রম্য কথা -পর্ব-(৫)-আনিসুল হক

রম্য কথা

আবার কৌতুকের ছলে বলে যাই ভাগ্যিস, এই জরুরি অবস্থা জনগণমনধন্য। গণমাধ্যম-বান্ধব। নইলে সত্যি সত্যি যদি মত প্রকাশের সব অধিকার কেড়ে নেওয়া হতাে, তাহলে হয় কারাগারে যেতে হতাে, নইলে লিখতে হতাে লাল শাকের উপকারিতা, কাঁচা পায়খানার স্বাস্থ্যঝুঁকি, পৌষ-সকালে শীতের পিঠা নিয়ে। এই সরকারের নীতিনির্ধারকদের ধন্যবাদ যে, এক দিনের মধ্যেই তারা কারফিউ ও গণমাধ্যমের ওপরে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছেন। 

এই সুযােগে কতগুলাে কৌতুক বলে নিই। নতুন কৌতুক পাচ্ছি না। পুরােনাে দিয়েই চালাই। 

একদিন এক লােক কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বালির নিচে একটা প্রদীপের মতাে কী দেখল সেটা হাতে নিয়ে বালি পরিষ্কার করবার জন্যে যেই না সে ঘষা দিয়েছে, অমনি বেরিয়ে এল সেই বিখ্যাত রূপকথার আলাউদ্দিনের দৈত্য। বলল, আপনার একটা ইচ্ছা আমি পূরণ করব। আপনি বলেন, আপনি কী চান?  লােকটি বলল, এই যে সমুদ্র, এইটার ওপরে একটা ব্রিজ বানিয়ে দাও, আমেরিকা পর্যন্ত। | দৈত্য বলল, স্যার, আপনি বেশি চাচ্ছেন। এর আগে আন্তঃমহাদেশীয় সেতু তাে পৃথিবীতে হয় নাই। মহাসাগরের ওপরে সেতু। এইটা কি সম্ভব? কত ইঞ্জিনিয়ার, কত মিস্ত্রি, কত লােহা লাগবে, ইয়ত্তা আছে?

রম্য কথা -পর্ব-(৫)

তার ওপর এটা আদৌ ফিজিবল কি না, সেটাও তাে দেখতে হবে ! আপনি অন্য আরেকটা আদেশ দেন। | লােকটা বলল, আচ্ছা, তাহলে একটা কাজ করাে, আমেরিকা তাে পৃথিবীর ঠিক উল্টো পিঠে। বাংলাদেশ থেকে একটা ফুটা করে তা আমেরিকাতে বার করাে। সেই ফুটায় ট্রেন লাগায়া দাও । সরাসরি আমেরিকাতে চলে যাব । | দৈত্য বলল, এইটাও প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব কি না, আমি ঠিক শিওর না । পৃথিবীটা এফোড়-ওফোড় করতে হলে পৃথিবীর মধ্যখানে গনগনে আগুনের স্তর পার হতে পারে। সেটার ভেতর দিয়ে ট্রেন চলবে কিনা…আপনি বরং আরেকটা আদেশ করেন। 

লােকটা বলল, বাংলাদেশে এমন একটা নির্বাচন করাে, যেটা সুষ্ঠু হয়েছে বলে উভয় জোটই মেনে নেবে, যেটাতে থাকবে না পেশিশক্তি ও দুর্নীতিবাজদের সামান্যতম প্রভাব,… 

লােকটা তালিকা দীর্ঘ করতে চেয়েছিল। দৈত্য তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, দাঁড়ান, দাঁড়ান, তালিকা আর দীর্ঘ করতে হবে না। উভয় জোটকে খুশি করার নির্বাচন করা আমার পক্ষে সম্ভব না। আপনি বরং বলেন, আগের দুইটা ইচ্ছার কোনটা আপনি পূরণ করতে চান। আমি কাজে লেগে পড়ছি। | ফখরুদ্দীন আহমদের নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে আমাদের চাওয়ার সীমা নাই। তাঁরা ভােটার-পরিচয়পত্র করবেন, নির্ভুল ভােটার তালিকা করবেন, দুর্নীতি ও সন্ত্রাস দূর করবেন, বিদ্যুৎ দেবেন, প্রশাসনকে ঢেলে সাজাবেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিধান করবেন, তারপর যথাশিগগির সম্ভব একটা নির্বাচনও দেবেন। আর সেই নির্বাচন হবে সুষ্ঠু, সর্বজনগ্রাহ্য । 

রম্য কথা -পর্ব-(৫)

এর চেয়ে মহাসাগরের ওপরে সেতু বানানাে কি সহজ নয়? তবে, সুযােগ যখন পাওয়া গেছে, যতদূর সম্ভব জঞ্জাল পরিষ্কার করতে হবে। জঞ্জাল কারা বানিয়েছে? আবার কৌতুক বলতে হয়। এইটাও পুরােনাে কৌতুক: 

ডাক্তার, প্রকৌশলী আর রাজনীতিবিদের বাহাস বসেছে। কাদের পেশা। আদিতম? 

