স্তব্ধ হয়ে গেল চির আলোর পথিক গ্যেটের মহাজীবন ।
