সে আরেক গল্প।
বরং একজন খাদ্যমন্ত্রীর গল্প বলি । তিনি গেছেন উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে বললেন, কোথায় মঙ্গা। আমি তাে কোনাে মঙ্গা দেখি না। এক চরে গিয়ে তিনি দেখলেন, একজন লােক কাশ চিবিয়ে খাচ্ছে।
তুমি এই ঘাস খাচ্ছ কেন? স্যার, আমার খাবার নাই।
আচ্ছা তাহলে তুমি চলাে আমার সঙ্গে ঢাকায়।
স্যার, আমার বউও স্যার খাইতে পায় না।
ও-ও কি ঘাস খায়? জি স্যার। ওকে নিয়ে চলাে। স্যার আমার ছয় ছেলেমেয়ে। ওদেরও নিয়ে চলাে। যদি কি না ওরা ঘাস খায়। জি স্যার, গত সাত দিন আমরা কাইশা খায়াই আছি।
মন্ত্রী ওদের ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছেন। চামচা বলল, স্যার, আপনার দয়ার শরীর। ভুখা একটা ফ্যামিলির দায়িত্ব নিলেন।
আরে বেটা গাধা, মন্ত্রী বললেন, আমার বাড়ির লনের ঘাসগুলাে বড় হয়ে গেছে। এদের নিয়ে গেলে আর কষ্ট করে ঘাস কাটাতে হবে না।
পুনশ্চ: শুনতে পাচ্ছি, দেশে আইন হবে-যে ফেরারি দুর্নীতিবাজ গডফাদাররা ধরা দেবেন না, তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে। তাহলে ওইসব প্রাসাদে কি উচ্ছেদ হওয়া বস্তিবাসীর জায়গা দেওয়া যায় না? এই মাঘের শেষে যখন ধন্যি রাজার পুণ্যি দেশে বৃষ্টি হচ্ছে, তখন ওই ঘরহারা বস্তিবাসী কোথায় রাত কাটাচ্ছে, কে জানে?
রম্য কথা -পর্ব-(৭)
৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৭
বই কিনব না, কিনব না, কিনব না । বই কেন কিনব? বই পড়ে কী হয়? শিল্প-সাহিত্যের কী–বা এমন ক্ষমতা?
বই কী করতে পারে? কবিতার শক্তি কতটুকুন? কী করতে পারে একটা ভালাে উপন্যাস কিংবা চিত্রকলা? কী করতে পারে ব্যালাড অব আ সােলজার বা ক্রেইনস আর ফ্লাইং–এর মতাে একটা ছবি? স্টেডিয়ামের উইকেট পড়া কি বন্ধ করতে পারে কবিতা? শেয়ার মার্কেটের দরপতন ঠেকাতে পারে? মহাযুদ্ধ বন্ধ করতে পারে? ইরাকের নিস্পাপ শিশুদের ছবি আমরা দেখেছি ইন্টারনেটে, মাথাভরা স্প্রিন্টারের আঘাত নিয়ে একেকটা শিশু কী বেদনায় পৃথিবীর সমুদয় কষ্ট আর বিষাদ ধারণ করে মূক চেয়ে আছে! বই কি সেই শিশুর পাশে দাঁড়াতে পেরেছে?
না, পারেনি। তাই আমরা বই পড়ব না। বই কিনব না। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলার আগে বুশ সাহেবকে নিয়ে প্রচলিত পুরােনাে কৌতুকটা আরেকবার বলে নিই।
স্বর্গের দরজায় একে একে যাচ্ছেন স্বর্গপ্রাপ্তরা। প্রথমে গেলেন আইনস্টাইন। স্বর্গের প্রহরী তাকে আটকে ফেলল। আপনি?
আমার নাম আলবার্ট আইনস্টাইন। আমি একজন বিজ্ঞানী। পৃথিবীর জ্ঞানের জগৎকে আমি পাল্টে দিয়েছি। স্বর্গ অবশ্যই আমার প্রাপ্য।
আচ্ছা আচ্ছা। আমরা আপনার নাম জানি। আপনার স্বর্গে আসবার কথা। তবে আপনিই যে আইনস্টাইন তার কি কোনাে প্রমাণ আছে? কোনাে আইডি কার্ড?