ডাক্তার বলল, অবশ্যই আমারটা। কারণ, যেদিন আদমকে সৃষ্টি করা হলাে, তার পাঁজরের হাড় থেকে হাওয়াকে, সেদিনই তাে অপারেশনের জন্যে ডাক্তারি শাস্ত্রের দরকার হয়েছিল। 

প্রকৌশলী বলল, তারও আগে মহাজগৎটা ছিল বিশৃঙ্খল । সেটাকে ঈশ্বর শৃঙ্খলাবদ্ধ করলেন। কাজেই তখনই দরকার হয়েছিল প্রকৌশল শাস্ত্রের । কাজেই দেখা যাচ্ছে, আমাদের পেশাটাই আদিতম।রাজনীতিবিদ মুচকি হেসে বললেন, কিন্তু মহাজগতে ওই বিশৃঙ্খল পরিবেশটা কে সৃষ্টি করেছিল। কাজেই রাজনীতিই পৃথিবীর আদিতম পেশা। 

এই লেখাটা লেখার জন্যে আমি ইন্টারনেটে বসে বিভিন্ন জোক সাইটে টু মেরেছি। প্রথম যে কৌতুকটা পেয়েছিলাম, সেটা হলাে, বাবা আর মা ভাবছেন, তার কৈশাের-উত্তীর্ণ ছেলে বড় হলে কী হবে । আচ্ছা একটা পরীক্ষা করা যাক। ছেলে যখন ঘরে আসবে, তার আগে তারা ঘরে কিছু ডলার, একটা বাইবেল আর একটা 

হুইস্কির বােত রেখে দিলেন। ছেলে যদি ডলার নেয়, বুঝতে হবে, সে বড় হয়ে ব্যবসায়ী হবে, ছেলে যদি বাইবেল নেয় তাহলে সে ধার্মিক হবে আর যদি সে নেয় বােতলটা, তাহলে–সর্বনাশ, সে বড় হয়ে একটা বেহেড় মাতালই হবে।ছেলে ঘরে ঢুকছে। বাবা-মা আলমারির ভেতরে ঢুকে লুকিয়ে রইলেন। 

রম্য কথা -পর্ব-(৫)

ছেলেটা ঘরে ঢুকে সব দেখে প্রথমে মানিব্যাগে টাকা ভরল, তারপর বাইবেলটা থলেয় পুরল, তারপর বােতলটা। বােতলটা খুলে পান করতে করতে সে বেরিয়ে গেল। বাবা-মা আর্তনাদ করে উঠলেন, ছেলে তাে বড় হয়ে রাজনীতিবিদ হবে ।রাজনীতিবিদদের নিয়ে এইসব রসিকতা আর করছি না। আমি সত্য সত্য বিশ্বাস করি, সব পেশাতেই ভালাে মানুষ আছে, সব পেশাতেই খারাপ মানুষ আছে। আর ভালাে মানুষের সংখ্যাই এই দেশে বেশি। সব পেশাতেই ।

আর আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, এই দেশটা স্বাধীন হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানের মতাে একজন সর্বস্বত্যাগী ও সর্বোচ্চ ত্যাগে প্রস্তুত ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ রাজনীতিবিদের জন্যে, তাজউদ্দীন আহমদ নামের এক বিজ্ঞ ও সুবিবেচক ত্যাগী মানুষের হাল ধরে থাকার জন্যে; মুক্তিযােদ্ধাদের বীরত্ব, শহীদদের আত্নত্যাগ ও সাড়ে সাত কোটি মানুষের সবার অংশগ্রহণ, ত্যাগস্বীকার ও প্রবল ইচ্ছাশক্তির কারণে। কিন্তু সাড়ে সাত কোটি মানুষ যে এক হতে পেরেছিল, তাও সম্ভব হয়েছিল রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণেই। 

নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানও হতে পেরেছিল তিন জোটের রূপরেখা প্রণীত হওয়ার পরেই । 

তবে সত্য বটে, হুমায়ুন কবির বা শেরেবাংলা ফজলুল হক বা মাওলানা আবুল কালাম আজাদদের মতাে মেধাবী, শিক্ষিত ত্যাগী নেতার সংখ্যা দেশে কমে আসছে। কী রেখে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বা তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, নজরুল ইসলাম-মৃত্যুর আগে? কয়টা বাড়ি, কত বিঘা জমি, কত কত ব্যবসা! কিছু না। নিজেদের উন্নতির জন্যে আগে কেউ রাজনীতি করতেন না। এখন নিজেদের উন্নতির জন্যে রাজনীতি করে না, এমন মানুষই কম। তবু নিজেরা দুর্নীতি করে অর্থসম্পদ লুট করেননি, এমন নেতা এখনাে এই দেশে আছেন। যেমন আছেন মতিয়া চৌধুরী। যেমন ছিলেন শাহ এ এম এস কিবরিয়া। নুরুল ইসলাম নাহিদকেও সেই দলে ফেলা যাবে । 

কিন্তু আজকে ছাত্রনেতা মানেই বড় গাড়ি, দামি মােবাইল ফোনসেট । যুবনেতা মানেই দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডার । এই অবস্থা থেকে অবশ্যই আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে । এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার সেই ঘুরে দাড়ানাের স্বপ্নটা বুনে চলুক। 

অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ প্রথম আলাের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যার লেখায় কয়েকটা কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা হাজার বছর ধরে বলে 

 

Read more

রম্য কথা -পর্ব-(৬)-আনিসুল হক

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *