রম্য কথা -পর্ব-(৩)-আনিসুল হক

রম্য কথা

পুলিশ বলল, এই এনারে বাড়ি পেঁৗছায়া দাও। 

স্কুটার বাংলামটর পর্যন্ত গিয়ে আবার ঘুরে এল। সৌরভই স্কুটারওয়ালাকে ফের যেতে বলেছে শেরাটনের মােড়ে। পুলিশকে তার একই প্রশ্ন: এই তােরা কী করছিস? মাছি মারছিস? 

একবার দুইবার তিনবার । তিনবার স্কুটার ঘুরে এল। এবং অপার কৌতূহলী সৌরভের একই প্রশ্ন পুলিশের উদ্দেশে ধাবিত হলাে: এই তােরা কী করিস। মাছি মারিস। 

পুলিশের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। তারা সৌরভকে নামিয়ে একটা লাইটপােস্টের সঙ্গে বেঁধে রেখে দিল। তারও ঘণ্টাখানেক পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে পলিশ তার পাকস্থলী ওয়াশ করাল। সে বড় কষ্টকর প্রক্রিয়া। শােনা যায়, একবার কারও পাকস্থলী ওয়াশ করানাে হলে সে আর দ্বিতীয়বার মদ্যপান করে না ।

কিন্তু সৌরভের কাছে এসব জাগতিক দুঃখকষ্ট অতি তুচ্ছ । সে বলল, বেটারা আমাকে বেঁধে রেখেছে। রাখুক। কিন্তু এত দামি মদ কেন ওরা বের করে নিল। 

 ফিরিয়ে দাও আমার আট পেগ হুইস্কি! এই ছিল সৌরভ শমসেরের সংলাপ।। 

আমি আমার বউয়ের চুড়ি চুরি করে এনে বিক্রি করে এই মদের টাকা জোগাড় করেছি। 

 কয়েকদিন পরে শােনা গেল, সৌরভের বউ, রানীভাবি মারা গেছে। পরে জানা গেল, আসলে যায় নাই। প্রথমে তার অসুখ ও পরে মৃত্যুর কাহিনী ছড়িয়ে দিয়ে সৌরভ মদের টাকা জোগাড় করেছে। 

রম্য কথা -পর্ব-(৩)

একদিন রাতের বেলা, সে রাত দুটো হবে, হঠাৎ আমার মােবাইল ফোন বেজে উঠল। কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলে মেজাজ খারাপ হয় । আমারও তাই হলাে। মােবাইল ফোনে নাম উঠেছে কালাম মজনুর। কালাম মজনু খুব বড় গায়ক। আমাদের বন্ধু । 

আমি ঘুম জড়ানাে গলায় বললাম, কী ব্যাপার কালাম । এত রাতে। কোনাে বিপদ-আপদ! 

কালাম বলল, বিপদের ওপরে বিপদ । রাতের বেলা গানের রেকর্ডিং সেরে বের হইছি । ট্যাক্সির খোঁজে হাটতেছি । দেখি ফুটপাতে বসে আছে এক লােক। কাছে গিয়া দেখি সৌরভ শমসের। বেহেড মাতাল। তাকে ধরাধরি করে একটা স্কুটারে তুলছি। স্কুটারওয়ালা দেখি সৌরভকে চিনে।

দেখেই বলে আমি কোনাে মাতালকে তুলি না। শেষে তুলল। | মগবাজারে সৌরভের বাড়ি এইটা আমি জানি। মগবাজার গাবতলা। স্কুটার নিয়া আসছি এইখানে। এখন সৌরভ নিজের বাড়ি চিনতেছে না। আমি কই, ও সৌরভ, তােমার বাড়ি কোনটা? সে খালি খুঁজে । বলে, চিনতেছি না। কী করি বলাে তাে। সৌরভ নিজের বাড়ি চিনতেছে না। তুমি সৌরভের বাড়ির নাম্বার জাননা। 

আমি বললাম, তােমার তাে বাড়ি চেনার দরকার নাই । ওরে স্কুটার থেকে নামায়া দিয়া ওই স্কুটার নিয়া তুমি চলে যাও বাসায়। সব মাতালই জাতে মাতাল তালে ঠিক। 

সৌরভের বউ এসে নানাজনের কাছে কান্নাকাটি করতে লাগল, সৌরভ রাতে বিরেতে ফিরে বউ পেটায়। বাড়িওয়ালা তাদেরকে নােটিশ দিয়েছে। তারা তাকে বাড়িভাড়া দেবে না। 