, আইডি কার্ড তাে আমার নাই। তাহলে আপনি একটা কিছু করে দেখান, যাতে আমরা বুঝতে পারি আপনিই সেই বিখ্যাত বিজ্ঞানী। আইনস্টাইন তখন একটা কাগজে লিখলেন ই ইকুয়াল টু এমসি স্কয়ার। তারপর স্বাক্ষর করে দিলেন । প্রহরী হেসে বলল, ঠিক আছে ঠিক আছে স্যার, আপনিই মহান সেই ব্যক্তি, আপনি ভেতরে প্রবেশ করুন।
রম্য কথা -পর্ব-(৭)
এরপর এলেন পাবলাে পিকাসাে। তাকেও প্রহরী আটকে দিল। কারণ তার কাছেও পরিচয়পত্র নাই। শেষে পিকাসাে তার বিখ্যাত পায়রার ছবিটা একটানে এঁকে নিচে স্বাক্ষর করে দিলেন। প্রহরী খুশিতে গদগদ হয়ে বলল, স্যার, আপনি স্বর্গে প্রবেশ করুন। কোনােই সন্দেহ নাই যে আপনিই সেই মহান শিল্পী।
তারপর এলেন প্রেসিডেন্ট বুশ। স্যার, আপনি? আমি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বুশ। আমি অবশ্যই স্বর্গে ঢুকব। | নিশ্চয়ই স্যার। কিন্তু আপনিই যে বুশ, তার কোনাে প্রমাণ আছে? কোনাে পরিচয়পত্র?
পরিচয়পত্র? আমিই সারা পৃথিবীর লােকদের পরিচয়পত্র দিয়ে থাকি, আমাকে কে পরিচয়পত্র দেবে! ওইসব আমার কাছে নাই ।
তাহলে স্যার আপনি একটা কিছু করে দেখান, যাতে আমরা বুঝতে পারি, আপনিই সেই মহাপরাক্রমশালী বুশ।
বুশ বললেন, তােমার এত বড় স্পর্ধা। তুমি আমার কাছে পরিচয়ের প্রমাণ চাও! তুমি জানাে আমি কত বড় ক্ষমতাশালী মানুষ। আমি ইচ্ছা করলে পৃথিবীটাকে ধ্বংস করে দিতে পারি।
ও আপনি অনেকটা করে ফেলেছেন বটে। তবে প্রমাণ ছাড়া আপনাকে ঢুকতে দিতে পারি না, তা আপনি যত বড় মানুষই হন না কেন! এর আগে আলবার্ট আইনস্টাইন ও পাবলাে পিকাসােও তাদের পরিচয়ের প্রমাণ দিয়ে গেছেন। বিস্মিত কণ্ঠে বুশ বললেন, আইনস্টাইন, পিকাসাে-এঁরা আবার কারা?
স্বর্গের প্রহরী সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, বুঝেছি বুঝেছি বুঝেছি, আপনিই প্রেসিডেন্ট বুশ। আপনি ভেতরে ঢুকতে পারেন।
রম্য কথা -পর্ব-(৭)
হ্যা, জর্জ ডব্লিউ বুশ হচ্ছেন তেমনই এক ব্যক্তি, যিনি পিকাসাে বা আইনস্টাইনের নাম শুনেছেন কি না এ সন্দেহ নিঃসন্দেহে প্রকাশ করা যায়।
ফলে এর পক্ষেই সম্ভব গণবিধ্বংসী অস্ত্রভাণ্ডার আছে, বা তুই আমার পানি ঘােলা করছিস কেন বলে ইরাকের ওপরে ঝাপিয়ে পড়া। নির্বিচারে ক্লাস্টার বােমা ফেলা ইরাকের জনবসতিতে, বিক্ষত বিকলাঙ্গ করা অসংখ্য নিরপরাধ শিশুকে।
কিন্তু এই ব্যক্তিটিই যদি ছােটবেলা থেকে সংস্পর্শে আসতেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থগুলাের, স্পর্শ পেতেন সেরা সাহিত্যগুলাের, রসাস্বাদন করতেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চিত্রকলাগুলাের, উপভােগ করতেন পৃথিবীর উৎকৃষ্ট সংগীত কিংবা চলচ্চিত্র, এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বড় হয়ে যদি তিনি একদিন অধিষ্ঠিত হতেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পদটিতে, তাহলে পৃথিবীর ইতিহাস আজ অন্যভাবে লিখতে হতাে। ওই ব্যক্তিটির পক্ষে আর সম্ভব হতাে না ব্যাবিলনের মতাে ঐতিহাসিক স্থান ধ্বংস করা, শিশুরা আছে এই রকম সম্ভাবনাপূর্ণ স্থানের আশপাশে বােমা ফেলা।
Read more