কী আর করা। আমরা সবাই চাঁদা দিয়ে সৌরভকে একটা মাদকমুক্তি ক্লিনিকে ভর্তি করিয়ে দিলাম। ডাক্তার বলেছেন, অন্তত তিন মাস এখানেই থাকতে হবে। 

রানীভাবি বলেন, দুর্নাম হবে না? গীতিকার মানুষ। আমরা বললাম, দুর্নাম যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন ও যদি সেরে ওঠে, তাতেই ওর সুনাম হবে। আমাদের কালচারাল ফিল্ডে মাদক একটা ভয়াবহ সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সুনামহানির ভয় পেলে চলবে না।

রম্য কথা -পর্ব-(৩)

রিহ্যাব সেন্টারে ভর্তি করায়া প্রত্যেককে আলাদা আলাদা করে ট্রিটমেন্ট করানাে ছাড়া উপায় নাই। নাইলে এরা খালি নিজেরা নষ্ট হবে না, নিজের পরিবার আর বন্ধুবান্ধবদের কষ্ট দেবে না, এরা পুরা দেশটাকে ছারখার করে ফেলবে। | ওর বউ বলল, ঠিক আছে। ভর্তি থাকুক। ওর ছেলে বা মেয়ে এসে যেন দেখে বাবা ঠিক আছে। 

আমি বললাম, কবে এক্সপেক্ট করছেন। দেরি আছে। কেবল পাঁচ মাস চলছে। 

বলতে বলতে রানীভাবি কাঁদতে শুরু করলেন। সন্তানসম্ভবা একজন মহিলা এইভাবে কাঁদছেন । দেখে নিজের চোখই ভিজে আসতে লাগল। কোনাে মানে হয়! 

২৫ ডিসেম্বর ২০০৬ 

অটোগ্রাফের সন্ধানে এক বিকেল 

আজকাল দাওয়াত-আতঙ্কে ভুগি। নিজের তাগিদে যেতে হয় কত অনুষ্ঠানে, আবার নিজেকেই মেজবান হতে হয় কখনাে কখনাে। আমন্ত্রণপত্র দেখলেই গায়ে জ্বর আসে। আজ আমি কোথাও যাব না-এ রকম একটা শুক্রবার আর কখনাে কি আসবে না আর, এই পৃথিবীতে! 

কিন্তু আজকের শুক্রবারটা অন্য রকম। সকাল থেকেই মনটা আনন্দে নেচে উঠতে চাইছে। আজকে একটা অনুষ্ঠান আছে, প্রথম আলােরই অনুষ্ঠান, যেখানে যাব বলে সকাল থেকে মনের মধ্যে সাজ-সাজ রব। 

গ্রামীণফোন-প্রথম আলাে বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদের পুরস্কার দেওয়া হবে আজ। শেরাটনে, বিকেলে। আমার মেয়ে পদ্যরও উৎসাহ প্রচুর, কিন্তু আমার চেয়েও বেশি কি! মেয়ের হাতে একটা ডায়েরি তুলে দিলাম, রাগী গলায় বললাম, “রাখ এটা, অটোগ্রাফ নিবি না! পরে এসে তাে কান্দবি। রাগটা কৃত্রিম । পাছে মেয়ে বুঝে ফেলে বাবা নিজেই অটোগ্রাফ নিতে চাইছে। 

৫টায় অনুষ্ঠান। পৌনে ৫টায় বান্দা হাজির। শেরাটনের গেটে, মেটাল ডিটেক্টর তােরণের অভ্যর্থনা পেরােতে গিয়ে চোখে পড়ল ওই যে মাশরাফি। স্বয়ং। না, মাদাম তুসাে মিউজিয়ামের মােমের পুতুল নয়। লন্ডনে আমি আর পদ্য রােনালদো-পেলের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছি।

রম্য কথা -পর্ব-(৩)

এইখানে অরিজিনাল মাশরাফি বিন মুর্তজা। দ্য গ্রেট। পদ্য পদ্য, মাশরাফি। নে নে। আমার মেয়ে তার বাবার স্বভাব পেয়েছে, মুখচোরা। কাজেই বাবাকে তার চরিত্র বদলাতে হয়, ভাই মাশরাফি, কেমন আছেন, একটা অটোগ্রাফ দেন না!

এই ছেলে গত বছর ওয়ানডেতে সবচেয়ে বেশি উইকেট পেয়েছে পৃথিবী নামের এই গ্রহে! অথচ তার হাঁটুতে অপারেশন হয়েছে তিনবার। রােনালদোর সঙ্গে অন্তত এই একটা ক্ষেত্রে মিল। মাশরাফির সঙ্গে খাতির দেওয়ার জন্য বলি, চিনছেন তাে আমাকে, ওই যে মজিদ, কচি খন্দকার, নড়াইলের! মাশরাফি চিনতে পারে। নিজেকে ধন্য লাগে। আমার পরিচিত মাশরাফির পরিচিত। তাহার দুটি পালন করা ভেড়া, যখন ভাঙে আমার ক্ষেতের বেড়া, কোলের পরে নেই তাহারে তুলে। আমরা দুজন একটি গায়ে থাকি, সেই আমাদের একটিমাত্র সুখ। 

এনামুল হক জুনিয়র আসেন। মাশরাফিকে ডাকেন, হাই ম্যাশ। পদ্য আমার কনুইয়ে চিমটি দেয়। তার স্বাক্ষর নিয়ে আমরা ভেতরে যাই। 

বলরুমের সামনে এরই মধ্যে ক্রীড়াবিদদের হাট বসে গেছে। চাঁদের হাট। ওই যে জাভেদ ওমর। ওই যে পাইলট। এই পাইলট! কত দিনের চেনা ভেবে ডাক দিই। দিয়ে লজ্জা পাই। আজ থেকে দশ বছর ধরে আমরা পাইলটকে চিনি। উনি কেন আমাকে চিনবেন!

পাইলট বিনয়ী। বলেন, আমি তাে আপনাকে চিনি। পাইলট ২০০৪ সালের সেরা ক্রীড়াবিদের পুরস্কার পেয়েছিলেন। তাঁর প্রতিক্রিয়ায় তিনি একটা বাক্য বলে আমার চোখে পানি এনেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আইসিসি ট্রফির একটা নকআউটের খেলায় দলের বিপদের মুখে তিনি প্রার্থনা করেছিলেন, আমার প্রিয় কাউকে তুমি তুলে নাও, তবু আজকের খেলায় আমাদের জয় দাও। দেশের জন্য এ ধরনের স্যাক্রিফাইস করতে চাওয়া কি যা-তা কথা! 

রম্য কথা -পর্ব-(৩)

হেই আশরাফুল! আমি একজন একজন করে খেলােয়াড় দেখি আর এগিয়ে যাই। পদ্য তার স্বাক্ষরের খাতা এগিয়ে দেয় । হাবিবুল বাশার সদালাপী, হাস্যময়। পড়াশােনা করেন। গল্প-উপন্যাসও পড়েন বােধ হয়। তার সঙ্গে আগে থেকে পরিচয় আছে। তার দিকে এগিয়ে যেতে ভূমিকা লাগে না। তিনি এসেছেন সস্ত্রীক । একটু পরে সস্ত্রীক আসেন শাহরিয়ার নাফীস। 

অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাচ্ছে। উৎপল শুভ্র মাইক্রোফোনে। আমার টেনশন হচ্ছে। কে হবেন সেরা ক্রীড়াবিদ। আমি তাে শাহরিয়ার নাফীস ছাড়া কাউকে দেখি না। আজীবন সম্মাননা পেলেন রণজিৎ দাস। সেরা উদীয়মান ক্রীড়াবিদ হলেন সাকিব। ছেলেটা তাে দেখতেও দেবশিশুর মতাে। সেরা নারী ক্রীড়াবিদ হলেন রংপুরের মেয়ে জুই।

সেই সুবাদে আমরা জানতে পারলাম এই দেশে মেয়েদের খেলাধুলা করাটা দিন-দিন সহজ না হয়ে কঠিন হয়ে পড়ছে। জানতে পারলাম, পঞ্চাশ দশকের নামী অ্যাথলেট জিনাত হােসেনের বক্তৃতা থেকে। সবচেয়ে ঋদ্ধ হলাম অ্যাথলেটিকস কোচ কিতাব আলী আর এসএ গেমসে ১১০ মিটার হার্ডলসে সােনাজয়ী মিঠুর বক্তৃতায়। মিঠু হলেন বর্ষসেরা রানারআপ। বললেন, এক সেকেন্ডের দশ ভাগের এক ভাগ সময় কমানাের জন্য কত দীর্ঘ সাধনার দরকার হয়।

সময় যে মূল্যবান, এই অমূল্য কথাটা যা হােক জানা গেল আরেকবার। বর্ষসেরা রানারআপ আরেকজন হলেন মাশরাফি। আমি এই ছেলের দারুণ ভক্ত। আমি মনে করি, আগের বাংলাদেশ আর এখনকার বাংলাদেশের পার্থক্য দুজন, হােয়াটমাের আর মাশরাফি। 

রম্য কথা -পর্ব-(৩)

তায়কোয়ান্দো নামের খেলাটা কী, সেটাও জানতে পারলাম এই খেলায় এসএ গেমসে সােনাজয়ী মিজানের কথায়। আর তাদের সরল অভিযােগ, তাঁদের কথা কেন কেউ তেমন করে লেখে না! 

সবশেষে সেই টানটান উত্তেজনার ক্ষণ । কে হচ্ছেন বছরের সেরা? শাহরিয়ার নাফীস না হলে কি প্রতিবাদ জানাব? মেঘমল্লার নামে এক কিশাের তারই প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমিও কি যােগ দেব? না। শাহরিয়ার নাফীসই হলেন। অনুষ্ঠান শেষ হলাে ডেভ হােয়াটমােরের ছােট্ট বক্তৃতা দিয়ে। 

কিন্তু কেউ আর নড়ে না। চা-চক্রে জমে উঠল আড্ডা। ওই তাে ফুটবলার আসলাম ভাই। ওই তাে লিপু ভাই। ফুটবলার সালাউদ্দিন ভাই কি চলে গেলেন । ডানা আপা, ভালাে আছেন? লিনু? ঘরে যত মহিলারা ঘুরে ফিরে চলে, বাংলাদেশের ভবিষ্যতের কথা মনে মনে বলে। আমি চোখ বড় বড় করে এদের দেখছি। ছােটবেলায় গােলকিপার শান্টুর জয়গান শুনে স্বপ্ন দেখতাম বড় হয়ে গােলকিপার হব।

আমরা অবশ্য বলতাম গােলকি। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। ক্রিকেট খেলতে গিয়ে ব্যাটসম্যানের সামনে ক্যাচিং পজিশনে দাড়িয়ে একদিন পিঠে ব্যাটের বাড়ি খেয়েছিলাম। ভাগ্যিস সমানতলটা লেগেছিল, ব্যথা পাইনি। কিন্তু খেলােয়াড়দের জন্য ভালােবাসাটা কমেনি একটুও। বরং দিন দিন বাড়ছে। আদেখলার মতাে করে এই তারার মেলা দেখছি। শাে-বিজ তারকাদের সঙ্গে তাে নানা অনুষ্ঠানে সারাক্ষণই দেখা হয়।

ওদের দেখে আর নিজের ভেতরের শিশুটি জেগে ওঠে না। খেলােয়াড়দের দেখলে মনে হয় ফ্যান বনে যাই। নিজের ভারাক্রান্ত বর্তমান ভুলে চলে যাই শৈশবের দিনগুলােয়। সেইটা খুব স্বাস্থ্যকর আর অমূল্য বলে মনে হচ্ছে। 

আবার কবে এই অনুষ্ঠানটা হবে? আবার কবে যাব? 

আসিফকে দেখে মায়া লাগল। হায় রে কমনওয়েলথজয়ী শ্যটার। পুলিশ তােমাকে মেরে হাত ভেঙে দিয়েছে। কেন বাবা পুলিশের ড্রাইভারের সঙ্গে গণ্ডগােল করতে গেলে ওই তাে টেংকু ভাই, ক্রীড়া আলােকচিত্রী। পুলিশ তাে চট্টগ্রামে তাকেও মেরেছিল। গত বছরের সেরা পারফরমার তাে পুলিশই। শুভ্র এই কথাটা বলতে ভুলে গেল! 

ভুলে গেলেই ভালাে। যেমন এখন এই অনুষ্ঠানে থেকে ভুলে যাচ্ছি, বাইরে জরুরি অবস্থা! আমাদের মৌলিক অধিকারগুলাে সব স্থগিত হয়ে আছে। 

২১ জানুয়ারি ২০০৭

 

Read more

রম্য কথা -পর্ব-(৪)-আনিসুল হক

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *